ঘরে প্রেগন্যান্সি টেস্ট করার নিয়ম: কখন করবেন, ফল কীভাবে বুঝবেন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
মাসিকের তারিখ পেরিয়ে গেলে অনেকের মনেই প্রথম প্রশ্ন জাগে, এখনই কি টেস্ট করব? উত্তর হলো, মাসিক যেদিন হওয়ার কথা ছিল, তার অন্তত এক দিন পর থেকে ঘরে কিট দিয়ে টেস্ট করা যায়। তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফল পেতে মাসিক বন্ধ হওয়ার এক সপ্তাহ পর টেস্ট করাই ভালো।
বিজ্ঞাপন
বাজারে যে প্রেগন্যান্সি কিট পাওয়া যায়, সেগুলো প্রস্রাবে এইচসিজি নামের একটি হরমোন আছে কি না তা ধরে। গর্ভধারণ হলে শরীর এই হরমোন তৈরি করতে শুরু করে, আর দিন যত যায় এর পরিমাণ তত বাড়ে। তাই খুব আগে টেস্ট করলে হরমোন কম থাকায় ফল নেগেটিভ আসতে পারে, যদিও আসলে গর্ভধারণ হয়ে গেছে।
ঘরে টেস্ট করা সহজ, খরচও কম। তবে কয়েকটি ছোট ভুলের কারণে ফল ভুল আসে। কখন, কীভাবে টেস্ট করবেন আর ফল কীভাবে পড়বেন, নিচে ধাপে ধাপে দেওয়া হলো।
প্রেগন্যান্সি টেস্ট কখন করতে হয়
যাঁদের মাসিক নিয়মিত, তাঁদের জন্য হিসাব সহজ। শেষ মাসিক শুরুর দিন থেকে চক্রের দৈর্ঘ্য গুনে যেদিন পরের মাসিক হওয়ার কথা, সেদিন পেরোলেই টেস্ট করা যায়। কিছু কিট আরও আগে ফল দেখানোর দাবি করে, কিন্তু আগে টেস্ট করলে ভুল নেগেটিভ আসার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
বিজ্ঞাপন
যাঁদের মাসিক অনিয়মিত, তাঁরা শেষ শারীরিক সম্পর্কের অন্তত তিন সপ্তাহ পর টেস্ট করলে মোটামুটি নির্ভরযোগ্য ফল পাবেন। কারণ গর্ভধারণের পর প্রস্রাবে হরমোন ধরা পড়ার মতো মাত্রায় পৌঁছাতে কিছুদিন সময় লাগে।
দিনের কোন সময়ে টেস্ট করবেন, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। সকালের প্রথম প্রস্রাব সবচেয়ে ঘন থাকে, তাই এতে হরমোন ধরা পড়ে সহজে। বিশেষ করে শুরুর দিকে টেস্ট করলে সকালের প্রস্রাব ব্যবহার করুন।
প্রেগন্যান্সি কিট ব্যবহারের নিয়ম
ফার্মেসিতে সাধারণত দুই ধরনের কিট পাওয়া যায়। একটি ছোট প্লাস্টিকের কার্ড, যার সঙ্গে একটি ড্রপার থাকে। অন্যটি কলমের মতো মিডস্ট্রিম কিট, যা সরাসরি প্রস্রাবের ধারায় ধরতে হয়। দুটোর কাজের ধরন এক, শুধু ব্যবহারের পদ্ধতি আলাদা। কার্ড কিটের ক্ষেত্রে নিচের ধাপগুলো মেনে চলুন।
বিজ্ঞাপন
১. মেয়াদ দেখুন: প্যাকেটের গায়ে মেয়াদ লেখা থাকে। মেয়াদোত্তীর্ণ বা ছেঁড়া প্যাকেটের কিট ব্যবহার করবেন না।
২. পরিষ্কার পাত্রে প্রস্রাব নিন: শুকনো, পরিষ্কার একটি ছোট পাত্রে সকালের প্রথম প্রস্রাব সংগ্রহ করুন। পাত্রে সাবান বা ডিটারজেন্টের অবশিষ্ট যেন না থাকে।
৩. কিট সমতলে রাখুন: প্যাকেট খুলে কিটটি টেবিল বা মেঝের মতো সমতল জায়গায় রাখুন। খোলার পর দেরি না করে ব্যবহার করুন।
৪. নির্দিষ্ট ফোঁটা দিন: ড্রপার দিয়ে কিটের গোল গর্তে সাধারণত তিন থেকে চার ফোঁটা প্রস্রাব দিন। প্যাকেটে যত ফোঁটার কথা বলা আছে, তার বেশি দেবেন না।
