থাইল্যান্ড ভ্রমণ গাইড: ভিসা, খরচ, সেরা সময় ও জনপ্রিয় গন্তব্য
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
বাংলাদেশ থেকে প্রথম বিদেশ ভ্রমণের তালিকায় থাইল্যান্ডের নাম প্রায় সব সময়ই থাকে। আকাশপথে আড়াই ঘণ্টার দূরত্ব, সোনালি চূড়ার মন্দির, নীল পানির দ্বীপ, রাস্তার খাবার আর তুলনামূলক সাশ্রয়ী খরচ, সব মিলিয়ে দেশটি পর্যটকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। পরিবার, দম্পতি বা বন্ধুদের দল, সবার জন্যই এখানে কিছু না কিছু আছে।
বিজ্ঞাপন
থাইল্যান্ড ভ্রমণের প্রথম শর্ত ভিসা। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের যাত্রার আগেই ভিসা নিতে হয়, বিমানবন্দরে নেমে ভিসা পাওয়ার সুযোগ নেই। থাইল্যান্ড ভিসা আবেদনের জন্য অনলাইন ই-ভিসা ব্যবস্থা চালু করেছে, ঢাকার থাই দূতাবাসের অফিশিয়াল নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদন করতে হয়।
সবচেয়ে আরামদায়ক সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। ছয়-সাত দিনের একটি সাধারণ ভ্রমণে বিমানভাড়াসহ জনপ্রতি আনুমানিক ৮০ হাজার থেকে সোয়া লাখ টাকা খরচ হতে পারে। হোটেলের মান, কোন কোন শহরে যাচ্ছেন আর কেনাকাটার ওপর এই অঙ্ক অনেকটাই বদলায়।
থাইল্যান্ড ভিসা: কাগজপত্র ও প্রক্রিয়া
১. পাসপোর্ট: যাত্রার দিন থেকে অন্তত ছয় মাস মেয়াদ এবং ফাঁকা পাতা থাকতে হবে। আগের বিদেশ ভ্রমণের ভিসা ও সিল থাকলে তা আবেদনকে শক্তিশালী করে।
বিজ্ঞাপন
২. ছবি: নির্ধারিত মাপের সাম্প্রতিক রঙিন ছবি, সাধারণত সাদা পটভূমিতে।
৩. আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণ: সাম্প্রতিক কয়েক মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সনদ। হঠাৎ বড় অঙ্ক জমা দেখালে প্রশ্ন উঠতে পারে, তাই নিয়মিত লেনদেনের হিসাব থাকাই ভালো।
৪. পেশার প্রমাণ: চাকরিজীবীদের অফিসের অনাপত্তিপত্র ও ছুটির কাগজ, ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স, শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র ও অনুমতিপত্র।
৫. ভ্রমণের পরিকল্পনা: যাওয়া-আসার বিমান টিকিটের বুকিং আর হোটেল বুকিং।
বিজ্ঞাপন
আবেদনের কাগজের তালিকা ও ফি সময়ে সময়ে বদলায়। আবেদনের আগে থাই দূতাবাসের ওয়েবসাইটে হালনাগাদ তালিকা দেখে নিন। ভিসা প্রক্রিয়ায় কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে, তাই যাত্রার অন্তত এক মাস আগে আবেদন করুন। ভিসা পাওয়ার আগে ফেরতযোগ্য নয় এমন টিকিট কাটবেন না।
থাইল্যান্ডে ঢোকার আগে অনলাইনে একটি ডিজিটাল অ্যারাইভাল কার্ড পূরণের নিয়ম চালু আছে, যাত্রার কয়েক দিনের মধ্যে এটি জমা দিতে হয়। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে ফিরতি টিকিট, হোটেল বুকিং আর খরচের সামর্থ্যের প্রমাণ দেখতে চাইতে পারে, তাই সেগুলো হাতের কাছে রাখুন।
