মন ভালো রাখার উপায়: মানসিক চাপ কমিয়ে ভালো থাকার অভ্যাস
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
মন খারাপ হওয়া দুর্বলতা নয়, মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। পরীক্ষার ফল খারাপ হলে, চাকরির চাপ বাড়লে, প্রিয় কেউ দূরে গেলে বা শুধু একটানা বৃষ্টির দিনে মন ভার হয়ে থাকতেই পারে। সমস্যা হয় তখন, যখন এই ভার দিনের পর দিন নামে না, ঘুম-খাওয়া-কাজ সবকিছুতে প্রভাব ফেলে। মন ভালো রাখার উপায় তাই সবসময় হাসিখুশি থাকার কৌশল নয়; বরং মন খারাপের ধাক্কা সামলে আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার ক্ষমতা তৈরি করা।
বিজ্ঞাপন
এই ক্ষমতা কিছুটা অভ্যাসে গড়ে ওঠে। ঘুম, শরীর নড়াচড়া, আলো, খাবার আর মানুষের সঙ্গ, এই পাঁচটি জিনিস মনের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। এর সঙ্গে মানসিক চাপ সামলানোর কয়েকটি সহজ কৌশল শিখে নিলে কঠিন দিনগুলোও তুলনামূলক সহজে পার হয়।
শরীর ও মন ভালো রাখার উপায়: পাঁচটি ভিত্তি
১. ঘুম: একটানা কয়েক রাত কম ঘুমালে অল্পতেই রাগ, দুশ্চিন্তা ও মন খারাপ বাড়ে। প্রতিদিন মোটামুটি একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ওঠার চেষ্টা করুন; প্রাপ্তবয়স্কদের সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম দরকার। শোবার আগে মোবাইল দূরে রাখুন।
২. শরীর নড়াচড়া: নিয়মিত হাঁটা, দৌড়, সাইকেল চালানো বা যেকোনো ব্যায়াম মেজাজ ভালো রাখতে এবং দুশ্চিন্তা ও হালকা বিষণ্নতা কমাতে সাহায্য করে বলে বহু গবেষণায় দেখা গেছে। দিনে ২০ থেকে ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটাই যথেষ্ট শুরু।
বিজ্ঞাপন
৩. সকালের আলো ও প্রকৃতি: ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ রোদে বা বাইরের আলোয় থাকুন। পার্ক, নদীর পাড়, গাছপালার মধ্যে হাঁটা, এমনকি ছাদে বা বারান্দায় কয়েকটি গাছের যত্ন নেওয়াও মন শান্ত করে।
৪. খাবার: বেলা বাদ দিলে রক্তে শর্করা কমে গিয়ে খিটখিটে লাগে। নিয়মিত খান; শাকসবজি, ফল, ডাল, মাছ, ডিম ও বাদাম রাখুন। অতিরিক্ত চা-কফি দুশ্চিন্তা ও বুক ধড়ফড় বাড়াতে পারে, আর অতিরিক্ত মিষ্টি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার মেজাজের ওঠানামা বাড়ায়।
৫. মানুষের সঙ্গ: পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশীর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা মানসিক সুস্থতার সবচেয়ে শক্তিশালী রক্ষাকবচগুলোর একটি। ব্যস্ততার মধ্যেও সপ্তাহে কয়েকবার কাছের মানুষদের ফোন করুন, মুখোমুখি দেখা করুন।
মন মেজাজ ভালো রাখার উপায়: তাৎক্ষণিক কিছু কৌশল
বিজ্ঞাপন
হঠাৎ মন খারাপ বা অস্থির লাগলে এগুলো চেষ্টা করুন:
১. দশ মিনিট হাঁটা: ঘর থেকে বেরিয়ে একটু হেঁটে আসুন। দৃশ্য বদলালে চিন্তার স্রোতও বদলায়।
২. ধীর শ্বাস: চার গোনা পর্যন্ত নাক দিয়ে শ্বাস নিন, ছয় গোনা পর্যন্ত মুখ দিয়ে ধীরে ছাড়ুন। পাঁচ মিনিট করলে বুকের ধুকপুকানি কমে আসে।
৩. লিখে ফেলুন: কী নিয়ে খারাপ লাগছে, কাগজে লিখুন। চিন্তা কাগজে নামলে তার আকার ছোট মনে হয়, সমাধানও চোখে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
৪. কাউকে বলুন: বিশ্বাসযোগ্য একজনকে ফোন করে বলুন, আজ দিনটা ভালো যাচ্ছে না। সমাধান না দিলেও শুধু শোনার মানুষ থাকলে ভার কমে।
৫. ছোট একটি কাজ শেষ করুন: বিছানা গোছানো, ড্রয়ার পরিষ্কার, একটি ই-মেইলের উত্তর। ছোট সাফল্য মনকে আবার সচল করে।
৬. পছন্দের কিছু: প্রিয় গান, পুরোনো ছবি দেখা, রান্না, বাগান, ছবি আঁকা, কোরআন তিলাওয়াত বা প্রার্থনা, যা আপনাকে শান্ত করে।
মানসিক চাপ সামলানোর অভ্যাস
বিজ্ঞাপন
চাপ পুরোপুরি এড়ানো যায় না, তবে সামলানো যায়। প্রথমে চিহ্নিত করুন কোন বিষয়গুলো চাপ তৈরি করছে, তারপর দুই ভাগ করুন: যেগুলো বদলানো সম্ভব আর যেগুলো সম্ভব নয়। প্রথম ভাগের জন্য ছোট ছোট পদক্ষেপ ঠিক করুন; দ্বিতীয় ভাগের ক্ষেত্রে মেনে নেওয়ার চেষ্টা আর নিজের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণই কাজ।
