নেপাল ভ্রমণ গাইড: অন অ্যারাইভাল ভিসা, খরচ ও যাওয়ার সেরা সময়
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
বিদেশ ভ্রমণের শুরুটা যাঁরা কাছে কোথাও থেকে করতে চান, তাঁদের কাছে নেপাল সবচেয়ে সহজ বিকল্পগুলোর একটি। ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু আকাশপথে দেড় ঘণ্টার কম, আর আগে থেকে ভিসার জন্য দূতাবাসে দৌড়াতে হয় না। বাংলাদেশিরা কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমেই অন অ্যারাইভাল ভিসা পান। সার্কভুক্ত দেশের নাগরিক হিসেবে বছরের প্রথম ভ্রমণে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য এই ভিসা ফি ছাড়াই দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
নেপাল ভ্রমণের উপযুক্ত সময় অক্টোবর-নভেম্বর এবং মার্চ-এপ্রিল। এ সময় আকাশ পরিষ্কার থাকে, হিমালয়ের তুষারঢাকা চূড়াগুলো স্পষ্ট দেখা যায়। বর্ষায় পাহাড়ি পথে ধস নামে, আর ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে উঁচু এলাকায় প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়ে।
খরচের হিসাবে, পাঁচ-ছয় দিনের একটি সাধারণ ভ্রমণে বিমানভাড়াসহ জনপ্রতি আনুমানিক ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা লাগতে পারে। বিমানভাড়া আর হোটেলের মানের ওপর এই অঙ্ক অনেকটা ওঠানামা করে।
নেপাল ভ্রমণ ভিসা: কী লাগে
১. পাসপোর্ট: যাত্রার দিন থেকে অন্তত ছয় মাস মেয়াদ থাকতে হবে, সঙ্গে ফাঁকা পাতা।
বিজ্ঞাপন
২. অ্যারাইভাল ফরম: নেপালের ইমিগ্রেশন বিভাগের অনলাইন ফরম যাত্রার আগে পূরণ করে রাখা যায়, অথবা বিমানবন্দরের কিয়স্কে পূরণ করা যায়। আগে পূরণ করলে লাইনে সময় কম লাগে।
৩. ফিরতি টিকিট ও হোটেল বুকিং: ইমিগ্রেশনে এগুলো দেখতে চাইতে পারে, প্রিন্ট বা মোবাইলে রাখুন।
৪. ডলার এনডোর্সমেন্ট: বাংলাদেশ থেকে বিদেশে খরচের জন্য পাসপোর্টে ডলার এনডোর্স করিয়ে নিন। নেপালে খরচের জন্য মার্কিন ডলার সঙ্গে নেওয়াই সুবিধাজনক।
বিমানবন্দরে নামার পর প্রক্রিয়াটি সহজ। অন অ্যারাইভাল ভিসার নির্দিষ্ট লাইনে দাঁড়িয়ে পূরণ করা ফরমের রসিদ বা কিউআর কোড, পাসপোর্ট আর প্রয়োজনে ফিরতি টিকিট দেখাতে হয়। কর্মকর্তা কোথায় থাকবেন, কত দিন থাকবেন জানতে চাইতে পারেন, সংক্ষেপে সঠিক উত্তর দিন। এরপর পাসপোর্টে ভিসার স্টিকার বা সিল দিয়ে দেওয়া হয়। ভ্রমণের মৌসুমে এই লাইনে কিছুটা সময় লাগতে পারে, ধৈর্য রাখুন।
বিজ্ঞাপন
একই বছরে দ্বিতীয়বার গেলে বা বেশি দিন থাকতে চাইলে ফি দিয়ে ভিসা নিতে হয়। ভিসার নিয়ম ও মেয়াদ সময়ে সময়ে বদলাতে পারে, তাই যাওয়ার আগে নেপালের ইমিগ্রেশন বিভাগ বা ঢাকার নেপাল দূতাবাসের হালনাগাদ তথ্য দেখে নিন।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করে বাংলাদেশি ও নেপালি কয়েকটি এয়ারলাইন। আগেভাগে কাটলে যাওয়া-আসার ভাড়া আনুমানিক ৩০ থেকে ৪৫ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়, উৎসবের মৌসুমে বেশি। বিমান থেকে নামার আগে আকাশ পরিষ্কার থাকলে জানালা দিয়ে হিমালয়ের সারি দেখা যায়, তাই বাঁ দিকের জানালার আসন অনেকের পছন্দ।
