ব্রণের দাগ দূর করার উপায়: পুরোনো দাগ হালকা করার ঘরোয়া যত্ন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
ব্রণ সেরে গেছে, কিন্তু মুখে রয়ে গেছে তার স্মৃতি। কারও গালে লালচে বা বাদামি ছোপ, কারও ত্বকে ছোট ছোট গর্ত। দুটোকেই আমরা ব্রণের দাগ বলি, কিন্তু এদের প্রকৃতি ও প্রতিকার একেবারে আলাদা। সুখবর হলো, বেশির ভাগ মানুষের মুখে যা থাকে তা আসলে চ্যাপ্টা রঙিন দাগ, যা সময় ও সঠিক যত্নে অনেকটা মিলিয়ে যায়। আর গর্ত বা উঁচু দাগের ক্ষেত্রেও আধুনিক চিকিৎসায় ভালো উন্নতি সম্ভব, যদিও তা ঘরোয়া উপায়ে হয় না।
বিজ্ঞাপন
তাই ব্রণের দাগ দূর করার উপায় খোঁজার আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটু খেয়াল করে দেখুন, দাগটা ত্বকের সমান তলে রঙের পরিবর্তন, নাকি ত্বকের গঠনের পরিবর্তন।
দাগের ধরন চিনুন
১. লালচে বা গোলাপি দাগ: ব্রণ সারার পর প্রদাহের কারণে ছোট রক্তনালি প্রসারিত হয়ে থাকে। ফর্সা ত্বকে বেশি দেখা যায়, ধীরে ধীরে নিজে থেকেই মিলিয়ে যায়।
২. বাদামি বা কালচে দাগ: প্রদাহের পর মেলানিন বেড়ে যাওয়ায় হয়। শ্যামলা ত্বকে এটিই সবচেয়ে সাধারণ। রোদে আরও গাঢ় হয়, তবে স্থায়ী নয়; কয়েক মাস থেকে এক-দেড় বছরে হালকা হয়।
বিজ্ঞাপন
৩. গর্ত বা অ্যাট্রোফিক দাগ: ত্বকের গভীরে কোলাজেন নষ্ট হয়ে তৈরি হয়। কোনোটি সুচের খোঁচার মতো সরু ও গভীর, কোনোটি চওড়া কিনারাওয়ালা বাক্সের মতো, কোনোটি ঢেউয়ের মতো উঁচু-নিচু। এগুলো স্থায়ী।
৪. উঁচু দাগ: কারও কারও, বিশেষ করে বুক, পিঠ ও চোয়ালে, ব্রণ সারার পর শক্ত উঁচু দাগ বা কেলয়েড হয়।
আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখুন; সমান মসৃণ হলে রঙের দাগ, গর্ত বা উঁচু-নিচু অনুভব হলে গঠনের দাগ। আলোর পাশে দাঁড়িয়ে মুখ একটু কাত করলেও গর্ত স্পষ্ট বোঝা যায়।
মুখের ব্রণের দাগ দূর করার উপায়: রঙের দাগে যা কাজ করে
বিজ্ঞাপন
প্রথম শর্ত সানস্ক্রিন: প্রতিদিন এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি ব্রড স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন না লাগালে কোনো ক্রিম বা প্যাকই পুরো ফল দেবে না, কারণ রোদ নতুন করে মেলানিন বাড়িয়ে দাগ গাঢ় করে। ব্রণপ্রবণ ত্বকে জেল বা তেলমুক্ত সানস্ক্রিন বেছে নিন।
দ্বিতীয় শর্ত নতুন ব্রণ থামানো: প্রতিটি নতুন ব্রণ একটি নতুন দাগ। তাই সক্রিয় ব্রণ থাকলে আগে তার চিকিৎসা করুন এবং ব্রণ খোঁটা পুরোপুরি বন্ধ করুন।
তৃতীয় শর্ত ধৈর্য: ত্বকের কোষ নতুন হতে সময় লাগে। যেকোনো উপাদানের ফল বুঝতে অন্তত আট থেকে বারো সপ্তাহ নিয়মিত ব্যবহার করুন।
