লালবাগ কেল্লা: ইতিহাস, দেখার বিষয়, টিকিট ও যাওয়ার উপায়
ট্রাভেল ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
যে দুর্গ কখনো শেষ হয়নি, সেটিই আজ ঢাকার সবচেয়ে পরিচিত মোগল স্থাপনা। লালবাগ কেল্লার নির্মাণ শুরু হয়েছিল সতেরো শতকের শেষ ভাগে, কিন্তু মাঝপথে কাজ থেমে যায়। অসমাপ্ত সেই দুর্গের লাল ইটের দেয়াল, ফটক, মসজিদ আর একটি সমাধিসৌধ তিন শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে।
বিজ্ঞাপন
লালবাগ কেল্লা পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকায়, বুড়িগঙ্গা নদীর কাছাকাছি। আজিমপুর বা নীলক্ষেত থেকে রিকশায় অল্প সময়েই পৌঁছানো যায়। কেল্লাটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে আছে, টিকিট কেটে ঢুকতে হয় এবং সপ্তাহে রোববার এটি বন্ধ থাকে।
ভেতরে একসঙ্গে দেখা যায় তিনটি প্রধান স্থাপনা: পরী বিবির সমাধি, দেওয়ান-ই-আম ও হাম্মামখানা নিয়ে গড়া জাদুঘর এবং তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ। ঘণ্টা দুয়েক হাতে রাখলে ধীরেসুস্থে পুরোটা ঘুরে দেখা যায়।
লালবাগ কেল্লার ইতিহাস
মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ছেলে শাহজাদা মুহাম্মদ আজম বাংলার সুবাদার থাকার সময় ১৬৭৮ সালে এই দুর্গের নির্মাণ শুরু করেন। শুরুতে এর নাম ছিল কেল্লা আওরঙ্গাবাদ। কাজ শেষ হওয়ার আগেই সম্রাট তাঁকে দিল্লিতে ফিরিয়ে নেন।
বিজ্ঞাপন
এরপর সুবাদার হয়ে আসেন শায়েস্তা খান, যাঁর সময়ে ঢাকায় টাকায় আট মণ চাল পাওয়ার গল্প প্রচলিত আছে। তিনি দুর্গের কাজ আবার শুরু করেন। কিন্তু ১৬৮৪ সালে তাঁর মেয়ে ইরান দুখত, যিনি পরী বিবি নামে পরিচিত, এখানে মারা যান। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী শায়েস্তা খান এই ঘটনাকে অশুভ মনে করে দুর্গের কাজ বন্ধ করে দেন। ফলে পরিকল্পিত দুর্গের অনেক অংশ আর তৈরি হয়নি।
পরবর্তী সময়ে রাজধানী মুর্শিদাবাদে সরে গেলে দুর্গটি গুরুত্ব হারায়। উনিশ শতকে সিপাহি বিদ্রোহের সময় এখানে বিদ্রোহী সিপাহিদের সঙ্গে ইংরেজ বাহিনীর লড়াইয়ের ইতিহাসও আছে। পরে লালবাগ এলাকার নামেই দুর্গটির নাম হয়ে যায় লালবাগ কেল্লা।
ভেতরে কী দেখবেন
১. পরী বিবির সমাধি: কেল্লার মাঝখানের এই সমাধিসৌধটিই সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে। ভেতরে মার্বেল পাথর, কালো পাথর ও রঙিন টালির কাজ মোগল স্থাপত্যের সূক্ষ্মতার পরিচয় দেয়। সমাধির ভেতরে প্রবেশ সাধারণত সীমিত, বাইরে থেকে দেখতে হয়।
বিজ্ঞাপন
২. দেওয়ান-ই-আম ও হাম্মামখানা: সুবাদারের দরবার ও বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত দোতলা ভবন, যার নিচতলায় ছিল গোসলখানা বা হাম্মাম। এখন এটি জাদুঘর। এখানে মোগল আমলের অস্ত্রশস্ত্র, পাণ্ডুলিপি, মুদ্রা, পোশাক ও চিত্রকর্ম দেখা যায়। গরম পানি সরবরাহের পুরোনো ব্যবস্থার নিদর্শনও আগ্রহ জাগায়।
