দার্জিলিং ভ্রমণ: বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার উপায় ও দেখার জায়গা
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
ভোর চারটায় কনকনে ঠান্ডায় জিপে চড়ে টাইগার হিলে পৌঁছানো, তারপর অপেক্ষা। অন্ধকার ফিকে হতেই দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় প্রথম আলো পড়ে, সাদা বরফ মুহূর্তে হয়ে যায় সোনালি। দার্জিলিং ভ্রমণের এই দৃশ্যের জন্যই বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এই পাহাড়ি শহরে যান।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে দার্জিলিং যাওয়ার সবচেয়ে প্রচলিত পথ উত্তরবঙ্গের সীমান্ত দিয়ে। লালমনিরহাটের বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্ধা বা পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ী সীমান্ত পার হয়ে শিলিগুড়ি, সেখান থেকে জিপে পাহাড়ি পথে দার্জিলিং। এর জন্য লাগবে ভারতের বৈধ ভিসা, যাতে আপনার ব্যবহার করা প্রবেশপথের উল্লেখ থাকতে হবে।
মনে রাখবেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভারত বাংলাদেশিদের জন্য ভ্রমণ ভিসা সীমিত রেখেছে। পরিকল্পনা শুরুর আগে ভিসার সর্বশেষ অবস্থা জেনে নিন। দার্জিলিং যেতে ভারতীয় ভিসার বাইরে আলাদা কোনো অনুমতিপত্র লাগে না, তবে পাশের সিকিমে যেতে আলাদা অনুমতি নিতে হয়।
দার্জিলিং যাওয়ার উপায়
১. বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্ধা হয়ে: ঢাকা থেকে রাতের বাসে বুড়িমারী পৌঁছাতে সাধারণত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লাগে। সকালে সীমান্তে দুই দেশের ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস শেষ করে চ্যাংড়াবান্ধা থেকে বাস বা ভাড়া করা গাড়িতে শিলিগুড়ি, প্রায় তিন ঘণ্টা। শিলিগুড়ি থেকে শেয়ার জিপে দার্জিলিং যেতে আরও তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা লাগে।
বিজ্ঞাপন
২. বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ী হয়ে: পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা সীমান্ত শিলিগুড়ির খুব কাছে, ফলে সীমান্ত পার হওয়ার পর পথ কম। ঢাকা থেকে বাংলাবান্ধা বা পঞ্চগড় পর্যন্ত বাস ও ট্রেন দুটোই আছে।
৩. কলকাতা হয়ে: বেনাপোল-পেট্রাপোল দিয়ে কলকাতা গিয়ে সেখান থেকে রাতের ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন, তারপর জিপে দার্জিলিং। কলকাতাও যাঁরা ঘুরতে চান, তাঁদের জন্য এই পথ সুবিধাজনক।
৪. আকাশপথে: ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে বাগডোগরা বিমানবন্দর পর্যন্ত ফ্লাইটে যাওয়া যায়। বাগডোগরা থেকে দার্জিলিং সড়কপথে তিন ঘণ্টার মতো। খরচ বেশি, সময় কম।
