দুবাই ভ্রমণ: টুরিস্ট ভিসা, খরচ ও প্রস্তুতির পূর্ণ গাইড
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
দুবাই নামটি শুনলে বাংলাদেশে অনেকের মনে প্রথমে আসে প্রবাসী আত্মীয়ের কথা। তবে শুধু কাজের জায়গা নয়, ভ্রমণের জন্যও দুবাই এখন জনপ্রিয় গন্তব্য। বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন বুর্জ খলিফা, মরুভূমির সাফারি, সোনার বাজার আর সাজানো সৈকত, সব মিলিয়ে চার-পাঁচ দিনেই অনেক কিছু দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
দুবাই যাওয়ার নিয়মের প্রথম কথা হলো, বাংলাদেশিদের আগে থেকে টুরিস্ট ভিসা নিতে হয়, বিমানবন্দরে নেমে ভিসা পাওয়ার সুযোগ নেই। এই ভিসা সাধারণত সংযুক্ত আরব আমিরাতের এয়ারলাইন, হোটেল বা অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করা হয়, অনুমোদন হলে ইমেইলে ই-ভিসা আসে।
একটি বিষয় জেনে রাখা জরুরি। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশিদের জন্য আমিরাতের ভিসা প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি দেখা গেছে, কখনো কখনো নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির ভিসা সীমিত রাখা হয়েছে। তাই পরিকল্পনা শুরুর আগে ভিসার সর্বশেষ অবস্থা নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে জেনে নিন।
দুবাই টুরিস্ট ভিসা: প্রক্রিয়া ও কাগজ
১. কোথা থেকে আবেদন: আমিরাতভিত্তিক এয়ারলাইনের টিকিট কাটলে অনেক সময় তাদের মাধ্যমেই ভিসার আবেদন করা যায়। এ ছাড়া অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সি বা হোটেলের মাধ্যমেও আবেদন হয়।
বিজ্ঞাপন
২. ভিসার ধরন: সাধারণত ৩০ বা ৬০ দিনের, একবার বা একাধিকবার প্রবেশের ভিসা দেওয়া হয়। কত দিন থাকবেন, সেই অনুযায়ী বেছে নিন।
৩. প্রয়োজনীয় কাগজ: অন্তত ছয় মাস মেয়াদি পাসপোর্টের স্পষ্ট স্ক্যান কপি, সাদা পটভূমির রঙিন ছবি, যাওয়া-আসার বিমান টিকিট আর হোটেল বুকিং। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও পেশার প্রমাণও চাওয়া হয়।
৪. ই-ভিসা যাচাই: ভিসা হাতে পাওয়ার পর আমিরাতের সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট বা অ্যাপে ভিসার বৈধতা যাচাই করে নিন। নাম, পাসপোর্ট নম্বর আর মেয়াদ মিলিয়ে দেখুন।
ভিসার ফি, কাগজের তালিকা আর প্রক্রিয়ার সময় আবেদনের মাধ্যমভেদে আলাদা হয়। এজেন্সির মাধ্যমে করালে লিখিত রসিদ নিন, আর ভিসা না হলে টাকা ফেরতের শর্ত আগে জেনে নিন।
বিজ্ঞাপন
ঢাকার বিমানবন্দরে যা দেখাতে হতে পারে
