দাঁতের যত্ন: সঠিক ব্রাশ, খাবার ও ঘরোয়া উপায়ে সুস্থ দাঁত
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
দাঁতের ব্যথা যাঁর একবার হয়েছে, তিনি জানেন রাতের ঘুম কেড়ে নিতে এর চেয়ে বড় শত্রু কম আছে। অথচ দাঁতের ক্ষয় আর মাড়ির রোগ, এই দুই প্রধান সমস্যার বেশির ভাগই প্রতিরোধযোগ্য। দাঁতে সারা দিন খাবারের কণা আর জীবাণু মিলে একটি নরম আস্তরণ তৈরি হয়, যাকে প্লাক বলে। এটি নিয়মিত পরিষ্কার না হলে জীবাণুর তৈরি অ্যাসিড দাঁতের এনামেল ক্ষয় করে গর্ত তৈরি করে, আর মাড়িতে প্রদাহ হয়ে রক্ত পড়ে।
বিজ্ঞাপন
দাঁতের যত্ন তাই শুরু হয় প্রতিদিনের সঠিক ব্রাশ থেকে, তারপর খাবারের অভ্যাস, দাঁতের ফাঁক পরিষ্কার আর নিয়মিত পরীক্ষা। একবার ক্ষয় হয়ে যাওয়া এনামেল আর ফিরে আসে না, তাই সময় থাকতে যত্ন নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
ব্রাশ করার সঠিক নিয়ম
১. দিনে দুবার: সকালে নাশতার পর বা আগে, আর রাতে ঘুমানোর ঠিক আগে। রাতের ব্রাশটাই সবচেয়ে জরুরি, কারণ ঘুমের সময় মুখে লালা কম তৈরি হয় এবং জীবাণু বেশি সক্রিয় থাকে।
২. ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট: ফ্লোরাইড এনামেলকে শক্ত করে এবং ক্ষয়ের শুরুর দিকটা ঠেকাতে সাহায্য করে। বড়দের জন্য মটরদানার মতো পরিমাণ পেস্টই যথেষ্ট।
বিজ্ঞাপন
৩. নরম ব্রাশ ও সঠিক কোণ: নরম বা মাঝারি নরম ব্রাশ নিন। ব্রাশটি মাড়ির দিকে প্রায় ৪৫ ডিগ্রি কোণে ধরে ছোট ছোট বৃত্তাকারে বা সামনে-পেছনে আলতো করে ঘষুন। জোরে ঘষলে এনামেল ক্ষয় হয় এবং মাড়ি সরে গিয়ে দাঁত শিরশির করে।
৪. সব দিক পরিষ্কার: দাঁতের বাইরের দিক, ভেতরের দিক আর চিবানোর তল, সবখানে ব্রাশ করুন। মোট দুই মিনিট সময় দিন; মুখটাকে চার ভাগে ভাগ করে প্রতিটি ভাগে ৩০ সেকেন্ড।
৫. জিভ পরিষ্কার: জিভের ওপরের সাদা আস্তরণ মুখে দুর্গন্ধের বড় কারণ। ব্রাশ বা জিভছোলা দিয়ে আলতো করে পরিষ্কার করুন।
৬. কুলি কম: ব্রাশের পর পেস্ট থুতু দিয়ে ফেলুন, কিন্তু অনেক পানি দিয়ে বারবার কুলি না করলে ফ্লোরাইড দাঁতে বেশিক্ষণ কাজ করে।
বিজ্ঞাপন
৭. ব্রাশ বদলান: প্রতি তিন মাস পরপর, বা ব্রাশের শলা ছড়িয়ে গেলে আগেই। অসুখ থেকে সেরে ওঠার পরও বদলে নেওয়া ভালো।
মেসওয়াক ব্যবহার আমাদের দেশে প্রচলিত এবং সঠিকভাবে ব্যবহার করলে দাঁত পরিষ্কারে কার্যকর। তবে এতে ফ্লোরাইড থাকে না, তাই দিনে অন্তত একবার ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে ব্রাশ করা ভালো।
দাঁতের ফাঁক আর মাউথওয়াশ
