মোবাইলের চার্জ তাড়াতাড়ি শেষ হয় কেন: ব্যাটারি বাঁচানোর উপায়
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
সকালে একশো শতাংশ চার্জ দিয়ে বের হলেন, দুপুর গড়াতেই ফোন জানাচ্ছে মাত্র বিশ শতাংশ বাকি। পাওয়ার ব্যাংক সঙ্গে না থাকলে বিকেলের মধ্যেই ফোন বন্ধ। এই অভিজ্ঞতা কমবেশি সবার। মোবাইলের চার্জ তাড়াতাড়ি শেষ হয় কেন, প্রশ্নের উত্তর একটিমাত্র কারণে নয়। পর্দা, নেটওয়ার্ক, অ্যাপ, তাপমাত্রা আর ব্যাটারির বয়স, সব মিলেই চার্জ খরচের হিসাব।
বিজ্ঞাপন
সুখবর হলো, বেশির ভাগ কারণ আপনার নিয়ন্ত্রণে। পর্দার উজ্জ্বলতা কমানো, পেছনে চলা অ্যাপ সীমিত করা, প্রয়োজন না হলে লোকেশন ও ব্লুটুথ বন্ধ রাখা আর ব্যাটারি সেভার চালু করার মতো কয়েকটি অভ্যাসেই একই ফোনে কয়েক ঘণ্টা বেশি চার্জ পাওয়া যায়। তবে ব্যাটারি যদি পুরোনো হয়ে ফুলে যায় বা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, তখন সেটিংস নয়, ব্যাটারি বদলানোই সমাধান।
কোথায় চার্জ খরচ হচ্ছে, আগে দেখে নিন
অনুমানে না গিয়ে প্রথমে ফোনকেই জিজ্ঞেস করুন। অ্যান্ড্রয়েডে সেটিংসের ব্যাটারি অংশে, আইফোনে সেটিংসের ব্যাটারি অংশে গত কয়েক ঘণ্টা বা দিনে কোন অ্যাপ কত শতাংশ চার্জ খরচ করেছে, তার তালিকা থাকে।
তালিকায় যদি দেখেন এমন কোনো অ্যাপ অনেক চার্জ খরচ করছে যা আপনি প্রায় খোলেনই না, তাহলে বুঝবেন অ্যাপটি পেছনে চলছে। সেটির পেছনের কার্যক্রম সীমিত করুন বা আনইনস্টল করুন। আবার পর্দা বা স্ক্রিন সবচেয়ে ওপরে থাকলে বুঝবেন উজ্জ্বলতা আর পর্দা চালু থাকার সময়ই মূল খরচের জায়গা।
বিজ্ঞাপন
মোবাইলের চার্জ তাড়াতাড়ি শেষ হওয়ার প্রধান কারণ
উজ্জ্বল পর্দা: স্মার্টফোনের সবচেয়ে বেশি শক্তি খায় পর্দা। পুরো উজ্জ্বলতায় ভিডিও দেখলে চার্জ দ্রুত কমে।
দুর্বল নেটওয়ার্ক: যেখানে নেটওয়ার্কের দাগ কম, সেখানে ফোন সংযোগ ধরে রাখতে বেশি শক্তি দিয়ে সিগন্যাল খোঁজে। গ্রামে বা ভবনের ভেতরের ঘরে চার্জ দ্রুত ফুরানোর বড় কারণ এটি।
পেছনে চলা অ্যাপ: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-কমার্স ও কিছু গেম অ্যাপ বন্ধ থাকা অবস্থাতেও তথ্য হালনাগাদ করে, লোকেশন নেয়, নোটিফিকেশন পাঠায়।
বিজ্ঞাপন
লোকেশন, ব্লুটুথ ও হটস্পট: জিপিএস সারাক্ষণ চালু থাকলে, ব্যবহার ছাড়াই ব্লুটুথ খোলা থাকলে কিংবা হটস্পট চালু রেখে ভুলে গেলে চার্জ নীরবে খরচ হয়।
ভিডিও কল ও গেম: একটানা ভিডিও কল বা ভারী গেমে প্রসেসর, পর্দা আর নেটওয়ার্ক একসঙ্গে পূর্ণ শক্তিতে চলে।
