ওমরাহ করতে কত টাকা লাগে: খরচের খাত, প্যাকেজ ও প্রস্তুতি
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
ওমরাহর খরচের কোনো একক অঙ্ক নেই। একই মাসে একই এয়ারলাইনে গিয়েও কেউ দেড় লাখ টাকায় ফিরছেন, কেউ চার লাখ খরচ করছেন। পার্থক্য তৈরি করে মূলত তিনটি জিনিস: কোন মৌসুমে যাচ্ছেন, হোটেল মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববী থেকে কত দূরে, আর কত দিন থাকছেন।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ হিসাবে বাংলাদেশ থেকে ১০ থেকে ১৫ দিনের ইকোনমি প্যাকেজে আনুমানিক দেড় থেকে দুই লাখ টাকা লাগে। হারামের কাছের মানসম্মত হোটেল, ভালো খাবার ও আরামদায়ক যাতায়াতসহ প্যাকেজে খরচ আনুমানিক আড়াই থেকে চার লাখ টাকা বা তার বেশি হতে পারে। রমজানের শেষ দশক ও ছুটির মৌসুমে দাম সবচেয়ে চড়া থাকে। বিমানভাড়া ও সৌদি রিয়ালের বিনিময় হার বদলালে এই অঙ্কও বদলায়, তাই যাওয়ার আগে হালনাগাদ দাম যাচাই করে নিন।
খরচ কোথায় কোথায় হয়
প্যাকেজের দাম বুঝতে হলে খাতগুলো আলাদা করে দেখা দরকার। তাহলে কোন এজেন্সি কোথায় সাশ্রয় করছে বা কোথায় বাড়তি নিচ্ছে, তা ধরা সহজ হয়।
১. বিমানভাড়া: ঢাকা থেকে জেদ্দা বা মদিনা যাওয়া-আসার টিকিট সবচেয়ে বড় খাত। সাধারণ সময়ে আনুমানিক ৭০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা, মৌসুমে আরও বেশি। সরাসরি ফ্লাইট আর ট্রানজিট ফ্লাইটে দামের পার্থক্য থাকে।
বিজ্ঞাপন
২. ভিসা ও সার্ভিস চার্জ: ওমরাহ ভিসা, সৌদি আরবে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যবিমা ও এজেন্সির সেবামূল্য সাধারণত প্যাকেজে ধরা থাকে। আলাদা করে করলে এজেন্সিভেদে খরচ ভিন্ন হয়।
৩. হোটেল: মক্কা ও মদিনায় থাকার খরচ নির্ভর করে দূরত্বের ওপর। হারামের দরজা থেকে হাঁটা দূরত্বের হোটেল দামি; এক-দুই কিলোমিটার দূরে শাটল বাসের ওপর নির্ভরশীল হোটেল সস্তা। এক রুমে চার-পাঁচজন থাকলে মাথাপিছু খরচ কমে।
৪. যাতায়াত: জেদ্দা থেকে মক্কা, মক্কা থেকে মদিনা এবং ফেরার পথে বাস বা ট্রেন। বাস সাধারণত প্যাকেজে থাকে; দ্রুতগতির ট্রেনে গেলে বাড়তি খরচ।
৫. খাবার: কিছু প্যাকেজে তিন বেলা দেশি খাবার থাকে, কিছুতে শুধু সকালের নাশতা। খাবার না থাকলে দিনে মাথাপিছু আলাদা বাজেট রাখতে হয়।
বিজ্ঞাপন
৬. জিয়ারা ও ব্যক্তিগত খরচ: মক্কা-মদিনার ঐতিহাসিক স্থানগুলো ঘুরিয়ে দেখানো সাধারণত প্যাকেজে থাকে। এর বাইরে মোবাইল সিম, কেনাকাটা, উপহার ও জরুরি খরচের জন্য আলাদা টাকা রাখুন।
ওমরাহ প্যাকেজের ধরন ও কী দেখে বেছে নেবেন
