দুই পা হারানো সাখাওয়াতের হাতে হুইলচেয়ার ও এক মাসের বাজার
গাজীপুর বন্ধুসভার উদ্যোগে হুইলচেয়ার, নিত্যপণ্য ও দুই সন্তানের শিক্ষাসামগ্রী পেলেন সাখাওয়াত হোসেন
গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি · গাজীপুর
প্রকাশ:
জীবনসংগ্রামে হার না মানা সাখাওয়াত হোসেন চার বছর আগে অসুস্থতার কারণে দুই পা হারান। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও আর্থিক সংকটে জর্জরিত সাখাওয়াত পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চরম অসহায়ত্বের মুখে পড়েন। সংসারের হাল ধরতে দেড় বছর আগে শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার নংগরপাড়া থেকে তিনি গাজীপুরে চলে আসেন। তবে দুই পা না থাকায় কাজ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত জীবিকা নির্বাহের জন্য ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেন তিনি। বর্তমানে তিনি জয়দেবপুর রেলস্টেশন ও গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে ভিক্ষা করে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে জয়দেবপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার মুক্তারটেক নিয়ামত সড়কের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘ ছয় মাস ধরে একটি হুইলচেয়ারের জন্য বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ঘুরেও কোনো সহায়তা পাননি সাখাওয়াত। অভাবের সংসারে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারের টাকা জোগানো তাঁর জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সাখাওয়াতের এই বাস্তবতার কথা জানতে পেরে গাজীপুর বন্ধুসভা তাঁদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একটি ভালো কাজ’ কর্মসূচির আওতায় ২৭ অক্টোবর তাঁকে একটি হুইলচেয়ার, পরিবারের জন্য এক মাসের বাজার এবং দুই সন্তানের জন্য এক বছরের শিক্ষাসামগ্রী উপহার দিয়েছে।
উপহার হিসেবে দেওয়া বাজারের মধ্যে ছিল চাল, ডাল, আটা, তেল, আলু, পেঁয়াজ, লবণ, রসুন, চিনি, মুড়ি, ডিম, সুজি, সাবান, হলুদ, মরিচ, ধনে, মসলা, জিরাগুঁড়া, দুধ, ভিমবার, হুইল পাউডার ও নুডলস। এ ছাড়া শিক্ষাসামগ্রীর তালিকায় ছিল স্কুলব্যাগ, খাতা, পেনসিল, রাবার, পেনসিল বক্স, ক খ গ–এর গল্প, বর্ণ থেকে গল্প, এসো বাংলা শিখি প্রথম ভাগ ও রংপেনসিল।
হুইলচেয়ার পেয়ে আবেগাপ্লুত সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘একটা হুইলচেয়ারের জন্য ছয় মাস ধরে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ঘুরেছি। কেউ এই সাহায্যটুকুও করেনি। এই চেয়ার ও এক মাসের বাজার পেয়ে আমার অনেক উপকার হলো। আল্লাহ আপনাদের অসিলায় আমাকে বাঁচালেন। বই, ব্যাগ ও খাতা পেয়ে আমার বাচ্চাদেরও অনেক উপকার হলো। আমার নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তাই বাচ্চাদের খাতা-কলম কিনে দিতে পারি না।’
সাখাওয়াতের স্ত্রী জানান, ‘আমার মেয়ে সাদিয়াকে বই-খাতা ও ব্যাগ দিয়েছেন, খুব উপকার হলো। অনেক দিন ধরে মেয়েটা হাতে করে বই নিয়ে স্কুলে যায়। বাজার কেনার টাকাও থাকে না। অনেক দিন পর ভালো-মন্দ খেতে পারব।’ সাত বছর বয়সী মাদ্রাসাপড়ুয়া সাদিয়া আক্তার শিক্ষাসামগ্রী পেয়ে জানায়, ‘আমি এখন থেকে মন দিয়ে পড়াশোনা করব আর তোমাদের জন্যে দোয়া করব।’
বিজ্ঞাপন
গাজীপুর বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসেন বলেন, ‘প্রথম আলোর ২৮ বছর পূর্তি উপলক্ষে আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। প্রতিবছরের মতো এবারও আমাদের বন্ধুরা একটি ভালো কাজ করেছে। আমাদের সব বন্ধুই মানবিক। সবাইকে শুভেচ্ছা জানাই।’ সভাপতি বাবুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বরাবরের মতো এবারও একটি ভালো কাজ করতে পেরেছি। আমাদের বন্ধুরা মানবিক বন্ধু হিসেবে এগিয়ে যাবে।’
এ বিষয়ে মাসুদ রানা বলেন, ‘এমন একটি ভালো কাজের জন্য বন্ধুদের অনেক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ। আমার মনে হয়, এই সহায়তা তাঁর অনেক কাজে লাগবে। এক মাসের বাজার ও হুইলচেয়ার দিয়ে তাঁর পাশে থাকতে পেরে আমাদের খুব ভালো লাগছে। গাজীপুর বন্ধুসভার সব বন্ধুকে এমন দারুণ কাজের জন্যে ভালোবাসা জানাই। তবে সাখাওয়াতের জন্য শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তাই নয়, দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও জরুরি।’ পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম যোগ করেন, ‘সাখাওয়াতের জন্য একটি স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার বিষয়ে আমরা কথা বলেছি। তাঁকে কাজ খুঁজে দিতে বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা করছি।’
প্রথম আলোর গাজীপুর অফিসের নিচে সাখাওয়াতের হাতে এই উপহারসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। বন্ধুসভার সদস্যরা তাঁকে বাসা থেকে নিয়ে আসেন। এ সময় গাজীপুর বন্ধুসভার সহসভাপতি আশিকুল ইসলাম খান, সাংগঠনিক সম্পাদক নাছির উদ্দিন, দপ্তর সম্পাদক মারফুয়া আহম্মেদ, মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক তামিম মল্লিক, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া সম্পাদক ইতিহাস সরকার, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সম্পাদক মো. ইসমাইল, কার্যনির্বাহী সদস্য ইয়াকিনুর ইসলাম ভূঁইয়া এবং বন্ধু মারুফ আল ইমন, রাহুল হোসেন, বৃষ্টি আক্তার, নাঈমা আক্তার, আফরিন জাহান, ফাতেমা আক্তার ও মাহমুদুল হাসানসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।