জ্বর কমানোর ঘরোয়া উপায়: বাড়িতে যত্ন ও সতর্কতার লক্ষণ
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
জ্বর নিজে কোনো রোগ নয়, এটি শরীরের একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। জীবাণুর আক্রমণ ঠেকাতে মস্তিষ্ক শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা বাড়িয়ে দেয়। শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা মোটামুটি ৯৭ থেকে ৯৯ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে ওঠানামা করে। থার্মোমিটারে ১০০.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস কিংবা তার বেশি হলে তাকে জ্বর ধরা হয়।
বিজ্ঞাপন
বেশির ভাগ জ্বর ভাইরাসজনিত, আর বিশ্রাম, তরল খাবার ও সাধারণ যত্নে তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে সেরে যায়। জ্বর কমানোর ঘরোয়া উপায় মূলত রোগীকে আরাম দেওয়া আর পানিশূন্যতা ঠেকানো। তবে আমাদের দেশে ডেঙ্গু, টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া ও নিউমোনিয়ার মতো জ্বরও আছে, তাই কোন লক্ষণে বাড়িতে বসে থাকা চলবে না, তা জানা জরুরি।
জ্বর ঠিকভাবে মাপুন
হাত দিয়ে কপাল ছুঁয়ে জ্বর বোঝা যায় না। বাড়িতে একটি ডিজিটাল থার্মোমিটার রাখুন। মুখে মাপলে থার্মোমিটার জিভের নিচে রেখে ঠোঁট বন্ধ রাখুন, আর খাওয়া বা গরম-ঠান্ডা পানীয়ের পর অন্তত ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। ছোট শিশুদের বগলে মাপা নিরাপদ; বগল শুকনো রেখে হাত শরীরের সঙ্গে চেপে রাখতে হয়। বগলের তাপমাত্রা মুখের চেয়ে সাধারণত কিছুটা কম আসে। পারদের থার্মোমিটার ভেঙে গেলে পারদ বিপজ্জনক, তাই ডিজিটাল থার্মোমিটারই ভালো।
দিনে কয়েকবার তাপমাত্রা আর সময় খাতায় লিখে রাখুন। চিকিৎসকের কাছে গেলে এই তালিকা রোগ নির্ণয়ে সাহায্য করে।
বিজ্ঞাপন
জ্বর হলে করণীয়
১. বিশ্রাম: শরীর সংক্রমণের সঙ্গে লড়ছে, তাই কাজ বা স্কুল থেকে বিরতি নিন। জ্বর নিয়ে ভারী কাজ বা ব্যায়াম নয়।
২. প্রচুর তরল: জ্বরে ঘাম ও শ্বাসের মাধ্যমে শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যায়। পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, ফলের রস, স্যুপ, ডাল, পাতলা খিচুড়ি বারবার অল্প অল্প করে খান। প্রস্রাবের রং হালকা হলুদ থাকলে বুঝবেন পানি যথেষ্ট।
৩. হালকা পোশাক: অনেকে জ্বরের রোগীকে কাঁথা-কম্বলে মুড়ে রাখেন, এতে তাপমাত্রা আরও বাড়ে। পাতলা সুতির কাপড় পরান, ঘরে বাতাস চলাচল রাখুন। কাঁপুনি এলে সাময়িক হালকা চাদর দেওয়া যায়, কাঁপুনি থামলে সরিয়ে নিন।
বিজ্ঞাপন
৪. সহজপাচ্য খাবার: ক্ষুধা কম থাকলেও অল্প অল্প খান। জাউ, নরম ভাত, ডাল, সবজির স্যুপ, ডিম, কলা, পেঁপে, মৌসুমি ফল। জোর করে খাওয়ানোর দরকার নেই, তবে তরল যেন বন্ধ না হয়।
৫. পরিচ্ছন্নতা: হাত ধোয়া, আলাদা তোয়ালে আর কাশি-হাঁচিতে মুখ ঢাকা পরিবারের অন্যদের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
৬. মশারি ব্যবহার: জ্বরের রোগী দিনে ঘুমালেও মশারির ভেতরে রাখুন। ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়া হলে আক্রান্ত মানুষকে কামড়ানো মশা অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়াতে পারে। ঘরের আশপাশে ফুলের টব, ডাবের খোসা, পুরোনো টায়ার বা বালতিতে জমে থাকা পানি ফেলে দিন।
জলপট্টি দেওয়ার নিয়ম
বিজ্ঞাপন
জলপট্টি বা শরীর মুছে দেওয়া তাপমাত্রা কিছুটা কমায় এবং রোগীকে আরাম দেয়, বিশেষ করে যখন জ্বর বেশি।
১. পানি তৈরি: একটি বাটিতে কুসুম গরম বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি নিন। বরফ পানি বা খুব ঠান্ডা পানি নয়; এতে ত্বকের রক্তনালি সংকুচিত হয়ে শরীর ভেতরে তাপ ধরে রাখে এবং কাঁপুনি শুরু হয়।
২. কাপড় ভেজান: পরিষ্কার নরম কাপড় বা গামছা ভিজিয়ে হালকা চিপে নিন, যাতে পানি না ঝরে।
৩. কোথায় দেবেন: কপালে রাখার পাশাপাশি ঘাড়, বগল, হাত-পা ও পিঠ আলতো করে মুছে দিন। পুরো শরীর মুছে দিলে বেশি কাজ হয়, কারণ ত্বক থেকে পানি বাষ্প হওয়ার সময় তাপ বের করে নেয়।
বিজ্ঞাপন