ব্রাশ দাঁতের ফাঁকে পৌঁছায় না, আর সেখানেই অনেক ক্ষয় ও মাড়ির রোগ শুরু হয়। দিনে একবার ডেন্টাল ফ্লস বা দাঁতের ফাঁকের ছোট ব্রাশ দিয়ে পরিষ্কার করুন। ফ্লস দুই দাঁতের মাঝে আলতো করে ঢুকিয়ে প্রতিটি দাঁতের গা ঘেঁষে ইংরেজি সি অক্ষরের মতো বাঁকিয়ে ওপর-নিচ করুন, মাড়িতে জোরে চাপ দেবেন না। প্রথম কয়েক দিন সামান্য রক্ত পড়তে পারে, নিয়মিত করলে তা থেমে যায়।
বিজ্ঞাপন
খোঁচানোর জন্য পিন, সেফটিপিন বা ধারালো কাঠি ব্যবহার করবেন না, মাড়ি কেটে সংক্রমণ হতে পারে। মাউথওয়াশ ব্রাশের বিকল্প নয়; প্রয়োজন হলে দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যবহার করুন।
খাবার ও অভ্যাস
দাঁতের ক্ষয়ে চিনির পরিমাণের চেয়েও বড় বিষয় কত ঘন ঘন চিনি খাচ্ছেন। সারা দিন একটু পরপর চিনি দেওয়া চা, বিস্কুট, চকলেট বা কোমল পানীয় খেলে দাঁত বারবার অ্যাসিডের আক্রমণে পড়ে। মিষ্টি খেতে চাইলে খাবারের সঙ্গে খান, আলাদা করে বারবার নয়। আঠালো মিষ্টি, চিপস আর লজেন্স দাঁতে লেগে থাকে বেশিক্ষণ।
কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংক ও টক ফলের রস অম্লীয়, এনামেল নরম করে। খাওয়ার পর পানি দিয়ে কুলি করুন, তবে অম্লীয় কিছু খাওয়ার ঠিক পরেই জোরে ব্রাশ না করে আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করুন। দুধ, দই, পনির, ছোট মাছ ও সবুজ শাক দাঁত ও হাড়ের জন্য ভালো। গাজর, শসা, পেয়ারার মতো কচকচে ফল-সবজি চিবালে লালা বাড়ে, যা প্রাকৃতিকভাবে দাঁত পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞাপন
পান, জর্দা, সুপারি ও ধূমপান: এগুলো দাঁতে দাগ ফেলে, মাড়ির রোগ বাড়ায় এবং মুখের ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ। মুখে সাদা বা লাল দাগ, দুই সপ্তাহের বেশি না সারা ঘা, মুখ খুলতে কষ্ট বা গালের ভেতরে শক্ত ভাব দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান। দাঁত দিয়ে বোতলের ছিপি খোলা বা শক্ত কিছু ভাঙার অভ্যাসও দাঁত ফাটিয়ে দিতে পারে।
শিশুর দাঁতের যত্ন
প্রথম দাঁত ওঠার আগেই নরম ভেজা কাপড় দিয়ে শিশুর মাড়ি মুছে দিন। দাঁত ওঠা শুরু হলে শিশুদের নরম ব্রাশে দিনে দুবার ব্রাশ করিয়ে দিন। তিন বছরের কম বয়সী শিশুর জন্য চালের দানার মতো খুব সামান্য ফ্লোরাইডযুক্ত পেস্ট, আর তিন থেকে ছয় বছর বয়সে মটরদানার মতো পরিমাণ যথেষ্ট। শিশু যেন পেস্ট গিলে না ফেলে, সেদিকে খেয়াল রাখুন এবং মোটামুটি সাত-আট বছর পর্যন্ত বড়রা ব্রাশ তদারকি করুন।
রাতে মিষ্টি দুধ বা জুসের বোতল মুখে দিয়ে শিশুকে ঘুম পাড়ানো সামনের দাঁতে দ্রুত ক্ষয়ের বড় কারণ। দুধের দাঁত পড়েই যাবে ভেবে অবহেলা করবেন না; দুধের দাঁতে ক্ষয় ও সংক্রমণ হলে ব্যথা, খেতে কষ্ট এবং স্থায়ী দাঁত বাঁকা হয়ে ওঠার মতো সমস্যা হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