গরম আবহাওয়া ও অতিরিক্ত তাপ: তাপ লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির শত্রু। গরমে ব্যাটারি দ্রুত খালি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতাও হারায়।
ব্যাটারির বয়স: প্রতিটি ব্যাটারির নির্দিষ্টসংখ্যক চার্জ চক্রের পর ধারণক্ষমতা কমতে থাকে। দুই-তিন বছরের পুরোনো ফোনে নতুনের মতো চার্জ না থাকা স্বাভাবিক।
বিজ্ঞাপন
চার্জ সেভ করার উপায়: সেটিংসে ছোট পরিবর্তন
১. উজ্জ্বলতা স্বয়ংক্রিয় রাখুন: অ্যাডাপটিভ বা অটো ব্রাইটনেস চালু করলে আলো অনুযায়ী পর্দা নিজে মানিয়ে নেয়। ঘরের ভেতরে উজ্জ্বলতা অর্ধেকের নিচে রাখলেই যথেষ্ট।
২. স্ক্রিন টাইমআউট কমান: ফোন হাত থেকে নামানোর পর পর্দা ৩০ সেকেন্ড বা ১ মিনিটে বন্ধ হওয়ার ব্যবস্থা করুন।
৩. ডার্ক মোড ব্যবহার করুন: অ্যামোলেড বা ওলেড পর্দার ফোনে কালো রঙের পিক্সেল প্রায় শক্তি খরচ করে না। তাই ডার্ক মোডে এসব ফোনে চার্জ সাশ্রয় হয়।
বিজ্ঞাপন
৪. ব্যাটারি সেভার চালু রাখুন: চার্জ ৩০ শতাংশের নিচে নামলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেভার চালু হওয়ার ব্যবস্থা করুন। এতে পেছনের কাজ ও কিছু দৃশ্যমান প্রভাব সীমিত হয়।
৫. অপ্রয়োজনীয় সংযোগ বন্ধ: লোকেশন, ব্লুটুথ, এনএফসি আর হটস্পট দরকার না হলে বন্ধ রাখুন। যেসব অ্যাপের লোকেশন দরকার নেই, যেমন টর্চলাইট বা ক্যালকুলেটর, সেগুলোর লোকেশন অনুমতি তুলে নিন।
৬. নোটিফিকেশন কমান: প্রতিটি নোটিফিকেশন পর্দা জ্বালায় ও ফোন জাগায়। দরকারি ছাড়া অন্য অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ করুন।
৭. ওয়াইফাই থাকলে ওয়াইফাই: বাড়িতে বা অফিসে ওয়াইফাই থাকলে মোবাইল ডেটার বদলে সেটি ব্যবহার করুন। সাধারণত ওয়াইফাই মোবাইল নেটওয়ার্কের চেয়ে কম শক্তি নেয়।
বিজ্ঞাপন
চার্জ বেশি থাকার উপায়: অভ্যাসে পরিবর্তন
সেটিংসের পাশাপাশি দৈনন্দিন কয়েকটি অভ্যাসও বড় পার্থক্য তৈরি করে। নেটওয়ার্ক একেবারে না থাকা জায়গায়, যেমন লম্বা ভ্রমণে নদীপথে বা পাহাড়ে, কিছুক্ষণের জন্য এয়ারপ্লেন মোড চালু রাখলে ফোন অযথা সিগন্যাল খুঁজে চার্জ নষ্ট করে না। ভিডিও দেখার সময় রেজোলিউশন কমিয়ে দিলে চার্জ ও ডেটা দুটোই বাঁচে।
লাইভ ওয়ালপেপার, চলমান উইজেট আর সবসময় চালু থাকা পর্দা বা অলওয়েজ অন ডিসপ্লে বন্ধ রাখুন। একসঙ্গে অনেক মেসেজিং অ্যাপ রাখলে প্রতিটিই পেছনে সংযোগ ধরে রাখে, তাই যে অ্যাপ ব্যবহার করেন না সেটি মুছে দিন। সফটওয়্যার হালনাগাদ রাখুন, কারণ অনেক হালনাগাদে ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার উন্নতি থাকে।
চার্জ দেওয়ার সঠিক অভ্যাস
বিজ্ঞাপন
