মশা তাড়ানোর ঘরোয়া উপায়: রাসায়নিক ছাড়াই ঘর রাখুন মশামুক্ত
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
সন্ধ্যা নামলেই ঘরে মশার গুনগুন শুরু হয়, আর বর্ষায় সেটা অসহ্য হয়ে ওঠে। কয়েল বা স্প্রে দিয়ে কিছুক্ষণ রেহাই মেলে, কিন্তু ধোঁয়া আর গন্ধে অনেকের শ্বাসকষ্ট হয়, শিশু বা বয়স্কদের ঘরে এগুলো ব্যবহার করতেও ভয় লাগে। ভালো খবর হলো, রাসায়নিক ছাড়াই মশা অনেকটা কমানো যায়।
বিজ্ঞাপন
মশা তাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর ঘরোয়া উপায় হলো মশাকে জন্মাতে না দেওয়া। একটি মশা কয়েক দিনের জমা পানিতেই ডিম পাড়ে, আর এক সপ্তাহের মধ্যে সেই ডিম থেকে নতুন মশা বের হয়। তাই ফুলের টব, ফেলে রাখা বোতল, টায়ার বা ছাদের কোণে জমা পানি সরালেই মশা অনেক কমে যায়। এর সঙ্গে নেট, মশারি আর কিছু প্রাকৃতিক উপায় মিলিয়ে নিলে ঘর অনেকটাই মশামুক্ত রাখা সম্ভব।
ডেঙ্গুর মৌসুমে বিষয়টি শুধু আরামের নয়, সুস্থতারও। ডেঙ্গুর জীবাণু বহনকারী এডিস মশা দিনের বেলাতেও কামড়ায় এবং পরিষ্কার জমা পানিতে জন্মায়, তাই সতর্কতা সারা দিনের।
আগে বন্ধ করুন মশার প্রজনন
সপ্তাহে অন্তত একদিন ঘর আর বাড়ির চারপাশ ঘুরে দেখুন কোথায় পানি জমে আছে। এই অভ্যাসটাই সবচেয়ে বেশি কাজ দেয়।
বিজ্ঞাপন
১. ফুলের টব ও ট্রে: টবের নিচের ট্রেতে জমা পানি তিন দিন পরপর ফেলে দিন। মানিপ্ল্যান্ট বা পানিতে রাখা গাছের পানি সপ্তাহে অন্তত একবার বদলান।
২. ফ্রিজ ও এসির পানি: ফ্রিজের পেছনের ট্রে এবং এসির পানি পড়ার পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করুন। অনেকেই এগুলোর কথা ভুলে যান।
৩. ছাদ ও বারান্দা: ভাঙা বালতি, ডাবের খোসা, পলিথিন, পুরোনো টায়ার বা প্লাস্টিকের পাত্রে বৃষ্টির পানি জমে। এগুলো উল্টে রাখুন বা সরিয়ে ফেলুন।
৪. পানির ট্যাংক ও ড্রাম: পানি ধরে রাখার পাত্র সবসময় ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
৫. নর্দমা ও গর্ত: বাড়ির আশপাশের ছোট গর্ত মাটি দিয়ে ভরাট করুন, নালা যেন আটকে না থাকে সেদিকে নজর দিন।
একটি বাড়ি পরিষ্কার রাখলেই সমস্যা পুরো মেটে না, কারণ মশা আশপাশের বাড়ি থেকেও উড়ে আসে। ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকলে প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলে সপ্তাহে একদিন ছাদ, সিঁড়ি, গ্যারেজ ও নির্মাণাধীন অংশের জমা পানি দেখার দায়িত্ব ভাগ করে নিন। পাড়ায় ড্রেন বা খোলা জায়গায় দীর্ঘদিন পানি জমে থাকলে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় বা সিটি করপোরেশনকে জানান।
ঘরে ঢোকার পথ আটকান