দাঁতের যত্ন না নিলে কী হয়, আর ঘরোয়া উপায়ের সীমা
যত্ন না নিলে প্রথমে দাঁতে কালো দাগ ও গর্ত, ঠান্ডা-গরমে শিরশির, পরে তীব্র ব্যথা ও মাড়ি ফুলে পুঁজ জমতে পারে। মাড়ির রোগে ব্রাশের সময় রক্ত পড়া, মুখে দুর্গন্ধ, মাড়ি সরে যাওয়া আর শেষে দাঁত নড়ে পড়ে যাওয়া পর্যন্ত গড়ায়। গবেষণায় মাড়ির দীর্ঘস্থায়ী রোগের সঙ্গে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সমস্যা ও হৃদ্রোগের সম্পর্ক দেখা গেছে।
কিছু ঘরোয়া যত্ন সাময়িক আরাম দেয়। কুসুম গরম লবণ-পানিতে কুলি মাড়ির ফোলা ও ঘায়ে আরাম দেয়। দাঁতে ব্যথা হলে তুলায় সামান্য লবঙ্গের তেল লাগিয়ে ব্যথার জায়গায় অল্প সময় ধরে রাখলে সাময়িক উপশম হতে পারে, তবে বেশি দিলে মাড়ি পুড়ে যেতে পারে। গালের বাইরে ঠান্ডা সেঁকও ফোলা কমায়। মনে রাখবেন, এগুলো চিকিৎসা নয়; গর্ত হওয়া দাঁত ঘরোয়া উপায়ে ভরাট হয় না। কয়লা, ছাই, ইটের গুঁড়া বা মোটা দানার লবণ দিয়ে দাঁত মাজলে এনামেল ক্ষয় হয়, তাই এগুলো ব্যবহার করবেন না।
ছয় মাস থেকে এক বছর পরপর দন্ত চিকিৎসকের কাছে পরীক্ষা ও প্রয়োজনে স্কেলিং করান। দাঁতে ব্যথা, মাড়ি থেকে নিয়মিত রক্ত পড়া, মুখ বা গাল ফুলে যাওয়া, জ্বরের সঙ্গে দাঁতব্যথা, কিংবা নড়ে যাওয়া দাঁত থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান। মুখ বা গলা ফুলে শ্বাস নিতে বা গিলতে কষ্ট হলে জরুরি বিভাগে যেতে হবে।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
দাঁত সাদা করার টুথপেস্ট কি নিরাপদ?
এগুলো মূলত ওপরের দাগ তোলে, দাঁতের প্রাকৃতিক রং বদলায় না। কিছু পণ্যে ঘষা দেওয়ার উপাদান বেশি থাকে, নিয়মিত ব্যবহারে দাঁত শিরশির করতে পারে। দাঁত সাদা করতে চাইলে দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
স্কেলিং করলে কি দাঁত পাতলা বা ফাঁকা হয়ে যায়?
বিজ্ঞাপন
না। স্কেলিংয়ে দাঁতে জমে থাকা শক্ত পাথর তোলা হয়। পাথরের নিচে লুকিয়ে থাকা ফাঁক বা মাড়ি সরে যাওয়ার চিহ্ন পরে চোখে পড়ে, স্কেলিং তা তৈরি করে না।
ব্রাশ করার সময় মাড়ি থেকে রক্ত পড়লে কী করব?
এটি সাধারণত মাড়ির প্রদাহের লক্ষণ। ব্রাশ বন্ধ না করে নরম ব্রাশে আলতো করে নিয়মিত পরিষ্কার করুন এবং ফ্লস করুন। দুই সপ্তাহে না কমলে দন্ত চিকিৎসক দেখান।
দাঁত শিরশির করলে কী করব?
বিজ্ঞাপন
সংবেদনশীল দাঁতের জন্য তৈরি টুথপেস্ট ব্যবহার করুন, জোরে ব্রাশ বন্ধ করুন এবং খুব ঠান্ডা-গরম বা টক খাবার কমান। সমস্যা না কমলে দন্ত চিকিৎসক দেখান, কারণ ক্ষয় বা ফাটলও কারণ হতে পারে।