নীলগিরি ভ্রমণ: পাহাড়ি পথে যাতায়াত, থাকা, খরচ ও সতর্কতা
ট্রাভেল ডেস্ক · বান্দরবান
প্রকাশ:
নীলগিরির রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে নিচে তাকালে অনেক দিন পাহাড় দেখা যায় না, দেখা যায় মেঘের সাদা সমুদ্র। বর্ষার সকালে মেঘ পাহাড়ের ভাঁজে জমে থাকে, রোদ উঠলে ধীরে ধীরে সরে যায় আর একের পর এক সবুজ পাহাড়ের সারি বেরিয়ে আসে। এ কারণেই বান্দরবানের যত জায়গা আছে, তার মধ্যে নীলগিরি সবচেয়ে জনপ্রিয়গুলোর একটি।
বিজ্ঞাপন
নীলগিরি কোথায় অবস্থিত, এ প্রশ্নের সোজা উত্তর: বান্দরবান জেলায়, জেলা শহর থেকে বান্দরবান-থানচি সড়ক ধরে আনুমানিক ৪৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা দুই হাজার ফুটের বেশি। পাহাড়চূড়ার এই পর্যটনকেন্দ্রটি সেনাবাহিনী পরিচালনা করে।
ঢাকা থেকে বান্দরবান গিয়ে সেখান থেকে চাঁদের গাড়ি বা জিপে নীলগিরি যেতে হয়। পথে শৈলপ্রপাত, মিলনছড়ি ও চিম্বুক পড়ে, তাই একই যাত্রায় কয়েকটি জায়গা দেখা হয়ে যায়। দিনে গিয়ে দিনে ফেরা যায়, আবার কটেজে রাত কাটানোর সুযোগও আছে।
ঢাকা থেকে বান্দরবান
সরাসরি বাসে: ঢাকার সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, আরামবাগ ও কলাবাগান এলাকা থেকে বান্দরবানের এসি ও নন-এসি বাস ছাড়ে, বেশির ভাগই রাতে। সময় লাগে আট থেকে দশ ঘণ্টা। নন-এসি বাসের ভাড়া আনুমানিক ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা, এসি বাসে আনুমানিক ১৫০০ থেকে ২২০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
ট্রেনে চট্টগ্রাম হয়ে: কমলাপুর থেকে চট্টগ্রামের আন্তনগর ট্রেনে গিয়ে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে বান্দরবানের বাসে ওঠা যায়। চট্টগ্রাম থেকে বান্দরবান পৌঁছাতে আড়াই-তিন ঘণ্টা লাগে।
কক্সবাজার হয়ে: কেউ কক্সবাজার ভ্রমণের সঙ্গে বান্দরবান জুড়ে দিতে চাইলে কক্সবাজার থেকেও বান্দরবানের বাস পাওয়া যায়।
বান্দরবান শহর থেকে নীলগিরি যাওয়ার উপায়
নীলগিরি যাওয়ার উপায় হিসেবে সবচেয়ে প্রচলিত হলো চাঁদের গাড়ি বা খোলা জিপ রিজার্ভ করা। বান্দরবান শহরের নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড থেকে এসব গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়। একেকটি গাড়িতে দশ-বারোজন বসা যায়, তাই দলে গেলে খরচ ভাগ হয়ে যায়। ছোট দলের জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশাও যায়, তবে খাড়া পাহাড়ি পথে জিপই নিরাপদ।
বিজ্ঞাপন
গাড়ি ঠিক করার সময় চালকের অভিজ্ঞতা জিজ্ঞেস করুন, গাড়ির টায়ার ও ব্রেকের অবস্থা দেখে নিন। পাহাড়ি পথে অভিজ্ঞ চালক খুব জরুরি। হোটেলের কর্মীরাও সাধারণত পরিচিত চালকের খোঁজ দিতে পারেন।
