শবে বরাতের নামাজের নিয়ম ও নিয়ত: নফল ইবাদতের সঠিক ধারণা
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
শবে বরাতের রাতে নামাজ কীভাবে পড়বেন, এর উত্তর খুব সহজ: অন্য যেকোনো রাতের নফল নামাজের মতোই। দুই রাকাত করে, প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর যেকোনো সূরা, যত রাকাত সামর্থ্য ও মনোযোগ থাকে। শবে বরাতের জন্য নির্দিষ্ট রাকাত সংখ্যা, নির্দিষ্ট সূরা বা বিশেষ কোনো পদ্ধতির নামাজ সহিহ হাদিসে নেই।
বিজ্ঞাপন
তবু প্রতি বছর এ রাত ঘনিয়ে এলে নানা পদ্ধতির নামাজের তালিকা ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও একশ রাকাত, প্রতি রাকাতে দশবার সূরা ইখলাস; কোথাও মাগরিবের পর নির্দিষ্ট সূরা পড়ে নির্দিষ্ট রাকাত; সঙ্গে থাকে চমকপ্রদ সব সওয়াবের প্রতিশ্রুতি। এগুলো দেখে সাধারণ মানুষ দ্বিধায় পড়েন, কোনটি ঠিক।
এই লেখায় শবে বরাতের রাতে নফল নামাজ পড়ার সঠিক পদ্ধতি, নিয়ত, রাকাত সংখ্যা নিয়ে আলেমদের বক্তব্য এবং রাতটি ভারসাম্যপূর্ণভাবে কাটানোর কিছু পরামর্শ দেওয়া হলো। এ রাতের ফজিলত নিয়ে আলেমদের মধ্যে আলোচনা আছে; বাংলাদেশের অধিকাংশ আলেম ব্যক্তিগত নফল ইবাদতকে উত্তম মনে করেন, সে কাঠামোর মধ্যেই এই নির্দেশনা।
নফল নামাজ পড়ার নিয়ম
১. অজু করে প্রস্তুতি: ভালোভাবে অজু করে পবিত্র কাপড়ে, পবিত্র জায়গায় কিবলামুখী দাঁড়ান। ঘরের নিরিবিলি কোণ এ ধরনের ইবাদতের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
বিজ্ঞাপন
২. নিয়ত করুন: মনে মনে নিয়ত করুন, আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করছি।
৩. প্রথম রাকাত: তাকবিরে তাহরিমা, সানা, আউজুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ, সূরা ফাতিহা ও অন্য যেকোনো সূরা। তারপর রুকু, কওমা, দুই সিজদা।
৪. দ্বিতীয় রাকাত ও বৈঠক: সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা পড়ে রুকু-সিজদা শেষে বসে তাশাহুদ, দরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফেরান।
৫. পুনরাবৃত্তি: এভাবে দুই রাকাত করে যত ইচ্ছা পড়ুন। হানাফি মাজহাবে রাতের নফল চার রাকাত এক সালামেও পড়া যায়, তবে দুই রাকাত করে পড়াই বেশি প্রচলিত ও সহজ।
বিজ্ঞাপন
নফল নামাজের প্রতি রাকাতেই ফাতিহার পর সূরা মেলাতে হয়। যাঁরা অল্প সূরা জানেন, তাঁরা সেগুলোই বারবার পড়তে পারেন। একই সূরা দুই রাকাতে পড়লেও নামাজ হয়ে যায়।
শবে বরাতের নিয়ত কী
আলাদা কোনো নিয়ত নেই। শবে বরাতের নামাজ বলে বিশেষ নিয়ত করার প্রয়োজন নেই, কারণ এটি আলাদা কোনো নামাজ নয়। এ রাতে আপনি যে নফল পড়ছেন, সেটিই এ রাতের ইবাদত। আরবিতে নিয়ত মুখস্থ করা বা মুখে উচ্চারণ করাও জরুরি নয়; মনে নফল নামাজের সংকল্প থাকলেই যথেষ্ট।
শবে বরাত নামাজ কত রাকাত
বিজ্ঞাপন
নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। দুই রাকাত পড়লেও ইবাদত হলো, বিশ রাকাত পড়লেও। নিজের শক্তি, স্বাস্থ্য ও পরদিনের দায়িত্বের কথা ভেবে পরিমাণ ঠিক করুন।
একশ রাকাতের যে নামাজের কথা প্রচলিত, যেখানে প্রতি রাকাতে দশবার সূরা ইখলাস পড়ার কথা বলা হয়, তা নিয়ে মুহাদ্দিসদের বক্তব্য স্পষ্ট। হাদিসের বিশুদ্ধতা যাচাইকারী আলেমরা এ সংক্রান্ত বর্ণনাগুলোকে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলেছেন, আর ইমাম নববীর মতো ফকিহরা এ নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে পরবর্তী যুগে উদ্ভাবিত বলে সতর্ক করেছেন। একইভাবে মাগরিবের পর নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাতে নির্দিষ্ট সূরা পড়ে বিশেষ উদ্দেশ্য পূরণের যে পদ্ধতিগুলো শোনা যায়, সেগুলোরও নির্ভরযোগ্য কোনো ভিত্তি নেই।
কেউ নিজের ইচ্ছায় নফল নামাজে সূরা ইখলাস বারবার পড়লে তাতে কোনো দোষ নেই। সমস্যা হয় তখন, যখন একটি বানানো পদ্ধতিকে এ রাতের নির্ধারিত নামাজ মনে করা হয়, আর তার সঙ্গে বানানো সওয়াবের প্রতিশ্রুতি জুড়ে দেওয়া হয়।
