চুলের যত্ন: ঘরোয়া উপায়ে চুল সুস্থ ও ঝলমলে রাখার নিয়ম
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
চুলের যত্ন বলতে আমাদের নানি-দাদিদের কাছে ছিল এক বাটি গরম নারকেল তেল আর শুক্রবারের লম্বা বিনুনি। সেই অভ্যাসের মধ্যে অনেক কিছুই ঠিক ছিল, তবে আজকের ধুলাবালু, রোদ, আর্দ্রতা, হেলমেট, স্ট্রেটনার আর রং করার যুগে যত্নের নিয়মেও কিছু বদল দরকার। চুল আসলে মৃত কোষ দিয়ে তৈরি; একবার ফেটে গেলে বা ভেঙে গেলে তা আর জোড়া লাগে না। তাই চুলের যত্নের মূল লক্ষ্য দুটি: মাথার ত্বক সুস্থ রাখা, যেখান থেকে নতুন চুল গজায়, আর চুলের দৈর্ঘ্যকে ভাঙন থেকে রক্ষা করা।
বিজ্ঞাপন
ভালো খবর হলো, এর জন্য দামি সেলুন ট্রিটমেন্ট লাগে না। সঠিকভাবে ধোয়া, পরিমিত তেল, কোমল আচরণ, কম তাপ আর ঠিকঠাক খাবার, এই পাঁচটি অভ্যাসেই বেশির ভাগ মানুষের চুল সুস্থ আর ঝলমলে থাকে। ঘরোয়া হেয়ার প্যাক এর সঙ্গে বাড়তি যত্ন হিসেবে কাজ করে।
আগে নিজের চুল ও মাথার ত্বক চিনুন
চুল ধোয়ার এক দিন পর মাথার ত্বক তেলতেলে হয়ে গেলে আপনার মাথার ত্বক তৈলাক্ত; তিন-চার দিনেও তেল না জমলে এবং চুলকানি বা আঁশ থাকলে শুষ্ক। চুলের দৈর্ঘ্য আবার আলাদা হতে পারে: গোড়া তৈলাক্ত অথচ আগা রুক্ষ, এমনটা খুবই সাধারণ। কোঁকড়া ও ঢেউখেলানো চুলে মাথার তেল আগা পর্যন্ত কম পৌঁছায়, তাই এ ধরনের চুল সহজে শুষ্ক হয়। রিবন্ডিং, রং বা ব্লিচ করা চুল বেশি নাজুক, এদের বাড়তি আর্দ্রতা ও কোমলতা দরকার।
চুলের যত্ন নেওয়ার নিয়ম: ধোয়া, তেল ও শুকানো
বিজ্ঞাপন
১. কতবার ধোবেন: তৈলাক্ত মাথার ত্বকে একদিন পরপর বা সপ্তাহে তিনবার, শুষ্ক মাথার ত্বকে সপ্তাহে দুবার যথেষ্ট। ঘাম বেশি হলে বা হেলমেট পরলে আরও বেশিবার ধোয়া যায়।
২. শ্যাম্পু কোথায় লাগাবেন: শ্যাম্পু মূলত মাথার ত্বকে লাগিয়ে আঙুলের ডগায় আলতো ঘষুন, নখ দিয়ে নয়। ধোয়ার সময় যে ফেনা নিচে নামে, সেটাই চুলের দৈর্ঘ্য পরিষ্কারের জন্য যথেষ্ট।
৩. কন্ডিশনার: শুধু চুলের মাঝখান থেকে আগা পর্যন্ত লাগিয়ে দুই-তিন মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। মাথার ত্বকে লাগালে চুল তেলতেলে ও চ্যাপ্টা দেখায়।
৪. পানির তাপমাত্রা: কুসুম গরম বা স্বাভাবিক পানি। খুব গরম পানি মাথার ত্বক শুষ্ক করে, চুল রুক্ষ করে।
বিজ্ঞাপন
৫. তেল দেওয়ার নিয়ম: শ্যাম্পুর এক-দুই ঘণ্টা আগে, বা শুষ্ক চুলে আগের রাতে তেল দিন। নারকেল তেল চুলের ভেতরে ঢুকে প্রোটিন ক্ষয় কিছুটা কমায় বলে গবেষণায় দেখা গেছে। সপ্তাহে এক-দুই দিনই যথেষ্ট। প্রতিদিন তেল দিয়ে রাখলে ধুলা জমে, খুশকি বাড়তে পারে। খুশকি থাকলে মাথার ত্বকে কম, চুলের দৈর্ঘ্যে বেশি তেল দিন।