ব্যাটারির দীর্ঘ আয়ুর জন্য চার্জ দেওয়ার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি পুরোপুরি খালি করে তারপর চার্জ দেওয়ার দরকার নেই, বরং বারবার শূন্যে নামানো ক্ষতিকর। সাধারণ পরামর্শ হলো চার্জ মোটামুটি ২০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে রাখা। অনেক ফোনে সারা রাত চার্জে রাখলে ব্যাটারি রক্ষার জন্য অপ্টিমাইজড বা অ্যাডাপটিভ চার্জিংয়ের ব্যবস্থা থাকে, সেটি চালু রাখুন।
ফোনের সঙ্গে দেওয়া বা মানসম্মত চার্জার ও কেব্ল ব্যবহার করুন। নিম্নমানের চার্জার ব্যাটারি গরম করে এবং আগুনের ঝুঁকিও তৈরি করে। চার্জে থাকা অবস্থায় ভারী গেম খেলা বা বালিশের নিচে ফোন রেখে চার্জ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। চার্জের সময় ফোন বেশি গরম হলে মোটা কভার খুলে দিন।
কখন বুঝবেন ব্যাটারি বদলানোর সময় হয়েছে
সব চেষ্টার পরও যদি চার্জ কয়েক ঘণ্টাও না টেকে, তাহলে ব্যাটারির স্বাস্থ্য দেখুন। আইফোনে ব্যাটারির স্বাস্থ্য অংশে সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা শতাংশে দেখায়। অনেক অ্যান্ড্রয়েড ফোনেও সেটিংস বা ডিভাইস কেয়ার অংশে ব্যাটারির অবস্থা জানা যায়।
বিজ্ঞাপন
কয়েকটি লক্ষণ দেখলে দেরি করবেন না: ব্যাটারি ফুলে পেছনের ঢাকনা বা পর্দা উঁচু হয়ে যাওয়া, ৩০ বা ৪০ শতাংশ দেখানো অবস্থায় হঠাৎ ফোন বন্ধ হওয়া, স্বাভাবিক ব্যবহারেও অস্বাভাবিক গরম হওয়া। ফোলা ব্যাটারি বিপজ্জনক, এমন ফোন চার্জে দেবেন না এবং দ্রুত অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে নিয়ে যান। বাজারের নকল ব্যাটারির বদলে আসল বা মানসম্মত ব্যাটারি লাগান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
চার্জ কম খাওয়ার উপায় হিসেবে কি ব্যাটারি সেভার অ্যাপ নামানো উচিত?
না। ফোনের নিজস্ব ব্যাটারি সেভারই যথেষ্ট। বাইরের অনেক সেভার অ্যাপ নিজেই পেছনে চলে, বিজ্ঞাপন দেখায় এবং উল্টো চার্জ খরচ বাড়ায়।
বিজ্ঞাপন
সারা রাত চার্জে রাখলে কি ব্যাটারি নষ্ট হয়?
আধুনিক ফোন পূর্ণ চার্জ হলে নিজে থেকেই চার্জ নেওয়া নিয়ন্ত্রণ করে। তবে নিয়মিত সারা রাত চার্জে রাখলে তাপের কারণে দীর্ঘমেয়াদে সামান্য প্রভাব পড়তে পারে। অপ্টিমাইজড চার্জিং চালু রাখুন।
নতুন ফোনেও কেন চার্জ দ্রুত শেষ হচ্ছে?
প্রথম কয়েক দিন পুরোনো তথ্য স্থানান্তর, অ্যাপ হালনাগাদ ও ছবি ব্যাকআপের কাজ পেছনে চলে। এক সপ্তাহ পরও একই অবস্থা থাকলে বিক্রেতা বা সার্ভিস সেন্টারে দেখান।
বিজ্ঞাপন
মোবাইল ডেটা চালু রাখলে কি অনেক চার্জ যায়?
দুর্বল নেটওয়ার্কে মোবাইল ডেটা বেশি চার্জ খায়। প্রয়োজন না থাকলে বন্ধ রাখুন, আর ওয়াইফাই পেলে সেটি ব্যবহার করুন।