ওমরাহ করার নিয়ম: ইহরাম, তাওয়াফ, সাঈ ও মাথা মুণ্ডন ধাপে ধাপে
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
ওমরাহ মানে আল্লাহর ঘর জিয়ারত। হজের মতো এর নির্দিষ্ট দিন নেই, বছরের প্রায় যেকোনো সময় করা যায়। কাজও তুলনামূলক কম: ইহরাম, তাওয়াফ, সাঈ এবং মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা। ভিড় কম থাকলে মসজিদুল হারামে পৌঁছানোর পর তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যেই পুরো ওমরাহ শেষ হয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ওমরাহর ক্ষেত্রে ইহরাম হলো শর্ত, তাওয়াফ ফরজ, আর সাঈ এবং মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা ওয়াজিব। ফরজ বাদ পড়লে ওমরাহ হবে না; ওয়াজিব বাদ পড়লে ওমরাহ হয়ে যাবে, তবে দম দিতে হবে। নিচে প্রথমবার যাওয়া একজন বাংলাদেশির চোখে ধাপগুলো সাজানো হলো।
ধাপ ১: প্রস্তুতি ও ইহরাম
রওনা হওয়ার আগে নখ কাটা, গোঁফ ছোট করা ও অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করে নিন, কারণ ইহরামের পর এগুলো করা যাবে না। তারপর গোসল বা অন্তত অজু করুন। পুরুষেরা সেলাইবিহীন দুটি সাদা চাদর পরবেন: একটি কোমর থেকে নিচে, অন্যটি গায়ে। পায়ে এমন স্যান্ডেল, যাতে পায়ের পাতার ওপরের মাঝের হাড় খোলা থাকে। ইহরামের আগে শরীরে সুগন্ধি লাগানো যায়, তবে চাদরে নয়।
নারীরা স্বাভাবিক ঢিলেঢালা শালীন পোশাক পরবেন, মাথা ঢাকবেন। তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট রঙের বাধ্যবাধকতা নেই। হানাফি মতে ইহরাম অবস্থায় নারীর মুখে কাপড় লেগে থাকা নিষেধ, তাই পর্দার জন্য এমন কিছু ব্যবহার করবেন, যাতে কাপড় মুখ স্পর্শ না করে।
বিজ্ঞাপন
মিকাতের আগেই, মাকরুহ সময় না হলে, দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ুন। এরপর মনে মনে ওমরাহর নিয়ত করুন। অনেকে মুখে বলেন: আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদুল উমরাতা ফাইয়াসসিরহা লি ওয়া তাকাব্বালহা মিন্নি, অর্থাৎ হে আল্লাহ, আমি ওমরাহর ইচ্ছা করছি, আমার জন্য তা সহজ করুন এবং কবুল করুন। নিয়তের পর অন্তত একবার তালবিয়া পড়লেই ইহরাম শুরু হয়ে যায়।
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ
উচ্চারণ: লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক। পুরুষেরা উঁচু স্বরে, নারীরা নিচু স্বরে পড়বেন।
ইহরাম অবস্থায় যা করা যাবে না
বিজ্ঞাপন
ইহরাম বাঁধার পর থেকে ওমরাহ শেষ হওয়া পর্যন্ত কিছু কাজ নিষিদ্ধ:
১. পোশাক: পুরুষের জন্য সেলাই করা জামা, পায়জামা, টুপি বা মাথা ঢাকা নিষেধ। নারী-পুরুষ কেউ মুখ কাপড়ে ঢাকবেন না।
২. সুগন্ধি: সুগন্ধি তেল, আতর, সুগন্ধযুক্ত সাবান বা লোশন ব্যবহার করা যাবে না।
