পিকনিক স্পট ঢাকা: পরিবার ও অফিসের আয়োজনের জন্য সেরা জায়গা
ট্রাভেল ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
শীত এলেই অফিসে, পাড়ায় আর আত্মীয়স্বজনের দলে একটা প্রশ্ন ঘুরতে থাকে: এবার পিকনিক কোথায়? ঢাকা শহরের ভেতরে খোলা জায়গা কম, তাই বেশির ভাগ আয়োজন হয় শহরের সীমানা পেরিয়ে গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ বা পূর্বাচলের দিকে। এক-দেড় ঘণ্টার পথ পেরোলেই গাছপালা, মাঠ আর পুকুরঘেরা পরিবেশ পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
পিকনিক স্পট ঢাকা বলতে মোটামুটি দুই ধরনের জায়গা বোঝায়। একটি হলো সরকারি উদ্যান ও দর্শনীয় স্থান, যেমন ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান বা সোনারগাঁও। এগুলোতে প্রবেশ টিকিট কম, তবে নিয়মকানুন বেশি। অন্যটি হলো ব্যক্তিমালিকানাধীন পিকনিক স্পট ও রিসোর্ট, যেগুলো পুরো দিনের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। এগুলোতে খরচ বেশি, কিন্তু রান্না, খেলাধুলা ও অনুষ্ঠানের স্বাধীনতাও বেশি।
কোনটি বেছে নেবেন, তা নির্ভর করে দলের আকার, বাজেট আর কী ধরনের আয়োজন চান তার ওপর। পরিবারের ছোট দলের জন্য উদ্যান যথেষ্ট, অফিসের শখানেক মানুষের অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া নেওয়া স্পটই সুবিধাজনক।
ঢাকার আশেপাশে জনপ্রিয় পিকনিক স্পট
১. ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান, গাজীপুর: ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে, রাজধানী থেকে আনুমানিক ৪০ কিলোমিটার দূরে। শালবনের ভেতর বন বিভাগের নির্ধারিত কয়েকটি পিকনিক স্পট আছে, যেগুলো দলগতভাবে বরাদ্দ নিতে হয়। বনের ভেতর হাঁটার পথ, লেক আর বিশাল খোলা জায়গা থাকায় শীতকালে এখানে প্রচুর দল আসে। বরাদ্দের জন্য উদ্যান কর্তৃপক্ষ বা বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট অফিসে আগেভাগে যোগাযোগ করতে হয়।
বিজ্ঞাপন
২. জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান, মিরপুর: শহরের ভেতরেই বিশাল সবুজ এলাকা, পাশেই জাতীয় চিড়িয়াখানা। পরিবার নিয়ে দিনের বেলা হালকা খাবার সঙ্গে নিয়ে ঘোরার জন্য উপযুক্ত। বড় দলের রান্নাবান্নার আয়োজনের জায়গা নয়, তাই এখানে আয়োজন হয় ছোট পরিসরে।
৩. সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘর ও পানাম নগর, নারায়ণগঞ্জ: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে মোগরাপাড়া হয়ে যেতে হয়। লোকশিল্প জাদুঘরের চত্বর, পুকুর আর পাশের পানাম নগরের পুরোনো বাড়িঘর মিলিয়ে শিক্ষাসফর ও পারিবারিক ভ্রমণের জন্য জনপ্রিয়। দলগত আয়োজনের নিয়ম কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আগে জেনে নিন।
৪. জিন্দা পার্ক, রূপগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে, পূর্বাচলের কাছে। স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই পার্কে গাছপালা, জলাশয় আর গ্রামীণ পরিবেশ মিলে শান্ত একটা আবহ আছে। পরিবার ও ছোট দলের কাছে এটি প্রিয়।