৪. সময়: ১০ থেকে ১৫ মিনিট ধরে কাপড় বারবার ভিজিয়ে মুছতে থাকুন। রোগী কাঁপতে শুরু করলে থামুন।
৫. যা করবেন না: অ্যালকোহল, স্পিরিট বা ভিনেগার দিয়ে শরীর মোছা বিপজ্জনক, বিশেষ করে শিশুদের জন্য; ত্বক দিয়ে শোষিত হয়ে বিষক্রিয়া হতে পারে। মাথায় একটানা পানি ঢালার চেয়ে শরীর মুছে দেওয়া বেশি কার্যকর।
ওষুধ নিয়ে সতর্কতা
জ্বর ও ব্যথা কমাতে সাধারণত প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হয়। বয়স ও ওজন অনুযায়ী এর মাত্রা আলাদা, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ বা মোড়কের নির্দেশনা অনুযায়ী খান; বেশি খেলে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। একাধিক সর্দি-জ্বরের ওষুধে একই উপাদান থাকতে পারে, তাই একসঙ্গে কয়েক রকম খাওয়ার আগে উপাদান মিলিয়ে দেখুন।
বিজ্ঞাপন
ডেঙ্গুর মৌসুমে জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন বা এ ধরনের ব্যথানাশক খাবেন না, এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। শিশু ও কিশোরদের অ্যাসপিরিন দেওয়া যাবে না। নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না; ভাইরাস জ্বরে এগুলো কাজ করে না, আর টাইফয়েডের মতো রোগে ভুলভাবে খেলে রোগনির্ণয় কঠিন হয়ে যায়।
ডেঙ্গুর মৌসুমে বাড়তি সতর্কতা
বর্ষা ও তার পরের মাসগুলোতে জ্বর হলে ডেঙ্গুর কথা মাথায় রাখুন। হঠাৎ উচ্চ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও গিরায় ব্যথা ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণ। চিকিৎসকেরা সাধারণত জ্বরের প্রথম দিনগুলোতেই রক্ত পরীক্ষা করাতে বলেন।
জ্বর কমে যাওয়ার সময়টাই ডেঙ্গুতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ সময় পেটে তীব্র ব্যথা, বারবার বমি, দাঁতের মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্ত পড়া, কালো পায়খানা, অস্থিরতা বা ঝিমুনি, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কিংবা প্রস্রাব কমে যাওয়া দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যান।
বিজ্ঞাপন
কখন দেরি না করে চিকিৎসক দেখাবেন
১. তিন মাসের কম বয়সী শিশুর যেকোনো জ্বর।
২. তিন দিনের বেশি জ্বর, বা ১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি তাপমাত্রা যা যত্নেও কমছে না।
৩. খিঁচুনি, অজ্ঞান ভাব, অসংলগ্ন কথা বা অস্বাভাবিক ঝিমুনি।
বিজ্ঞাপন
৪. ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, তীব্র মাথাব্যথা, আলো সহ্য না হওয়া।
৫. শ্বাসকষ্ট, দ্রুত শ্বাস, বুকে ব্যথা।
৬. চামড়ায় লাল ছোপ বা দানা যা চাপ দিলে মিলিয়ে যায় না।
৭. পানি খেতে না পারা, বারবার বমি, প্রস্রাব খুব কমে যাওয়া।
বিজ্ঞাপন
৮. গর্ভবতী নারী, বয়স্ক মানুষ, কিংবা ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদ্রোগ বা ক্যানসারের রোগীর জ্বর।
শিশুর জ্বরের সঙ্গে খিঁচুনি হলে ভয় না পেয়ে তাকে নরম জায়গায় এক পাশে কাত করে শুইয়ে দিন, মুখে কিছু দেবেন না, আশপাশ থেকে শক্ত জিনিস সরান এবং খিঁচুনি থামার পর দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিন। খিঁচুনি পাঁচ মিনিটের বেশি চললে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
জ্বর হলে কি গোসল করা যায়?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ, কুসুম গরম পানিতে অল্প সময়ে গোসল বা শরীর মুছে নেওয়া আরামদায়ক। কাঁপুনি থাকলে গোসলের বদলে শরীর মুছে দিন।
জ্বরে কি ভাত খাওয়া যাবে?
যাবে। নরম ভাত, ডাল, সবজি সহজপাচ্য। তেল-মসলা কম রাখুন এবং খাবারের সঙ্গে প্রচুর তরল দিন।
জ্বর বারবার ফিরে এলে কী বুঝব?
বিজ্ঞাপন
ওষুধে কমে আবার আসা ভাইরাস জ্বরে স্বাভাবিক হতে পারে। তবে তিন দিনের বেশি চললে বা প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে জ্বর এলে রক্ত পরীক্ষার জন্য চিকিৎসক দেখান।
ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লে কি ভালো লক্ষণ?
সাধারণত তাপমাত্রা নামার সময় ঘাম হয়। ঘাম মুছে শুকনো কাপড় পরিয়ে দিন এবং পানি খাওয়ান, যাতে পানিশূন্যতা না হয়।