ঢাকার কাছে ঘোরার জায়গা: এক দিনে ঘুরে আসার সেরা গন্তব্য
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
সপ্তাহের ছুটির একটা দিন, শহরের ভিড় থেকে একটু দূরে যেতে চান, অথচ রাত কাটানোর ঝামেলা চান না। ঢাকার চারপাশে ৩০ থেকে ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে এমন অনেক জায়গা আছে, যেখানে ভোরে রওনা দিয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা যায়। কোথাও শত বছরের পুরোনো জমিদারবাড়ি, কোথাও শালবন, কোথাও নদীর পাড়ে ইলিশ ভাজার গন্ধ।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা থেকে একদিনের ট্যুরের সাফল্য নির্ভর করে একটি বিষয়ের ওপর: কখন বেরোচ্ছেন। ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথে যানজটে এক-দুই ঘণ্টা নষ্ট হওয়া খুবই সাধারণ। সকাল সাতটার আগে বেরোলে সেই সময়টুকু বাঁচে, গন্তব্যেও ভিড় শুরুর আগে পৌঁছানো যায়।
নিচে দিক ধরে ঢাকার আশেপাশে ঘোরার জায়গাগুলোর নাম, দূরত্ব আর যাওয়ার উপায় দেওয়া হলো। পরিবার, বন্ধু বা একা, সবার জন্যই কিছু না কিছু আছে।
পূর্ব দিকে: সোনারগাঁ ও পূর্বাচল
১. সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জ: ঢাকা থেকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার। একসময়ের বাংলার রাজধানী সোনারগাঁয়ে আছে পানাম নগর, যেখানে রাস্তার দুই পাশে উনিশ শতকের বণিকদের পুরোনো দালানের সারি। কাছেই বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের জাদুঘর, যেখানে দেশের লোকশিল্পের নিদর্শন আর বিশাল পুকুরঘেরা খোলা চত্বর। গুলিস্তান বা যাত্রাবাড়ী থেকে বাসে মোগরাপাড়া চৌরাস্তা, সেখান থেকে রিকশা বা অটোরিকশায় যাওয়া যায়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে এখানে লোকজ মেলা হয়। সময় থাকলে কাছের গোয়ালদী গ্রামে সুলতানি আমলের এক গম্বুজ মসজিদটিও দেখে আসুন, পোড়ামাটির কারুকাজের জন্য এটি পরিচিত। পানাম নগরের পুরোনো দালানগুলো জীর্ণ, ভেতরে ঢোকা বা দেয়ালে ওঠা নিষেধ, নির্দেশনা মেনে বাইরে থেকে দেখুন।
বিজ্ঞাপন
২. পূর্বাচল ও ৩০০ ফিট সড়ক: শহরের একেবারে কাছে খোলা জায়গা, নদীর পাড়ে নৌকায় ঘোরা আর লেকের ধারের রেস্তোরাঁ। শরতে এখানকার কাশবন অনেককে টানে। রূপগঞ্জের জিন্দা পার্কও এ পথেই, যেখানে গাছপালা, লেক আর গ্রামীণ পরিবেশে সময় কাটানো যায়।
উত্তর দিকে: গাজীপুর
গাজীপুর ঢাকার সবচেয়ে কাছের সবুজ। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান শালবনে ঘেরা, ভেতরে হাঁটার পথ, লেক আর পিকনিক স্পট। শ্রীপুর এলাকায় সাফারি পার্ক, যেখানে গাড়িতে বসে খোলা পরিবেশে বাঘ, সিংহ, হরিণ, জেব্রাসহ নানা প্রাণী দেখা যায়। শিশুরা এখানে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায়।
