হজের নিয়ম: ইহরাম থেকে বিদায়ী তাওয়াফ পর্যন্ত ধাপে ধাপে
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
হজ হলো নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট স্থানে, নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আল্লাহর ঘর ও তার আশপাশের পবিত্র স্থানগুলোতে ইবাদত করা। সামর্থ্যবান প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের ওপর জীবনে একবার হজ ফরজ। সুরা আলে ইমরানের ৯৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, তার ওপর আল্লাহর জন্য এই ঘরের হজ করা কর্তব্য।
বিজ্ঞাপন
হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা চলে জিলহজ মাসের ৮ তারিখ থেকে ১২ বা ১৩ তারিখ পর্যন্ত। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন ৯ জিলহজ, আরাফার দিন। আরাফায় অবস্থান না করলে হজই হয় না। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া হজযাত্রীদের বেশির ভাগ তামাত্তু হজ করেন, তাই এই লেখায় ধাপগুলো সেভাবেই সাজানো হয়েছে।
বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, মাবরুর হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়। মাবরুর হজ মানে এমন হজ, যা সঠিক নিয়মে, হালাল টাকায়, গুনাহ ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে মুক্ত থেকে আদায় করা হয়।
হজের প্রকার এবং ফরজ-ওয়াজিব
হজ তিন প্রকার। ইফরাদ হলো শুধু হজের ইহরাম বেঁধে হজ করা, সঙ্গে ওমরাহ নয়। কিরান হলো একই ইহরামে ওমরাহ ও হজ দুটিই আদায় করা; হজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইহরাম খোলা যায় না। তামাত্তু হলো হজের মাসে প্রথমে ওমরাহ করে ইহরাম খুলে ফেলা, তারপর ৮ জিলহজ নতুন করে হজের ইহরাম বাঁধা। কিরান ও তামাত্তু হজকারীর ওপর শুকরিয়ার কোরবানি ওয়াজিব।
বিজ্ঞাপন
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী হজের ফরজ তিনটি: ইহরাম বাঁধা, ৯ জিলহজ আরাফার ময়দানে অবস্থান এবং তাওয়াফে জিয়ারত। এর কোনো একটি বাদ পড়লে হজ হবে না।
ওয়াজিবগুলোর মধ্যে প্রধান হলো মুজদালিফায় অবস্থান, সাফা-মারওয়ায় সাঈ, জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ, তামাত্তু ও কিরানের কোরবানি, মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা এবং বহিরাগতদের জন্য বিদায়ী তাওয়াফ। কোনো ওয়াজিব ছুটে গেলে হজ বাতিল হয় না, তবে সাধারণত দম, অর্থাৎ হারাম এলাকায় একটি পশু জবাই করতে হয়।
মিকাত, ইহরাম ও তালবিয়া
মক্কার চারপাশে কিছু নির্ধারিত সীমানা আছে, যেগুলোকে মিকাত বলে। হজ বা ওমরাহর নিয়তে যাওয়া ব্যক্তিকে ইহরাম ছাড়া মিকাত অতিক্রম করা যায় না। বাংলাদেশ থেকে সরাসরি জেদ্দাগামী বিমান মিকাতের সীমানার ওপর দিয়ে যায়, তাই অনেকেই ঢাকা থেকে বা বিমানে ওঠার আগে ইহরামের কাপড় পরে নেন এবং বিমানে ঘোষণা হলে নিয়ত করেন। যাঁরা আগে মদিনায় যান, তাঁরা মক্কায় আসার পথে মদিনার মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধেন।
বিজ্ঞাপন
ইহরামের আগে নখ কাটা, অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করা ও গোসল করা সুন্নত। পুরুষেরা সেলাইবিহীন দুটি সাদা চাদর পরবেন, একটি লুঙ্গির মতো, অন্যটি গায়ে। নারীরা স্বাভাবিক শালীন পোশাকেই থাকবেন। মাকরুহ সময় না হলে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিয়ত করবেন এবং তালবিয়া পাঠ করবেন। নিয়ত ও তালবিয়া মিলেই ইহরাম শুরু হয়।