৫. গাজীপুরের সাফারি পার্ক: শ্রীপুরের এই সাফারি পার্কে খোলা পরিবেশে বন্যপ্রাণী দেখা যায়। শিশুদের নিয়ে যাওয়ার জন্য ভালো, তবে এখানে রান্নার আয়োজন নয়, বরং ঘুরে দেখাই মূল।
বিজ্ঞাপন
৬. নুহাশ পল্লী, গাজীপুর: প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের এই বাগানবাড়ি গাজীপুরের পিরুজালীতে। গাছপালা, দিঘি আর ভাস্কর্যের জন্য সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। প্রবেশ ও দলগত ভ্রমণের নিয়ম কর্তৃপক্ষের কাছে জেনে যান।
৭. মাওয়া ও পদ্মার পাড়: ঠিক পিকনিক স্পট না হলেও দিনের ভ্রমণে নদীর পাড়ে সময় কাটানো আর তাজা মাছ খাওয়ার জন্য অনেকে মাওয়া যান। পদ্মা সেতু হওয়ায় যাতায়াত সহজ হয়েছে।
অফিস ও বড় দলের জন্য ব্যক্তিগত পিকনিক স্পট
পঞ্চাশ থেকে কয়েক শ মানুষের অনুষ্ঠানে সরকারি উদ্যানে জায়গা পাওয়া আর সব আয়োজন করা কঠিন। তাই অফিস, স্কুল-কলেজের পুনর্মিলনী বা বড় পারিবারিক আয়োজনের জন্য অনেকে ব্যক্তিমালিকানাধীন পিকনিক স্পট ভাড়া নেন। গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা, সাভার-আশুলিয়া, পূর্বাচল-রূপগঞ্জ আর মুন্সিগঞ্জের দিকে এমন বহু স্পট গড়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
এসব জায়গায় সাধারণত খোলা মাঠ, ছায়াঘেরা বসার জায়গা, রান্নার ব্যবস্থা, শৌচাগার, বিশ্রামের ঘর আর কোথাও কোথাও পুকুর বা সুইমিং পুল থাকে। কেউ শুধু জায়গা ভাড়া দেয়, রান্না নিজেদের করতে হয়। কেউ খাবার, সাজসজ্জা, সাউন্ড সিস্টেম, খেলাধুলার সরঞ্জামসহ পুরো প্যাকেজ দেয়।
ব্যক্তিগত স্পটের সুবিধা হলো পুরো জায়গা নিজেদের দখলে থাকে, অপরিচিত লোকের ভিড় থাকে না, অনুষ্ঠান ও খেলাধুলা নির্বিঘ্নে করা যায়। অসুবিধা হলো খরচ বেশি, আর শীতের মৌসুমে ভালো দিনগুলো কয়েক সপ্তাহ আগেই বুক হয়ে যায়।
পিকনিক স্পট ভাড়া নেওয়ার আগে যা যাচাই করবেন
১. নিজে গিয়ে দেখুন: অনলাইনের ছবি আর বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। আয়োজক দলের অন্তত দুজন আগে গিয়ে জায়গাটি দেখে আসুন।
বিজ্ঞাপন
২. কী কী অন্তর্ভুক্ত: ভাড়ার মধ্যে বিদ্যুৎ, জেনারেটর, রান্নার জায়গা, চেয়ার-টেবিল, শৌচাগার, পানি, পার্কিং আছে কি না লিখিতভাবে নিন।
৩. ধারণক্ষমতা: আপনার দলের মানুষের সংখ্যা অনুযায়ী জায়গা, শৌচাগার ও বসার ব্যবস্থা যথেষ্ট কি না দেখুন। নারী ও শিশুদের জন্য আলাদা বিশ্রামের ঘর থাকলে ভালো।
৪. একই দিনে আর কারা: বড় স্পটে একই দিনে একাধিক দলকে ভাড়া দেওয়া হয় কি না জেনে নিন। পুরো স্পট আপনার হলে চুক্তিতে সেটি লিখিয়ে নিন।
৫. সময়সীমা ও শব্দের নিয়ম: কটা থেকে কটা পর্যন্ত থাকা যাবে, মাইক বা সাউন্ড সিস্টেম কতক্ষণ বাজানো যাবে, তা আগে জেনে নিন।
বিজ্ঞাপন
৬. অগ্রিম ও বাতিলের শর্ত: অগ্রিম কত দিতে হবে, বৃষ্টি বা জরুরি কারণে তারিখ বদলানো যাবে কি না, টাকা ফেরতের নিয়ম কী, সব রসিদসহ লিখিত রাখুন।
খরচের একটি আনুমানিক ধারণা
