ত্বকের যত্ন: প্রতিদিনের সহজ রুটিন আর ঘরোয়া উপায়ের পুরো গাইড
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
ভালো ত্বকের জন্য দশ ধাপের রুটিন বা দামি পণ্যের তাক লাগে না। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞেরা মূলত তিনটি কাজের ওপর জোর দেন: মুখ পরিষ্কার রাখা, আর্দ্রতা ধরে রাখা আর রোদ থেকে বাঁচানো। এই তিনটি প্রতিদিন ঠিকমতো করলে বেশির ভাগ মানুষের ত্বক সুস্থ, মসৃণ আর উজ্জ্বল থাকে। বাকি সব, সিরাম থেকে ফেসপ্যাক, এর ওপর বাড়তি সংযোজন।
বিজ্ঞাপন
ত্বকের যত্ন কিভাবে নেব, এই প্রশ্নের উত্তরও তাই শুরু হয় নিজের ত্বককে চেনা দিয়ে। তৈলাক্ত আর শুষ্ক ত্বকের পণ্য এক নয়, আবার গ্রীষ্ম আর শীতের যত্নেও পার্থক্য আছে। নিচে দৈনিক রুটিন, ঋতুভেদে যত্ন, ঘরোয়া উপায় আর সাধারণ ভুলগুলো একসঙ্গে দেওয়া হলো।
প্রথমে ত্বকের ধরন চিনুন
একটি সহজ পরীক্ষা করুন। মৃদু ফেসওয়াশে মুখ ধুয়ে কিছু না লাগিয়ে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করুন, তারপর আয়নায় দেখুন।
১. তৈলাক্ত ত্বক: পুরো মুখ চকচক করছে, লোমকূপ বড় দেখায়, ব্রণের প্রবণতা বেশি।
বিজ্ঞাপন
২. শুষ্ক ত্বক: টানটান লাগে, খসখসে বা আঁশের মতো ওঠে, কখনো চুলকায়।
৩. মিশ্র ত্বক: কপাল, নাক ও থুতনি তেলতেলে, গাল স্বাভাবিক বা শুষ্ক। আমাদের দেশে এটি খুবই সাধারণ।
৪. স্বাভাবিক ত্বক: খুব তেলতেলে বা খুব শুষ্ক কোনোটিই নয়।
৫. সংবেদনশীল ত্বক: নতুন পণ্যে সহজে জ্বালা, লালচে ভাব বা চুলকানি হয়। যেকোনো ধরনের ত্বকই সংবেদনশীল হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
ত্বকের যত্নের রুটিন: সকাল ও রাত
সকালের রুটিন
১. মুখ ধোয়া: মৃদু, সুগন্ধিহীন ফেসওয়াশ দিয়ে কুসুম গরম বা স্বাভাবিক পানিতে। তৈলাক্ত ত্বকে জেল বা ফোমিং ফেসওয়াশ, শুষ্ক ত্বকে ক্রিমি ক্লিনজার ভালো। শুষ্ক ত্বকের কেউ চাইলে সকালে শুধু পানিতেও মুখ ধুতে পারেন।
২. ময়েশ্চারাইজার: মুখ সামান্য ভেজা থাকতেই লাগান, তাতে আর্দ্রতা আটকে থাকে। তৈলাক্ত ত্বকে হালকা জেল, শুষ্ক ত্বকে ক্রিম।
বিজ্ঞাপন
৩. সানস্ক্রিন: এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি, ব্রড স্পেকট্রাম। মুখ ও গলায় মোটামুটি দুই আঙুলের দৈর্ঘ্যের সমান পরিমাণ। বাইরে থাকলে দুই-তিন ঘণ্টা পরপর আবার লাগান। ত্বকের যত্নে এটিই সবচেয়ে কার্যকর বয়সরোধী পদক্ষেপ।
রাতের রুটিন