শহর থেকে নীলগিরি পৌঁছাতে সাধারণত দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লাগে, পথে থামলে আরও বেশি। পুরো দিনের জন্য জিপ রিজার্ভের খরচ আনুমানিক ৪০০০ থেকে ৬০০০ টাকা, কোন কোন জায়গায় থামবেন আর কতক্ষণ থাকবেন তার ওপর নির্ভর করে। আগেই চালকের সঙ্গে রুট ও ফেরার সময় পরিষ্কার করে নিন।
থানচি সড়কে বাসও চলে। থানচিগামী বাসে উঠে নীলগিরির কাছে নামা যায়, খরচ অনেক কম। তবে ফেরার সময় বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয় এবং সময়মতো আসন পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না, তাই এটি একা বা দুজন অভিযাত্রী ধরনের পর্যটকের জন্য উপযুক্ত।
পথে যা দেখবেন
বিজ্ঞাপন
১. মেঘলা ও নীলাচল: শহরের কাছেই, ফেরার পথে বিকেলে দেখা ভালো। নীলাচল থেকে সূর্যাস্ত চমৎকার।
২. শৈলপ্রপাত: শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে রাস্তার পাশেই ছোট এই ঝরনা। বর্ষায় পানি বেশি থাকে। পাশে স্থানীয় বম জনগোষ্ঠীর হাতে বোনা কাপড় ও ফলের দোকান বসে।
৩. মিলনছড়ি: পথের একটি সুন্দর ভিউ পয়েন্ট, যেখান থেকে নিচে সাঙ্গু নদী আর পাহাড়ের ঢাল দেখা যায়।
৪. চিম্বুক পাহাড়: শহর থেকে আনুমানিক ২৬ কিলোমিটার দূরে। নীলগিরির আগে এটি একসময় বান্দরবানের প্রধান আকর্ষণ ছিল। ওপর থেকে চারদিকের পাহাড় আর আঁকাবাঁকা সড়ক দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
৫. নীলগিরি: চূড়ার চত্বর, হেলিপ্যাড, রেলিং দেওয়া ভিউ পয়েন্ট আর কটেজের চারপাশে হাঁটার পথ। ভোর ও বিকেলের আলোয় এখানকার দৃশ্য সবচেয়ে ভালো লাগে।
কোথায় থাকবেন
নীলগিরিতে সেনাবাহিনী পরিচালিত কয়েকটি কটেজ আছে। এখানে রাত কাটালে সন্ধ্যার মেঘ আর ভোরের সূর্যোদয় দেখার সুযোগ মেলে, যা দিনে গিয়ে ফিরে এলে হয় না। তবে কটেজের সংখ্যা কম, বুকিং দিতে হয় সেনাবাহিনীর নির্ধারিত মাধ্যমে এবং ছুটির মৌসুমে অনেক আগেই সব বুক হয়ে যায়। খরচও সাধারণ হোটেলের তুলনায় বেশি।
বেশির ভাগ পর্যটক বান্দরবান শহরে থাকেন। শহরে সাধারণ আবাসিক হোটেল থেকে শুরু করে মাঝারি মানের রিসোর্ট, সব ধরনের ব্যবস্থা আছে। শহরের বাইরে পাহাড়ের ঢালে কিছু রিসোর্ট ও কটেজও আছে। মৌসুমভেদে দুই শয্যার সাধারণ হোটেলকক্ষ আনুমানিক ১৫০০ থেকে ৩০০০ টাকায় পাওয়া যায়, ভালো মানের রিসোর্টে খরচ বেশি।
বিজ্ঞাপন
নীলগিরিতে ক্যানটিনে খাবার পাওয়া যায়, তবে দাম তুলনামূলক বেশি। পথে চিম্বুক বা শৈলপ্রপাতের কাছে স্থানীয় দোকানে কলা, পেঁপে, আনারসের মতো পাহাড়ি ফল কিনে খেতে পারেন। শহরে পাহাড়ি ধাঁচের রান্না, যেমন বাঁশের ভেতরে রান্না করা মুরগি, অনেক রেস্তোরাঁয় মেলে।
নীলগিরি ভ্রমণ খরচ: একটি আনুমানিক হিসাব
ঢাকা থেকে দুই রাত তিন দিনের একটি সাধারণ সফরে জনপ্রতি খরচ মোটামুটি এ রকম হতে পারে, সব অঙ্কই আনুমানিক:
যাতায়াত: ঢাকা-বান্দরবান নন-এসি বাসে যাওয়া-আসা ১৬০০ থেকে ২০০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
জিপ ভাড়া: দশজনের দলে ভাগ করলে জনপ্রতি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা।