৬. শুকানো: তোয়ালে দিয়ে জোরে ঘষবেন না; সুতির পুরোনো টি-শার্ট বা নরম তোয়ালে দিয়ে চেপে পানি শুষে নিন। পাখার বাতাসে বা স্বাভাবিকভাবে শুকানোই ভালো। হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার করলে কম তাপে, চুল থেকে কিছুটা দূরে রাখুন।
চুলের যত্নে হেয়ার প্যাক
ঘরোয়া হেয়ার প্যাক সপ্তাহে একবার যথেষ্ট। এগুলো চুল নরম ও ঝলমলে করে, তবে চুল পড়া বা টাক সারানোর ওষুধ নয়। প্রথমবার ব্যবহারের আগে কানের পেছনে অল্প লাগিয়ে দেখে নিন।
বিজ্ঞাপন
১. ডিম ও টক দই: একটি ডিম ফেটিয়ে তিন-চার চামচ টক দই মিশিয়ে চুলের দৈর্ঘ্যে লাগান, ২০-৩০ মিনিট পর ঠান্ডা বা স্বাভাবিক পানিতে ধুয়ে শ্যাম্পু করুন। গরম পানি দিলে ডিম জমে চুলে আটকে যায়। ডিমের গন্ধ দূর করতে ভালো করে ধুতে হবে।
২. কলা ও মধু: একটি পাকা কলা ভালো করে চটকে এক চামচ মধু ও এক চামচ নারকেল তেল মিশিয়ে লাগান। রুক্ষ চুলে আর্দ্রতা দেয়। কলার দলা যেন না থাকে, তাহলে ধুতে কষ্ট হবে।
৩. অ্যালোভেরা: তাজা অ্যালোভেরা জেল মাথার ত্বক ও চুলে লাগিয়ে ৩০ মিনিট রাখুন। চুলকানি কমায়, চুল নরম করে।
৪. মেথি: দুই চামচ মেথি রাতভর ভিজিয়ে বেটে পেস্ট করুন, চাইলে টক দই মেশান। ৩০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। চুল নরম ও মসৃণ হয়।
বিজ্ঞাপন
৫. নারকেলের দুধ: শুষ্ক, কোঁকড়া চুলে ২০-৩০ মিনিট লাগিয়ে রাখলে চুল নরম হয়।
আঁচড়ানো, বাঁধা আর তাপ
ভেজা চুল সবচেয়ে দুর্বল থাকে। মোটা দাঁতের চিরুনি দিয়ে আগা থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে জট ছাড়ান। একশোবার ব্রাশ করার পুরোনো পরামর্শ চুলের ক্ষতিই করে। খুব টাইট পনিটেল, খোঁপা বা বেণি দিনের পর দিন একই জায়গায় বাঁধলে গোড়ায় টান পড়ে চুল পাতলা হতে পারে; বাঁধার জায়গা ও ধরন মাঝেমধ্যে বদলান, ধাতব ক্লিপযুক্ত রাবার ব্যান্ডের বদলে কাপড়ের নরম ব্যান্ড ব্যবহার করুন।
স্ট্রেটনার, কার্লার, ব্লো-ড্রায়ার নিয়মিত ব্যবহার না করাই ভালো। করতে হলে আগে হিট প্রোটেক্ট্যান্ট লাগান এবং সবচেয়ে কম তাপমাত্রা বেছে নিন। রিবন্ডিং, স্মুদেনিং বা ব্লিচের মতো রাসায়নিক ট্রিটমেন্টের মাঝে যথেষ্ট বিরতি দিন। ফেটে যাওয়া আগা জোড়া লাগে না, তাই দুই-তিন মাস পরপর আগা সামান্য ছেঁটে নিলে চুল দেখতে স্বাস্থ্যবান থাকে এবং ভাঙন ওপরে উঠতে পারে না।
বিজ্ঞাপন
ঋতু ও পরিবেশ অনুযায়ী যত্ন