১. মেকআপ ও সানস্ক্রিন তোলা: মেকআপ বা ভারী সানস্ক্রিন থাকলে আগে ক্লিনজিং অয়েল, বাম বা মাইসেলার পানি দিয়ে তুলুন, তারপর ফেসওয়াশ দিয়ে ধুয়ে নিন।
২. প্রয়োজনভিত্তিক উপাদান: ব্রণ বা দাগ থাকলে এ সময় নিয়াসিনামাইড, অ্যাজেলাইক অ্যাসিড বা রেটিনয়েডের মতো একটি উপাদান ব্যবহার করা যায়। একসঙ্গে অনেক অ্যাসিড বা সক্রিয় উপাদান মেশাবেন না।
বিজ্ঞাপন
৩. ময়েশ্চারাইজার: রাতে শুষ্ক ত্বকে একটু ঘন ক্রিম দিতে পারেন। ঠোঁটে লিপ বাম, চোখের চারপাশে হালকা ক্রিম।
সাপ্তাহিক যত্ন: সপ্তাহে এক-দুই দিন মৃদু এক্সফোলিয়েশন, আর পছন্দমতো একটি ফেসপ্যাক। সংবেদনশীল ত্বকে সপ্তাহে একবারই যথেষ্ট।
সিরাম বা টোনার কি লাগবেই? না। মূল তিন ধাপ ঠিক থাকলে এগুলো ঐচ্ছিক। নির্দিষ্ট সমস্যা থাকলে একটি সিরাম যোগ করা যায়: দাগ ও অসম রঙে নিয়াসিনামাইড বা ভিটামিন সি, শুষ্কতায় হায়ালুরোনিক অ্যাসিড। টোনার কেনার সময় দেখুন তাতে অ্যালকোহল বেশি আছে কি না; অ্যালকোহলযুক্ত টোনার ত্বক শুষ্ক করে।
শরীরের ত্বকও ভুলবেন না: গোসলে মৃদু সাবান বা বডিওয়াশ ব্যবহার করুন, খুব ঘষে মরা চামড়া তোলার চেষ্টা করবেন না। গোসলের পর ত্বক সামান্য ভেজা থাকতে লোশন লাগালে আর্দ্রতা ধরে থাকে। হাত বারবার ধুতে হলে হাতে ক্রিম রাখুন। কনুই ও হাঁটুর কালচে খসখসে ভাব নিয়মিত ময়েশ্চারাইজারে নরম হয়।
বিজ্ঞাপন
ঋতু অনুযায়ী ত্বকের যত্ন
গ্রীষ্ম ও বর্ষা: গরম আর আর্দ্রতায় ঘাম ও তেল বেশি, ব্রণ ও ছত্রাক সংক্রমণের প্রবণতা বাড়ে। হালকা জেল ময়েশ্চারাইজার, ম্যাট ফিনিশের সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। ঘামে ভেজা কাপড় দ্রুত বদলান, ভাঁজের জায়গাগুলো শুকনো রাখুন। মুখ বেশি তেলতেলে হলে টিস্যু দিয়ে চেপে তেল তুলুন, বারবার সাবান দিয়ে ধোবেন না।
শীত: বাতাস শুষ্ক, ত্বক ফাটে, ঠোঁট ও গোড়ালি ফেটে যায়। ঘন ময়েশ্চারাইজার, গোসলের পর পুরো শরীরে লোশন বা অল্প তেল, ঠোঁটে লিপ বাম, গোড়ালিতে রাতে পেট্রোলিয়াম জেলি লাগিয়ে মোজা পরুন। খুব গরম পানিতে দীর্ঘক্ষণ গোসল ত্বকের তেল ধুয়ে শুষ্কতা বাড়ায়। শীতেও রোদে সানস্ক্রিন লাগবে।
ত্বকের যত্ন ঘরোয়া উপায়ে
বিজ্ঞাপন
রান্নাঘরের কিছু উপকরণ নিরাপদে ত্বক সতেজ রাখতে পারে। প্রথমবার ব্যবহারের আগে কানের পেছনে অল্প লাগিয়ে পরীক্ষা করে নিন।
১. টক দই ও মধু: এক চা-চামচ টক দই আর আধা চা-চামচ মধু, ১০-১৫ মিনিট। সব ধরনের ত্বকে মোটামুটি উপযোগী।
২. বেসন ও দই: তৈলাক্ত ত্বকে বাড়তি তেল কমাতে। শুকিয়ে টানটান হওয়ার আগেই ধুয়ে ফেলুন।
