টক দই বানানোর নিয়ম: ঘরে জমাট দই তৈরির সহজ পদ্ধতি ও সাজা
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
ঘরে টক দই বানাতে দুটি জিনিসই লাগে: দুধ আর সাজা, অর্থাৎ আগের দইয়ের সামান্য অংশ। সাজার ভেতরের উপকারী ব্যাকটেরিয়া উষ্ণ দুধে বংশবৃদ্ধি করে দুধের শর্করাকে ল্যাকটিক অ্যাসিডে পরিণত করে, আর তাতেই দুধ জমে টক স্বাদের দই হয়। পুরো কাজে হাতের সময় লাগে বড়জোর আধা ঘণ্টা, বাকিটা অপেক্ষা।
বিজ্ঞাপন
টক দই বানানোর নিয়মে সবচেয়ে জরুরি বিষয় তিনটি: সাজা মেশানোর সময় দুধের সঠিক তাপমাত্রা, ভালো মানের সাজা, আর জমার সময় পাত্রটিকে নাড়াচাড়া না করে উষ্ণ জায়গায় রাখা। এই তিনটি ঠিক থাকলে বাজারের মতো, বরং তার চেয়েও ভালো জমাট দই ঘরেই পাওয়া যায়।
উপকরণ
এক লিটার দুধের জন্য:
১. দুধ: এক লিটার। ঘন দই চাইলে ফুল ক্রিম বা গরুর খাঁটি দুধ নিন। কম চর্বির দুধেও দই হয়, তবে একটু পাতলা হয়।
বিজ্ঞাপন
২. সাজা: দুই টেবিল চামচ টক দই। আগের বানানো দই বা দোকানের সাধারণ টক দই, মিষ্টি বা স্বাদযুক্ত নয়।
৩. গুঁড়া দুধ (ঐচ্ছিক): দুই টেবিল চামচ, দই আরও ঘন করতে।
৪. পাত্র: মাটির হাঁড়ি, কাচ বা স্টিলের বাটি, ঢাকনাসহ। মাটির হাঁড়ি দইয়ের বাড়তি পানি শুষে নেয় বলে দই বেশি ঘন হয়।
দই জমানোর নিয়ম: ধাপে ধাপে
বিজ্ঞাপন
১. দুধ ফোটান: ভারী তলার পাত্রে দুধ জ্বাল দিন। ফুটে উঠলে আঁচ কমিয়ে নাড়তে নাড়তে ১০ থেকে ১৫ মিনিট জ্বাল দিন, যাতে দুধ কিছুটা ঘন হয়, মোটামুটি এক-পঞ্চমাংশ কমে আসে। গুঁড়া দুধ দিলে এ সময় অল্প ঠান্ডা দুধে গুলিয়ে মিশিয়ে দিন। দুধ ভালোভাবে ফোটালে অন্য জীবাণু মরে যায় এবং দইয়ের গঠন মসৃণ হয়।
২. ঠান্ডা করুন কুসুম গরম পর্যন্ত: চুলা থেকে নামিয়ে দুধ ঠান্ডা হতে দিন। সাজা মেশানোর সঠিক তাপমাত্রা মোটামুটি ৪০ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। থার্মোমিটার না থাকলে আঙুল ডুবিয়ে দেখুন: বেশ গরম লাগবে, কিন্তু দশ গোনা পর্যন্ত আঙুল রাখা যাবে, পুড়ে যাওয়ার মতো লাগবে না। দুধ বেশি গরম থাকলে সাজার ব্যাকটেরিয়া মরে যায়, দই জমে না; বেশি ঠান্ডা হলে জমতে অনেক সময় লাগে ও পাতলা হয়।
৩. সাজা প্রস্তুত করুন: দুই টেবিল চামচ দই একটি ছোট বাটিতে নিয়ে কয়েক চামচ কুসুম গরম দুধ মিশিয়ে মসৃণ করে ফেটিয়ে নিন।
৪. মেশান: সাজাটি বাকি দুধে ঢেলে আলতো করে নেড়ে পুরোপুরি মিশিয়ে দিন। বেশি সাজা দিলে দই দ্রুত জমে কিন্তু বেশি টক হয়।
বিজ্ঞাপন
৫. পাত্রে ঢালুন ও ঢাকুন: দুধ পরিষ্কার পাত্রে ঢেলে ঢাকনা দিন।
৬. উষ্ণ জায়গায় রাখুন: রান্নাঘরের কোনো উষ্ণ কোণ, চাল রাখার ড্রামের ভেতর বা আলমারির ভেতরে রাখুন। গরমকালে সাধারণত ছয় থেকে আট ঘণ্টায় দই জমে যায়, শীতে আট থেকে বারো ঘণ্টা বা তার বেশি লাগতে পারে। এ সময় পাত্র নাড়বেন না।
৭. জমেছে কি না দেখুন: পাত্র একটু কাত করলে দই একসঙ্গে সরে আসবে, তরলের মতো দুলবে না। ওপরে সামান্য হলদে পানি জমতে পারে, এটি স্বাভাবিক ঘোল।
৮. ফ্রিজে রাখুন: জমে গেলে কয়েক ঘণ্টা ফ্রিজে রাখুন। ঠান্ডায় দই আরও ঘন হয় এবং টক হওয়া থেমে যায়।
বিজ্ঞাপন
শীতকালে দই জমানোর কৌশল
শীতে দই না জমা সবচেয়ে প্রচলিত সমস্যা। এ সময় সাজা মেশানোর সময় দুধ একটু বেশি উষ্ণ রাখুন, তবে আঙুল সহ্য করার সীমার মধ্যে। পাত্রটি মোটা তোয়ালে বা কম্বলে পেঁচিয়ে রাখুন। খাবার গরম রাখার ক্যাসারোল বা হটপটে রাখলেও ভালো জমে। ওভেন থাকলে বন্ধ ওভেনের ভেতর শুধু বাতি জ্বালিয়ে রাখা যায়। আরেকটি সহজ উপায়: বড় একটি পাত্রে কুসুম গরম পানি রেখে তার ভেতরে দইয়ের বাটি বসিয়ে ঢেকে রাখা।
