আশুরা কী: আশুরার ইতিহাস, তাৎপর্য ও এ দিনের ঘটনাবলি
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
মহররম মাসের দশম দিনটিকে আরবিতে বলা হয় আশুরা। শব্দটি এসেছে আরবি 'আশারা' থেকে, যার অর্থ দশ। হিজরি বর্ষের প্রথম মাস মহররম, আর কোরআনে যে চারটি মাসকে সম্মানিত বলা হয়েছে, মহররম তার একটি। তাই বছরের শুরুতেই আসা এই দিনটি মুসলমানদের কাছে আলাদা মর্যাদা পায়।
বিজ্ঞাপন
আশুরার মূল তাৎপর্য জড়িয়ে আছে নবী মুসা (আ.)-এর সঙ্গে। সহিহ হাদিস অনুযায়ী, এ দিনেই আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে রক্ষা করেন এবং ফেরাউনকে তার বাহিনীসহ সাগরে ডুবিয়ে দেন। কৃতজ্ঞতা হিসেবে মুসা (আ.) এ দিনে রোজা রাখতেন। মহানবী মুহাম্মাদ (সা.)-ও এ দিনে রোজা রেখেছেন এবং সাহাবিদের রাখতে উৎসাহ দিয়েছেন।
এর বহু শতাব্দী পর, ৬১ হিজরির ১০ মহররম, ইরাকের কারবালা প্রান্তরে মহানবী (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হজরত হুসাইন (রা.) পরিবার-পরিজনসহ শহীদ হন। এ কারণে উপমহাদেশে আশুরা বলতে অনেকে কেবল কারবালার শোককেই বোঝেন। অথচ ইতিহাস বলে, আশুরার মর্যাদা কারবালার অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত ছিল। কারবালার ঘটনা এ দিনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি হৃদয়বিদারক অধ্যায় হিসেবে।
মহররম মাস ও আশুরার মর্যাদা
সুরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তাঁর কাছে মাসের সংখ্যা বারো, যার মধ্যে চারটি সম্মানিত। বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত বিদায় হজের ভাষণে মহানবী (সা.) এই চার মাসের নাম বলেছেন: জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব। এসব মাসে অন্যায় ও জুলুম থেকে বিশেষভাবে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
মহররমকে হাদিসে 'আল্লাহর মাস' বলা হয়েছে। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে আছে, রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা। আর এই মাসের সবচেয়ে পরিচিত দিনটিই আশুরা। ফলে আশুরাকে বোঝার শুরু মহররমের মর্যাদা থেকেই।
মুসা (আ.) ও ফেরাউনের ঘটনা: আশুরার মূল ভিত্তি
বুখারি ও মুসলিমে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা.) হিজরত করে মদিনায় এসে দেখলেন, সেখানকার ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখছে। কারণ জানতে চাইলে তারা বলল, এটি একটি মহান দিন; এ দিনে আল্লাহ মুসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে শত্রুর হাত থেকে মুক্তি দিয়েছেন, তাই মুসা (আ.) কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রোজা রেখেছিলেন। তখন মহানবী (সা.) বললেন, মুসার ব্যাপারে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার। এরপর তিনি নিজে রোজা রাখলেন এবং অন্যদেরও রাখতে বললেন।
কোরআনে এই মুক্তির ঘটনা একাধিক জায়গায় এসেছে। সুরা শুআরায় বলা হয়েছে, আল্লাহ মুসা (আ.)-কে লাঠি দিয়ে সাগরে আঘাত করতে বললেন, আর সাগর ভাগ হয়ে প্রতিটি ভাগ বিশাল পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে গেল। বনি ইসরাইল নিরাপদে পার হলো, পেছনে ধাওয়া করা ফেরাউন ও তার সৈন্যরা ডুবে মরল। সুরা ইউনুসের ৯২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ জানিয়েছেন, ফেরাউনের দেহ পরবর্তী মানুষের জন্য নিদর্শন হিসেবে রক্ষা করা হবে।
