ওজন কমানোর ডায়েট চার্ট: সাত দিনের বাংলাদেশি খাবার তালিকা
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
ওজন কমানোর ডায়েট চার্ট মানেই সেদ্ধ সবজি আর না খেয়ে থাকা, এই ধারণা থেকেই অনেকের ডায়েট দুই সপ্তাহে ভেঙে যায়। কার্যকর চার্ট সেটাই, যা নিজের রান্নাঘরের পরিচিত খাবার দিয়ে মাসের পর মাস মানা যায়। ভাত, রুটি, ডাল, মাছ, সবজি, ডিম, এগুলো দিয়েই ওজন কমানো সম্ভব, শুধু পরিমাণ আর রান্নার ধরনটা ঠিক করতে হয়।
বিজ্ঞাপন
নিচের সাত দিনের তালিকাটি সাধারণ প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের জন্য একটি নমুনা, যেখানে দৈনিক ক্যালরি মোটামুটি পরিমিত মাত্রায় রাখা হয়েছে। পুরুষ বা বেশি শারীরিক পরিশ্রম করেন এমন কেউ ভাত বা রুটির পরিমাণ সামান্য বাড়াতে পারেন। ডায়াবেটিস, কিডনি বা হৃদ্রোগ থাকলে, গর্ভাবস্থায় বা বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় পুষ্টিবিদ বা চিকিৎসকের দেওয়া তালিকাই মেনে চলুন।
চার্ট মানার আগে মাপগুলো বুঝে নিন
এই তালিকায় এক কাপ মানে সাধারণ চায়ের কাপ বা ছোট বাটির সমান, মোটামুটি ২৫০ মিলিলিটার। এক কাপ রান্না করা ভাতে প্রায় ২০০ ক্যালরির মতো থাকে। একটি রুটি মানে তেল ছাড়া মাঝারি আকারের আটার রুটি। এক টুকরা মাছ বা মাংস মানে মোটামুটি তালুর সমান আকারের টুকরা। রান্নায় পুরো পরিবারের জন্য দিনে কয়েক টেবিল চামচের বেশি তেল নয়; জনপ্রতি দিনে মোটামুটি দুই থেকে তিন চা-চামচ।
প্লেটের নিয়ম: প্লেটের অর্ধেক শাকসবজি, এক-চতুর্থাংশ ভাত বা রুটি, এক-চতুর্থাংশ মাছ, মাংস, ডিম বা ডাল। চার্ট মনে না থাকলেও এই নিয়ম মনে রাখলেই চলবে।
বিজ্ঞাপন
ওজন কমাতে সকালের নাস্তা
সকালের নাস্তায় প্রোটিন আর আঁশ থাকলে দুপুর পর্যন্ত ক্ষুধা কম লাগে। কয়েকটি বিকল্প, যেগুলো সপ্তাহজুড়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেতে পারেন:
১. রুটি-ডিম-সবজি: দুটি লাল আটার রুটি, একটি সেদ্ধ ডিম বা কম তেলের অমলেট, এক বাটি সবজি ভাজি।
২. ওটস: আধা কাপ ওটস কম চর্বির দুধ বা পানিতে রান্না, সঙ্গে আধা কাপ কাটা ফল, চিনি ছাড়া।
বিজ্ঞাপন
৩. চিড়া-দই: এক কাপ ভেজানো চিড়া, আধা কাপ টক দই, একটি কলা বা কয়েক টুকরা পেঁপে।
৪. ডিম-পাউরুটি: দুই স্লাইস লাল আটার পাউরুটি, একটি ডিম, শসা-টমেটো।
৫. খিচুড়ি: আধা কাপ সবজি খিচুড়ি, কম তেলে, সঙ্গে একটি ডিম।
পরোটা, পুরি, পাউরুটি-জেলি, মিষ্টি বিস্কুট আর চিনি দেওয়া চা দিয়ে নাস্তা সারার অভ্যাস থাকলে আগে সেটি বদলান।
বিজ্ঞাপন
সাত দিনের খাবার তালিকা