টুরিস্ট ভিসায় দুবাই যাওয়ার সময় ঢাকার বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে যাত্রীদের ভ্রমণের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। কারণ, অনেকে ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে কাজ খোঁজার চেষ্টা করেন, যা বেআইনি এবং ঝুঁকিপূর্ণ। সত্যিকারের পর্যটক হিসেবে যাচ্ছেন, তা বোঝাতে ফিরতি টিকিট, হোটেল বুকিং, পাসপোর্টে ডলার এনডোর্সমেন্ট, পেশার প্রমাণ আর ছুটির কাগজ সঙ্গে রাখুন। প্রশ্নের উত্তর সংক্ষেপে ও সত্যভাবে দিন। কাগজে অসংগতি থাকলে যাত্রা আটকে যেতে পারে।
কীভাবে যাবেন ও কখন যাবেন
ঢাকা থেকে দুবাই আকাশপথে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার মতো। চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকেও দুবাইয়ের ফ্লাইট আছে। আগেভাগে কাটলে যাওয়া-আসার ভাড়া আনুমানিক ৪০ থেকে ৭০ হাজার টাকা, ঈদ ও ছুটির মৌসুমে অনেক বেশি।
বিজ্ঞাপন
নভেম্বর থেকে মার্চ দুবাই ভ্রমণের সেরা সময়। তখন দিনের তাপমাত্রা সহনীয়, সন্ধ্যা আরামদায়ক, খোলা জায়গায় ঘোরা যায়। শীতকালীন মেলা আর মৌসুমি পার্কগুলোও এ সময় খোলা থাকে। জুন থেকে সেপ্টেম্বর প্রচণ্ড গরম, দুপুরে বাইরে থাকা কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ।
দুবাইয়ে কী কী দেখবেন
১. বুর্জ খলিফা ও দুবাই মল: বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবনের পর্যবেক্ষণ তলায় উঠতে টিকিট লাগে, অনলাইনে আগে কাটলে সুবিধা। নিচের দুবাই মলে বিশাল অ্যাকুয়ারিয়াম, আর সন্ধ্যায় মলের সামনের লেকে ফোয়ারার প্রদর্শনী বিনা মূল্যে দেখা যায়।
২. পুরোনো দুবাই: দুবাই ক্রিকের দুই পাড়ের পুরোনো এলাকা। ঐতিহ্যবাহী কাঠের নৌকা আবরায় অল্প ভাড়ায় খাঁড়ি পার হওয়া যায়। ওপারে সোনার বাজার আর মসলার বাজার, পাশে আল ফাহিদির পুরোনো বাড়িঘর ও জাদুঘর।
বিজ্ঞাপন
৩. মরুভূমি সাফারি: বিকেলে গাড়িতে বালিয়াড়িতে ছুটে চলা, উটের পিঠে চড়া, সূর্যাস্ত আর রাতের খাবারসহ প্যাকেজ। বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বা নারী বা পিঠের সমস্যা থাকলে বালিয়াড়ির ঝাঁকুনি এড়িয়ে চলুন।
৪. পাম জুমেইরা, দুবাই মেরিনা ও সৈকত: কৃত্রিম দ্বীপ, উঁচু ভবনের সারি আর সৈকতে বিকেল কাটানো যায়। মেরিনায় সন্ধ্যার নৌভ্রমণ জনপ্রিয়।
৫. মৌসুমি আকর্ষণ: শীতের মৌসুমে খোলা থাকা গ্লোবাল ভিলেজে নানা দেশের প্যাভিলিয়ন, খাবার ও কেনাকাটা। ফুলের বাগান মিরাকল গার্ডেনও মৌসুমে খোলা থাকে। এ ছাড়া দুবাই ফ্রেম আর মিউজিয়াম অব দ্য ফিউচার দেখতে যান অনেকে।
৬. আবুধাবি: দুবাই থেকে সড়কপথে দেড় ঘণ্টার মতো। শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ দেখতে এক দিনের ট্যুর জনপ্রিয়। মসজিদে ঢুকতে শালীন পোশাকের নিয়ম কড়াভাবে মানা হয়।
বিজ্ঞাপন
দুবাই ভ্রমণ খরচ ও চলাফেরা
মাঝারি মানের হোটেলে প্রতি রাত আনুমানিক ছয় থেকে ১২ হাজার টাকার সমপরিমাণ, এলাকা ও মৌসুমভেদে বেশি-কম। পুরোনো দুবাইয়ের দেইরা ও বুর দুবাই এলাকায় তুলনামূলক কম দামে থাকার জায়গা পাওয়া যায়, এসব এলাকায় দক্ষিণ এশীয় খাবারের দোকানও অনেক। ভিসা, বিমানভাড়া, হোটেল, খাওয়া আর কয়েকটি টিকিটসহ পাঁচ-ছয় দিনের ভ্রমণে জনপ্রতি আনুমানিক এক থেকে দেড় লাখ টাকা খরচ হতে পারে।
