কলকাতার দর্শনীয় স্থান: ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল থেকে হাওড়া ব্রিজ
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
বাংলাদেশিদের কাছে কলকাতা অচেনা শহর নয়। একই ভাষা, অনেকটা একই খাবার, আর ইতিহাসের দীর্ঘ যোগসূত্র। চিকিৎসা, কেনাকাটা বা বেড়ানো, নানা কারণে মানুষ সেখানে যান। কিন্তু কাজের ফাঁকে শহরটা ঠিকমতো দেখা হয় কজনের? কলকাতা ভ্রমণে দুই-তিনটি দিন আলাদা রাখলে ঔপনিবেশিক স্থাপত্য, গঙ্গার ঘাট, বইপাড়া আর পুরোনো বাঙালি বাড়ির এক অন্য রূপ দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
কলকাতায় ঘুরতে যাওয়ার জায়গাগুলো মোটামুটি তিনটি এলাকায় ছড়ানো। দক্ষিণ-মধ্য কলকাতায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ময়দান আর পার্ক স্ট্রিট। উত্তরে হাওড়া ব্রিজ, কলেজ স্ট্রিট, জোড়াসাঁকো, দক্ষিণেশ্বর আর বেলুড়। আর পূর্বে নিউ টাউনের ইকো পার্ক। এলাকা ধরে দিন ভাগ করলে যানজটে সময় কম নষ্ট হয়।
যাওয়ার আগে একটি বিষয় নিশ্চিত হোন। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত বাংলাদেশিদের জন্য ভ্রমণ ভিসা সীমিত রেখেছে, মূলত চিকিৎসা ও জরুরি ভিসা দেওয়া হচ্ছে। ভিসার সর্বশেষ অবস্থা জেনে তবেই পরিকল্পনা করুন।
কলকাতা যাওয়ার উপায়
১. সড়কপথে বেনাপোল হয়ে: ঢাকা থেকে সরাসরি কলকাতাগামী বাস বা বেনাপোল পর্যন্ত বাসে গিয়ে সীমান্ত পার হওয়া যায়। পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা থেকে বেনাপোল পৌঁছাতে সময় অনেক কমেছে। সীমান্তের ওপারে পেট্রাপোল থেকে বাস, ট্যাক্সি বা বনগাঁ স্টেশন থেকে লোকাল ট্রেনে কলকাতা যাওয়া যায়। ভিসায় সংশ্লিষ্ট প্রবেশপথ থাকতে হবে, আর সীমান্তে যাওয়ার আগে ভ্রমণ কর পরিশোধ করতে হয়।
বিজ্ঞাপন
২. আকাশপথে: ঢাকা থেকে কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ঘণ্টারও কম সময়ের ফ্লাইট আছে। আগেভাগে কাটলে ভাড়া তুলনামূলক কম পড়ে।
৩. ট্রেনে: ঢাকা-কলকাতা সরাসরি আন্তর্জাতিক ট্রেন চালু ছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তঃসীমান্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। চালু হলে এটি আরামদায়ক বিকল্প।
সড়কপথে গেলে বেনাপোলে পৌঁছে প্রথমে ভ্রমণ কর আর স্থলবন্দরের ফি পরিশোধ, তারপর বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস। শূন্যরেখা পার হয়ে পেট্রাপোলে ভারতের ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস শেষ করতে হয়। ছুটির মৌসুমে দুই পাশেই দীর্ঘ লাইন হয়, তাই সকালে পৌঁছানোর চেষ্টা করুন। সীমান্তের দুই পাশে দালালেরা দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন, তাঁদের এড়িয়ে নিজে কাউন্টারে যান।
কলকাতার প্রধান দর্শনীয় স্থান
বিজ্ঞাপন
১. ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল: সাদা মার্বেলের বিশাল স্মৃতিসৌধ, চারপাশে সাজানো বাগান। ভেতরের জাদুঘরে ঔপনিবেশিক আমলের ছবি, চিত্রকর্ম ও নিদর্শন। সাধারণত সোমবার জাদুঘর বন্ধ থাকে।