জামাতে নফল নয়, একা পড়ুন
বিজ্ঞাপন
হানাফি মাজহাবে তারাবি, সূর্যগ্রহণ ও বৃষ্টির নামাজের মতো কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া নফল নামাজ লোক ডেকে জামাতে পড়া মাকরুহ। তাই শবে বরাতে মসজিদে ঘোষণা দিয়ে নফলের জামাত করা ঠিক নয়। পুরুষেরা মসজিদে গেলে নিজে নিজে নফল পড়বেন, আর নারীরা ঘরেই ইবাদত করবেন।
নবী (সা.) বলেছেন, ফরজ ছাড়া মানুষের অন্য নামাজ ঘরে পড়াই উত্তম (বুখারি, মুসলিম)। তাই রাতের নফল ঘরে পড়লে একদিকে সুন্নতের অনুসরণ হয়, অন্যদিকে লোক দেখানোর আশঙ্কাও কমে। ঘরে নামাজের পরিবেশ থাকলে পরিবারের শিশুরাও তা দেখে শেখে, যা কোনো উপদেশের চেয়ে বেশি কার্যকর। মসজিদে গেলে উচ্চ স্বরে জিকির বা মাইকে বয়ান চালিয়ে অন্যের ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটানো থেকেও বিরত থাকা দরকার।
নামাজের বাইরে নফল ইবাদত
রাতটি শুধু নামাজে ভরিয়ে ফেলতে হবে, এমন নয়। মাঝে মাঝে বসে কোরআন তেলাওয়াত করুন, অর্থসহ পড়লে আরও ভালো। সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ও দরুদ শরিফ পড়ুন। আস্তাগফিরুল্লাহ বা সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার পড়ে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চান।
বিজ্ঞাপন
নিজের ভাষায় দোয়া করুন: নিজের গুনাহ মাফের জন্য, মা-বাবার জন্য, মৃত আত্মীয়দের জন্য, অসুস্থদের সুস্থতার জন্য। কারও প্রতি মনে ক্ষোভ বা বিদ্বেষ থাকলে তা দূর করার জন্যও দোয়া করুন, কারণ মধ্য শাবানের রাতের হাদিসে বিদ্বেষ পোষণকারীকে ক্ষমা থেকে বাদ রাখার কথা এসেছে।
কবর জিয়ারত যেকোনো দিন সুন্নত। এ রাতে কেউ একা গিয়ে নীরবে জিয়ারত করে এলে দোষ নেই, কিন্তু একে এ রাতের আবশ্যক রীতি বানানো, দলবেঁধে ভিড় করা বা কবরে মোমবাতি জ্বালানোর কোনো ভিত্তি নেই।
রাতের ইবাদতে ভারসাম্য
সারা রাত জেগে ফজরের নামাজ কাজা করে ফেলা কোনোভাবেই ঠিক নয়। ফরজ ছেড়ে নফলে রাত জাগার কোনো মূল্য নেই। তাই রাতের একটি অংশ ইবাদত করুন, কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিন, শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ুন এবং ফজর জামাতে আদায় করুন।
বিজ্ঞাপন
যাঁদের কাজা নামাজ বাকি, আলেমরা তাঁদের নফলের আগে কাজা আদায়ের পরামর্শ দেন। পরদিন অফিস, পরীক্ষা বা জরুরি কাজ থাকলে নিজের শরীরের সামর্থ্য বুঝে ইবাদত করুন। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের ওপর রাত জাগার চাপ দেবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
শবে বরাতের নফল নামাজ কি মাগরিবের পরই পড়তে হয়?
না। এশার পর থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত যেকোনো সময় পড়া যায়। রাতের শেষ ভাগ নফল নামাজ ও দোয়ার জন্য সবচেয়ে উত্তম সময়।
বিজ্ঞাপন
শবে বরাতের নামাজে কোন সূরা পড়তে হয়?
নির্দিষ্ট কোনো সূরা নেই। যেকোনো সূরা বা আয়াত পড়া যায়, যা মুখস্থ আছে।
মহিলারা কি শবে বরাতে মসজিদে যাবেন?
নফল ইবাদতের জন্য নারীদের ঘরে নামাজ পড়াই উত্তম। ঘরের নিরিবিলি পরিবেশে নামাজ, তেলাওয়াত ও দোয়ায় সময় দিন।
বিজ্ঞাপন
শবে বরাতে নফল না পড়লে কি গুনাহ হবে?
না। এ রাতের সব ইবাদত নফল ও ঐচ্ছিক। না পড়লে গুনাহ নেই, তবে সুযোগ থাকলে ইবাদতে সময় দেওয়া কল্যাণকর।
শবে বরাতের পরদিন রোজা রাখা কি সুন্নত?
পনেরো শাবানের রোজা নিয়ে আলাদা যে বর্ণনা আছে, তার সনদ খুবই দুর্বল। তবে নবী (সা.) শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখতেন, আর প্রতি চান্দ্রমাসের তেরো, চৌদ্দ ও পনেরো তারিখের রোজাও সুন্নত। এই সাধারণ সুন্নতের নিয়তে পনেরো শাবানের রোজা রাখা যায়।
বিজ্ঞাপন
অনেক কাজা নামাজ বাকি থাকলে এ রাতে কোনটি আগে পড়ব?
আলেমরা কাজা নামাজকে অগ্রাধিকার দিতে বলেন, কারণ তা ফরজের দায়। রাতের বড় অংশ কাজা আদায়ে দিন, বাকি সময় দোয়া ও ইস্তিগফারে কাটান।