ব্রণের দাগ দূর করার ক্রিম: উপাদান দেখে বাছুন
বিজ্ঞাপন
১. অ্যাজেলাইক অ্যাসিড: ব্রণ ও ব্রণ-পরবর্তী কালচে দাগ দুটোতেই কাজ করে, তুলনামূলক মৃদু।
২. নিয়াসিনামাইড: রং সমান করে, লালচে ভাব কমায়, বেশির ভাগ ত্বকে সহনীয়।
৩. রেটিনয়েড: অ্যাডাপালিন বা রেটিনলের মতো উপাদান কোষ বদলের গতি বাড়ায়, দাগ হালকা করে, দীর্ঘ মেয়াদে হালকা গর্তের চেহারাও কিছুটা উন্নত করতে পারে। রাতে অল্প পরিমাণে শুরু করুন, প্রথম দিকে শুষ্কতা ও লালচে ভাব হতে পারে। গর্ভাবস্থায় ব্যবহার নিষেধ।
৪. ভিটামিন সি: অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, দাগ হালকা করতে সাহায্য করে, সকালে সানস্ক্রিনের নিচে ব্যবহার করা যায়।
বিজ্ঞাপন
৫. আলফা আরবুটিন, কোজিক অ্যাসিড, ট্রানেক্সামিক অ্যাসিড: মেলানিন তৈরি কমিয়ে কালচে দাগে সাহায্য করে।
৬. সিলিকন জেল: উঁচু দাগ নরম ও চ্যাপ্টা করতে চিকিৎসকেরা প্রায়ই এর পরামর্শ দেন।
একসঙ্গে সবকিছু মুখে মাখবেন না। একটি বা দুটি উপাদান বেছে নিয়ে নিয়মিত ব্যবহার করুন। মোড়কে উপাদান লেখা নেই বা কয়েক দিনে দাগ মুছে দেওয়ার দাবি করে, এমন ক্রিমে স্টেরয়েড বা পারদ থাকার ঝুঁকি আছে; এগুলো দাগ সারানোর বদলে ত্বকের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
ঘরোয়া যত্ন: কোনটা নিরাপদ
বিজ্ঞাপন
ঘরোয়া উপায় হালকা রঙের দাগে সহায়ক হতে পারে, গর্তে নয়। প্রথমবার ব্যবহারের আগে কানের পেছনে পরীক্ষা করে নিন এবং সপ্তাহে দুই-তিন দিনের বেশি নয়।
১. অ্যালোভেরা জেল: রাতে পাতলা করে লাগালে প্রদাহ কমে, ত্বক আর্দ্র থাকে।
২. টক দই ও মধুর প্যাক: দইয়ের ল্যাকটিক অ্যাসিড মৃদু এক্সফোলিয়েন্ট; ১০-১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।
৩. ঠান্ডা গ্রিন টি: তুলায় ভিজিয়ে মুখে বুলিয়ে নিলে লালচে ভাব কিছুটা কমতে পারে।
বিজ্ঞাপন
পিঠ ও বুকের ব্রণের দাগেও একই নিয়ম খাটে। ঘামে ভেজা জামা দ্রুত বদলান, ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরুন, গোসলে স্যালিসাইলিক অ্যাসিড বা বেনজয়েল পারক্সাইডযুক্ত বডিওয়াশ ব্যবহার করা যায়। বেনজয়েল পারক্সাইড কাপড় ও তোয়ালের রং নষ্ট করতে পারে, তাই সাদা তোয়ালে ব্যবহার করুন। রোদে খোলা পিঠে গেলে সেখানেও সানস্ক্রিন লাগান।
লেবুর রস, বেকিং সোডা, টুথপেস্ট, কাঁচা রসুন বা অ্যাপল সিডার ভিনেগার সরাসরি দাগে লাগাবেন না। এগুলো ত্বকে জ্বালা ও রাসায়নিক পোড়া তৈরি করে নতুন কালচে দাগের জন্ম দেয়। মোটা দানার স্ক্রাব দিয়ে জোরে ঘষে দাগ তোলার চেষ্টাও একই রকম ক্ষতিকর।
ব্রণের গর্ত দূর করার উপায়