এজেন্সিগুলো সাধারণত তিন ধরনের প্যাকেজ দেয়। ইকোনমি প্যাকেজে হোটেল কিছুটা দূরে, রুমে বেশি মানুষ, খাবার সাধারণ। স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজে হোটেল তুলনামূলক কাছে, রুমে তিন-চারজন। প্রিমিয়াম প্যাকেজে হারামের পাশের হোটেল, দুজনের রুম, ভালো খাবার ও আলাদা গাড়ি।
প্যাকেজের দাম তুলনা করার সময় কেবল মোট অঙ্ক দেখবেন না। লিখিতভাবে জেনে নিন: কোন এয়ারলাইন, সরাসরি নাকি ট্রানজিট, মক্কা ও মদিনায় কত রাত, হোটেলের নাম ও হারাম থেকে দূরত্ব, রুমে কতজন, কোন বেলার খাবার, জিয়ারা আছে কি না, আর গাইড বা মুয়াল্লিম সঙ্গে থাকবেন কি না। বয়স্ক বা অসুস্থ সঙ্গী থাকলে একটু বেশি খরচ করে কাছের হোটেল নেওয়া অনেক সময় বেশি লাভজনক, কারণ প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত যাতায়াতের কষ্ট কমে।
বিজ্ঞাপন
কাগজপত্র ও ভিসা প্রক্রিয়া
১. পাসপোর্ট: যাত্রার দিন থেকে অন্তত ছয় মাস মেয়াদ থাকতে হবে। ই-পাসপোর্ট না থাকলে epassport.gov.bd থেকে আবেদন প্রক্রিয়া জেনে নিন এবং সময় হাতে রেখে করুন।
২. ছবি ও তথ্য: নির্দিষ্ট মাপের ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এবং নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে মাহরামের সঙ্গে সম্পর্কের প্রমাণ এজেন্সি চাইতে পারে।
৩. টিকা: সৌদি আরব সাধারণত মেনিনজাইটিস টিকার সনদ চায়। কোন টিকা কবে নিতে হবে, তা যাত্রার আগে এজেন্সি ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে জেনে নিন।
বিজ্ঞাপন
৪. ভিসা: ওমরাহ ভিসা সৌদি সরকারের অনুমোদিত ব্যবস্থায় এজেন্সির মাধ্যমে হয়। ভিসার মেয়াদ ও সৌদিতে অবস্থানের সময়সীমা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে টিকিট কাটুন।
৫. নুসুক অ্যাপ: সৌদি সরকারের অফিসিয়াল অ্যাপ নুসুক থেকে ওমরাহ ও মসজিদে নববীর রওজা শরিফে প্রবেশের অনুমতি নেওয়ার ব্যবস্থা আছে। এজেন্সি অনেক সময় এ কাজ করে দেয়, তবে নিজে ব্যবহার শিখে নেওয়া ভালো।
এজেন্সি বাছাইয়ে সতর্কতা
প্রতি মৌসুমেই কিছু মানুষ প্রতারণার শিকার হন: টাকা নিয়ে ভিসা না দেওয়া, শেষ মুহূর্তে হোটেল বদলে দূরে পাঠানো বা ফেরার টিকিট নিয়ে জটিলতা। এড়াতে কয়েকটি বিষয় মানুন। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধিত হজ ও ওমরাহ এজেন্সি কি না, লাইসেন্স নম্বর দেখে যাচাই করুন। অফিসের স্থায়ী ঠিকানা আছে কি না দেখুন। আগে যাঁরা তাদের মাধ্যমে গেছেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলুন। প্যাকেজের সব শর্ত লিখিত চুক্তিতে নিন এবং প্রতিটি লেনদেনের রসিদ রাখুন। অস্বাভাবিক কম দামের প্রস্তাব দেখলে বাড়তি সতর্ক হোন।
বিজ্ঞাপন
ব্যাগে যা রাখবেন