সীমান্ত পারাপারের দিনটি সবচেয়ে সময়সাপেক্ষ। বাংলাদেশ অংশে ভ্রমণ কর আর স্থলবন্দরের নির্ধারিত ফি দিয়ে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস শেষ করতে হয়। এরপর হেঁটে শূন্যরেখা পার হয়ে ভারতীয় অংশে আবার ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস। সীমান্তের ইমিগ্রেশন নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খোলা থাকে, তাই সকালে পৌঁছানোর চেষ্টা করুন। সীমান্তের দুই পাশেই মানি এক্সচেঞ্জ আছে, তবে শুধু অনুমোদিত জায়গা থেকে টাকা বদলান এবং বিনিময় হার জেনে নিন। দালালের কথায় বাড়তি টাকা দেবেন না, সব কাজ নিজে কাউন্টারে গিয়ে করুন।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত সরাসরি আন্তর্জাতিক ট্রেন চালু হয়েছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তঃসীমান্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। চালু হলে এটি সবচেয়ে আরামদায়ক পথ হবে।
দার্জিলিং দর্শনীয় স্থান
১. টাইগার হিল: শহর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার। আকাশ পরিষ্কার থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপর সূর্যোদয় দেখা যায়, ভাগ্য ভালো হলে দূরে এভারেস্টের চূড়াও। ভোর চারটার দিকে রওনা দিতে হয়, আগের সন্ধ্যায় জিপ ঠিক করে রাখুন। ফেরার পথে ঘুম মনাস্ট্রি আর বাতাসিয়া লুপ দেখে নেওয়া যায়।
২. বাতাসিয়া লুপ: টয় ট্রেনের লাইন এখানে একটি বৃত্তাকার পথে ঘুরে গেছে। মাঝখানে গোর্খা সৈনিকদের স্মৃতিসৌধ আর বাগান, পরিষ্কার দিনে এখান থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
৩. টয় ট্রেন: দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। দার্জিলিং থেকে ঘুম পর্যন্ত ছোট জয়রাইডে চড়া যায়, টিকিট আগে কেটে রাখা ভালো।
৪. ম্যাল ও চৌরাস্তা: শহরের কেন্দ্র, সন্ধ্যায় হাঁটা, কেনাকাটা আর খাওয়ার জায়গা। এখান থেকে পাহাড়ের ঢালে শহরের আলো দেখতে দারুণ লাগে।
৫. চিড়িয়াখানা ও পর্বতারোহণ ইনস্টিটিউট: একই চত্বরে পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান চিড়িয়াখানা, যেখানে রেড পান্ডা ও তুষার চিতার মতো হিমালয়ের প্রাণী আছে। পাশেই হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের জাদুঘর।
৬. চা-বাগান ও অন্যান্য: হ্যাপি ভ্যালি চা-বাগানে চা তৈরির প্রক্রিয়া দেখা যায়। জাপানিজ পিস প্যাগোডা, রক গার্ডেন আর রোপওয়েও জনপ্রিয়। শিলিগুড়ি থেকে আসার পথে মিরিক লেক ঘুরে আসা যায়।
বিজ্ঞাপন
চার দিনের নমুনা সূচি
১. প্রথম দিন: ভোরে বুড়িমারী বা বাংলাবান্ধা সীমান্ত পার হয়ে দুপুরের মধ্যে শিলিগুড়ি। সেখান থেকে জিপে বিকেলে দার্জিলিং পৌঁছে হোটেলে বিশ্রাম, সন্ধ্যায় ম্যালে হাঁটা।
২. দ্বিতীয় দিন: ভোর চারটায় টাইগার হিল, ফেরার পথে ঘুম মনাস্ট্রি ও বাতাসিয়া লুপ। নাশতার পর চিড়িয়াখানা, পর্বতারোহণ ইনস্টিটিউট আর বিকেলে টয় ট্রেনের জয়রাইড।
৩. তৃতীয় দিন: সকালে হ্যাপি ভ্যালি চা-বাগান, পিস প্যাগোডা আর রোপওয়ে। বিকেলে কেনাকাটা, চা কেনার জন্য ভালো দোকান বেছে নিন।
বিজ্ঞাপন
৪. চতুর্থ দিন: সকালে জিপে শিলিগুড়ি নেমে আসা, পথে সময় থাকলে মিরিক লেক। বিকেলের মধ্যে সীমান্ত পার হয়ে রাতের বাসে ঢাকা।