৩. চুল ও নখ: শরীরের কোথাও চুল কাটা, তোলা বা নখ কাটা নিষেধ।
বিজ্ঞাপন
৪. শিকার ও ঘনিষ্ঠতা: স্থলের প্রাণী শিকার এবং স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক ঘনিষ্ঠতা নিষিদ্ধ।
৫. আচরণ: গালমন্দ, ঝগড়া ও অশ্লীল কথা সব সময় নিষেধ, ইহরামে আরও কঠোরভাবে।
ভুলে বা অজ্ঞতায় কোনো নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ হলে অনেক ক্ষেত্রে সদকা বা দম দিতে হয়। পরিমাণ ঘটনাভেদে আলাদা, তাই আলেমের কাছে জেনে নেওয়াই ভালো।
ধাপ ২: তাওয়াফ ও দুই রাকাত নামাজ
বিজ্ঞাপন
মসজিদুল হারামে ডান পা দিয়ে প্রবেশ করে মসজিদে ঢোকার দোয়া পড়ুন: আল্লাহুম্মাফতাহ লি আবওয়াবা রাহমাতিক, অর্থাৎ হে আল্লাহ, আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাগুলো খুলে দিন। দোয়াটি সহিহ মুসলিমে বর্ণিত।
তাওয়াফের জন্য অজু থাকা জরুরি। তাওয়াফ শুরুর আগে পুরুষেরা গায়ের চাদর ডান বগলের নিচ দিয়ে বাম কাঁধে তুলে দেবেন, যাতে ডান কাঁধ খোলা থাকে; একে ইজতিবা বলে। হাজরে আসওয়াদ বরাবর দাগ বা নির্দেশক থেকে তাওয়াফ শুরু হয়। সেখানে দাঁড়িয়ে কাবার দিকে মুখ করে ইশারায় হাত তুলে 'বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার' বলুন, তারপর কাবাকে বাম দিকে রেখে হাঁটা শুরু করুন। প্রতি চক্কর শেষে আবার হাজরে আসওয়াদ বরাবর এসে একই কাজ করবেন।
প্রথম তিন চক্করে পুরুষেরা ছোট ছোট পদক্ষেপে কাঁধ দুলিয়ে একটু দ্রুত হাঁটবেন, একে রমল বলে; বাকি চার চক্কর স্বাভাবিক গতিতে। তাওয়াফে নির্দিষ্ট দোয়া মুখস্থ করা জরুরি নয়; নিজের ভাষায় যা খুশি চাইতে পারেন। রুকনে ইয়ামানি থেকে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত অংশে আবু দাউদে বর্ণিত এ দোয়াটি পড়া সুন্নত: রাব্বানা আতিনা ফিদ দুনইয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আজাবান নার। অর্থ: হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখিরাতে কল্যাণ দিন এবং আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। এটি সুরা বাকারার ২০১ নম্বর আয়াত।
সাত চক্কর শেষে ডান কাঁধ ঢেকে নিন। মাকামে ইবরাহিমের পেছনে, ভিড় থাকলে মসজিদের যেকোনো জায়গায় দুই রাকাত নামাজ পড়ুন; হানাফি মতে এটি ওয়াজিব। প্রথম রাকাতে সুরা কাফিরুন ও দ্বিতীয় রাকাতে সুরা ইখলাস পড়া সুন্নত। এরপর তৃপ্তি নিয়ে জমজমের পানি পান করুন।
বিজ্ঞাপন
ধাপ ৩: সাফা-মারওয়ায় সাঈ
সাফা পাহাড়ের দিকে যান। সেখানে উঠে কাবার দিকে মুখ করে হাত তুলে আল্লাহর প্রশংসা ও দোয়া করুন। শুরুতে সুরা বাকারার ১৫৮ নম্বর আয়াতের প্রথম অংশ পড়া সুন্নত: ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শাআইরিল্লাহ, অর্থাৎ নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত।