দইয়ের সাজা তৈরি ও সংরক্ষণ
প্রথমবার দোকান থেকে ভালো মানের সাধারণ টক দই কিনে সাজা হিসেবে ব্যবহার করুন। এরপর প্রতিবার বানানো দই থেকে দুই-তিন টেবিল চামচ আলাদা একটি পরিষ্কার ছোট বাটিতে তুলে ফ্রিজে রেখে দিন, এটাই পরের বারের সাজা। সাজা যত তাজা, দই তত ভালো জমে; সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যের দই সাজা হিসেবে ভালো কাজ করে।
বিজ্ঞাপন
কয়েক মাস একই সাজা থেকে বারবার দই বানালে কখনো কখনো দই পাতলা বা বেশি টক হতে থাকে। তখন বাজার থেকে নতুন দই এনে আবার শুরু করুন। সাজা তোলার সময় সবসময় পরিষ্কার শুকনো চামচ ব্যবহার করুন। কাঁচা মরিচের বোঁটা বা অন্য উপায়ে শূন্য থেকে সাজা বানানোর কিছু পদ্ধতি প্রচলিত আছে, তবে এগুলোর ফল অনিশ্চিত, তাই নির্ভরযোগ্য দই দিয়েই শুরু করা ভালো।
আরও ঘন দই চাইলে: জমে যাওয়া ঠান্ডা দই একটি পরিষ্কার পাতলা সুতির কাপড়ে ঢেলে পুঁটলি বেঁধে ফ্রিজের ভেতরে একটি বাটির ওপর দুই থেকে চার ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখুন। নিচে ঘোল ঝরে গিয়ে ক্রিমের মতো ঘন দই থাকবে, যা ডিপ, স্যান্ডউইচ বা মাংস মাখানোর কাজে চমৎকার। ঝরে পড়া ঘোল ফেলবেন না; লবণ ও ভাজা জিরার গুঁড়া মিশিয়ে পান করা যায়, বা রুটির আটা মাখতে ব্যবহার করা যায়।
মাটির হাঁড়ি নতুন হলে: প্রথমবার ব্যবহারের আগে কয়েক ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রেখে ধুয়ে শুকিয়ে নিন। প্রতিবার ব্যবহারের পর গরম পানিতে ধুয়ে রোদে শুকান, সাবান কম ব্যবহার করুন, কারণ মাটি গন্ধ শুষে নেয়।
সমস্যা ও সমাধান
বিজ্ঞাপন
দই জমেনি, পাতলা রয়ে গেছে: দুধ বেশি গরম বা বেশি ঠান্ডা ছিল, সাজা পুরোনো ছিল, অথবা জায়গাটা ঠান্ডা। একই দুধ আবার কুসুম গরম করে নতুন সাজা দিয়ে চেষ্টা করা যায়।
খুব টক হয়েছে: বেশি সময় বাইরে রাখা হয়েছে বা সাজা বেশি দেওয়া হয়েছে। পরেরবার জমার সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিজে তুলুন।
ওপরে অনেক পানি জমেছে: বেশি সময় রাখা বা জমার সময় নাড়াচাড়া হয়েছে। পানিটা ফেলে না দিয়ে দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে পারেন বা আলাদা পান করতে পারেন।
দানাদার বা ছানার মতো: দুধ বেশি গরম অবস্থায় সাজা দিলে এমন হয়।
বিজ্ঞাপন
ওপরে গোলাপি, কালো বা সবুজ ছত্রাক, দুর্গন্ধ বা আঠালো সুতার মতো টান: অন্য জীবাণু জন্মেছে। এ দই খাবেন না, পুরোটা ফেলে দিন এবং পাত্র ভালো করে ধুয়ে নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ঘরে বানানো দই কত দিন রাখা যায়?
ঢাকনাসহ ফ্রিজে রাখলে সাধারণত তিন-চার দিন ভালো থাকে। দিন যত যায়, টক ভাব তত বাড়ে। গন্ধ বা রং বদলালে ফেলে দিন।
বিজ্ঞাপন
প্যাকেটের তরল দুধে কি দই হয়?
হ্যাঁ। পাস্তুরিত দুধও একবার ফুটিয়ে কিছুটা ঘন করে নিলে ভালো দই হয়। ঘন দইয়ের জন্য গুঁড়া দুধ যোগ করতে পারেন।
টক দই খাওয়ার উপকারিতা কী?
দইয়ে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম এবং অন্ত্রের জন্য উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে। দুধ সহ্য না হওয়া অনেকে দই সহজে হজম করতে পারেন। ভাতের সঙ্গে, রায়তা, লাচ্ছি বা মাংস মাখানোর কাজে দই ব্যবহার করা যায়।
বিজ্ঞাপন
মিষ্টি দই কি একইভাবে বানানো যায়?
মিষ্টি দইয়ের জন্য দুধ আরও বেশি জ্বাল দিয়ে ঘন করা হয় এবং চিনি বা গুড় পুড়িয়ে ক্যারামেল করে মেশানো হয়। মূল পদ্ধতি একই, তবে স্বাদ ও রঙের জন্য আলাদা কিছু ধাপ লাগে।