অনিয়মিত মাসিক নিয়মিত করার উপায়: কারণ, খাবার ও জীবনযাপন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
প্রতি মাসে একই তারিখে মাসিক হবে, এমন নিয়ম শরীর মানে না। দুই চক্রের মধ্যে কয়েক দিনের হেরফের স্বাভাবিক। কিন্তু কখনো দেড় মাস, কখনো তিন মাস পর মাসিক হলে, কিংবা মাসে দুবার হলে সেটাকে অনিয়মিত মাসিক বলা হয়, আর এর পেছনে সাধারণত কোনো না কোনো কারণ থাকে।
বিজ্ঞাপন
অনিয়মিত মাসিক নিয়মিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সেই কারণটা ধরা। ওজন বেড়ে যাওয়া, হঠাৎ অনেক কমে যাওয়া, দীর্ঘ মানসিক চাপ, অনিয়মিত ঘুম, থাইরয়েডের সমস্যা বা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম, এগুলোই সবচেয়ে সাধারণ কারণ। জীবনযাপনের কারণে সমস্যা হলে খাবার, ঘুম আর ব্যায়ামে পরিবর্তন এনে কয়েক মাসের মধ্যে উন্নতি দেখা যায়। হরমোনজনিত সমস্যায় চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিতে হয়।
এখানে সহজ ভাষায় জানানো হলো কখন মাসিককে অনিয়মিত ধরবেন, কেন এমন হয়, কী খাবেন এবং কোন লক্ষণে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাবেন।
কোন অবস্থাকে অনিয়মিত মাসিক বলা হয়
প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ক্ষেত্রে এক মাসিক শুরুর দিন থেকে পরের মাসিক শুরুর দিন পর্যন্ত সাধারণত ২১ থেকে ৩৫ দিন সময় লাগে। রক্তপাত চলে মোটামুটি দুই থেকে সাত দিন। এই সীমার মধ্যে থাকলে এবং প্রতি মাসে চক্রের দৈর্ঘ্য খুব বেশি না বদলালে মাসিককে নিয়মিত ধরা হয়।
বিজ্ঞাপন
চক্র বারবার ২১ দিনের কম বা ৩৫ দিনের বেশি হলে, এক মাসের সঙ্গে আরেক মাসের ব্যবধান অনেক বেশি হলে, টানা তিন মাস বা তার বেশি মাসিক না হলে কিংবা দুই মাসিকের মাঝে রক্তপাত হলে সেটি অনিয়মিত।
মনে রাখবেন, প্রথম মাসিক শুরুর পর প্রথম দুই-এক বছর এবং মেনোপজের আগের কয়েক বছর চক্র এলোমেলো হওয়া অনেকটাই স্বাভাবিক। সন্তান জন্মের পর বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়ও মাসিক দেরিতে ফিরে আসে।
মাসিক দেরিতে হওয়ার কারণ
১. গর্ভধারণ: বিবাহিত নারীর মাসিক দেরি হলে প্রথমেই প্রেগন্যান্সি টেস্ট করে নিশ্চিত হয়ে নিন।
বিজ্ঞাপন
২. মানসিক চাপ: পরীক্ষা, চাকরি, পারিবারিক দুশ্চিন্তা বা শোকের মতো দীর্ঘ চাপ মস্তিষ্কের যে অংশ হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে, তার কাজে প্রভাব ফেলে। ফলে ডিম্বস্ফোটন পিছিয়ে যায়।
৩. ওজনের বড় পরিবর্তন: অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। আবার খুব কম খেয়ে দ্রুত ওজন কমালে বা শরীর খুব রোগা হলেও মাসিক বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
৪. পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস): এ দেশের তরুণীদের মধ্যে অনিয়মিত মাসিকের একটি পরিচিত কারণ। সঙ্গে মুখে বা শরীরে অতিরিক্ত লোম, ব্রণ, ওজন বাড়া ও ঘাড়ে কালচে দাগ দেখা দিতে পারে।
৫. থাইরয়েডের সমস্যা: থাইরয়েড হরমোন বেশি বা কম, দুই অবস্থাতেই মাসিকের ধরন বদলে যায়।
বিজ্ঞাপন
৬. অতিরিক্ত ব্যায়াম: খেলোয়াড় বা যাঁরা কম খেয়ে খুব বেশি ব্যায়াম করেন, তাঁদের মাসিক অনিয়মিত হতে পারে।
৭. কিছু ওষুধ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি: জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি হঠাৎ বন্ধ করলে, ইনজেকশন বা ইমপ্ল্যান্ট নিলে কিংবা কিছু মানসিক রোগের ওষুধ খেলে চক্র বদলাতে পারে।
কী খেলে মাসিক নিয়মিত হয়
কোনো একটি খাবার খেলেই মাসিক নিয়মিত হয়ে যাবে, এমন নয়। তবে সুষম খাবার ওজন ঠিক রাখে, রক্তে শর্করার ওঠানামা কমায় এবং হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে।
বিজ্ঞাপন
প্রতিদিনের থালায় লাল চালের ভাত বা আটার রুটি, ডাল, প্রচুর শাকসবজি, মৌসুমি ফল, ডিম, মাছ ও অল্প পরিমাণ বাদাম রাখুন। পিসিওএস থাকলে সাদা চিনি, মিষ্টি, কোমল পানীয়, বেকারির খাবার ও ভাজাপোড়া কমানো বিশেষভাবে দরকার, কারণ এ সমস্যায় শরীরে ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করে না।
রক্তপাত বেশি হলে শরীরে আয়রন কমে যায়। কচুশাক, পালংশাক, লালশাক, কলিজা, ডিম ও ডাল আয়রনের ভালো উৎস। এসবের সঙ্গে লেবু, আমলকী বা পেয়ারার মতো ভিটামিন সি-যুক্ত খাবার খেলে আয়রন ভালো শোষিত হয়।