এরপর মারওয়ার দিকে হাঁটুন। পথে সবুজ বাতি চিহ্নিত অংশে পুরুষেরা কিছুটা দৌড়ের ভঙ্গিতে দ্রুত হাঁটবেন, নারীরা স্বাভাবিকভাবে। সাফা থেকে মারওয়া এক চক্কর, মারওয়া থেকে সাফা আরেক চক্কর। এভাবে সাত চক্কর, যা শেষ হবে মারওয়ায়। প্রতিবার সাফা ও মারওয়ায় উঠে কেবলামুখী হয়ে দোয়া করা সুন্নত। সাঈর জন্য অজু শর্ত নয়, তবে অজুসহ করা উত্তম। হাঁটতে অক্ষম হলে হুইলচেয়ার ব্যবহার করা যায়।
ধাপ ৪: মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা
বিজ্ঞাপন
সাঈ শেষে পুরুষেরা পুরো মাথা মুণ্ডন করবেন, এটিই উত্তম। চাইলে পুরো মাথার চুল ছোট করতে পারেন; হানাফি মতে অন্তত মাথার এক-চতুর্থাংশের চুল আঙুলের এক কর পরিমাণ কাটা জরুরি। নারীরা চুলের আগা একত্র করে আঙুলের এক কর পরিমাণ কেটে নেবেন, এর বেশি নয়। এর মাধ্যমেই ওমরাহ সম্পন্ন হলো এবং ইহরামের সব নিষেধাজ্ঞা উঠে গেল।
নারীদের জন্য বিশেষ কথা ও সাধারণ ভুল
ঋতুস্রাব অবস্থায় ইহরাম বাঁধা যায়, কিন্তু মসজিদে প্রবেশ ও তাওয়াফ করা যায় না। পবিত্র হওয়ার পর গোসল করে তাওয়াফ ও সাঈ করবেন। তাওয়াফ শেষ হওয়ার পর ঋতুস্রাব শুরু হলে সাঈ করে নেওয়া যায়, কারণ সাঈর জন্য পবিত্রতা শর্ত নয়।
প্রথমবার যাঁরা যান, তাঁরা কিছু ভুল প্রায়ই করেন। হাজরে আসওয়াদ ছুঁতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কি করা, তাওয়াফের মধ্যে ছবি বা ভিডিও তোলায় ব্যস্ত থাকা, পুরো তাওয়াফে ডান কাঁধ খোলা রেখে নামাজ পড়া, আর চক্কর গুনতে ভুল করা। চক্করের সংখ্যায় সন্দেহ হলে কম সংখ্যাটি ধরে নিন। হাতে তাসবিহ বা আঙুলে গোনার অভ্যাস কাজে দেয়।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ওমরাহর ফরজ ও ওয়াজিব কয়টি?
হানাফি মতে ইহরাম শর্ত এবং তাওয়াফ ফরজ। সাফা-মারওয়ায় সাঈ এবং মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা ওয়াজিব।
ওমরাহর নির্দিষ্ট দোয়া মুখস্থ না থাকলে কি ওমরাহ হবে?
বিজ্ঞাপন
হবে। তাওয়াফ ও সাঈতে নির্দিষ্ট দোয়া পড়া বাধ্যতামূলক নয়। বাংলায় নিজের মতো দোয়া করলেও চলবে। তালবিয়া ও কয়েকটি ছোট দোয়া শিখে নিলে ভালো।
একবার মক্কায় গিয়ে একাধিক ওমরাহ করা যায়?
যায়। এর জন্য হারাম এলাকার বাইরে, সাধারণত তানইম বা জিরানায় গিয়ে নতুন ইহরাম বাঁধতে হয়। তবে বারবার ওমরাহর চেয়ে বেশি বেশি তাওয়াফ উত্তম কি না, এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে ভিন্নমত আছে।
ওমরাহ শেষে চুল কাটার আগে ইহরাম খুলে ফেললে কী হবে?
বিজ্ঞাপন
চুল কাটার আগে ইহরামের নিষিদ্ধ কাজ করলে কাফফারা আসতে পারে। দ্রুত আলেমের কাছে জানিয়ে করণীয় ঠিক করে নিন।