স্থলপথেও যাওয়া সম্ভব, পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা সীমান্ত দিয়ে ভারতের শিলিগুড়ি হয়ে নেপালের কাকরভিটা। তবে এ জন্য ভারতের ট্রানজিট বা ভ্রমণ ভিসা লাগে, আর পুরো পথ দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর। প্রথমবার যাঁরা যাচ্ছেন, তাঁদের জন্য আকাশপথই সহজ।
বিজ্ঞাপন
কোথায় কোথায় ঘুরবেন
কাঠমান্ডু: রাজধানী শহরেই ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা কয়েকটি স্থাপনা। কাঠমান্ডু দরবার স্কয়ার, পশুপতিনাথ মন্দির, বৌদ্ধনাথ স্তূপ আর পাহাড়ের ওপরের স্বয়ম্ভূনাথ স্তূপ ঘুরতে দুই দিন লাগে। কাছের পাটন ও ভক্তপুর দরবার স্কয়ারে প্রাচীন নেওয়ারি স্থাপত্যের অসাধারণ নিদর্শন। পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার মূল এলাকা থামেল।
নাগরকোট: কাঠমান্ডু থেকে ঘণ্টা দেড়েকের পথ। ভোরে আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে হিমালয়ের লম্বা সারির ওপর সূর্যোদয় দেখা যায়।
পোখারা: কাঠমান্ডু থেকে সড়কপথে ছয় থেকে আট ঘণ্টা, আকাশপথে আধা ঘণ্টারও কম। ফেওয়া লেকে নৌকাভ্রমণ, সারাংকোট থেকে অন্নপূর্ণা পর্বতমালার ওপর সূর্যোদয়, শান্তি স্তূপ, ডেভিস ফলস আর পাশের গুহা পোখারার প্রধান আকর্ষণ। প্যারাগ্লাইডিংয়ের জন্যও জায়গাটি বিখ্যাত।
বিজ্ঞাপন
চিতওয়ান জাতীয় উদ্যান: দক্ষিণের সমতলে বনাঞ্চল, এক শিংওয়ালা গন্ডার আর নানা প্রাণী দেখার জন্য জঙ্গল সাফারি হয়।
ট্রেকিং করতে চাইলে
নেপাল ট্রেকিংয়ের স্বর্গ। প্রথমবারের জন্য পোখারার কাছের পুনহিল বা ছোট ট্রেকগুলো ভালো। অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প বা এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের মতো উঁচু ট্রেকে যেতে শারীরিক প্রস্তুতি, সঠিক সরঞ্জাম আর অভিজ্ঞতা দরকার। সংরক্ষিত এলাকায় ট্রেকিংয়ের জন্য প্রবেশ অনুমতি লাগে, আর বিদেশি ট্রেকারদের জন্য নিবন্ধিত গাইড নেওয়ার নিয়ম চালু আছে। উচ্চতাজনিত অসুস্থতার লক্ষণ, যেমন মাথাব্যথা, বমিভাব বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে আর ওপরে না উঠে নিচে নেমে আসুন। উঁচু ট্রেকে যাওয়ার আগে এমন ভ্রমণ বিমা নিন, যাতে জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসার খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকে।
ছয় দিনের একটি নমুনা সূচি
বিজ্ঞাপন
১. প্রথম দিন: সকালে কাঠমান্ডু পৌঁছে থামেলের হোটেলে উঠুন। বিকেলে হেঁটে কাঠমান্ডু দরবার স্কয়ার ঘুরে আসুন, সন্ধ্যায় থামেলের রাস্তায় হাঁটুন।
২. দ্বিতীয় দিন: সকালে স্বয়ম্ভূনাথ, দুপুরের পর পশুপতিনাথ আর সন্ধ্যার আগে বৌদ্ধনাথ স্তূপ। এই তিনটি একই দিনে ট্যাক্সিতে ঘোরা যায়।
