কৃমি দূর করার ঘরোয়া উপায়: লক্ষণ, প্রতিরোধ ও শিশুর যত্ন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
শিশুর পেট ফোলা, খেতে চায় না, রাতে ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় বা পায়ুপথে চুলকানি, এমন কিছু দেখলেই অনেক মা-বাবা ভাবেন কৃমি হয়েছে। আমাদের মতো গরম ও আর্দ্র দেশে, যেখানে অনেক জায়গায় এখনো নিরাপদ পানি আর স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের অভাব, কৃমির সংক্রমণ শিশুদের মধ্যে বেশ প্রচলিত। বড়দেরও হয়, তবে শিশুরা মাটিতে খেলে, হাত মুখে দেয়, তাই তাদের ঝুঁকি বেশি।
বিজ্ঞাপন
একটা বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার থাকা দরকার: পেটে বাসা বাঁধা কৃমি মারতে নির্দিষ্ট কৃমিনাশক ওষুধই সবচেয়ে কার্যকর, সস্তা ও নিরাপদ উপায়। কৃমি দূর করার ঘরোয়া উপায় বলতে মূলত বোঝায় পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস, যা সংক্রমণ ঠেকায় এবং চিকিৎসার পর আবার কৃমি হওয়া রোধ করে। কিছু প্রচলিত খাবারের কথা শোনা যায়, তবে সেগুলো ওষুধের বিকল্প নয়।
কৃমি কীভাবে শরীরে ঢোকে
১. গোল কৃমি বা কেঁচো কৃমি: কৃমির ডিম মিশে থাকা মাটি, না ধোয়া ফল-সবজি বা দূষিত পানি থেকে মুখ দিয়ে ঢোকে। অন্ত্রে বড় হয়ে কয়েক ইঞ্চি লম্বা হতে পারে।
২. বক্র কৃমি বা হুকওয়ার্ম: খালি পায়ে দূষিত মাটিতে হাঁটলে লার্ভা পায়ের চামড়া ভেদ করে ঢোকে। অন্ত্রের দেয়ালে আটকে রক্ত খায়, ফলে রক্তস্বল্পতা হয়।
বিজ্ঞাপন
৩. সুতা কৃমি বা পিনওয়ার্ম: ছোট সাদা সুতার মতো কৃমি। রাতে পায়ুপথের চারপাশে ডিম পাড়ে, তাই তীব্র চুলকানি হয়। চুলকানোর সময় নখের নিচে ডিম লেগে আবার মুখে যায়, পরিবারের অন্যদের মধ্যেও সহজে ছড়ায়।
৪. ফিতা কৃমি: কম সেদ্ধ গরু বা শূকরের মাংস এবং দূষিত খাবার থেকে আসতে পারে।
কৃমির লক্ষণ
হালকা সংক্রমণে অনেক সময় কোনো লক্ষণই থাকে না। বেশি সংক্রমণ হলে দেখা দিতে পারে:
বিজ্ঞাপন
১. পেটব্যথা, বিশেষ করে নাভির চারপাশে, পেট ফাঁপা, বমিভাব।
২. ক্ষুধামন্দা, অথবা খাওয়ার পরও ওজন না বাড়া।
৩. শিশুর বৃদ্ধি ধীর হওয়া, দুর্বলতা, পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া।
৪. রক্তস্বল্পতা: ফ্যাকাশে চেহারা, অল্পতেই হাঁপিয়ে যাওয়া। হুকওয়ার্মে এটি বেশি হয়।
বিজ্ঞাপন
৫. রাতে পায়ুপথে চুলকানি, ঘুম ভেঙে যাওয়া, খিটখিটে মেজাজ; মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে যোনিপথের চারপাশেও চুলকানি হতে পারে।
৬. পায়খানায় বা বমিতে কৃমি দেখা যাওয়া।
৭. পাতলা পায়খানা বা কখনো কোষ্ঠকাঠিন্য।
ঘুমের মধ্যে দাঁত কিড়মিড় করা বা মুখে লালা পড়া মানেই কৃমি, এই ধারণার পক্ষে জোরালো প্রমাণ নেই। এগুলো অন্য কারণেও হয়।
বিজ্ঞাপন
চিকিৎসা: ওষুধই আসল সমাধান
কৃমির ওষুধ বহু বছর ধরে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সঠিক মাত্রায় খুবই নিরাপদ। বাংলাদেশে সরকারি উদ্যোগে নির্দিষ্ট সময়ে কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় স্কুলগামী শিশু-কিশোরদের বিনা মূল্যে কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানো হয়। এসব কর্মসূচিতে শিশুকে অংশ নিতে দিন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কৃমিপ্রবণ এলাকায় এক বছরের বেশি বয়সী শিশুদের নির্দিষ্ট বিরতিতে কৃমিনাশক ওষুধ দেওয়ার পরামর্শ দেয়। কোন বয়সে কোন ওষুধ, কতটা আর কত দিন পরপর, তা চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে জেনে নিন। সুতা কৃমির ক্ষেত্রে সাধারণত পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে চিকিৎসা দেওয়ার এবং নির্দিষ্ট দিন পর আরেকবার ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এক বছরের কম বয়সী শিশু ও গর্ভবতী নারীকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কৃমির ওষুধ দেবেন না।
কৃমি দূর করার ঘরোয়া উপায় ও প্রতিরোধে করণীয়
বিজ্ঞাপন
ওষুধ খেলে অন্ত্রের কৃমি মরে, কিন্তু অভ্যাস না বদলালে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আবার সংক্রমণ হতে পারে। তাই ঘরোয়া যত্নের আসল কাজ এখানেই।