বিজ্ঞাপন
৫. অপেক্ষা করুন: পাঁচ মিনিটের মতো অপেক্ষা করুন। কিটের নির্দেশনায় যে সময় লেখা থাকে, সেটিই মানুন। দশ মিনিট পেরোনোর পর যে দাগ ওঠে, তার ওপর ভরসা করবেন না।
মিডস্ট্রিম কিট ব্যবহার করলে এর শোষক মাথাটি প্রস্রাবের ধারায় কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখতে হয়, তারপর ঢাকনা লাগিয়ে সমতলে রেখে অপেক্ষা করতে হয়।
কিট কেনার পর রান্নাঘরের চুলার পাশে বা রোদে রাখবেন না, ঠান্ডা ও শুকনো জায়গায় রাখুন। আর্দ্রতায় প্যাকেট নষ্ট হলে কিট ঠিকমতো কাজ করে না। টেস্টের আগে প্রতিটি কোম্পানির নির্দেশিকা একবার পড়ে নিন, কারণ কোনোটিতে অপেক্ষার সময় তিন মিনিট, কোনোটিতে পাঁচ মিনিট লেখা থাকে। হাতে ঘড়ি বা মোবাইলের টাইমার রাখলে সময়ের ভুল হয় না।
ফল কীভাবে বুঝবেন
বিজ্ঞাপন
কিটে সাধারণত দুটি জায়গা থাকে, একটির পাশে লেখা থাকে C, অন্যটির পাশে T। C মানে কন্ট্রোল লাইন, যা প্রমাণ করে কিটটি ঠিকমতো কাজ করছে। T মানে টেস্ট লাইন।
শুধু C-তে একটি দাগ: ফল নেগেটিভ। অর্থাৎ এই মুহূর্তে প্রস্রাবে হরমোন ধরা পড়েনি।
C ও T দুটিতেই দাগ: ফল পজিটিভ। T-এর দাগ হালকা হলেও সেটি পজিটিভ ধরা হয়। শুরুর দিকে হরমোন কম থাকায় দাগ হালকা হতে পারে।
C-তে কোনো দাগ নেই: কিটটি নষ্ট বা ব্যবহারে ভুল হয়েছে। T-তে দাগ থাকুক বা না থাকুক, এই ফল বাতিল। নতুন কিট দিয়ে আবার টেস্ট করুন।
বিজ্ঞাপন
খুব হালকা দাগ দেখে দ্বিধায় পড়লে দুই-তিন দিন পর আবার সকালের প্রস্রাবে টেস্ট করুন। গর্ভধারণ হয়ে থাকলে তত দিনে দাগ সাধারণত স্পষ্ট হয়।
ফল ভুল আসে কেন
ভুল নেগেটিভ আসার প্রধান কারণ খুব আগে টেস্ট করা। এ ছাড়া রাতে বা দুপুরে প্রচুর পানি খাওয়ার পর পাতলা প্রস্রাবে টেস্ট করলে, নির্ধারিত সময়ের আগেই ফল দেখে ফেললে কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ কিট ব্যবহার করলেও ফল নেগেটিভ আসতে পারে।
ভুল পজিটিভ তুলনামূলক কম ঘটে। দশ মিনিটের অনেক পরে কিট দেখলে প্রস্রাব শুকিয়ে একটি অস্পষ্ট রেখা দেখা দিতে পারে, যাকে অনেকে পজিটিভ ভেবে ভুল করেন। খুব শুরুর দিকে গর্ভপাত হলে, সম্প্রতি সন্তান প্রসব বা গর্ভপাত হয়ে থাকলে, বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় হরমোন ইনজেকশন নিলে এবং কিছু বিরল শারীরিক সমস্যায়ও পজিটিভ ফল আসতে পারে।
বিজ্ঞাপন
ঘরোয়া উপায়ে প্রেগন্যান্সি টেস্ট কি নির্ভরযোগ্য
চিনি, লবণ, টুথপেস্ট, ভিনেগার বা সাবানের সঙ্গে প্রস্রাব মিশিয়ে গর্ভধারণ বোঝার নানা পদ্ধতি লোকমুখে প্রচলিত। এসব পদ্ধতির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ফেনা ওঠা, দানা জমা বা রং বদলানো প্রস্রাবের সাধারণ রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই হয়, গর্ভধারণের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই।
