চুল লম্বা করার উপায়: দ্রুত চুল বাড়াতে ঘরোয়া যত্ন ও তেল
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
এক মাসে চুল কতটুকু বাড়ে, জানলে অনেক বিজ্ঞাপনের দাবি নিজেই ধরা পড়ে যায়। গড়ে একজন মানুষের চুল মাসে মোটামুটি এক থেকে সোয়া এক সেন্টিমিটার, অর্থাৎ আধা ইঞ্চির মতো বাড়ে, বছরে প্রায় ছয় ইঞ্চি। এই গতি মূলত বংশগত, বয়স ও স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে। কোনো তেল, প্যাক বা বড়ি এক সপ্তাহে চুল দুই ইঞ্চি লম্বা করতে পারে না।
বিজ্ঞাপন
তাহলে কারও চুল কোমর ছাড়িয়ে যায়, আর কারও কাঁধের নিচে নামতেই চায় না কেন? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উত্তরটা ভাঙন। চুল গোড়া থেকে ঠিকই বাড়ছে, কিন্তু আগা ফেটে, ভেঙে সমান হারে ঝরে যাচ্ছে, ফলে দৈর্ঘ্য একই জায়গায় আটকে থাকে। চুল লম্বা করার উপায় তাই দুটি কাজ: মাথার ত্বক সুস্থ রেখে স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করা, আর যে চুল বেড়েছে তা ভাঙতে না দেওয়া।
চুল কেন একটা দৈর্ঘ্যে আটকে থাকে
প্রতিটি চুলের একটি নির্দিষ্ট বৃদ্ধিকাল থাকে, যা কয়েক বছর স্থায়ী হয়। এরপর চুলটি বিশ্রামে যায় এবং ঝরে পড়ে। যাঁদের বৃদ্ধিকাল লম্বা, তাঁদের চুল স্বাভাবিকভাবেই বেশি লম্বা হতে পারে। এটা বদলানো যায় না।
তবে যেসব কারণে চুল অকালে ভাঙে, সেগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা যায়: ফেটে যাওয়া আগা, ভেজা চুলে জোরে আঁচড়ানো, নিয়মিত তাপ, রাসায়নিক ট্রিটমেন্ট, টাইট করে বাঁধা, রোদ ও রুক্ষতা। এর বাইরে আয়রন ও প্রোটিনের ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা বা দীর্ঘ অসুখে চুলের বৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে।
বিজ্ঞাপন
চুল দ্রুত বড় করার উপায়: দৈর্ঘ্য ধরে রাখার নিয়ম
১. নিয়মিত আগা ছাঁটুন: শুনতে উল্টো মনে হলেও দুই থেকে তিন মাস পরপর আধা ইঞ্চির মতো আগা ছাঁটলে ফাটা অংশ ওপরের দিকে ছড়াতে পারে না। ফলে ভাঙন কমে, দৈর্ঘ্য ধরে রাখা সহজ হয়।
২. ভেজা চুলে সাবধান: ভেজা চুল সবচেয়ে বেশি প্রসারিত হয় ও ভাঙে। মোটা দাঁতের চিরুনি দিয়ে আগা থেকে জট ছাড়ান, কন্ডিশনার লাগানো অবস্থায় জট ছাড়ানো আরও সহজ।
৩. তাপ কম: স্ট্রেটনার, কার্লার ও ব্লো-ড্রায়ার যত কম ব্যবহার করবেন, চুল তত কম ভাঙবে। প্রয়োজনে হিট প্রোটেক্ট্যান্ট ও কম তাপমাত্রা।
বিজ্ঞাপন