ফেরার দিন সীমান্ত বন্ধ হওয়ার সময়ের কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা করুন। দেরি হয়ে গেলে শিলিগুড়িতে এক রাত থেকে পরদিন সকালে সীমান্ত পার হওয়াই নিরাপদ।
কখন যাবেন
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর আকাশ সবচেয়ে পরিষ্কার থাকে, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সম্ভাবনাও তখন বেশি। তবে ডিসেম্বরে বেশ ঠান্ডা, তাপমাত্রা কখনো শূন্যের কাছাকাছি নামে। মার্চ থেকে মে বসন্ত, ফুল ফোটে, আবহাওয়া আরামদায়ক, তবে মাঝে মাঝে কুয়াশায় পাহাড় ঢাকা পড়ে। জুন থেকে সেপ্টেম্বর বর্ষায় পাহাড়ি পথে ধস নামে, দৃশ্যও কম মেলে।
বিজ্ঞাপন
থাকা, খাওয়া ও খরচ
ম্যাল ও চৌরাস্তার আশপাশে, হিলকার্ট রোড ধরে সব মানের হোটেল আছে। সাধারণ হোটেলে প্রতি রাত আনুমানিক দুই থেকে চার হাজার টাকার সমপরিমাণ, পাহাড়মুখী ভালো হোটেলে বেশি। শীতে হিটার বা গরম পানির ব্যবস্থা আছে কি না বুক করার আগে জেনে নিন। খাবারের মধ্যে মোমো, থুকপা আর দার্জিলিং চা অবশ্যই চেখে দেখবেন। হালাল খাবার খুঁজলে শহরের কেন্দ্রের কাছে কয়েকটি মুসলিম মালিকানাধীন রেস্তোরাঁ পাওয়া যায়, স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করলে দেখিয়ে দেন। নিরামিষ ও ডিমের খাবারও সহজেই মেলে।
চা কেনার সময় বাগানের নাম, তোলার মৌসুম আর প্যাকেটের মোড়ক দেখে কিনুন। ভালো মানের চায়ের দাম তুলনামূলক বেশি, খুব সস্তা দামে ভালো দার্জিলিং চা পাওয়ার আশা না করাই ভালো।
সীমান্ত দিয়ে গিয়ে চার-পাঁচ দিনের একটি সাধারণ ভ্রমণে যাতায়াত, ভ্রমণ কর, সাধারণ হোটেল ও খাওয়া মিলিয়ে জনপ্রতি আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। আকাশপথে গেলে খরচ অনেক বেশি পড়ে।
বিজ্ঞাপন
প্রস্তুতি ও সতর্কতা
পাসপোর্ট, ভিসা, ভ্রমণ কর পরিশোধের রসিদ আর ডলার এনডোর্সমেন্টের কাগজ একসঙ্গে রাখুন। ভারতীয় রুপি সীমান্ত বা শিলিগুড়ির অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জ থেকে বদলে নিন। হোটেলে পাসপোর্টের কপি জমা দিতে হয়, এটি স্বাভাবিক নিয়ম। ভারী গরম কাপড়, টুপি, মোজা আর আরামদায়ক জুতা নিন, কারণ শহরটা ঢালু আর হাঁটতে হয় অনেক। পাহাড়ি পথে বমির প্রবণতা থাকলে আগে থেকে প্রস্তুতি নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
দার্জিলিং যেতে কি আলাদা অনুমতি লাগে?
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশিদের জন্য বৈধ ভারতীয় ভিসাই যথেষ্ট। সিকিমে যেতে চাইলে আলাদা অনুমতিপত্র নিতে হয়।
টাইগার হিলে কি সব দিন সূর্যোদয় দেখা যায়?
আকাশ পরিষ্কার না থাকলে দেখা যায় না। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তাই হাতে একটি বাড়তি দিন রাখা ভালো।
দার্জিলিং ঘুরতে কয়দিন লাগে?
বিজ্ঞাপন
দার্জিলিং শহরে তিন দিন যথেষ্ট। মিরিক বা কালিম্পং যোগ করলে আরও এক-দুই দিন রাখুন।
শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং কীভাবে যাব?
শিলিগুড়ি থেকে নিয়মিত শেয়ার জিপ ছাড়ে, পুরো গাড়ি রিজার্ভও করা যায়। পাহাড়ি পথে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা লাগে।