জানালা ও দরজায় নেট: জানালায় মশা আটকানোর জাল লাগানো এককালীন খরচ, কিন্তু বছরের পর বছর কাজ দেয়। দরজায় চুম্বকযুক্ত পর্দা-নেটও এখন সহজে পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
সন্ধ্যার সময়টা খেয়াল করুন: সূর্যাস্তের আগে থেকে ঘণ্টাখানেক মশা সবচেয়ে বেশি ঘরে ঢোকে। এ সময় দরজা-জানালা বন্ধ রাখুন, তারপর খুলে দিতে পারেন যদি নেট থাকে।
মশারি টানান: ঘুমানোর সময় মশারিই সবচেয়ে নিরাপদ সুরক্ষা। শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও অসুস্থ মানুষের জন্য দিনে ঘুমানোর সময়ও মশারি ব্যবহার করুন। মশারির কোথাও ছিদ্র থাকলে সেলাই করে নিন এবং কিনারা তোশকের নিচে ভালোভাবে গুঁজে দিন।
ঘর অন্ধকার ও গোছানো রাখুন: খাটের নিচে, আলমারির পেছনে বা ঝুলিয়ে রাখা কাপড়ের ভাঁজে মশা লুকিয়ে থাকে। জামাকাপড় দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে না রেখে ভাঁজ করে তুলে রাখুন।
মশা দূর করার প্রাকৃতিক উপায়
বিজ্ঞাপন
এই উপায়গুলো মশাকে কিছুটা দূরে রাখে। পুরোপুরি মশা মারে না, তাই ওপরের সতর্কতার পাশাপাশি ব্যবহার করুন।
১. নিমপাতার ধোঁয়া: শুকনো নিমপাতা মাটির পাত্রে অল্প আগুনে পুড়িয়ে সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ ধোঁয়া দিলে মশা সরে যায়। ধোঁয়া দেওয়ার সময় ঘরে শিশু বা শ্বাসকষ্টের রোগী না রাখাই ভালো, পরে জানালা খুলে বাতাস চলাচল করতে দিন।
২. কর্পূর: একটি ছোট বাটিতে পানি নিয়ে তাতে কয়েক টুকরা কর্পূর রেখে ঘরের কোণে রাখলে এর গন্ধে মশা কিছুটা কম আসে। কর্পূর শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন, ভুলে খেয়ে ফেললে তা বিপজ্জনক।
৩. গাছ লাগান: জানালার পাশে বা বারান্দায় তুলসী, লেমনগ্রাস বা পুদিনার টব রাখতে পারেন। এদের গন্ধ মশা পছন্দ করে না, তবে শুধু গাছ দিয়ে ঘর মশামুক্ত হবে এমন আশা করবেন না।
বিজ্ঞাপন
৪. লেবু ও লবঙ্গ: অর্ধেক কাটা লেবুর ভেতরে কয়েকটি লবঙ্গ গেঁথে ঘরের কোণে রাখার পদ্ধতি অনেকে ব্যবহার করেন। এর প্রভাব সামান্য ও সাময়িক।
৫. ফ্যান চালান: মশা দুর্বল উড়ুক্কু, ফ্যানের বাতাসে কাছে আসতে পারে না। বসার ঘরে বা পড়ার টেবিলে টেবিল ফ্যান খুব কাজে দেয়।
মশার কামড় থেকে বাঁচার উপায়
ঘরের বাইরে বা সন্ধ্যায় উঠানে বসলে লম্বা হাতার জামা ও পায়জামা পরুন। মশা গাঢ় রঙের কাপড়ের দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়, তাই হালকা রঙের পোশাক ভালো।
বিজ্ঞাপন
ত্বকে লাগানোর মশানিরোধক লোশন বা ক্রিম ব্যবহার করতে চাইলে প্যাকেটের নির্দেশনা মেনে চলুন। ছোট শিশুর ক্ষেত্রে কোনটি নিরাপদ, তা শিশু বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জেনে নিন। নারকেল তেলের সঙ্গে কয়েক ফোঁটা লেমনগ্রাস বা নিম তেল মিশিয়ে লাগানোর ঘরোয়া পদ্ধতি অনেকে ব্যবহার করেন, তবে কয়েক ঘণ্টার বেশি এর প্রভাব থাকে না এবং কারও কারও ত্বকে জ্বালা হতে পারে। আগে হাতের ছোট জায়গায় লাগিয়ে দেখে নিন।