কখন যাবেন: থাইল্যান্ড ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি থাইল্যান্ডের শীতকাল, তবে আমাদের মতো ঠান্ডা নয়, বরং আরামদায়ক উষ্ণ। বৃষ্টি কম, সাগর শান্ত, তাই দ্বীপ ঘোরার জন্যও এটিই সেরা সময়। তবে এ সময় ভিড় ও হোটেলের দাম দুটোই বেশি।
বিজ্ঞাপন
মার্চ থেকে মে প্রচণ্ড গরম। এপ্রিলের মাঝামাঝি থাই নববর্ষ সংক্রান উৎসবে রাস্তায় পানি ছিটানোর আয়োজন হয়, যা অনেক পর্যটকের কাছে আকর্ষণীয়। জুন থেকে অক্টোবর বর্ষা। এ সময় হোটেলে ছাড় মেলে, তবে ফুকেট ও ক্রাবির দিকের সাগর উত্তাল থাকে, দ্বীপের নৌভ্রমণ বাতিলও হতে পারে।
জনপ্রিয় গন্তব্য
ব্যাংকক: রাজধানী শহরেই অনেক কিছু দেখার। গ্র্যান্ড প্যালেস, শায়িত বুদ্ধমূর্তির জন্য বিখ্যাত ওয়াট ফো আর নদীর পাড়ের ওয়াট অরুণ একই দিনে ঘোরা যায়। চাও প্রায়া নদীতে নৌকাভ্রমণ, সপ্তাহান্তের চাতুচাক বাজার আর প্রাতুনামের কেনাকাটার এলাকা বাংলাদেশি পর্যটকদের প্রিয়। শহরে চলাফেরার জন্য স্কাইট্রেন ও মেট্রো সবচেয়ে সুবিধাজনক।
পাতায়া: ব্যাংকক থেকে সড়কপথে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। সৈকত, রাতের জমজমাট পরিবেশ আর কাছের কোরাল দ্বীপে স্পিডবোট বা ফেরিতে দিনভর ঘোরা এখানকার মূল আকর্ষণ।
বিজ্ঞাপন
ফুকেট: আন্দামান সাগরের পাড়ে থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় দ্বীপ। সৈকত, দৃশ্যমান পাহাড়ি পথ আর এখান থেকে ফি ফি দ্বীপপুঞ্জে দিনের ট্যুর জনপ্রিয়। ব্যাংকক থেকে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে এক ঘণ্টার কিছু বেশি।
ক্রাবি: চুনাপাথরের খাড়া পাহাড়, স্বচ্ছ পানি আর ছোট ছোট দ্বীপ। আও নাং সৈকত থেকে লংটেইল নৌকায় কাছের দ্বীপগুলো ঘোরা যায়। ফুকেটের তুলনায় কিছুটা শান্ত।
চিয়াং মাই: উত্তরের পাহাড়ি শহর, প্রাচীন মন্দির, রাতের বাজার আর শীতল আবহাওয়ার জন্য পরিচিত। শহর থেকে পাহাড়ের ওপরের দোই সুথেপ মন্দির দেখতে যান অনেকে।
ব্যাংককের বিমানবন্দর থেকে শহরে যেতে এয়ারপোর্ট রেল লিংক ট্রেন, মিটার ট্যাক্সি আর অ্যাপভিত্তিক গাড়ি পাওয়া যায়। বিমানবন্দরেই পর্যটকদের জন্য বিশেষ মোবাইল সিম বিক্রি হয়, পাসপোর্ট দেখিয়ে কিনতে হয়। ট্যাক্সিতে উঠলে মিটার চালু আছে কি না দেখে নিন।
বিজ্ঞাপন
প্রথমবার গেলে ব্যাংকক ও পাতায়া মিলিয়ে পাঁচ-ছয় দিন, অথবা ব্যাংকক ও ফুকেট মিলিয়ে ছয়-সাত দিনের পরিকল্পনা সবচেয়ে প্রচলিত।
থাইল্যান্ড ভ্রমণ খরচ ও প্যাকেজ
ঢাকা থেকে ব্যাংককের যাওয়া-আসার বিমানভাড়া আগেভাগে কাটলে আনুমানিক ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা, ছুটির মৌসুমে বেশি। মাঝারি মানের হোটেলে প্রতি রাত আনুমানিক তিন থেকে সাত হাজার টাকার সমপরিমাণ। রাস্তার পাশের দোকানে খেলে দিনে খাবারের খরচ কম পড়ে, রেস্তোরাঁয় খেলে বেশি। দ্বীপভ্রমণ, শো আর বিনোদনের টিকিট আলাদা খরচ।
