ডেন্টাল হাইজিনিস্ট থেকে উদ্যোক্তা: ফ্লোরিডায় সন্দ্বীপের জাহান রিমার সফল যাত্রা
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সাহিত্য ও শিল্পকর্মেও রেখেছেন সৃজনশীলতার ছাপ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:
বাংলাদেশের মাসুমা জাহান রিমা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বসবাস করছেন। পেশায় ডেন্টাল হাইজিনিস্ট হলেও তিনি এক যুগের বেশি সময় ধরে লেখক এবং প্রায় ছয় বছর ধরে শিল্পী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। সর্বশেষ তিনি একজন উদ্যোক্তা হিসেবেও নাম লিখিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বড় শপিং মলে নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী হয়েছেন। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে জন্ম নেওয়া জাহান রিমার জীবনের পথচলা চিকিৎসাসেবা থেকে শুরু করে সাহিত্য ও ব্যবসার নানা বাঁক পেরিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
নিজের বহুমুখী পরিচয় সম্পর্কে জাহান রিমা বলেন, ‘আমার জীবনটা মিশ্র। পেশায় একজন ডেন্টাল হাইজিনিস্ট; মনের কাছে লেখক; আবেগে শিল্পী; আর নিজের ইচ্ছায় আমি একজন উদ্যোক্তা।’ কোন পরিচয়টি তাকে সবচেয়ে বেশি প্রকাশ করে—এমন প্রশ্নে তিনি হেসে জানান, ‘সবগুলোই আমি, আবার কোনোটাই শুধু আমি না।’ তিনি কখনোই একটি পরিচয়কে অন্যটির প্রতিদ্বন্দ্বী করেননি, বরং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে একেকটি রূপকে সামনে এনেছেন।
করোনা মহামারির সময় সম্মুখসারির সেবাকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন রিমা। ২০২০ সালে দুর্গম এলাকায় আক্রান্ত রোগীদের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন তিনি। এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক সংস্থা ‘রিমোট এরিয়া মেডিক্যাল’ (র্যাম) থেকে তিনি ‘সার্টিফিকেট অব অ্যাপ্রিসিয়েশন’ লাভ করেন। পেশাগত কাজের বাইরে মানুষের মন ও সম্পর্ককে শব্দে বাঁধার তাড়না থেকে তিনি লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
২০১৯ সালে তাঁর প্রথম গল্পের বই ‘যে তুমি মানুষ খোঁজো’ প্রকাশিত হয়। এরপর ২০২১ সালে যমজ বোন জাহান রিপার সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশ করেন কবিতার বই ‘রিপাবনে বিভোরিমা’। বর্তমানে তিনি তাঁর তৃতীয় বই ‘আনন্দবাড়ির আব্বু’ লিখছেন। ২০১৪ সালে তাঁর কবিতা নিয়ে নির্মিত আবৃত্তি ও সংগীতের ভিডিওতে দেশের একজন সুপরিচিত আবৃত্তিশিল্পী কণ্ঠ দিয়েছিলেন এবং দেশের বিভিন্ন পত্রিকাতেও তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে সম্পাদনা ও প্রকাশনার সঙ্গেও যুক্ত আছেন জাহান রিমা। তিনি এক দশকের বেশি সময় ধরে ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোভিত্তিক বাংলা সাময়িকী ‘একতারা’র সম্পাদকীয় ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন। পাশাপাশি ‘বাংলাটাইমস ৩৬০’–এর সহযোগী সম্পাদক হিসেবেও কাজ করছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
জাহান রিমার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার নেপথ্যে রয়েছে তাঁর শিক্ষাজীবনের পরিবর্তনের গল্প। বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক শেষ করার পর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তিনি স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও ডেন্টাল হাইজিনে নতুন করে পড়াশোনা করেন। এরপর ছয়-সাত বছরের নিবিড় পড়াশোনা শেষে একটি জরুরি ডেন্টাল ক্লিনিকে কাজ শুরু করেন। নিজের সৃজনশীলতাকে সম্বল করে প্রায় পাঁচ বছর আগে ‘দ্য ফ্লোরিডা মল’-এ একটি কিয়স্কের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেন তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘জাহান’স আর্টিস্টিক ওয়ার্ল্ড’। সেখানে মেহেদি, বডি আর্ট, পোর্ট্রেট, ক্যারিকেচার ও পেইন্টিং নিয়ে সেবা প্রদান করেন তিনি।
শুরুর দিকের চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি বলেন, ‘শুরুতে ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। যদি না চলে? আমার আগে কেউ কেন করেনি? তার ওপর ছিল মলের চড়া ভাড়া আর অনিশ্চয়তা।’ সেই সময় মার্কিন লেখক জ্যাক উলড্রিচের একটি উক্তি তাঁকে সাহস জুগিয়েছিল, ‘যেটি তোমাকে একই সঙ্গে রোমাঞ্চিত করে এবং ভয় দেখায়, সম্ভবত সেটিই তোমার করা উচিত।’ এরপর তিনি ইউনিভার্সাল স্টুডিওর চাকরি ছেড়ে ডিজনি ওয়ার্ল্ডের মরক্কো প্যাভিলিয়নের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন এবং নিজের প্ল্যাটফর্মে মনোযোগী হন।
বর্তমানে ‘দ্য ফ্লোরিডা মল’ ছাড়াও হাই-এন্ড শপিং মল ‘অরল্যান্ডো ভাইনল্যান্ড প্রিমিয়াম আউটলেটস’–এ তাঁর নতুন শাখা রয়েছে। এছাড়া অরল্যান্ডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (এমসিও) তাঁর একটি লন্ড্রোম্যাট ব্যবসাও চালু রয়েছে। সাফল্য প্রসঙ্গে জাহান রিমা বলেন, ‘আমি বলব না আমি সফল হয়ে গেছি। এখনো অনেক পথ বাকি; কিন্তু আমি আমার নিজের মতো করে সফল। আমার কাছে সাফল্য মানে মনের সুখ। আপনি যেখানে আছেন, সেখানে যদি খুশি থাকেন, তাহলেই আপনি সফল।’
বাংলাদেশি ঐতিহ্যকে তুলে ধরার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার আনন্দ হয় এই ভেবে যে আমাদের বাংলাদেশের ট্র্যাডিশনাল মেহেদি আর্টকে আমেরিকার মলে নিয়ে আসতে পেরেছি। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নানা সংস্কৃতির মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি আমাদের আনন্দ উদ্যাপনের ঐতিহ্য।’ মেহেদি ছাড়াও তেলরং, জলরং, ওয়ান-লাইন আর্ট ও মিক্সড মিডিয়ায় নিয়মিত কাজ করেন তিনি। সম্প্রতি অরল্যান্ডো ভয়েজার ম্যাগাজিনের ‘হিডেন জেম’ সিরিজেও তাঁকে নিয়ে লেখা প্রকাশিত হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের ‘পাওয়ারহাউস’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পুরো পৃথিবীটাই এখন আমার স্টুডিও মনে হয়।’