প্রতিদিনের মূল তিন বেলার সঙ্গে মধ্যসকাল ও বিকেলে হালকা নাশতা রাখা হয়েছে, যাতে বড় বেলায় অতিরিক্ত ক্ষুধা নিয়ে বসতে না হয়।
১. প্রথম দিন: সকালে দুটি রুটি, একটি সেদ্ধ ডিম, সবজি ভাজি। মধ্যসকালে একটি পেয়ারা। দুপুরে এক কাপ ভাত, এক টুকরা রুই মাছের ঝোল, এক বাটি লাউ বা পেঁপের তরকারি, আধা কাপ পাতলা ডাল, সালাদ। বিকেলে চিনি ছাড়া চা ও আধা কাপ মুড়ি, সঙ্গে শসা। রাতে দুটি রুটি, এক টুকরা মুরগির তরকারি, এক বাটি মিশ্র সবজি।
২. দ্বিতীয় দিন: সকালে ওটস, ফল দিয়ে। মধ্যসকালে আধা কাপ টক দই। দুপুরে এক কাপ ভাত, কম তেলে রান্না করা শাক, ডাল, এক টুকরা মাছ ভুনা। বিকেলে এক মুঠো ভেজানো ছোলা, টমেটো-পেঁয়াজ দিয়ে মাখা। রাতে এক কাপ ভাত বা দুটি রুটি, ডিমের তরকারি, ঢ্যাঁড়স ভাজি অল্প তেলে।
বিজ্ঞাপন
৩. তৃতীয় দিন: সকালে চিড়া-দই, পেঁপে। মধ্যসকালে একটি আপেল বা কমলা। দুপুরে এক কাপ ভাত, ছোট মাছের চচ্চড়ি, পটোল বা ঝিঙের তরকারি, সালাদ। বিকেলে চিনি ছাড়া চা, একটি সেদ্ধ ডিম। রাতে দুটি রুটি, এক বাটি ঘন ডাল, মিশ্র সবজি।
৪. চতুর্থ দিন: সকালে দুই স্লাইস লাল আটার পাউরুটি, একটি ডিম, শসা-টমেটো। মধ্যসকালে এক টুকরা তরমুজ বা কয়েক টুকরা আনারস। দুপুরে এক কাপ ভাত, মুরগির ঝোল চামড়া ছাড়া, বাঁধাকপি বা ফুলকপির তরকারি, সালাদ। বিকেলে এক মুঠো বাদাম, পাঁচ-ছয়টির মতো। রাতে এক কাপ ভাত, মাছের ঝোল, শাক।
৫. পঞ্চম দিন: সকালে আধা কাপ সবজি খিচুড়ি, একটি ডিম। মধ্যসকালে একটি পেয়ারা। দুপুরে এক কাপ ভাত, ডাল, এক টুকরা মাছ, করলা বা কাঁকরোল ভাজি অল্প তেলে, সালাদ। বিকেলে টক দই ও শসা দিয়ে রায়তা। রাতে দুটি রুটি, মুরগি বা ডিমের তরকারি, সবজি।
৬. ষষ্ঠ দিন: সকালে দুটি রুটি, ডাল, সবজি। মধ্যসকালে একটি কলা বা ছোট আকারের একটি আম মৌসুমে। দুপুরে এক কাপ ভাত, সবজি দিয়ে মাছের ঝোল, শাক, সালাদ। বিকেলে সবজি স্যুপ, অথবা চিনি ছাড়া চা ও আধা কাপ মুড়ি। রাতে এক কাপ ভাত, মুরগির তরকারি, লাউ বা পেঁপের তরকারি।
বিজ্ঞাপন
৭. সপ্তম দিন: সকালে ওটস বা চিড়া-দই। মধ্যসকালে একটি ফল। দুপুরে চাইলে একটু আয়েশি খাবার, যেমন অল্প পোলাও বা মাংস, তবে পরিমাণ এক কাপের মধ্যে আর সঙ্গে বড় প্লেট সালাদ। বিকেলে ভেজানো ছোলা বা সেদ্ধ ডিম। রাতে হালকা খাবার, যেমন দুটি রুটি, ডাল আর সবজি।
এক সপ্তাহ শেষ হলে আবার প্রথম দিন থেকে শুরু করুন, অথবা একই ধরনের খাবার বদলে নিন: রুইয়ের বদলে পাঙাশ, তেলাপিয়া বা কই; লাউয়ের বদলে চালকুমড়া বা পটোল। মৌসুমি ও দেশি সবজি-ফল সস্তা এবং পুষ্টিকর।
পানীয়, নাশতার বদল আর যা কমাবেন