গ্রীষ্ম ও বর্ষা: ঘাম আর আর্দ্রতায় মাথার ত্বক দ্রুত তেলতেলে হয়, খুশকি ও ছত্রাক বাড়ে। বেশিবার চুল ধোয়া, ভেজা চুল খোলা বাতাসে শুকানো এবং বৃষ্টিতে ভিজলে পরিষ্কার পানিতে চুল ধুয়ে নেওয়া জরুরি। রোদে দীর্ঘক্ষণ থাকলে স্কার্ফ, টুপি বা ছাতা ব্যবহার করুন; কড়া রোদ চুল রুক্ষ ও রং ফ্যাকাশে করে।
শীত: বাতাস শুষ্ক, চুলে স্থির বিদ্যুৎ তৈরি হয়, আগা ফাটে। কন্ডিশনার নিয়মিত ব্যবহার করুন, সপ্তাহে একবার তেল বা প্যাক দিন। খুব গরম পানিতে মাথা ধোয়ার লোভ সামলান।
যেখানে পানিতে আয়রন বা লবণ বেশি, সেখানে চুল রুক্ষ ও লালচে হতে পারে। সম্ভব হলে শেষবার ছাঁকা বা ফোটানো ঠান্ডা পানিতে চুল ধুয়ে নিন। সাঁতারের পুলের পানিতে নামার আগে চুল সাধারণ পানিতে ভিজিয়ে নিলে ক্লোরিন কম শোষিত হয়।
বিজ্ঞাপন
খাবার ও কখন চিকিৎসক
চুলের মূল উপাদান কেরাটিন একটি প্রোটিন। প্রতিদিনের খাবারে ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল, দুধ বা দই রাখুন। আয়রনের জন্য সবুজ শাক, কচুশাক, ডাল, কলিজা ও মাংস; জিঙ্কের জন্য বাদাম, বীজ ও ডাল; আর ভিটামিন সি-র জন্য আমলকী, পেয়ারা, লেবু খান। হঠাৎ কঠোর ডায়েটে ওজন কমালে কয়েক মাস পর চুল পড়া বাড়ে। চুলের ভিটামিন বড়ি ঘাটতি না থাকলে বাড়তি কিছু দেয় না।
অস্বাভাবিক চুল পড়া, গোল গোল টাক, মাথার ত্বকে ঘা, পুঁজ, তীব্র চুলকানি বা পুরু আঁশ, কিংবা চুল পড়ার সঙ্গে ক্লান্তি ও অনিয়মিত মাসিক থাকলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ দেখান। এসব ক্ষেত্রে শুধু ঘরোয়া যত্নে কাজ হয় না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
রাতে তেল দিয়ে ঘুমানো কি ভালো?
শুষ্ক চুলে রাতে তেল দিয়ে সকালে ধুয়ে ফেলা যায়। তবে তৈলাক্ত মাথার ত্বক বা খুশকি থাকলে এক-দুই ঘণ্টাই যথেষ্ট। বালিশে পুরোনো কভার দিয়ে রাখুন।
প্রতিদিন শ্যাম্পু করলে কি চুলের ক্ষতি হয়?
মৃদু শ্যাম্পু হলে এবং মাথার ত্বক তৈলাক্ত হলে প্রতিদিন ধোয়ায় বড় ক্ষতি নেই। শুষ্ক চুলে প্রতিদিন শ্যাম্পু করলে চুল আরও রুক্ষ হয়, তখন শুধু পানিতে ধুয়ে কন্ডিশনার দিন।
বিজ্ঞাপন
সালফেটমুক্ত শ্যাম্পু কি জরুরি?
সবার জন্য নয়। শুষ্ক, কোঁকড়া, রং করা বা সংবেদনশীল মাথার ত্বকে সালফেটমুক্ত মৃদু শ্যাম্পু আরামদায়ক হতে পারে। তৈলাক্ত মাথার ত্বকে সাধারণ শ্যাম্পুও ঠিক আছে।
ভেজা চুল বেঁধে রাখলে কী হয়?
ভেজা চুল টান লেগে সহজে ভাঙে, আর বাঁধা অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ ভেজা থাকলে দুর্গন্ধ ও ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। অন্তত বেশির ভাগ শুকিয়ে তারপর ঢিলে করে বাঁধুন।