গর্ত বা অ্যাট্রোফিক দাগ ত্বকের গভীর স্তরের ক্ষতি, তাই কোনো প্যাক, তেল বা ক্রিম এগুলো ভরাট করতে পারে না। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে কয়েক ধরনের চিকিৎসা আছে, যা দাগের ধরন দেখে বেছে নেওয়া হয়:
বিজ্ঞাপন
১. মাইক্রোনিডলিং: সূক্ষ্ম সুচ দিয়ে ত্বকে নিয়ন্ত্রিত ক্ষত তৈরি করে নতুন কোলাজেন তৈরিতে উদ্দীপনা দেওয়া হয়।
২. ফ্র্যাকশনাল লেজার: ত্বকের স্তর নতুন করে গড়তে সাহায্য করে।
৩. কেমিক্যাল পিল: বিভিন্ন গভীরতার অ্যাসিড প্রয়োগে ওপরের স্তর তুলে নতুন ত্বক আনা হয়; সরু গভীর গর্তে বিশেষ কৌশলে প্রয়োগ করা হয়।
৪. সাবসিশন: ঢেউখেলানো দাগের নিচে আটকে থাকা আঁশ আলগা করে ত্বক ওপরে তোলা হয়।
বিজ্ঞাপন
৫. ফিলার: কিছু দাগে সাময়িকভাবে ভরাট করা যায়।
এসব চিকিৎসায় সাধারণত কয়েকটি সেশন লাগে, খরচ ও সময় দাগের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে, আর ফল হয় উন্নতি, পুরোপুরি মুছে যাওয়া নয়। শ্যামলা ত্বকে ভুল পদ্ধতি বা অদক্ষ হাতে করালে নতুন কালচে দাগ পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই নিবন্ধিত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছেই করান, বিউটি পারলারে নয়। সক্রিয় ব্রণ থাকা অবস্থায় সাধারণত গর্তের চিকিৎসা শুরু করা হয় না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ব্রণের কালো দাগ কত দিনে যায়?
বিজ্ঞাপন
নিয়মিত সানস্ক্রিন ও যত্নে বেশির ভাগ কালচে দাগ তিন থেকে ছয় মাসে অনেকটা হালকা হয়। গভীর রঙের দাগে এক বছর বা তার বেশি লাগতে পারে।
ঘরে ডার্মা রোলার ব্যবহার করা কি নিরাপদ?
ঘরে ব্যবহারের রোলার জীবাণুমুক্ত না রাখলে সংক্রমণ হতে পারে, আর ভুলভাবে করলে দাগ বাড়ে। সক্রিয় ব্রণে কখনো ব্যবহার করবেন না। গর্তের চিকিৎসা চিকিৎসকের কাছে করানোই নিরাপদ।
বরফ ঘষলে কি ব্রণের দাগ কমে?
বিজ্ঞাপন
বরফ সক্রিয় ব্রণের ফোলা সাময়িক কমায়, পুরোনো দাগ বা গর্তে কাজ করে না।
ব্রণের দাগ ঠেকাতে সবচেয়ে জরুরি কী?
শুরু থেকেই ব্রণের চিকিৎসা করা, ব্রণ না খোঁটা এবং প্রতিদিন সানস্ক্রিন ব্যবহার। মাঝারি থেকে তীব্র ব্রণে দ্রুত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ দেখালে গর্তের ঝুঁকি অনেক কমে।
দাগের ক্রিম কত দিন ব্যবহার করব?
বিজ্ঞাপন
অন্তত তিন মাস নিয়মিত ব্যবহার করে তারপর ফল বিচার করুন। দাগ হালকা হয়ে গেলেও সানস্ক্রিন চালিয়ে যান, নইলে রোদে আবার গাঢ় হতে পারে। জ্বালা, ফোসকা বা লাল হয়ে যাওয়া দেখা দিলে ব্যবহার বন্ধ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।