দিনে আট থেকে দশ গ্লাস পানি খান, গরমে বেশি। চা-কফি চিনি ছাড়া বা ধীরে চিনি কমিয়ে। কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস ও এনার্জি ড্রিংক বাদ দিন। ফলের রসের চেয়ে গোটা ফল ভালো, কারণ তাতে আঁশ থাকে এবং পেট বেশি ভরে।
বিজ্ঞাপন
বিকেলের সিঙ্গাড়া, সমুচা, পুরি, চপের বদলে মুড়ি-ছোলা, সেদ্ধ ডিম, ফল, শসা-গাজর বা অল্প বাদাম বেছে নিন। মিষ্টি, কেক, পেস্ট্রি, ফাস্ট ফুড আর বেশি তেলে ভুনা রান্না সপ্তাহে একবারের বেশি নয়। রান্নায় ঘি-ডালডা কমান, ভুনার বদলে ঝোল বা ভাপে রান্না করুন। দাওয়াতে গেলে আগে সালাদ ও সবজি নিন, তারপর ছোট পরিমাণে পছন্দের খাবার।
নিরাপদে মানার শর্ত
ওজন কমানোর খাবার তালিকা কাজ করে তখনই, যখন এর সঙ্গে নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম থাকে, সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট। সপ্তাহে আধা থেকে এক কেজি কমলেই ভালো অগ্রগতি। সপ্তাহে একবার একই সময়ে ওজন মাপুন। দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা বুক ধড়ফড় লাগলে খাবারের পরিমাণ বাড়ান এবং চিকিৎসককে জানান।
ডায়াবেটিসের রোগীরা, বিশেষ করে যাঁরা ইনসুলিন বা শর্করা কমানোর ওষুধ খান, তাঁরা হঠাৎ খাবার কমালে রক্তে শর্করা বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে। কিডনির রোগীদের ডাল, প্রোটিন ও কিছু ফল-সবজির পরিমাণে বিধিনিষেধ থাকে। তাঁদের অবশ্যই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে কথা বলে চার্ট বদলে নিতে হবে। কিশোর-কিশোরীদের বৃদ্ধির বয়সে কঠোর ডায়েট নয়, বরং ভাজাপোড়া ও মিষ্টি কমানো আর খেলাধুলা বাড়ানোই যথেষ্ট।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
রাতে কি ভাত খাওয়া যাবে?
যাবে। ওজন নির্ভর করে সারা দিনের মোট খাবারের ওপর। রাতে পরিমাণ এক কাপের মধ্যে রাখুন এবং ঘুমানোর দুই-তিন ঘণ্টা আগে খান।
এই চার্টে কত দিনে ফল পাব?
বিজ্ঞাপন
নিয়মিত মানলে এবং হাঁটার অভ্যাস থাকলে সাধারণত দুই-চার সপ্তাহের মধ্যে ওজন ও কোমরের মাপে পরিবর্তন দেখা যায়। প্রথম সপ্তাহে দ্রুত কমার বড় অংশ শরীরের পানি।
ছুটির দিনে ডায়েট ভাঙলে কী করব?
একবেলা বেশি খেলে সব শেষ হয়ে যায় না। পরের বেলা থেকে আবার তালিকায় ফিরুন, না খেয়ে থেকে পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন না।
পুরুষদের জন্য কি একই চার্ট?
বিজ্ঞাপন
কাঠামো একই। পুরুষদের ক্যালরির চাহিদা সাধারণত বেশি, তাই তাঁরা প্রতিবেলায় একটি রুটি বা আধা কাপ ভাত বেশি খেতে পারেন।