জাফলং ভ্রমণ গাইড: কোথায় অবস্থিত, যাওয়ার উপায়, খরচ ও দেখার বিষয়
ট্রাভেল ডেস্ক · সিলেট
প্রকাশ:
সীমান্তের ওপারে মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়, পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝরনা, আর এপারে স্বচ্ছ পানির নদী, যার তলায় ছড়িয়ে আছে নানা রঙের পাথর। জাফলং বলতে বেশির ভাগ মানুষের চোখে এই ছবিটাই ভাসে। সিলেটে বেড়াতে গিয়ে জাফলং না দেখে ফিরেছেন, এমন পর্যটক কমই আছেন।
বিজ্ঞাপন
জাফলং সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলায়, সিলেট শহর থেকে আনুমানিক ৬০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে, একেবারে ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে। পিয়াইন নদী ওপারের ডাউকি থেকে নেমে এসে এখানে বাংলাদেশে ঢুকেছে। নদীর পাথর, ঝুলন্ত ডাউকি সেতুর দৃশ্য আর খাসিয়া জনগোষ্ঠীর গ্রাম, এই তিনে মিলে জাফলং কিসের জন্য বিখ্যাত, সে প্রশ্নের উত্তর।
ঢাকা থেকে এক রাতের যাত্রায় সিলেট পৌঁছে পরদিন সকালে বের হলে সন্ধ্যার আগেই জাফলং ঘুরে শহরে ফেরা যায়। হাতে সময় থাকলে পথে লালাখাল ও জৈন্তাপুরের চা বাগানও দেখে নিতে পারেন।
ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার উপায়
জাফলং যাওয়ার উপায় মূলত দুই ধাপের। প্রথমে সিলেট শহর, তারপর সেখান থেকে জাফলং।
বিজ্ঞাপন
বাসে: ঢাকার সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, মহাখালী ও আরামবাগ এলাকা থেকে সিলেটের এসি ও নন-এসি বাস ছাড়ে দিনরাত। রাস্তার অবস্থা ভেদে সাধারণত ছয় থেকে সাত ঘণ্টা লাগে। নন-এসি বাসের ভাড়া আনুমানিক ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা, এসি বাসে আনুমানিক ১২০০ থেকে ২০০০ টাকা।
ট্রেনে: কমলাপুর থেকে পারাবত, জয়ন্তিকা, কালনী ও রাতের উপবন এক্সপ্রেস সিলেটে যায়। সময় লাগে সাত থেকে আট ঘণ্টার মতো। শোভন চেয়ারের ভাড়া তুলনামূলক কম, তাই কম বাজেটের পর্যটকদের কাছে ট্রেনই প্রিয়। রাতের ট্রেনে গেলে হোটেলের এক রাতের খরচও বাঁচে।
বিমানে: ঢাকা থেকে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেশি কয়েকটি এয়ারলাইনসের নিয়মিত ফ্লাইট আছে। আকাশপথে এক ঘণ্টারও কম সময় লাগে।
সিলেট শহর থেকে জাফলং
বিজ্ঞাপন
সিলেট-তামাবিল সড়ক ধরে জাফলংয়ের পথ। রাস্তাটি জৈন্তাপুর হয়ে তামাবিল স্থলবন্দর পেরিয়ে জাফলংয়ে গিয়ে শেষ হয়েছে। পথের দুই পাশে চা বাগান আর দূরে মেঘালয়ের পাহাড়, যাত্রাটাই একটা ভ্রমণ।
শহরের বাসস্ট্যান্ড থেকে জাফলংগামী লোকাল বাস ছাড়ে, ভাড়া কম তবে সময় বেশি লাগে। দলে তিন-চারজন হলে সিএনজিচালিত অটোরিকশা সারা দিনের জন্য ভাড়া নেওয়া সুবিধাজনক। আনুমানিক ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকায় যাওয়া-আসা হয়, দরদাম করে নিতে হয়। বড় দল বা পরিবার হলে মাইক্রোবাস বা প্রাইভেট কার নেওয়া যায়, আনুমানিক খরচ ৩৫০০ থেকে ৫০০০ টাকা।