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ
উচ্চারণ: লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক। অর্থ: আমি হাজির, হে আল্লাহ, আমি হাজির। আমি হাজির, আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সব প্রশংসা, সব নেয়ামত আপনার এবং রাজত্বও আপনার। আপনার কোনো শরিক নেই।
ইহরাম অবস্থায় পুরুষের সেলাই করা পোশাক পরা ও মাথা ঢাকা, নারী-পুরুষ সবার সুগন্ধি ব্যবহার, চুল-নখ কাটা, শিকার করা, স্বামী-স্ত্রীর ঘনিষ্ঠতা এবং ঝগড়া-বিবাদ নিষিদ্ধ। তামাত্তু হজকারী মক্কায় পৌঁছে ওমরাহ শেষ করে মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করে ইহরাম খুলে ফেলবেন এবং ৮ জিলহজ পর্যন্ত স্বাভাবিক অবস্থায় থাকবেন।
বিজ্ঞাপন
৮ ও ৯ জিলহজ: মিনা থেকে আরাফা
১. ৮ জিলহজ, মিনায় যাত্রা: তামাত্তু হজকারী মক্কায় নিজের অবস্থানস্থল থেকেই গোসল করে হজের ইহরাম বাঁধবেন এবং তালবিয়া পড়তে পড়তে মিনায় যাবেন। সেখানে জোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও পরদিনের ফজর পড়া সুন্নত।
২. ৯ জিলহজ, আরাফার দিন: সূর্যোদয়ের পর আরাফার দিকে রওনা। আরাফায় অবস্থানের সময় শুরু হয় দুপুরে সূর্য হেলে পড়ার পর থেকে। এদিন বেশি বেশি দোয়া, জিকির, তওবা ও তালবিয়া পাঠ করবেন। তিরমিজির হাদিসে আছে, সর্বোত্তম দোয়া আরাফার দিনের দোয়া, আর নবীজি ও তাঁর আগের নবীরা যা বলেছেন তার মধ্যে উত্তম হলো এই কালেমা:
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
বিজ্ঞাপন
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির। অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই; রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।
হানাফি মতে মসজিদে নামিরায় হজের ইমামের সঙ্গে জামাতে পড়লে জোহর ও আসর একসঙ্গে জোহরের সময়ে পড়া হয়। নিজ তাঁবুতে থাকলে জোহর ও আসর নিজ নিজ ওয়াক্তে পড়বেন। সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফার সীমানার ভেতরে থাকা ওয়াজিব; সীমানা চিহ্নিত বোর্ড খেয়াল রাখুন, কারণ ভুল করে সীমানার বাইরে থাকলে অবস্থান গণ্য হয় না।
মুজদালিফার রাত ও ১০ জিলহজের কাজ
সূর্যাস্তের পর মাগরিব না পড়েই মুজদালিফার দিকে রওনা হবেন। সেখানে পৌঁছে এশার সময়ে মাগরিব ও এশা একসঙ্গে পড়বেন। রাতটি খোলা আকাশের নিচে কাটানো সুন্নত। ফজরের পর সূর্যোদয়ের কিছু আগ পর্যন্ত মুজদালিফায় অবস্থান করা হানাফি মতে ওয়াজিব; তবে নারী, অসুস্থ ও দুর্বলদের জন্য আগে চলে যাওয়ার অবকাশ আছে। কঙ্করের জন্য ছোলার দানার মতো ছোট পাথর এখান থেকে সংগ্রহ করা যায়।
বিজ্ঞাপন
১০ জিলহজ তামাত্তু ও কিরান হজকারীর চারটি কাজ এই ক্রমে করতে হয়:
১. জামরাতুল আকাবায় কঙ্কর: শুধু বড় জামরায় সাতটি কঙ্কর, প্রতিটির সঙ্গে 'বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার'। প্রথম কঙ্কর মারার সময় তালবিয়া বন্ধ হয়ে যায়।
২. কোরবানি: তামাত্তু ও কিরানের শুকরিয়ার কোরবানি। অনুমোদিত ব্যবস্থায় কুপন কিনলে কোরবানি সম্পন্ন হয়েছে কি না নিশ্চিত হয়ে নিন।