থাইল্যান্ড ভ্রমণ প্যাকেজ দেশের অনেক ট্রাভেল এজেন্সি বিক্রি করে। প্যাকেজে সাধারণত বিমান টিকিট, হোটেল, বিমানবন্দর থেকে হোটেলে আনা-নেওয়া আর কয়েকটি ট্যুর থাকে। প্যাকেজ কেনার আগে লিখিতভাবে জেনে নিন কী কী অন্তর্ভুক্ত, ভিসা প্রক্রিয়ার দায়িত্ব কার, হোটেলের নাম ও মান কী আর ভিসা না হলে টাকা ফেরতের নিয়ম কী। এজেন্সিটি সরকারি নিবন্ধনপ্রাপ্ত কি না, তাও দেখে নিন।
বিজ্ঞাপন
থাই মুদ্রা বাথ। বাংলাদেশ থেকে মার্কিন ডলার নিয়ে গিয়ে সেখানকার অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জে বদলানো সাধারণত লাভজনক। বিমানবন্দরের চেয়ে শহরের ভেতরের এক্সচেঞ্জে হার প্রায়ই ভালো থাকে। কার্ড ব্যবহার করতে চাইলে আন্তর্জাতিক লেনদেন চালু আছে কি না দেশ ছাড়ার আগে নিশ্চিত হন।
যে নিয়ম ও সতর্কতা মানতে হবে
থাইল্যান্ডে রাজপরিবার নিয়ে অসম্মানজনক কথা বা আচরণ কঠোর আইনে দণ্ডনীয়, এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করাই নিরাপদ। মন্দিরে ঢোকার সময় কাঁধ ও হাঁটু ঢাকা পোশাক পরতে হয়, জুতা খুলতে হয়। ইলেকট্রনিক সিগারেট বহন ও ব্যবহার সেখানে নিষিদ্ধ।
পর্যটকদের লক্ষ্য করে কিছু প্রতারণা প্রচলিত আছে। কেউ যদি বলেন আজ মন্দির বন্ধ, চলুন অন্য জায়গায় নিয়ে যাই, কিংবা খুব কম ভাড়ায় টুকটুকে শহর ঘোরানোর প্রস্তাব দেন, সাবধান হোন। এসব প্রায়ই রত্ন বা কাপড়ের দোকানে নিয়ে যাওয়ার কৌশল। জেট স্কি বা বাইক ভাড়া নেওয়ার আগে ছবি তুলে রাখুন, পরে ক্ষতির মিথ্যা অভিযোগ এড়াতে।
বিজ্ঞাপন
হালাল খাবার খুঁজলে দোকানের সামনে হালাল চিহ্ন দেখুন। ব্যাংকক ও দক্ষিণের শহরগুলোতে হালাল রেস্তোরাঁ বেশ সহজেই পাওয়া যায়। প্রচুর পানি পান করুন, রোদে সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। পাসপোর্টের কপি সঙ্গে রাখুন, মূল পাসপোর্ট হোটেলের নিরাপদ জায়গায় রাখতে পারেন। ভিসার মেয়াদের বেশি থাকবেন না, এতে জরিমানা ও ভবিষ্যতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা হতে পারে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বাংলাদেশিরা কি থাইল্যান্ডে অন অ্যারাইভাল ভিসা পায়?
না, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের যাত্রার আগেই ভিসা নিতে হয়। ঢাকার থাই দূতাবাসের নির্দেশনা অনুযায়ী অনলাইনে আবেদন করতে হয়।
বিজ্ঞাপন
থাইল্যান্ড ভ্রমণে কত দিন রাখা উচিত?
ব্যাংকক ও পাতায়ার জন্য পাঁচ দিন যথেষ্ট। ফুকেট বা ক্রাবি যোগ করলে অন্তত সাত দিন রাখুন।
থাইল্যান্ডে কি সহজে হালাল খাবার পাওয়া যায়?
ব্যাংকক, ফুকেট ও ক্রাবিতে হালাল রেস্তোরাঁ আছে। দক্ষিণের প্রদেশগুলোতে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় সেখানে আরও সহজে মেলে।
বিজ্ঞাপন
থাইল্যান্ড ভ্রমণ প্যাকেজ নেওয়া ভালো, নাকি নিজে পরিকল্পনা?
প্রথমবার গেলে প্যাকেজে ঝামেলা কম। অভিজ্ঞতা থাকলে নিজে টিকিট ও হোটেল বুক করে ঘুরলে খরচ কম পড়ে এবং স্বাধীনতাও বেশি থাকে।