থাকা: বান্দরবান শহরে দুই রাত, ভাগাভাগি করে থাকলে জনপ্রতি ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা।
খাবার ও টিকিট: প্রবেশ ফি, পার্কিং ও তিন দিনের খাবার মিলিয়ে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা।
সব মিলিয়ে জনপ্রতি আনুমানিক ৫০০০ থেকে ৭০০০ টাকা। দল ছোট হলে বা নীলগিরির কটেজে থাকলে খরচ বাড়বে।
বিজ্ঞাপন
সতর্কতা ও জরুরি পরামর্শ
যাওয়ার আগে খোঁজ নিন: পার্বত্য এলাকায় নিরাপত্তার কারণে মাঝে মাঝে কিছু সড়ক বা এলাকায় পর্যটকদের চলাচল সীমিত করা হয়। রওনা দেওয়ার আগে বান্দরবান জেলা প্রশাসন বা স্থানীয় পর্যটন তথ্যকেন্দ্র থেকে হালনাগাদ খবর নিন।
পরিচয়পত্র: পথে চেকপোস্টে জাতীয় পরিচয়পত্র দেখতে চাওয়া হতে পারে। মূল কপি ও কয়েকটি ফটোকপি সঙ্গে রাখুন। বিদেশি নাগরিকদের জন্য আলাদা অনুমতির নিয়ম আছে।
পাহাড়ি রাস্তা: থানচি সড়ক খাড়া ও আঁকাবাঁকা। যাদের গাড়িতে বমি ভাব হয়, তাঁরা আগে থেকে প্রস্তুতি নিন। চালককে অতিরিক্ত গতিতে চালাতে নিষেধ করুন, আর জিপের ছাদে বসে যাবেন না।
বিজ্ঞাপন
আবহাওয়া: বর্ষায় পাহাড়ধস ও রাস্তা পিচ্ছিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলে যাত্রা পিছিয়ে দিন। শীতে চূড়ায় সন্ধ্যায় বেশ ঠান্ডা পড়ে, গরম কাপড় নিন।
স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান: পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর গ্রামে অনুমতি ছাড়া ঢুকবেন না, ছবি তুলবেন না। প্লাস্টিক ও ময়লা নিজের ব্যাগে ফিরিয়ে আনুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
নীলগিরি যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় কোনটি?
বিজ্ঞাপন
মেঘ দেখতে চাইলে জুন থেকে সেপ্টেম্বর, তবে তখন রাস্তায় ঝুঁকি বেশি। পরিষ্কার আকাশ ও আরামদায়ক আবহাওয়ার জন্য অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি ভালো।
বান্দরবান থেকে একদিনে কি নীলগিরি ঘুরে আসা যায়?
হ্যাঁ। সকালে রওনা দিয়ে পথে শৈলপ্রপাত ও চিম্বুক দেখে নীলগিরি ঘুরে বিকেলে শহরে ফেরা যায়। সন্ধ্যার আগে পাহাড়ি পথ পেরিয়ে আসা নিরাপদ।
নীলগিরি রিসোর্টে থাকতে কী করতে হয়?
বিজ্ঞাপন
নীলগিরির কটেজ সেনাবাহিনী পরিচালিত, বুকিং তাদের নির্ধারিত মাধ্যমে আগেভাগে করতে হয়। বুকিং না পেলে বান্দরবান শহরে থেকে দিনে ঘুরে আসাই সহজ।
নীলগিরিতে কি প্রবেশ ফি আছে?
সাধারণত জনপ্রতি প্রবেশ টিকিট ও গাড়ির পার্কিং ফি নেওয়া হয়। অঙ্ক সময়ে সময়ে বদলায়, প্রবেশপথেই তা জানিয়ে দেওয়া থাকে।
শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে কি নীলগিরি যাওয়া যায়?
বিজ্ঞাপন
যায়, কারণ চূড়া পর্যন্ত গাড়ি যায় এবং ওপরে খুব বেশি হাঁটতে হয় না। তবে আঁকাবাঁকা পথে বমি ভাব হতে পারে, তাই প্রয়োজনীয় ওষুধ, পানি আর হালকা খাবার সঙ্গে রাখুন এবং মাঝপথে বিরতি নিন।