৩. লালবাগ কেল্লা মসজিদ: তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদে এখনো নিয়মিত নামাজ হয়। নামাজের সময় পর্যটকদের ভেতরে ঘোরাঘুরি না করা এবং শালীন পোশাকে প্রবেশ করা উচিত।
৪. ফটক, প্রাচীর ও বুরুজ: দক্ষিণ দিকের প্রধান ফটক আর প্রাচীরের বুরুজগুলো দুর্গের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা বোঝায়। প্রাচীরের কাছে গেলে বোঝা যায়, একসময় নদী কতটা কাছে ছিল।
৫. বাগান, ফোয়ারা ও পুকুর: মোগল ধাঁচের বাগান আর পানির নালা কেল্লার ভেতরটা সাজিয়ে রেখেছে। পুকুরের পাড়ে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
খোলার সময় ও লালবাগ কেল্লার টিকিট
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী লালবাগ কেল্লা সাধারণত রোববার পুরো দিন বন্ধ থাকে এবং সোমবার খোলে দুপুরের পর। অন্যান্য দিন সকাল থেকে বিকেল বা সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকে। গ্রীষ্ম ও শীতে খোলার সময় এক-আধ ঘণ্টা এদিক-ওদিক হয়, আর শুক্রবার জুমার নামাজের সময় কিছুক্ষণের বিরতি থাকে। সরকারি ছুটির দিনে সময়সূচি বদলাতে পারে, তাই বিশেষ দিনে যাওয়ার আগে খোঁজ নিন।
টিকিট কাটতে হয় প্রধান ফটকের পাশের কাউন্টার থেকে। দেশি দর্শনার্থীদের জন্য টিকিটের দাম কম, আনুমানিক ২০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে। শিশু ও শিক্ষার্থীদের জন্য কখনো কখনো কম মূল্যের টিকিট থাকে। সার্কভুক্ত দেশ ও অন্যান্য বিদেশি নাগরিকদের জন্য টিকিটের দাম আলাদা ও বেশি। ক্যামেরা নিয়ে ঢোকার নিয়ম সময়ে সময়ে বদলায়, কাউন্টারেই জেনে নিন।
লালবাগ কেল্লা যাওয়ার উপায়
বিজ্ঞাপন
ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে আজিমপুর, নীলক্ষেত বা পলাশী এলাকায় আসুন। এসব জায়গায় শহরের বিভিন্ন রুটের বাস থামে। সেখান থেকে লালবাগ কেল্লা রিকশায় দশ-পনেরো মিনিটের পথ। আজিমপুর থেকে হেঁটেও যাওয়া যায়।
গুলিস্তান বা সদরঘাটের দিক থেকে এলে চকবাজার হয়ে রিকশায় যাওয়া সুবিধাজনক। নিজের গাড়ি নিয়ে গেলে পুরান ঢাকার সরু রাস্তায় যানজট ও পার্কিং সমস্যার কথা মাথায় রাখুন। রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল বা গাড়িতে কেল্লার ফটক পর্যন্ত যাওয়া যায়, তবে ফেরার সময় বাহন পেতে কিছুটা হাঁটতে হতে পারে।
ভিড় এড়াতে চাইলে সপ্তাহের মাঝের দিনে সকালে যান। শুক্র ও শনিবার বিকেলে আর ঈদের ছুটিতে প্রচুর ভিড় হয়।
ঘুরে দেখার কিছু পরামর্শ
বিজ্ঞাপন
১. সকালের আলো বেছে নিন: সকালে রোদ নরম থাকে, লাল ইটের দেয়াল আর পরী বিবির সমাধির ছবি ভালো আসে। দুপুরের কড়া রোদে খোলা চত্বরে হাঁটা কষ্টকর, বিশেষ করে গ্রীষ্মে।