খুব কম খাওয়া, দিনের পর দিন না খেয়ে থাকা বা ভাত পুরোপুরি বাদ দিয়ে কঠোর ডায়েট মাসিককে আরও এলোমেলো করতে পারে।
জীবনযাপনে যে পরিবর্তন কাজে দেয়
বিজ্ঞাপন
ওজন স্বাভাবিক সীমায় আনুন: যাঁদের ওজন বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে শরীরের মোট ওজনের সামান্য অংশ কমালেও অনেক সময় চক্র নিয়মিত হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে কমান, মাসে দুই থেকে চার কেজির বেশি নয়।
নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম: সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা হালকা ব্যায়াম ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায় ও মন ভালো রাখে।
ঘুমের রুটিন ঠিক করুন: প্রতি রাতে সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমান, প্রতিদিন মোটামুটি একই সময়ে শুতে যান। গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইল দেখার অভ্যাস কমান।
চাপ সামলানোর উপায় খুঁজুন: নামাজ, ধ্যান, শ্বাসের ব্যায়াম, প্রিয় কারও সঙ্গে কথা বলা বা খোলা জায়গায় হাঁটা দুশ্চিন্তা কমায়।
বিজ্ঞাপন
তারিখ লিখে রাখুন: ক্যালেন্ডারে বা মোবাইলের অ্যাপে প্রতি মাসের মাসিক শুরু ও শেষের তারিখ, রক্তপাতের পরিমাণ ও ব্যথা লিখে রাখুন। চিকিৎসকের কাছে গেলে এই তথ্য খুব কাজে লাগে।
ঘরোয়া উপায়ে মাসিক নিয়মিত করা: কী আশা করবেন
আদা চা, দারুচিনি, কাঁচা পেঁপে বা মেথি খেলে মাসিক নিয়মিত হয়, এমন কথা প্রচলিত আছে। এগুলো পরিমিত খাওয়ায় সাধারণত ক্ষতি নেই, আদা অনেকের মাসিকের ব্যথায় কিছুটা আরামও দেয়। কিন্তু এসব দিয়ে হরমোনের সমস্যা সারে না। গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকলে মাসিক 'নামানোর' উদ্দেশ্যে কোনো ভেষজ বা ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক।
অনেকে পরিচিত কারও পরামর্শে বা ফার্মেসি থেকে নিজে হরমোনের বড়ি কিনে খান। এতে সাময়িক রক্তপাত হলেও আসল কারণ চাপা পড়ে যায়, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও থাকে। হরমোনের ওষুধ শুধু চিকিৎসকের পরামর্শে খাওয়া উচিত।
বিজ্ঞাপন
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
টানা তিন মাস মাসিক না হলে এবং প্রেগন্যান্সি টেস্ট নেগেটিভ এলে, ১৫ বছর বয়সেও প্রথম মাসিক না হলে, এক সপ্তাহের বেশি রক্তপাত চললে, ঘণ্টায় ঘণ্টায় প্যাড বদলাতে হলে, দুই মাসিকের মাঝে বা শারীরিক সম্পর্কের পর রক্তপাত হলে এবং মেনোপজের পর আবার রক্তপাত হলে অবশ্যই গাইনি বিশেষজ্ঞ দেখান।
চিকিৎসক সাধারণত রক্তে হরমোন ও থাইরয়েড পরীক্ষা এবং তলপেটের আলট্রাসনোগ্রাম করিয়ে কারণ নির্ণয় করেন। পিসিওএস বা থাইরয়েডের মতো সমস্যা ধরা পড়লে নিয়মিত চিকিৎসায় তা ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, আর এতে ভবিষ্যতে গর্ভধারণের সম্ভাবনাও বাড়ে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
মাসিক কত দিন দেরি হলে চিন্তার বিষয়?
এক-দুই সপ্তাহ দেরি মাঝেমধ্যে হতেই পারে। কিন্তু বারবার এমন হলে বা টানা তিন মাস মাসিক না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
বিয়ের পর কি অনিয়মিত মাসিক এমনিতেই ঠিক হয়ে যায়?
এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। বিয়ের সঙ্গে মাসিক নিয়মিত হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ থাকলে তার চিকিৎসা করাতে হয়।
বিজ্ঞাপন
অনিয়মিত মাসিক থাকলে কি সন্তান হয় না?
অনেকেরই হয়। তবে অনিয়মিত চক্রে ডিম্বস্ফোটন অনিশ্চিত থাকায় গর্ভধারণে দেরি হতে পারে। সন্তান নিতে চাইলে আগে থেকেই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
ওজন কমালে কি পিসিওএসে মাসিক নিয়মিত হয়?
অনেক ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়। অতিরিক্ত ওজনের সামান্য অংশ কমালেও চক্র নিয়মিত হতে দেখা যায়, তবে প্রয়োজনে চিকিৎসাও চালিয়ে যেতে হয়।
বিজ্ঞাপন
মাসিক নিয়মিত হতে কত সময় লাগে?
জীবনযাপনের পরিবর্তনে ফল পেতে সাধারণত তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগে, কারণ শরীরের হরমোন ধীরে ধীরে মানিয়ে নেয়। এই সময়ে ধৈর্য ধরে রুটিন চালিয়ে যান এবং তারিখগুলো লিখে রাখুন, তাহলে উন্নতি হচ্ছে কি না নিজেই বুঝতে পারবেন।