৩. অ্যালোভেরা জেল: রোদে পোড়া বা লালচে ত্বকে আরাম দেয়।
বিজ্ঞাপন
৪. ওটস ও দুধ: গুঁড়া ওটস দুধে মিশিয়ে প্যাক; শুষ্ক ও চুলকানিযুক্ত ত্বকে আরামদায়ক।
৫. শসা বা ঠান্ডা পানি: গরমে মুখ সতেজ রাখতে।
লেবুর রস, বেকিং সোডা, টুথপেস্ট, ভিনেগার বা চিনির মোটা দানার স্ক্রাব মুখে ব্যবহার করবেন না। এগুলো ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর নষ্ট করে, জ্বালা ও দাগের কারণ হয়।
খাবার, ঘুম আর সাধারণ ভুল
বিজ্ঞাপন
ত্বক শরীরেরই অংশ, তাই ভেতরের যত্নও সমান জরুরি। প্রতিদিন রঙিন শাকসবজি ও ফল, মাছ, ডিম, ডাল, বাদাম খান। পর্যাপ্ত পানি পান করুন। চিনি, মিষ্টি পানীয় আর ভাজাপোড়া কমালে অনেকের ব্রণ ও তৈলাক্ত ভাব কমে। রাতে সাত-আট ঘণ্টা ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম আর ধূমপান না করা ত্বকের রং ও টানটান ভাব ধরে রাখে।
যেসব ভুল প্রায়ই চোখে পড়ে: দিনে বারবার সাবানে মুখ ধোয়া, তৈলাক্ত ত্বকে ময়েশ্চারাইজার বাদ দেওয়া, শুধু রোদেলা দিনে সানস্ক্রিন, বিজ্ঞাপন দেখে একসঙ্গে অনেক নতুন পণ্য শুরু, মেকআপ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়া, ব্রণ খোঁটা, আর উপাদান না লেখা রং ফর্সাকারী ক্রিম ব্যবহার। নতুন পণ্য একটি একটি করে যোগ করুন এবং প্রতিটি অন্তত চার সপ্তাহ ব্যবহার করে ফল বিচার করুন।
দীর্ঘদিনের চুলকানি, ছড়িয়ে পড়া লাল চাকা, ব্রণে গর্ত বা দাগ, হঠাৎ রং বদলানো বা রক্তপাত হওয়া তিল, কিংবা কোনো পণ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
ঘরে থাকলেও কি সানস্ক্রিন লাগবে?
জানালার পাশে বসলে বা দিনে কয়েকবার বাইরে গেলে লাগানো ভালো। একেবারে ঘরের ভেতরে থাকলে জরুরি নয়, তবে মেছতা থাকলে ঘরেও ব্যবহার করুন।
ছেলেদের কি আলাদা স্কিনকেয়ার লাগে?
না, মূল তিন ধাপ একই। দাড়ি কামানোর পর জ্বালা কমাতে সুগন্ধিহীন ময়েশ্চারাইজার লাগান এবং পরিষ্কার, ধারালো রেজার ব্যবহার করুন।
বিজ্ঞাপন
কোন বয়স থেকে ত্বকের যত্ন শুরু করা উচিত?
মুখ পরিষ্কার রাখা আর সানস্ক্রিনের অভ্যাস কৈশোর থেকেই শুরু করা ভালো। রেটিনয়েডের মতো সক্রিয় উপাদান প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে শুরু করুন।
দামি পণ্য কি বেশি কাজ করে?
সবসময় নয়। দাম নয়, উপাদান আর নিজের ত্বকের সঙ্গে মানানসই কি না সেটাই আসল। সাধারণ মানের একটি ফেসওয়াশ, ময়েশ্চারাইজার আর সানস্ক্রিনই যথেষ্ট।