সরকারি উদ্যানে প্রবেশ টিকিট জনপ্রতি সাধারণত কম, আর নির্ধারিত পিকনিক স্পট বরাদ্দের জন্য আলাদা ফি লাগে। ব্যক্তিগত পিকনিক স্পটে শুধু জায়গার দিনভাড়া আকার ও সুবিধাভেদে আনুমানিক ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকার বেশি পর্যন্ত হতে পারে।
খাবারসহ প্যাকেজ নিলে সাধারণত জনপ্রতি হিসাব হয়, মেনুভেদে আনুমানিক ৮০০ থেকে ২০০০ টাকা বা তারও বেশি। এর বাইরে বাস ভাড়া, সাজসজ্জা, পুরস্কার ও খেলাধুলার সরঞ্জামের খরচ যোগ করুন। একটি ৪০ আসনের বাস ঢাকা থেকে গাজীপুর যাওয়া-আসার জন্য সারা দিনের ভাড়া মৌসুমভেদে আনুমানিক ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
বাজেট নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুক্রবারের বদলে শনিবার বা সপ্তাহের মাঝের দিন বেছে নিন, তাতে ভাড়া কম হয় এবং রাস্তায় যানজটও কম থাকে।
আয়োজনের দিন যা মাথায় রাখবেন
সকাল সকাল রওনা: ঢাকা থেকে বেরোতে যানজটে সময় লাগে। সকাল সাতটার মধ্যে বাস ছাড়লে দুপুরের আগেই অনুষ্ঠান শুরু করা যায়।
তালিকা ও দায়িত্ব ভাগ: খাবার, খেলাধুলা, প্রাথমিক চিকিৎসা আর বাসের যাত্রী তালিকার জন্য আলাদা আলাদা দায়িত্বপ্রাপ্ত মানুষ রাখুন।
বিজ্ঞাপন
শিশুদের নিরাপত্তা: পুকুর বা জলাশয়ের কাছে শিশুদের একা যেতে দেবেন না। ভিড়ে হারিয়ে গেলে কোথায় অপেক্ষা করবে, তা আগেই বলে রাখুন।
প্রাথমিক চিকিৎসা: ব্যান্ডেজ, অ্যান্টিসেপটিক, খাবার স্যালাইন আর প্রয়োজনীয় সাধারণ ওষুধের একটি বাক্স সঙ্গে রাখুন। খেলাধুলায় আঘাত লাগা পিকনিকে সাধারণ ঘটনা।
পরিচ্ছন্নতা: প্লেট, প্যাকেট ও বোতল নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলুন। সরকারি উদ্যানে আগুন জ্বালানো বা রান্নার নিয়ম আলাদা, নির্দেশনা না মেনে বনে আগুন জ্বালাবেন না।
ফেরার সময়: অন্ধকার নামার আগেই ফেরা শুরু করুন। সন্ধ্যার পর মহাসড়কে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ঢাকার আশেপাশে পিকনিকের সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা কোনটি?
বড় দলের কাছে গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান ও এর আশপাশের ব্যক্তিগত পিকনিক স্পটগুলো সবচেয়ে জনপ্রিয়। পরিবারের ছোট দলের জন্য জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান, সোনারগাঁও ও জিন্দা পার্কও ভালো।
পিকনিক স্পট কত দিন আগে বুক করা উচিত?
বিজ্ঞাপন
ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির শুক্র ও শনিবারের জন্য অন্তত চার থেকে ছয় সপ্তাহ আগে বুক করা ভালো। অন্য সময় দুই-তিন সপ্তাহ আগে করলেই চলে।
সরকারি উদ্যানে কি নিজেরা রান্না করা যায়?
উদ্যানভেদে নিয়ম আলাদা। কিছু উদ্যানে নির্ধারিত পিকনিক স্পটে রান্নার অনুমতি থাকে, কোথাও শুধু রান্না করা খাবার নিয়ে ঢোকা যায়। বরাদ্দ নেওয়ার সময় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিয়মটি জেনে নিন।
শিশুদের পিকনিকের জন্য কোন জায়গা ভালো?
বিজ্ঞাপন
খোলা মাঠ, শৌচাগার ও ছায়ার ব্যবস্থা আছে এবং পানির ধারে নিরাপত্তাবেষ্টনী আছে, এমন জায়গা বেছে নিন। সাফারি পার্ক বা উদ্ভিদ উদ্যানের মতো জায়গায় শিশুরা ঘুরে শিখতেও পারে।