ঘাম আর শরীরের গন্ধে মশা আকৃষ্ট হয়। তাই বাইরে থেকে ফিরে গোসল করা ও পরিষ্কার কাপড় পরা ভালো অভ্যাস।
কয়েল ও স্প্রে ব্যবহারে সতর্কতা
যদি কয়েল, ম্যাট বা স্প্রে ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে বদ্ধ ঘরে নয়, বাতাস চলাচল আছে এমন ঘরে ব্যবহার করুন। কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমিয়ে পড়বেন না, বিছানা বা পর্দার কাছে রাখবেন না। স্প্রে করার পর অন্তত আধা ঘণ্টা ঘর বন্ধ রেখে তারপর ঢুকুন, খাবার ও পানির পাত্র আগেই ঢেকে নিন। শিশু, অ্যাজমার রোগী ও পোষা প্রাণীকে স্প্রে করা ঘর থেকে দূরে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
মশা মারার ব্যাট নিরাপদ বিকল্প, তবে শিশুদের হাতে দেবেন না।
জ্বর হলে অবহেলা নয়
মশার কামড়ের পর হঠাৎ তীব্র জ্বর, মাথা ও চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও গিঁটে ব্যথা, গায়ে লালচে দানা দেখা দিলে ডেঙ্গু হতে পারে। জ্বর হলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন ও পরীক্ষা করান। জ্বরের সময় নিজে থেকে ব্যথানাশক ওষুধ খাবেন না, কারণ কিছু ব্যথানাশক ডেঙ্গুতে রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ায়। পেটে তীব্র ব্যথা, বারবার বমি, দাঁতের মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্ত পড়া, খুব দুর্বল লাগা বা প্রস্রাব কমে যাওয়া বিপদের লক্ষণ, এ অবস্থায় দ্রুত হাসপাতালে যান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
মশা কোন সময় সবচেয়ে বেশি কামড়ায়?
বেশির ভাগ মশা সন্ধ্যা ও রাতে বেশি সক্রিয়। তবে ডেঙ্গু ছড়ানো এডিস মশা সাধারণত সকালে ও বিকেলে, অর্থাৎ দিনের আলোতে কামড়ায়।
নিমপাতার ধোঁয়া কি সবার জন্য নিরাপদ?
যেকোনো ধোঁয়াই ফুসফুসে জ্বালা তৈরি করতে পারে। শিশু, অ্যাজমা বা হাঁপানির রোগীর ঘরে ধোঁয়া না দেওয়াই ভালো।
বিজ্ঞাপন
এসি চালালে কি ঘরে মশা থাকে না?
ঠান্ডায় মশা কিছুটা নিস্তেজ হয়, কিন্তু মরে না। এসির পানি জমার জায়গা পরিষ্কার না রাখলে উল্টো মশা জন্মাতে পারে।
ঘরে মাছের অ্যাকুরিয়াম থাকলে কি মশা জন্মায়?
যে অ্যাকুরিয়ামে মাছ আছে এবং পানি চলাচল করে, সেখানে মশার লার্ভা টিকতে পারে না। মাছবিহীন পানির পাত্রেই ঝুঁকি বেশি।
বিজ্ঞাপন
মশা কামড়ালে চুলকানি কমাতে কী করব?
জায়গাটি সাবান-পানিতে ধুয়ে কয়েক মিনিট বরফ বা ঠান্ডা ভেজা কাপড় চেপে ধরুন। নখ দিয়ে চুলকাবেন না, এতে ক্ষত ও সংক্রমণ হতে পারে। বেশি ফুলে গেলে বা শিশুর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।