বিজ্ঞাপন
আশুরা কেন পালন করা হয়, এ প্রশ্নের মূল উত্তর তাই এই ঘটনাতেই নিহিত। এই ঘটনার শিক্ষা পরিষ্কার: জুলুম যত শক্তিশালীই হোক, শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে না। আর বিপদ থেকে মুক্তি পেলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উত্তম পথ হলো আল্লাহর ইবাদত।
ইসলামের প্রথম যুগে আশুরার রোজা
হজরত আয়েশা (রা.) জানিয়েছেন, জাহেলি যুগেও কুরাইশরা আশুরার দিনে রোজা রাখত, আর মহানবী (সা.)-ও মক্কায় থাকতে এ রোজা রাখতেন। মদিনায় এসে তিনি নিজে রেখেছেন এবং সাহাবিদের রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। পরে যখন রমজানের রোজা ফরজ হলো, তখন তিনি বললেন, যার ইচ্ছা আশুরার রোজা রাখবে, যার ইচ্ছা ছেড়ে দেবে। হাদিসটি বুখারি ও মুসলিমে আছে।
অর্থাৎ রমজান ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজার গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি, পরে তা নফল বা সুন্নত রোজায় পরিণত হয়। সহিহ মুসলিমের হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, আশুরার রোজার বিনিময়ে তিনি আল্লাহর কাছে আশা করেন, তা আগের এক বছরের গুনাহ মুছে দেবে। জীবনের শেষ বছরে তিনি আরও বলেছিলেন, আগামী বছর বেঁচে থাকলে নবম তারিখেও রোজা রাখবেন। সে কারণে আলেমরা ৯ ও ১০ মহররম, অথবা ১০ ও ১১ মহররম মিলিয়ে দুটি রোজা রাখতে উৎসাহ দেন।
বিজ্ঞাপন
কারবালার ঘটনা: ৬১ হিজরির ১০ মহররম
হজরত মুআবিয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পর ইয়াজিদ শাসনক্ষমতায় বসলে হজরত হুসাইন (রা.) তার আনুগত্য মেনে নেননি। কুফার বহু মানুষ চিঠি পাঠিয়ে তাঁকে সেখানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। পরিবার ও অল্প কিছু সঙ্গী নিয়ে তিনি কুফার পথে রওনা হন। পথে কারবালা প্রান্তরে উমাইয়া প্রশাসনের বাহিনী তাঁদের ঘিরে ফেলে এবং ফোরাত নদীর পানির পথ বন্ধ করে দেয়।
১০ মহররম অসম লড়াইয়ে হজরত হুসাইন (রা.) শহীদ হন। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর সঙ্গে পরিবার ও সঙ্গী মিলিয়ে প্রায় ৭২ জন শাহাদাত বরণ করেন। নবী-পরিবারের সদস্যদের এমন করুণ মৃত্যু মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে গভীর বেদনার অধ্যায় হয়ে আছে। সব মত ও পথের মুসলমান হজরত হুসাইন (রা.)-কে ভালোবাসেন এবং তাঁর আত্মত্যাগকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকার দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেন।
তবে মনে রাখা দরকার, আশুরার রোজা ও মর্যাদা কারবালার কারণে আসেনি। কারবালার ঘটনা ঘটেছে নবীজির ইন্তেকালের প্রায় অর্ধশতাব্দী পর। দুটি বিষয় আলাদা করে বোঝা গেলে আশুরা নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি দূর হয়।
বিজ্ঞাপন
আশুরা নিয়ে প্রচলিত বর্ণনা: কোনটি প্রমাণিত, কোনটি নয়
আমাদের দেশে ওয়াজ ও বিভিন্ন বইয়ে আশুরার দিনে ঘটে যাওয়া বহু ঘটনার তালিকা শোনা যায়। যেমন, এ দিনে আদম (আ.)-এর তওবা কবুল হয়েছে, নুহ (আ.)-এর নৌকা জুদি পাহাড়ে থেমেছে, ইবরাহিম (আ.) আগুন থেকে রক্ষা পেয়েছেন, ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছেন, আসমান-জমিন সৃষ্টি হয়েছে, এমনকি কিয়ামতও হবে এই দিনে।