তাই ঘরে টেস্ট করতে চাইলে ফার্মেসির কিটই একমাত্র ভরসাযোগ্য উপায়। দামও বেশি নয়, প্রায় সব ফার্মেসিতেই পাওয়া যায়।
ফল পাওয়ার পর করণীয়
বিজ্ঞাপন
কিটে পজিটিভ এলে যত দ্রুত সম্ভব একজন গাইনি চিকিৎসক বা নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যান। চিকিৎসক প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা ও আলট্রাসনোগ্রাম করিয়ে গর্ভধারণ নিশ্চিত করবেন, গর্ভের বয়স হিসাব করবেন এবং গর্ভাবস্থার যত্ন শুরু করবেন। প্রথম তিন মাসে ফলিক অ্যাসিড শুরু করা, নিয়মিত চেকআপ ও সঠিক খাবার মা ও শিশুর জন্য জরুরি।
পজিটিভ ফলের পর নিজে থেকে কোনো ওষুধ খাওয়া বন্ধ বা শুরু করবেন না। আগে থেকে কোনো ওষুধ চললে চিকিৎসককে জানান। ধূমপানের ধোঁয়া এড়িয়ে চলুন, পর্যাপ্ত পানি পান করুন এবং ভারী কাজ কমিয়ে দিন।
টেস্ট পজিটিভ হোক বা নেগেটিভ, কিছু লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা করা উচিত নয়। তলপেটের এক পাশে তীব্র ব্যথা, প্রচুর রক্তপাত, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি, কাঁধে ব্যথা ইত্যাদি জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণের লক্ষণ হতে পারে। এটি জরুরি অবস্থা, দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুবার টেস্ট নেগেটিভ এসেছে, অথচ মাসিক হচ্ছে না, এমন অবস্থাতেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মানসিক চাপ, ওজনের বড় পরিবর্তন, থাইরয়েড বা পলিসিস্টিক ওভারির মতো কারণে মাসিক পিছিয়ে যেতে পারে।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
রাতের প্রস্রাবে কি প্রেগন্যান্সি টেস্ট করা যায়?
করা যায়, তবে প্রস্রাব পাতলা থাকলে শুরুর দিকে ভুল নেগেটিভ আসতে পারে। মাসিক অনেক দিন পিছিয়ে গেলে দিনের যেকোনো সময় ফল ঠিক আসে, কিন্তু শুরুর দিকে সকালের প্রথম প্রস্রাবই ভালো।
শারীরিক সম্পর্কের কত দিন পর টেস্ট করলে ফল বোঝা যায়?
বিজ্ঞাপন
সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর কিটে নির্ভরযোগ্য ফল আসে। এর আগে টেস্ট করলে নেগেটিভ এলেও নিশ্চিত হওয়া যায় না।
খুব হালকা দ্বিতীয় দাগ মানে কি পজিটিভ?
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হালকা দাগ উঠলে সেটি সাধারণত পজিটিভ। নিশ্চিত হতে দুই-তিন দিন পর আবার টেস্ট করুন অথবা চিকিৎসকের কাছে রক্ত পরীক্ষা করান।
একই কিট কি দুবার ব্যবহার করা যায়?
বিজ্ঞাপন
না। প্রতিটি কিট একবারই ব্যবহারযোগ্য। আবার টেস্ট করতে নতুন কিট লাগবে।
কিটে নেগেটিভ, কিন্তু বমিভাব ও স্তনে ব্যথা আছে, কী করব?
খুব আগে টেস্ট করলে এমন হতে পারে। তিন-চার দিন পর সকালের প্রস্রাবে আবার টেস্ট করুন। তখনো নেগেটিভ এলে এবং উপসর্গ চলতে থাকলে চিকিৎসকের কাছে রক্তে এইচসিজি পরীক্ষা করান।