৩. মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা: পুরুষের জন্য পুরো মাথা মুণ্ডন উত্তম। নারীরা চুলের আগা থেকে আঙুলের এক কর পরিমাণ কাটবেন। এরপর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছাড়া ইহরামের অন্য সব নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়।
বিজ্ঞাপন
৪. তাওয়াফে জিয়ারত ও সাঈ: এটি হজের ফরজ তাওয়াফ। ১০ থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে আদায় করা ওয়াজিব। তামাত্তু হজকারী এর পর সাফা-মারওয়ায় সাঈ করবেন। এ তাওয়াফের পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও বৈধ হয়ে যায়।
হানাফি মতে প্রথম তিনটি কাজের ক্রম রক্ষা করা ওয়াজিব। ইফরাদ হজকারীর ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়, তিনি কঙ্কর মারার পর মাথা মুণ্ডন করবেন।
১১ থেকে ১৩ জিলহজ: মিনায় অবস্থান ও কঙ্কর
তাওয়াফে জিয়ারত শেষে মিনায় ফিরে রাত কাটানো সুন্নত। ১১ ও ১২ জিলহজ দুপুরে সূর্য হেলে পড়ার পর তিনটি জামরায় সাতটি করে কঙ্কর মারতে হয়, ক্রম হলো ছোট জামরা, মধ্যম জামরা, তারপর বড় জামরা। প্রথম দুটির পর একটু সরে কেবলামুখী হয়ে দোয়া করা সুন্নত।
বিজ্ঞাপন
১২ জিলহজ কঙ্কর মেরে সূর্যাস্তের আগে মিনা ছেড়ে মক্কায় চলে যাওয়া যায়। সূর্যাস্তের পর যাওয়া মাকরুহ, আর ১৩ জিলহজের সুবহে সাদিক মিনায় হলে সেদিনের কঙ্করও মারতে হবে। দুর্বল, অসুস্থ বা বয়স্ক ব্যক্তি নিজে যেতে না পারলে অন্যকে দিয়ে কঙ্কর মারানো যায়; সুস্থ ব্যক্তির জন্য এ সুযোগ নেই।
বিদায়ী তাওয়াফ ও জরুরি সতর্কতা
মক্কা ছেড়ে দেশে ফেরার আগে বিদায়ী তাওয়াফ করা বহিরাগত হাজিদের জন্য ওয়াজিব। এতে ইহরাম, রমল বা সাঈ নেই। ঋতুস্রাবগ্রস্ত নারীর জন্য এ তাওয়াফ মাফ।
ভিড়ে হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের জন্য ধাক্কাধাক্কি করবেন না; দূর থেকে হাতের ইশারাই যথেষ্ট। আরাফা ও মিনায় পর্যাপ্ত পানি পান করুন, ছাতা ব্যবহার করুন, কারণ গরমে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি থাকে। দলের মুয়াল্লিম ও গাইডের নির্দেশনা মানুন, তাঁবুর নম্বর ও পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখুন। কোনো ওয়াজিব ছুটে গেছে মনে হলে দেরি না করে নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে জেনে নিন।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
হজ কার ওপর ফরজ?
মুসলমান, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের এমন ব্যক্তির ওপর, যার যাতায়াত ও হজকালীন খরচ বহনের সামর্থ্য আছে এবং ফেরা পর্যন্ত পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা আছে। হানাফি মাজহাবে নারীর জন্য মাহরাম সঙ্গী থাকাও শর্ত।
তামাত্তু হজ কেন বেশি করা হয়?
বিজ্ঞাপন
এতে ওমরাহর পর ইহরাম খুলে কয়েক দিন স্বাভাবিকভাবে থাকা যায়, যা দীর্ঘ সময় মক্কায় অবস্থানকারী বাংলাদেশি হাজিদের জন্য সহজ। এর বিনিময়ে শুকরিয়ার কোরবানি ওয়াজিব হয়।
আরাফায় অবস্থান করতে না পারলে কী হবে?
আরাফায় অবস্থান হজের ফরজ। ৯ জিলহজ দুপুর থেকে ১০ জিলহজের সুবহে সাদিকের মধ্যে কিছু সময়ও আরাফায় না থাকলে সে বছরের হজ হবে না।
ঋতুস্রাবের কারণে তাওয়াফে জিয়ারত করতে না পারলে?
বিজ্ঞাপন
পবিত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন, তারপর তাওয়াফ করবেন। এ কারণে দেরি হলে দম দিতে হয় না। তবে ফ্লাইটের সময় নিয়ে সমস্যা হলে আলেমের পরামর্শ নিন।