২. আগে জাদুঘর, পরে বাগান: জাদুঘরের ভেতর তুলনামূলক ঠান্ডা ও শান্ত। শুরুতে সেখানে সময় দিলে ইতিহাসটা মাথায় থাকে, তারপর বাইরের স্থাপনাগুলো দেখতে আরও অর্থবহ লাগে।
৩. স্থাপনার গায়ে হাত নয়: দেয়ালে নাম লেখা, টালি বা পাথরে আঁচড় দেওয়া, রেলিং টপকে সমাধির কাছে যাওয়া, এসব শুধু নিষিদ্ধই নয়, ঐতিহ্যেরও ক্ষতি করে। শিশুদের এ বিষয়ে আগেই বুঝিয়ে বলুন।
৪. পানি ও ছাতা: চত্বরে ছায়া কম। গরমের দিনে পানির বোতল, টুপি বা ছাতা সঙ্গে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
৫. শিক্ষার্থীদের জন্য: স্কুল-কলেজের শিক্ষাসফরে গেলে শিক্ষকেরা আগে থেকে মোগল আমলের ইতিহাস নিয়ে একটু প্রস্তুতি নিয়ে গেলে ভ্রমণটা পাঠের মতোই কাজে লাগে। দলের জন্য টিকিটের বিশেষ নিয়ম আছে কি না কাউন্টারে জেনে নিন।
৬. পোশাক ও আচরণ: মসজিদ অংশে শালীন পোশাক পরুন, উচ্চ স্বরে কথা বলবেন না। কেল্লার ভেতরে খাবার খেয়ে উচ্ছিষ্ট ফেলে আসবেন না।
আশপাশে আর যা দেখা যায়
লালবাগ কেল্লা দেখে একই দিনে পুরান ঢাকার আরও কয়েকটি ঐতিহাসিক জায়গা ঘুরে নেওয়া যায়। কাছেই ঢাকেশ্বরী মন্দির, একটু এগোলে চকবাজার, বড় কাটরা ও ছোট কাটরার ধ্বংসাবশেষ। আরও কিছুটা গেলে বুড়িগঙ্গার তীরে আহসান মঞ্জিল, আরমানিটোলার আর্মেনীয় গির্জা ও তারা মসজিদ।
বিজ্ঞাপন
খাওয়ার জন্য পুরান ঢাকার বিরিয়ানি, কাচ্চি, বাকরখানি, লাচ্ছি আর মিষ্টির দোকান তো আছেই। রমজানে চকবাজারের ইফতারির বাজার বিখ্যাত। তবে ভিড়ের দোকানে খাওয়ার আগে পরিচ্ছন্নতা দেখে নিন।
একটি সহজ পরিকল্পনা হতে পারে এমন: সকালে লালবাগ কেল্লা, দুপুরে পুরান ঢাকার খাবার, বিকেলে আহসান মঞ্জিল আর সন্ধ্যায় সদরঘাটে নদীর পাড়ে কিছুক্ষণ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
লালবাগ কেল্লা কোথায় অবস্থিত?
বিজ্ঞাপন
পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকায়, বুড়িগঙ্গা নদীর কাছে। আজিমপুর থেকে এর দূরত্ব খুবই কম।
লালবাগ কেল্লা কবে বন্ধ থাকে?
সাধারণত রোববার পুরো দিন বন্ধ থাকে এবং সোমবার দুপুরের পর খোলে। সরকারি ছুটি ও বিশেষ দিনে সময়সূচি বদলাতে পারে।
লালবাগ কেল্লা কে নির্মাণ করেন?
বিজ্ঞাপন
নির্মাণ শুরু করেন শাহজাদা মুহাম্মদ আজম, পরে সুবাদার শায়েস্তা খান কাজ এগিয়ে নেন। মেয়ে পরী বিবির মৃত্যুর পর কাজ বন্ধ হয়ে যায়, তাই দুর্গটি অসমাপ্ত রয়ে গেছে।
ভেতরে ছবি তোলা কি যায়?
কেল্লার খোলা চত্বরে মোবাইলে ছবি তোলা যায়। জাদুঘরের ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ থাকতে পারে, নির্দেশনা দেখে নিন।
লালবাগ কেল্লা ঘুরে দেখতে কত সময় লাগে?
বিজ্ঞাপন
জাদুঘরসহ পুরো কেল্লা ধীরেসুস্থে দেখতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা যথেষ্ট। ছবি তোলা আর বাগানে বসে বিশ্রাম নিলে আরও কিছু সময় লাগবে।