২. হাওড়া ব্রিজ: হুগলি নদীর ওপর কলকাতার সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক। হেঁটে ব্রিজ পার হওয়া যায়, নিচের মল্লিক ঘাটের ফুলের বাজারও দেখার মতো। নদীর বুক থেকে ব্রিজ দেখতে ফেরিতে চড়ুন।
৩. প্রিন্সেপ ঘাট: সন্ধ্যায় গঙ্গার পাড়ে বসে বিদ্যাসাগর সেতুর আলো দেখার জনপ্রিয় জায়গা। চাইলে নৌকায় খানিকটা ঘুরে আসা যায়।
৪. ভারতীয় জাদুঘর: ভারতের অন্যতম পুরোনো জাদুঘর, প্রত্নতত্ত্ব, ভাস্কর্য, মুদ্রা আর প্রাকৃতিক ইতিহাসের বিশাল সংগ্রহ। সাধারণত সোমবার বন্ধ।
বিজ্ঞাপন
৫. দক্ষিণেশ্বর ও বেলুড় মঠ: গঙ্গার দুই পাড়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান। দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির থেকে ফেরিতে নদী পার হয়ে বেলুড় মঠে যাওয়া যায়, এক বেলায় দুটোই দেখা সম্ভব।
৬. জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ও মৃত্যু এই বাড়িতে। এখন এটি জাদুঘর, ঠাকুর পরিবারের ইতিহাস আর রবীন্দ্রনাথের জীবন ঘিরে সাজানো।
৭. কলেজ স্ট্রিট ও কফি হাউস: রাস্তার দুই পাশে বইয়ের দোকানের সারি, পুরোনো ও নতুন বইয়ের সবচেয়ে বড় বাজারগুলোর একটি। পাশেই বিখ্যাত ইন্ডিয়ান কফি হাউস, যেখানে বসে কফি খাওয়া অনেকের কাছে কলকাতা ভ্রমণের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৮. অন্যান্য: পার্ক স্ট্রিটের রেস্তোরাঁপাড়া, নিউ মার্কেটের কেনাকাটা, কুমারটুলির প্রতিমা তৈরির কারিগরপাড়া, নাখোদা মসজিদ, সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল, নিউ টাউনের ইকো পার্ক আর শিশুদের জন্য সায়েন্স সিটি।
বিজ্ঞাপন
তিন দিনের নমুনা সূচি
১. প্রথম দিন: সকালে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ও তার বাগান, দুপুরের পর ভারতীয় জাদুঘর। সন্ধ্যায় পার্ক স্ট্রিটে রাতের খাবার, অথবা প্রিন্সেপ ঘাটে গঙ্গার পাড়ে বসে সূর্যাস্ত।
২. দ্বিতীয় দিন: সকালে দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির, ফেরিতে বেলুড় মঠ। দুপুরে ফিরে হাওড়া ব্রিজ ও মল্লিক ঘাটের ফুলবাজার। বিকেলে ফেরিতে নদী পার হয়ে নদীর বুক থেকে ব্রিজ দেখা।
৩. তৃতীয় দিন: সকালে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি, তারপর কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের দোকান আর কফি হাউস। বিকেলে নিউ মার্কেটে কেনাকাটা।
বিজ্ঞাপন
শিশুরা সঙ্গে থাকলে একটি দিন সায়েন্স সিটি আর ইকো পার্কের জন্য রাখুন। জাদুঘরগুলো সাধারণত সোমবার বন্ধ থাকে, তাই সূচি সাজানোর সময় দিনটি মিলিয়ে নিন।
চিকিৎসার জন্য যাঁরা যান, তাঁরা চিকিৎসকের সাক্ষাতের ফাঁকে ফাঁকে কাছের জায়গাগুলো দেখে নিতে পারেন। রোগীকে ক্লান্ত না করে অল্প সময়ের জন্য প্রিন্সেপ ঘাট বা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের বাগান ঘুরে আসা মন ভালো রাখতেও সাহায্য করে।
শহরে চলাফেরা