মহাখালী বা উত্তরা থেকে ময়মনসিংহগামী বাসে ভাওয়াল উদ্যানের সামনে নামা যায়। সাফারি পার্কে নিজের গাড়ি বা ভাড়া করা গাড়িতে যাওয়াই সুবিধাজনক। গাজীপুরে অনেক বেসরকারি রিসোর্টও আছে, যেগুলো দিনভিত্তিক প্যাকেজ দেয়। সেখানে যেতে চাইলে আগে থেকে বুক করুন। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রতিষ্ঠিত নুহাশ পল্লিও গাজীপুরে, তাঁর পাঠকদের কাছে জায়গাটি বিশেষ আকর্ষণের। সেখানে প্রবেশের নিয়ম ও সময় আগে জেনে নিন। শালবনে হাঁটার সময় নির্ধারিত পথের বাইরে একা গভীরে যাবেন না, আর পিকনিক শেষে আবর্জনা নিজ দায়িত্বে সরিয়ে আসুন।
বিজ্ঞাপন
পশ্চিম দিকে: সাভার ও মানিকগঞ্জ
১. জাতীয় স্মৃতিসৌধ, সাভার: ঢাকা থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে নির্মিত এই সৌধ আর চারপাশের সবুজ চত্বর, লেক ও গণকবর দেখতে সারা বছর মানুষ আসেন। গাবতলী থেকে সাভার বা নবীনগরগামী বাসে সহজেই যাওয়া যায়। ভেতরে শালীনতা বজায় রাখা আর নির্দেশনা মানা জরুরি।
২. বালিয়াটি জমিদারবাড়ি, মানিকগঞ্জ: সাটুরিয়া উপজেলায় একই চত্বরে কয়েকটি বিশাল প্রাসাদ, সামনে বড় পুকুর। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে থাকা এই স্থাপনা সাধারণত রোববার বন্ধ থাকে। গাবতলী থেকে মানিকগঞ্জ বা সাটুরিয়ার বাসে গিয়ে সেখান থেকে অটোরিকশায় যাওয়া যায়।
৩. তেওতা জমিদারবাড়ি: মানিকগঞ্জের শিবালয়ে যমুনার কাছে আরেকটি পুরোনো জমিদারবাড়ি। বালিয়াটির সঙ্গে একই দিনে মেলানো যায়, যদি ভোরে রওনা দেন।
বিজ্ঞাপন
দক্ষিণে: পদ্মা পাড় ও মুন্সীগঞ্জ
পদ্মা সেতু হয়ে যাওয়ার পর মাওয়া ও জাজিরা অংশে নদীর পাড়ে ঘুরতে যাওয়ার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। নদীর পাড়ের রেস্তোরাঁয় তাজা ইলিশ ভাজা আর নদীর বাতাস, দুপুরের খাবারের জন্য এর চেয়ে ভালো উপলক্ষ কমই আছে। ইলিশ কেনার সময় দাম ও ওজন আগে ঠিক করে নিন। ইলিশের ভরা মৌসুমে, অর্থাৎ বর্ষা ও তার পরের কয়েক মাসে, এখানে আসার আনন্দ সবচেয়ে বেশি। তবে মা ইলিশ রক্ষায় সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞার সময়ে ইলিশ ধরা ও কেনাবেচা বন্ধ থাকে, তখন অন্য মাছেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। নদীতে নৌকায় ঘুরতে চাইলে লাইফ জ্যাকেট নিশ্চিত করুন, পদ্মার স্রোত তীব্র।
মুন্সীগঞ্জ শহরে মোগল আমলের ইদ্রাকপুর দুর্গ আছে। শ্রীনগরের আড়িয়াল বিল বর্ষা ও শরতে পানিতে ভরা থাকে, শীতে সেখানে ফসলের মাঠ। মৌসুম বুঝে গেলে বিলের দুই রকম রূপ দেখা যায়।
একটু দূরে, তবু এক দিনে
বিজ্ঞাপন
উয়ারী-বটেশ্বর, নরসিংদী: ঢাকা থেকে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার। আড়াই হাজার বছরের পুরোনো দুর্গনগরীর প্রত্নস্থান, যেখানে খননে প্রাচীন মুদ্রা, পুঁতি আর ইটের স্থাপনা পাওয়া গেছে। ইতিহাসে আগ্রহীদের জন্য দারুণ জায়গা।