৪. রাসায়নিক বিরতি: রিবন্ডিং, ব্লিচ ও ঘন ঘন রং চুলের গঠন দুর্বল করে। লম্বা চুল চাইলে এগুলোর মাঝে দীর্ঘ বিরতি দিন।
৫. ঢিলে করে বাঁধুন: রাতে ঢিলে বেণি করে ঘুমালে জট ও ঘর্ষণ কমে। মসৃণ কাপড়ের বালিশের কভার বা স্কার্ফ ঘর্ষণ আরও কমায়। ধাতব ক্লিপযুক্ত রাবার ব্যান্ড এড়িয়ে চলুন।
৬. আগা আর্দ্র রাখুন: শ্যাম্পুর পর কন্ডিশনার, আর শুষ্ক আগায় দুই-এক ফোঁটা তেল বা সিরাম লাগালে আগা কম ফাটে।
৭. রোদ ও বাতাস থেকে আড়াল: কড়া রোদ আর বাইক বা রিকশায় খোলা চুলে বাতাসের ঝাপটা চুল রুক্ষ করে, জট বাড়ায়। বাইরে লম্বা সময় থাকলে চুল বেঁধে স্কার্ফ বা ওড়নায় ঢেকে রাখুন। লম্বা চুল ব্যাগের ফিতা বা জ্যাকেটের চেইনে আটকে গিয়েও অনেক সময় ভাঙে, খেয়াল রাখুন।
বিজ্ঞাপন
চুল বাড়ানোর তেল: কোনটা কতটা কাজের
তেল চুলের গোড়া থেকে বৃদ্ধি দ্রুত করে, এমন জোরালো প্রমাণ বেশির ভাগ তেলের ক্ষেত্রে নেই। তবে তেল চুলকে সুরক্ষা দেয়, ভাঙন কমায়, আর তেল দিয়ে মাথার ত্বক মালিশ করার কিছু উপকার আছে।
নারকেল তেল: চুলের ভেতরে ঢুকে প্রোটিন ক্ষয় কিছুটা কমায় বলে গবেষণায় দেখা গেছে। শ্যাম্পুর আগে লাগালে ধোয়ার সময় চুল কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দৈর্ঘ্য ধরে রাখার জন্য এটি ভালো পছন্দ।
রোজমেরি অয়েল: একটি ছোট গবেষণায় বংশগত চুল পাতলা হওয়ায় কয়েক মাস ব্যবহারের পর কিছু উপকার দেখা গেছে। তবে এটি খুব ঘন তেল, সরাসরি নয়; নারকেল বা অন্য বাহক তেলে কয়েক ফোঁটা মিশিয়ে ব্যবহার করতে হয় এবং আগে অল্প জায়গায় পরীক্ষা করে নিতে হয়।
বিজ্ঞাপন
ক্যাস্টর অয়েল: চুল বাড়ানোর তেল হিসেবে খুব জনপ্রিয়, কিন্তু চুলের বৃদ্ধিতে এর কার্যকারিতা নিয়ে নির্ভরযোগ্য গবেষণা নেই। এটি ঘন ও আঠালো, অন্য তেলের সঙ্গে মিশিয়ে আগায় ব্যবহার করলে আর্দ্রতা দেয়।
আমলা, সরিষা ও তিলের তেল: আমাদের দেশে বহুদিন ধরে প্রচলিত। চুল নরম ও ঝলমলে রাখে, তবে বৃদ্ধি দ্রুত করার প্রমাণ সীমিত।
মাথার ত্বক মালিশ: ছোট একটি গবেষণায় প্রতিদিন কয়েক মিনিট মাথার ত্বক মালিশে কয়েক মাস পর চুল কিছুটা ঘন হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। সপ্তাহে কয়েক দিন আঙুলের ডগায় পাঁচ মিনিট আলতো চাপ দিয়ে মালিশ করুন, তেল দিয়ে বা তেল ছাড়াই। নখ দিয়ে ঘষবেন না।
ঘরোয়া উপায়ে চুল লম্বা করা: খাবার ও জীবনযাপন
বিজ্ঞাপন