বড় কাজকে ছোট টুকরায় ভাগ করুন এবং দিনে তিনটির বেশি জরুরি কাজ তালিকায় রাখবেন না। নিজের সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব নিতে হলে বিনয়ের সঙ্গে না বলতে শিখুন। কাজের মাঝে ছোট বিরতি নিন। অফিসের কাজ বাসায় আনলে নির্দিষ্ট সময়ের পর ল্যাপটপ বন্ধ করুন।
সামাজিক মাধ্যম আর খবর মনের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। অন্যের সাজানো জীবনের ছবি দেখে নিজের জীবন নিয়ে হতাশা জাগে, আর একটানা দুঃসংবাদ দুশ্চিন্তা বাড়ায়। দিনে নির্দিষ্ট সময়ে খবর দেখুন, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন, ঘুমের আগের এক ঘণ্টা ও ঘুম থেকে ওঠার পরের প্রথম আধা ঘণ্টা মোবাইল থেকে দূরে থাকুন।
প্রতিদিন রাতে তিনটি ভালো জিনিস লিখে রাখার অভ্যাস, যতই ছোট হোক, মনকে ইতিবাচক দিকগুলো খেয়াল করতে শেখায়। অন্যকে সাহায্য করা, যেমন প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া বা কোনো স্বেচ্ছাসেবী কাজে যুক্ত হওয়া, নিজের মনকেও ভালো রাখে।
বিজ্ঞাপন
ধূমপান, মাদক বা ঘুমের ওষুধে মন খারাপ সামলানোর চেষ্টা সাময়িক স্বস্তি দিলেও পরে উদ্বেগ ও বিষণ্নতা বাড়িয়ে দেয়। নিজের কষ্ট চাপা দিতে এগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ছেন মনে হলে দ্রুত সাহায্য নিন।
সবসময় মন ভালো রাখার উপায় আছে কি
সত্যি কথা হলো, সবসময় মন ভালো রাখা সম্ভব নয়, আর সেটা লক্ষ্য হওয়াও উচিত নয়। দুঃখ, রাগ, ভয়, হতাশা মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি; এগুলো আমাদের কিছু জানাতে চায়। অনুভূতিকে অস্বীকার না করে নাম দিন: আমি এখন হতাশ, কারণ কাজটা হয়নি। নাম দিলে অনুভূতির ওপর নিয়ন্ত্রণ কিছুটা ফেরে।
নিজের সঙ্গে কথা বলার ধরন খেয়াল করুন। ভুল হলে নিজেকে বকাঝকা না করে ভাবুন, কাছের বন্ধু একই ভুল করলে তাকে কী বলতেন। নিজের প্রতি সেই সহানুভূতিটুকু দেখান। জীবনের লক্ষ্য বাস্তবসম্মত রাখুন, আর অন্যের সঙ্গে তুলনা কমান।
বিজ্ঞাপন
কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন
শরীরের অসুখের মতো মনেরও অসুখ হয়, এবং তার কার্যকর চিকিৎসা আছে। নিচের লক্ষণগুলো দুই সপ্তাহের বেশি থাকলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট বা কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলুন: প্রায় সারা দিন মন খারাপ, আগে যা ভালো লাগত তাতে আগ্রহ না থাকা, ঘুম ও খাওয়ায় বড় পরিবর্তন, সবসময় ক্লান্তি, মনোযোগ দিতে না পারা, নিজেকে অপ্রয়োজনীয় বা দোষী মনে হওয়া, অকারণ ভয় বা বুক ধড়ফড় যা দৈনন্দিন কাজ আটকে দেয়।
কারও মনে আত্মহত্যা বা নিজের ক্ষতির চিন্তা এলে এটি জরুরি অবস্থা। একা থাকবেন না, এখনই কাছের কাউকে জানান এবং নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে বা মনোরোগ বিভাগে যোগাযোগ করুন। সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর মনোরোগ বিভাগ এবং ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা পাওয়া যায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
মন খারাপ আর বিষণ্নতার পার্থক্য কী?
মন খারাপ সাধারণত কোনো ঘটনার সঙ্গে যুক্ত এবং কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনে কেটে যায়। বিষণ্নতা দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, দৈনন্দিন কাজ, ঘুম ও খাওয়ায় প্রভাব ফেলে এবং চিকিৎসা লাগে।
ব্যায়াম কি সত্যিই মন ভালো রাখে?
হ্যাঁ। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম মেজাজ ভালো রাখে, ঘুম উন্নত করে এবং দুশ্চিন্তা কমায়। হালকা বিষণ্নতায় এটি চিকিৎসার সহায়ক অংশ হিসেবে পরামর্শ দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গেলে কি সবসময় ওষুধ খেতে হয়?
না। অনেক ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপিই যথেষ্ট। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক ওষুধ দেন, এবং তা তাঁর তত্ত্বাবধানে নিয়ম মেনে খেতে হয়।
কাছের কেউ ভালো নেই বুঝলে কী করব?
বিচার না করে মন দিয়ে শুনুন, উপদেশের ঝাঁপি খুলে বসবেন না। তাঁকে জানান আপনি পাশে আছেন, এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে উৎসাহ দিন, পারলে সঙ্গে যান।