শহরে চলাফেরার জন্য দুবাই মেট্রো সবচেয়ে সাশ্রয়ী। রিচার্জযোগ্য কার্ড দিয়ে মেট্রো, বাস আর জলযানে চড়া যায়। ট্যাক্সি মিটারে চলে, অ্যাপভিত্তিক গাড়িও আছে। স্থানীয় মুদ্রা দিরহাম। মার্কিন ডলার নিয়ে গিয়ে অনুমোদিত এক্সচেঞ্জ থেকে বদলানো সুবিধাজনক।
আইন, শিষ্টাচার ও সতর্কতা
বিজ্ঞাপন
আমিরাতের আইন কঠোর, পর্যটকদেরও তা মেনে চলতে হয়। জনসমক্ষে শালীন পোশাক ও আচরণ বজায় রাখুন। অনুমতি ছাড়া কারও, বিশেষ করে নারীদের ছবি তুলবেন না, সরকারি স্থাপনার ছবি তোলাতেও বিধিনিষেধ থাকতে পারে। কিছু ওষুধ সেখানে নিয়ন্ত্রিত, তাই নিয়মিত কোনো ওষুধ সঙ্গে নিলে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র রাখুন। রমজানে দিনের বেলা প্রকাশ্যে খাওয়া-দাওয়ায় সংযম দেখান।
পোশাকের ক্ষেত্রে হালকা সুতির কাপড় নিন, তবে মল ও মেট্রোর ভেতরে শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ঠান্ডার জন্য একটি পাতলা জ্যাকেট বা চাদর রাখুন। মসজিদ ও ঐতিহ্যবাহী এলাকায় যাওয়ার দিনের জন্য ঢিলেঢালা, শরীর ঢাকা পোশাক আলাদা করে রাখুন। মেট্রোতে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট কামরা থাকে, সেখানে পুরুষদের ওঠা নিষেধ এবং জরিমানাযোগ্য। মেট্রো ও বাসের ভেতরে খাওয়া-দাওয়াও নিষেধ।
টুরিস্ট ভিসায় কোনোভাবেই কাজ করবেন না, আর ভিসার মেয়াদের বেশি থাকবেন না। এতে দৈনিক জরিমানা, আটক আর ভবিষ্যতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা হতে পারে। গরমে প্রচুর পানি পান করুন, দুপুরের রোদে দীর্ঘ সময় বাইরে থাকবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশিরা কি দুবাইয়ে অন অ্যারাইভাল ভিসা পায়?
না, আগে থেকে টুরিস্ট ভিসা নিতে হয়। এয়ারলাইন, হোটেল বা অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করা যায়।
দুবাই টুরিস্ট ভিসা পেতে কত দিন লাগে?
সাধারণত কয়েক কর্মদিবস লাগে। তবে চাপ বা নীতিগত কড়াকড়ির কারণে সময় বেশি লাগতে পারে, তাই হাতে সময় রেখে আবেদন করুন।
বিজ্ঞাপন
টুরিস্ট ভিসায় গিয়ে কি কাজের ভিসা করা যায়?
এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া দালাল এড়িয়ে চলুন। বৈধভাবে কাজে যেতে বাংলাদেশ থেকেই সরকারি প্রক্রিয়ায় কর্মী ভিসা ও বিএমইটির ছাড়পত্র নিতে হয়।
দুবাই ঘুরতে কয়দিন লাগে?
দুবাইয়ের প্রধান জায়গাগুলো দেখতে চার-পাঁচ দিন যথেষ্ট। আবুধাবি যোগ করলে আরও এক দিন রাখুন।
বিজ্ঞাপন
দুবাইয়ে আত্মীয়ের বাসায় থাকলে কি হোটেল বুকিং লাগবে?
ভিসার আবেদনে থাকার ঠিকানার প্রমাণ চাওয়া হয়। আত্মীয়ের বাসায় থাকলে তাঁর ঠিকানা ও পরিচয়ের কাগজ লাগতে পারে, আবেদনের মাধ্যম থেকে নিয়ম জেনে নিন।