চুলের কোষ শরীরের সবচেয়ে দ্রুত বিভাজিত কোষগুলোর একটি, তাই পুষ্টির ঘাটতি হলে আগে চুলে প্রভাব পড়ে। প্রতিদিন প্রোটিন রাখুন: ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল, দুধ বা দই। আয়রনের জন্য শাক, কচু, ডাল, কলিজা ও মাংস খান, সঙ্গে ভিটামিন সি-যুক্ত ফল। বাদাম ও বীজে জিঙ্ক ও ভালো চর্বি আছে। হঠাৎ কঠোর ডায়েট বা বেলা বাদ দেওয়ার অভ্যাস চুলের বৃদ্ধি থামিয়ে দিতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ আর ধূমপান না করাও চুলের জন্য ভালো। মাথার ত্বকে খুশকি বা চুলকানি থাকলে আগে সেটি সারান, কারণ সুস্থ মাথার ত্বক ছাড়া সুস্থ চুল হয় না। সপ্তাহে একবার ডিম-দই, কলা-মধু বা অ্যালোভেরার মতো হেয়ার প্যাক চুল নরম রাখে, যা পরোক্ষভাবে ভাঙন কমায়।
যে ভুল এড়াবেন, কখন চিকিৎসক
চুল বাড়ানোর বড়ি বা ইনজেকশনের বিজ্ঞাপনে ভরসা করবেন না। বায়োটিনের মতো সাপ্লিমেন্ট ঘাটতি না থাকলে বাড়তি সুবিধা দেয় না, আর কিছু রক্ত পরীক্ষার ফলাফলেও গোলমাল করতে পারে। প্রতি সপ্তাহে নতুন তেল বা শ্যাম্পু বদলানোও কাজের নয়; চুলের যেকোনো যত্নের ফল বুঝতে অন্তত তিন মাস সময় দিন।
বিজ্ঞাপন
চুল মোটেই বাড়ছে না বলে মনে হলে, হঠাৎ অনেক চুল পড়তে শুরু করলে, মাথায় ফাঁকা জায়গা দেখা দিলে, কিংবা চুল পড়ার সঙ্গে ক্লান্তি, অনিয়মিত মাসিক বা ওজনে বড় পরিবর্তন থাকলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান। রক্তস্বল্পতা বা থাইরয়েডের সমস্যা ধরা পড়লে তার চিকিৎসাতেই চুলের বৃদ্ধি স্বাভাবিক হয়ে আসে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ন্যাড়া করলে কি চুল দ্রুত লম্বা হয়?
না। মাথা ন্যাড়া করলে চুলের বৃদ্ধির গতি বা গোড়ার সংখ্যা বদলায় না। নতুন চুল ভাঙনমুক্ত থাকে বলে কিছুদিন সুস্থ দেখায়, এটুকুই।
বিজ্ঞাপন
চুল কাটলে কি চুল তাড়াতাড়ি বাড়ে?
চুল কাটলে গোড়া থেকে বৃদ্ধির গতি বাড়ে না। তবে ফাটা আগা ছেঁটে ফেললে ভাঙন কমে, ফলে দৈর্ঘ্য ধরে রাখা সহজ হয়।
ছেলেদের চুল কি মেয়েদের চেয়ে কম বাড়ে?
বৃদ্ধির গতি মোটামুটি কাছাকাছি। পার্থক্য হয় চুল কতটা লম্বা রাখা হয় এবং বংশগত টাকের প্রবণতায়।
বিজ্ঞাপন
এক মাসে কি চুল চার-পাঁচ ইঞ্চি লম্বা করা সম্ভব?
না। স্বাভাবিকভাবে মাসে আধা ইঞ্চির মতো বাড়ে। যে পণ্য এর চেয়ে বেশি দাবি করে, তার প্রতিশ্রুতিতে ভরসা না করাই ভালো।
পেঁয়াজের রস কি চুল লম্বা করে?
পেঁয়াজের রস নিয়ে ছোট পরিসরের কিছু গবেষণা হয়েছে নির্দিষ্ট ধরনের চুল পড়ায়, দৈর্ঘ্য বাড়ানোয় নয়। ব্যবহার করতে চাইলে সপ্তাহে একবার অল্প সময় রেখে ভালো করে ধুয়ে ফেলুন; জ্বালা বা চুলকানি হলে বন্ধ করুন।