কলকাতায় ঘোরার সবচেয়ে সাশ্রয়ী আর দ্রুত মাধ্যম মেট্রোরেল, দেশের প্রথম মেট্রো এই শহরেই চালু হয়েছিল। উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রধান লাইন ধরে অনেক দর্শনীয় স্থানের কাছে পৌঁছানো যায়। হলুদ ট্যাক্সি আর অ্যাপভিত্তিক গাড়িও পাওয়া যায়, ট্যাক্সিতে উঠলে মিটার চালু করতে বলুন বা ভাড়া আগে ঠিক করুন। গঙ্গার দুই পাড়ের মধ্যে ফেরি যানজট এড়ানোর চমৎকার উপায়।
বিজ্ঞাপন
থাকা, খাওয়া ও খরচ
বাংলাদেশি পর্যটকদের অনেকে নিউ মার্কেটের কাছে মারকুইস স্ট্রিট ও মির্জা গালিব স্ট্রিট এলাকায় ওঠেন। এখানে সাধারণ ও মাঝারি মানের অনেক হোটেল, মানি এক্সচেঞ্জ আর বাংলাদেশগামী বাসের কাউন্টার আছে। সাধারণ হোটেলে প্রতি রাত আনুমানিক দুই থেকে চার হাজার টাকার সমপরিমাণ। চিকিৎসার জন্য গেলে হাসপাতালের কাছাকাছি থাকা সুবিধাজনক।
খাবারের মধ্যে কলকাতার বিরিয়ানি, কাঠি রোল, ফুচকা, মিষ্টি আর পার্ক স্ট্রিটের রেস্তোরাঁগুলো জনপ্রিয়। কেনাকাটার জন্য নিউ মার্কেট ছাড়াও গড়িয়াহাট ও হাতিবাগান পরিচিত। ফুটপাতের দোকানে দর-কষাকষি স্বাভাবিক। দেশে ফেরার সময় শুল্কমুক্ত সীমার বেশি পণ্য আনলে শুল্ক দিতে হতে পারে, তাই কেনাকাটার পরিমাণ সেই অনুযায়ী ঠিক করুন। তিন-চার দিনের সাধারণ ভ্রমণে সড়কপথে গিয়ে জনপ্রতি আনুমানিক ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হতে পারে, কেনাকাটা বাদে।
কখন যাবেন ও সতর্কতা
বিজ্ঞাপন
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি আবহাওয়া সবচেয়ে আরামদায়ক। দুর্গাপূজার সময় শহর আলোয় সাজে, তবে ভিড় ও হোটেল ভাড়া দুটোই চরমে থাকে। গ্রীষ্মে প্রচণ্ড গরম আর আর্দ্রতা, বর্ষায় জলাবদ্ধতা হয়।
পাসপোর্ট ও ভিসার কপি আলাদা জায়গায় রাখুন, মূল কাগজ হোটেলের নিরাপদ জায়গায় রাখতে পারেন। ভিড়ের বাজারে পকেটমার থেকে সাবধান থাকুন। মুদ্রা বদলানোর সময় অনুমোদিত দোকান থেকে রসিদ নিন। ভিসার মেয়াদের বেশি থাকবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কলকাতা ঘুরতে কয়দিন লাগে?
বিজ্ঞাপন
প্রধান দর্শনীয় স্থানগুলো দেখতে তিন দিন যথেষ্ট। কেনাকাটা বা চিকিৎসার কাজ থাকলে সেই অনুযায়ী বাড়তি দিন রাখুন।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল কোন দিন বন্ধ থাকে?
ভেতরের জাদুঘর সাধারণত সোমবার বন্ধ থাকে। যাওয়ার আগে সময়সূচি দেখে নিন।
কলকাতায় বাংলাদেশি টাকা কোথায় ভাঙাব?
বিজ্ঞাপন
নিউ মার্কেট ও মারকুইস স্ট্রিট এলাকায় অনেক মানি এক্সচেঞ্জ আছে। কয়েকটিতে হার মিলিয়ে অনুমোদিত দোকান থেকে বদলান।
এক দিনে দক্ষিণেশ্বর ও বেলুড় মঠ দেখা যায়?
হ্যাঁ, দুটি গঙ্গার দুই পাড়ে, ফেরিতে পার হওয়া যায়। সকালে গেলে দুপুরের মধ্যে দুটোই দেখা সম্ভব।
কলকাতায় কি সহজে হালাল খাবার পাওয়া যায়?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ, নিউ মার্কেট, পার্ক সার্কাস, জাকারিয়া স্ট্রিট আর মারকুইস স্ট্রিট এলাকায় অনেক মুসলিম মালিকানাধীন রেস্তোরাঁ আছে। রমজানে জাকারিয়া স্ট্রিটের ইফতারের খাবার বিশেষভাবে পরিচিত।