হাদিস বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এসব বর্ণনার বেশির ভাগের সনদ দুর্বল, কোনো কোনোটি একেবারে ভিত্তিহীন। আশুরার সঙ্গে সহিহ সূত্রে নিশ্চিতভাবে যুক্ত ঘটনা হলো মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলের মুক্তি। তাই কোনো বর্ণনা শুনলে তা কোন গ্রন্থে, কোন মানের সনদে এসেছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে জেনে নেওয়াই নিরাপদ। দুর্বল বর্ণনাকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।
আশুরার দিনে পরিবারের জন্য খরচে উদারতা দেখানোর একটি বর্ণনাও প্রচলিত আছে। এর সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে; কেউ কেউ একে আমলযোগ্য মনে করেন, কেউ দুর্বল বলেছেন।
বিজ্ঞাপন
এ দিনে মুমিনের করণীয় ও বর্জনীয়
আশুরার সবচেয়ে প্রমাণিত আমল হলো রোজা। এর পাশাপাশি তওবা, ইস্তেগফার, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও সাধ্যমতো দান করা যায়। এগুলো সারা বছরের সাধারণ নেক আমল, আশুরায়ও করা যায়। কারবালার ইতিহাস পড়া এবং পরিবারকে সত্য ও ধৈর্যের শিক্ষা দেওয়াও হতে পারে দিনটির অর্থবহ ব্যবহার।
আশুরার জন্য নির্দিষ্ট রাকাত ও নির্দিষ্ট সুরা দিয়ে বিশেষ নামাজের যে পদ্ধতি কোথাও কোথাও প্রচলিত, তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য দলিল পাওয়া যায় না। কেউ চাইলে সাধারণ নফল নামাজ পড়তে পারেন, তবে বিশেষ ফজিলতের দাবি করা ঠিক নয়। একইভাবে বিশেষ খাবার রান্নাকে ধর্মীয় দায়িত্ব মনে করার ভিত্তি নেই।
শোক প্রকাশের নামে বুক চাপড়ানো, শরীরে আঘাত করা বা বিলাপ করার বিষয়ে বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে কঠোর সতর্কতা এসেছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি গাল চাপড়ায়, জামা ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহেলি যুগের মতো বিলাপ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। শোক অন্তরে থাকুক, প্রকাশ হোক দোয়া ও ধৈর্যের মাধ্যমে।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
আশুরা প্রতিবছর কবে পড়ে?
আশুরা হিজরি চান্দ্র মাসের ১০ মহররম। চান্দ্রবর্ষ সৌরবর্ষের চেয়ে ১০ থেকে ১১ দিন ছোট, তাই ইংরেজি তারিখ প্রতিবছর এগিয়ে আসে। বাংলাদেশে চাঁদ দেখার ভিত্তিতে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি মহররমের শুরু ঘোষণা করে, সেখান থেকে আশুরার তারিখ ঠিক হয়।
আশুরা কি শুধু কারবালার শোকের দিন?
বিজ্ঞাপন
না। আশুরার মর্যাদা ও রোজার প্রচলন কারবালার আগেই ছিল, যার মূলে মুসা (আ.)-এর মুক্তির ঘটনা। কারবালার শাহাদাত এ দিনের ইতিহাসে যুক্ত হওয়া একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়।
আশুরার দিনে কোন আমলটি সবচেয়ে প্রমাণিত?
রোজা। সহিহ মুসলিমের হাদিসে এর বিনিময়ে আগের এক বছরের গুনাহ মাফের আশা ব্যক্ত করা হয়েছে। সঙ্গে ৯ বা ১১ মহররম মিলিয়ে দুটি রোজা রাখা উত্তম।
আশুরার দিনে কি বাংলাদেশে ছুটি থাকে?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ, বাংলাদেশে পবিত্র আশুরা উপলক্ষে সাধারণ ছুটি থাকে। তারিখ চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে বলে সরকারি ঘোষণা দেখে নেওয়া ভালো।