মহেড়া জমিদারবাড়ি, টাঙ্গাইল: মির্জাপুর উপজেলায় সুন্দর করে সংরক্ষিত জমিদারবাড়ি, এখন পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধীনে, টিকিট কেটে ঘোরা যায়।
ময়নামতি, কুমিল্লা: প্রায় ১০০ কিলোমিটার, বাসে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। শালবন বিহার, ময়নামতি জাদুঘর আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাধিক্ষেত্র একসঙ্গে দেখা যায়। শালবন বিহার প্রাচীন বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্রের ধ্বংসাবশেষ, পাশের জাদুঘরে খননে পাওয়া মূর্তি, মুদ্রা আর পোড়ামাটির ফলক সাজানো। ফেরার আগে কুমিল্লার রসমালাই চেখে দেখতে ভুলবেন না।
একদিনের ট্যুরের খরচ ও প্রস্তুতি
বিজ্ঞাপন
বাসে গেলে বেশির ভাগ জায়গায় যাওয়া-আসা আনুমানিক ২০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে হয়ে যায়। প্রবেশমূল্য আনুমানিক ২০ থেকে ১০০ টাকা, সাফারি পার্ক বা বেসরকারি পার্কে কিছুটা বেশি। দুপুরের খাবার আর স্থানীয় যাতায়াত মিলিয়ে জনপ্রতি আনুমানিক ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকায় একটি সাধারণ দিন কাটানো যায়। কয়েকজন মিলে মাইক্রোবাস ভাড়া করলে আরাম বেশি, খরচ ভাগ হয়ে যায়।
সঙ্গে পানি, হালকা খাবার, ছাতা আর নগদ টাকা রাখুন। প্রত্নস্থান ও জাদুঘরের সাপ্তাহিক ছুটির দিন আগে জেনে নিন। ফেরার শেষ বাস কখন, সেটিও জেনে রাখুন, বিশেষ করে শুক্রবারে।
মৌসুম বুঝে গন্তব্য বাছলে ভ্রমণ আরও উপভোগ্য হয়। শীতে জমিদারবাড়ি, প্রত্নস্থান আর জাদুঘর ঘোরা আরামদায়ক, রোদও গায়ে লাগে না। বর্ষায় আড়িয়াল বিল, পদ্মা পাড় আর শালবনের সবুজ সবচেয়ে সুন্দর। শরতে পূর্বাচল ও দিয়াবাড়ির কাশবন দেখতে যান। গ্রীষ্মের দুপুরে খোলা জায়গায় না থেকে সকাল-বিকেল ভাগ করে ঘোরার পরিকল্পনা করুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
পরিবার নিয়ে ঢাকার কাছে কোথায় যাওয়া ভালো?
সোনারগাঁয়ের লোকশিল্প জাদুঘর, জাতীয় স্মৃতিসৌধ আর গাজীপুরের সাফারি পার্ক পরিবার ও শিশুদের জন্য উপযোগী।
ঢাকার কাছে নদী দেখতে কোথায় যাব?
পদ্মা পাড়ের মাওয়া-জাজিরা, পূর্বাচলের নদীর পাড় আর মুন্সীগঞ্জ এলাকা নদী দেখার জন্য ভালো।
বিজ্ঞাপন
এক দিনে দুটি জায়গা কি ঘোরা যায়?
একই দিকের হলে যায়, যেমন বালিয়াটি ও তেওতা কিংবা পানাম নগর ও লোকশিল্প জাদুঘর। বিপরীত দিকের দুটি জায়গা এক দিনে রাখবেন না।
জমিদারবাড়িগুলো কোন দিন বন্ধ থাকে?
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে থাকা স্থাপনাগুলো সাধারণত রোববার বন্ধ থাকে। অন্য প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকলে নিয়ম আলাদা হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
একদিনের ট্যুরে নিজের গাড়ি না বাস, কোনটি ভালো?
দুই-তিনজন হলে বাস সাশ্রয়ী। পরিবার বা পাঁচ-ছয়জনের দল হলে মাইক্রোবাস ভাড়া করলে সময় বাঁচে, এক দিনে দুটি জায়গাও দেখা যায়।