পুরুষদের জন্য অন্তত দুই সেট ইহরামের কাপড়, ইহরামের বেল্ট ও পায়ের ওপরের অংশ খোলা থাকে এমন স্যান্ডেল নিন। নারীরা ঢিলেঢালা কয়েক সেট পোশাক ও আরামদায়ক জুতা নেবেন। সবার জন্য হালকা জায়নামাজ, ছোট ব্যাগ, পানির বোতল, ছাতা, সুগন্ধিমুক্ত সাবান ও লোশন কাজে আসে, কারণ ইহরামের সময় সুগন্ধযুক্ত কিছু ব্যবহার করা যায় না।
নিয়মিত ওষুধ খেলে পুরো সফরের হিসাবে বাড়তি কিছু ওষুধ ও প্রেসক্রিপশনের কপি সঙ্গে রাখুন। পাসপোর্ট, ভিসা ও টিকিটের ফটোকপি এবং মোবাইলে ছবি তুলে রাখুন। হোটেলের ঠিকানা আরবি ও ইংরেজিতে লেখা কার্ড সঙ্গে থাকলে পথ হারালে ফিরতে সুবিধা হয়। বয়স্কদের জন্য হালকা ফোল্ডিং টুল বা লাঠি অনেক সময় কাজে দেয়, কারণ তাওয়াফ ও সাঈতে দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়।
খরচ কমানোর কয়েকটি উপায়
বিজ্ঞাপন
রমজান, ঈদের ছুটি ও শীতকালীন ছুটির মৌসুম এড়িয়ে গেলে প্যাকেজ ও বিমানভাড়া দুটিই কম পড়ে। অন্তত দুই-তিন মাস আগে বুকিং দিলে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। পরিবার বা পরিচিতদের নিয়ে দল বেঁধে গেলে অনেক এজেন্সি ছাড় দেয়। রুম শেয়ার করলে হোটেল খরচ কমে।
সঙ্গে নগদ কিছু সৌদি রিয়াল রাখুন, বাকিটা আন্তর্জাতিক লেনদেন চালু থাকা কার্ডে। ব্যাংক থেকে বৈধ পথে বৈদেশিক মুদ্রা নিন। বিমানবন্দরে দাম বেশি, তাই প্রয়োজনীয় কেনাকাটা পরিকল্পনা করে করুন।
একটি ধর্মীয় দিকও মনে রাখা দরকার। ওমরাহ হানাফি মতে সুন্নত ইবাদত, তাই পরিবারের জরুরি প্রয়োজন বা ঋণ পরিশোধ ফেলে রেখে এর জন্য বড় অঙ্কের ধার করা আলেমরা সাধারণত নিরুৎসাহিত করেন। ইবাদতের খরচ হালাল উপার্জন থেকে হওয়া জরুরি।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে কম খরচে কখন ওমরাহ করা যায়?
সাধারণত রমজান ও ছুটির মৌসুমের বাইরে, যখন বিমানভাড়া ও হোটেলের চাহিদা কম থাকে। নির্দিষ্ট মাস প্রতিবছর এক রকম থাকে না, তাই কয়েকটি এজেন্সির দাম তুলনা করুন।
নিজে নিজে ওমরাহর ব্যবস্থা করা যায়?
ভিসা এখনো মূলত অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমেই হয়। টিকিট ও হোটেল নিজে বুক করার সুযোগ থাকলেও প্রথমবার যাঁরা যান, তাঁদের জন্য নির্ভরযোগ্য এজেন্সির প্যাকেজই নিরাপদ।
বিজ্ঞাপন
ওমরাহতে কত দিন থাকা ভালো?
বেশির ভাগ প্যাকেজ ১০ থেকে ১৫ দিনের। মক্কায় ছয়-সাত দিন এবং মদিনায় চার-পাঁচ দিন থাকলে তাড়াহুড়া ছাড়াই ইবাদত ও জিয়ারা করা যায়।
সঙ্গে কত টাকা নেওয়া উচিত?
প্যাকেজে খাবার থাকলে ব্যক্তিগত খরচের জন্য সীমিত অঙ্কই যথেষ্ট। খাবার না থাকলে প্রতিদিনের খাবার, যাতায়াত ও জরুরি প্রয়োজন হিসাব করে বাড়তি টাকা রাখুন।