১. সাবান দিয়ে হাত ধোয়া: খাওয়ার আগে, খাবার তৈরি ও পরিবেশনের আগে, শিশুকে খাওয়ানোর আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পর অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। শিশুকে খেলার পর হাত ধোয়া শেখান।
২. নখ ছোট ও পরিষ্কার রাখুন: নখের নিচে কৃমির ডিম জমে থাকে। সপ্তাহে একবার শিশুর নখ কেটে দিন, আঙুল মুখে দেওয়ার অভ্যাস কমাতে সাহায্য করুন।
৩. জুতা বা স্যান্ডেল পরুন: বাইরে, উঠানে ও টয়লেটে খালি পায়ে যাবেন না। এটি হুকওয়ার্ম ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
বিজ্ঞাপন
৪. স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার: খোলা জায়গায় মলত্যাগ বন্ধ করুন। শিশুর মলও শৌচাগারে ফেলুন।
৫. নিরাপদ পানি: ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধ করে পানি পান করুন।
৬. ফল-সবজি ভালো করে ধোয়া: বিশেষ করে যেগুলো কাঁচা খাওয়া হয়, যেমন সালাদের শসা, টমেটো, ধনেপাতা।
৭. মাংস ভালোভাবে রান্না: ভেতরে লাল বা গোলাপি ভাব থাকা মাংস খাবেন না।
বিজ্ঞাপন
৮. সুতা কৃমিতে বাড়তি যত্ন: প্রতিদিন সকালে গোসল করে পায়ুপথের চারপাশ পরিষ্কার করুন, প্রতিদিন অন্তর্বাস বদলান, বিছানার চাদর ও তোয়ালে গরম পানিতে ধুয়ে রোদে শুকান, আর শিশুকে চুলকাতে নিষেধ করুন।
শিশুকে অভ্যাস শেখানোর সবচেয়ে ভালো উপায় নিজে করে দেখানো। খাওয়ার আগে পরিবারের সবাই একসঙ্গে হাত ধুলে শিশুও তা অনুসরণ করে। হাত ধোয়ার জায়গায় সাবান সবসময় রাখুন, শিশুর উচ্চতায় পৌঁছানো যায় এমন জায়গায়। স্কুলের টিফিন বাড়ি থেকে দিন, খোলা খাবার কেনার অভ্যাস কমান। বাড়িতে পোষা কুকুর-বিড়াল থাকলে তাদেরও পশু চিকিৎসকের পরামর্শে কৃমিমুক্ত রাখুন এবং তাদের মল দ্রুত পরিষ্কার করুন।
পেঁপের বিচি, কুমড়ার বিচি, রসুন বা নিমপাতা কৃমি দূর করে বলে প্রচলিত আছে। কিছু প্রাথমিক গবেষণা হলেও এগুলো ওষুধের মতো নির্ভরযোগ্যভাবে কৃমি মারে, এমন প্রমাণ নেই। শিশুকে নিমপাতার রস বা অজানা ভেষজ জোর করে খাওয়াবেন না; এতে বমি, পেটব্যথা বা অন্য ক্ষতি হতে পারে।
পুষ্টি ও কখন চিকিৎসক
বিজ্ঞাপন
কৃমির সংক্রমণে শিশুর শরীরে আয়রন ও অন্যান্য পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেয়। চিকিৎসার পাশাপাশি আয়রনসমৃদ্ধ খাবার, যেমন ডিম, মাছ, মাংস, কলিজা, ডাল, সবুজ শাক এবং সঙ্গে ভিটামিন সি-যুক্ত ফল খাওয়ান। রক্তস্বল্পতা বেশি হলে চিকিৎসক আয়রন সাপ্লিমেন্ট দিতে পারেন।
এসব ক্ষেত্রে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান: তীব্র বা একটানা পেটব্যথা, পেট ফুলে শক্ত হয়ে যাওয়া, বারবার বমি বা বমিতে কৃমি, পায়খানায় রক্ত, শিশুর ওজন কমে যাওয়া বা চোখে পড়ার মতো ফ্যাকাশে ভাব, দীর্ঘদিনের ডায়রিয়া, কিংবা ওষুধ খাওয়ার পরও লক্ষণ না কমা। প্রয়োজনে চিকিৎসক পায়খানা ও রক্ত পরীক্ষা করে কৃমির ধরন নিশ্চিত হবেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কৃমির ওষুধ কি খালি পেটে খেতে হয়?
বিজ্ঞাপন
সব ওষুধের নিয়ম এক নয়। কিছু ওষুধ খাবারের পর বা চিবিয়ে খেতে বলা হয়। মোড়কের নির্দেশনা ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন।
মিষ্টি খেলে কি কৃমি হয়?
না। মিষ্টি খাওয়ার সঙ্গে কৃমির সরাসরি সম্পর্ক নেই। কৃমি ছড়ায় দূষিত মাটি, পানি, খাবার ও অপরিষ্কার হাতের মাধ্যমে। তবে বেশি মিষ্টি দাঁত ও সার্বিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
বড়দেরও কি নিয়মিত কৃমির ওষুধ খেতে হয়?
বিজ্ঞাপন
সবার জন্য নিয়মিত প্রয়োজন নেই। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে থাকলে, পরিবারের শিশুর সুতা কৃমি হলে বা লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে খাওয়া যায়।
গর্ভাবস্থায় কৃমির ওষুধ খাওয়া যাবে?
গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে সাধারণত দেওয়া হয় না। পরে প্রয়োজন হলে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেবেন; নিজে নিজে খাবেন না।
শিশুকে কত দিন পরপর কৃমির ওষুধ দিতে হয়?
বিজ্ঞাপন
কৃমিপ্রবণ এলাকায় সাধারণত বছরে এক বা দুবার নিয়মিত কৃমিনাশক দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। শিশুর বয়স ও অবস্থা অনুযায়ী সঠিক সময়সূচি চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে জেনে নিন।