৩. তৃতীয় দিন: ভোরে ট্যুরিস্ট বাসে পোখারার পথে রওনা দিন। বিকেলে পৌঁছে ফেওয়া লেকের পাড়ে বিশ্রাম।
৪. চতুর্থ দিন: খুব ভোরে সারাংকোটে সূর্যোদয়, তারপর শান্তি স্তূপ, ডেভিস ফলস আর গুহা। বিকেলে লেকে নৌকাভ্রমণ।
বিজ্ঞাপন
৫. পঞ্চম দিন: পোখারা থেকে কাঠমান্ডু ফেরা। সময় থাকলে সন্ধ্যায় কেনাকাটা।
৬. ষষ্ঠ দিন: সকালে ভক্তপুর বা পাটন দরবার স্কয়ার ঘুরে দুপুরের পর বিমানবন্দর।
এই সূচিতে তাড়াহুড়া কম, পরিবার নিয়েও স্বচ্ছন্দে ঘোরা যায়। হাতে দুই দিন বেশি থাকলে পোখারা থেকে চিতওয়ান ঘুরে কাঠমান্ডু ফেরা যায়, অথবা পোখারার কাছে ছোট একটি ট্রেক যোগ করা যায়।
নেপাল ভ্রমণ খরচ: আনুমানিক হিসাব
বিজ্ঞাপন
থামেল বা পোখারার লেকসাইড এলাকায় সাধারণ মানের হোটেলে প্রতি রাত আনুমানিক দেড় থেকে চার হাজার টাকার সমপরিমাণ, ভালো হোটেলে বেশি। স্থানীয় রেস্তোরাঁয় ডাল-ভাত, মোমো, থুকপা খেলে দিনে আনুমানিক এক থেকে দুই হাজার টাকার সমপরিমাণ খরচ হয়। কাঠমান্ডু-পোখারা ট্যুরিস্ট বাসে যাতায়াত তুলনামূলক সস্তা, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে খরচ অনেক বেশি। দর্শনীয় স্থানগুলোতে বিদেশিদের প্রবেশমূল্য দিতে হয়, সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য অনেক জায়গায় কম হারে।
নেপালি রুপি স্থানীয় মুদ্রা। থামেলে অনেক মানি এক্সচেঞ্জ আছে, কয়েকটিতে হার মিলিয়ে বদলান। বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে স্থানীয় মোবাইল সিম কিনতে পাসপোর্টের কপি ও ছবি লাগে। কাঠমান্ডুর ভেতরে ট্যাক্সিতে উঠলে ভাড়া আগে ঠিক করে নিন, অনেক চালক মিটারে চালাতে চান না। পাহাড়ি পথে ভ্রমণের সময় রাস্তার অবস্থার কারণে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি লাগতে পারে, তাই ফেরার ফ্লাইটের আগের দিন কাঠমান্ডুতে ফিরে থাকা নিরাপদ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বাংলাদেশিদের কি নেপালে যেতে আগে ভিসা নিতে হয়?
বিজ্ঞাপন
না, বিমানবন্দরে অন অ্যারাইভাল ভিসা পাওয়া যায়। সার্কভুক্ত দেশের নাগরিক হিসেবে বছরের প্রথম ভ্রমণে নির্দিষ্ট মেয়াদের ভিসা ফি ছাড়াই দেওয়া হয়।
নেপাল ভ্রমণের জন্য কত দিন যথেষ্ট?
কাঠমান্ডু ও পোখারা দেখতে পাঁচ-ছয় দিন যথেষ্ট। চিতওয়ান বা ট্রেকিং যোগ করলে আরও কয়েক দিন রাখুন।
নেপালে কি বাংলাদেশি টাকা চলে?
বিজ্ঞাপন
সাধারণত না। মার্কিন ডলার নিয়ে গিয়ে সেখানে নেপালি রুপিতে বদলানো সুবিধাজনক।
শীতকালে কি নেপাল যাওয়া ঠিক হবে?
কাঠমান্ডু ও পোখারায় যাওয়া যায়, আকাশও অনেক সময় পরিষ্কার থাকে। তবে রাতে বেশ ঠান্ডা পড়ে, উঁচু এলাকার ট্রেকিং কঠিন হয়ে যায়।
নেপালে হালাল খাবার পাওয়া যায় কি?
বিজ্ঞাপন
কাঠমান্ডু ও পোখারার পর্যটন এলাকায় কিছু হালাল রেস্তোরাঁ আছে। এর বাইরে নিরামিষ, ডাল-ভাত ও ডিমের খাবার সহজেই পাওয়া যায়।