সিলেট শহর থেকে জাফলং পৌঁছাতে সাধারণত দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লাগে। ভাড়া গাড়ি নিলে চালককে আগেই বলে রাখুন, পথে লালাখাল বা চা বাগানে থামবেন।
জাফলংয়ে কী দেখবেন
বিজ্ঞাপন
১. পিয়াইন নদী ও পাথরের চর: জাফলংয়ের প্রাণ এই নদী। শীতে পানি কমে গেলে বিশাল পাথুরে চর জেগে ওঠে, আর বর্ষায় পানি থাকে ভরা ও সবুজাভ।
২. ডাউকি সেতুর দৃশ্য: নদীর ওপারে ভারতের ডাউকি এলাকার ঝুলন্ত সেতুটি জাফলং থেকেই পরিষ্কার দেখা যায়। পাহাড়ের গায়ে নামা ঝরনাগুলোও চোখে পড়ে, বিশেষ করে বর্ষায়।
৩. খাসিয়া পল্লি: নৌকায় নদী পার হয়ে সংগ্রামপুঞ্জিসহ খাসিয়াদের গ্রামে যাওয়া যায়। পান ও সুপারির বাগান, উঁচু খুঁটির ওপর ঘর আর পরিচ্ছন্ন উঠান দেখার মতো। গ্রামে ঢুকলে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে সম্মান করুন, অনুমতি ছাড়া ছবি তুলবেন না।
৪. চা বাগান: জাফলং ও আশপাশে কয়েকটি চা বাগান আছে। দুপুরের রোদ কমলে বাগানের ভেতরের পথে হাঁটতে ভালো লাগে।
বিজ্ঞাপন
৫. নৌকাভ্রমণ: ঘাট থেকে ইঞ্জিন নৌকা বা ডিঙি ভাড়া করে নদীতে ঘোরা যায়। ভাড়া জনপ্রতি নয়, সাধারণত পুরো নৌকা হিসাবে দরদাম হয়।
কখন যাবেন, কোথায় থাকবেন, কী খাবেন
জাফলংয়ের আসল রূপ দেখা যায় বর্ষার শেষ থেকে শরতের শুরু পর্যন্ত, মোটামুটি জুলাই থেকে অক্টোবর। তখন ওপারের পাহাড় থেকে ঝরনা নামে, নদীর পানি থাকে স্বচ্ছ ও সবুজ। তবে ভারী বৃষ্টির দিনে নদী ফুলে উঠলে ঝুঁকি বাড়ে, তখন পানিতে নামা একেবারেই নিষেধ। শীতে পানি কমে যায়, চর হাঁটার জন্য ভালো হলেও নদীর সেই সবুজ রং থাকে না।
বেশির ভাগ পর্যটক সিলেট শহরে থেকে দিনে দিনে জাফলং ঘুরে আসেন। শহরে সব বাজেটের আবাসিক হোটেল ও গেস্টহাউস আছে। জাফলংয়ে কিছু সাধারণ মানের রিসোর্ট ও সরকারি রেস্টহাউস আছে, তবে মৌসুমে আগে থেকে খোঁজ না নিয়ে গেলে জায়গা পাওয়া কঠিন।
বিজ্ঞাপন
জাফলংয়ে ঘাটের কাছে ছোট রেস্তোরাঁয় ভাত, ডাল, মুরগি ও নদীর মাছ পাওয়া যায়। খাওয়ার আগে দাম জেনে নিন। সিলেট শহরে ফিরে সাতকড়া দিয়ে রান্না মাংস আর শুঁটকির ভর্তা চেখে দেখতে পারেন।
এক দিনের একটি নমুনা পরিকল্পনা
যাঁরা প্রথমবার যাচ্ছেন, তাঁদের জন্য একটি সহজ ছক দেওয়া হলো। নিজের সুবিধামতো সময় এদিক-ওদিক করে নিতে পারেন।
১. সকাল সাতটা থেকে আটটা: সিলেট শহরে নাশতা সেরে সিএনজি বা গাড়িতে রওনা। সকালে রাস্তা ফাঁকা থাকে, পথের দৃশ্যও পরিষ্কার দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
২. পথে লালাখাল বা চা বাগান: সারিঘাটের কাছে লালাখালের নীলচে-সবুজ পানি দেখে নিতে পারেন। জৈন্তাপুরের চা বাগানের পাশে কিছুক্ষণ থেমে ছবি তুলুন। এতে ঘণ্টাখানেক বাড়তি লাগবে।
৩. দুপুরের আগে জাফলং: পৌঁছে প্রথমে নদীর ঘাট ও পাথরের চর ঘুরুন, তারপর নৌকায় ওপারে খাসিয়া পল্লিতে যান।
৪. দুপুরের খাবার: ঘাটের কাছের রেস্তোরাঁয় খেয়ে নিন, দাম আগে জেনে অর্ডার দিন।
৫. বিকেল চারটার মধ্যে ফেরা শুরু: সীমান্ত এলাকায় সন্ধ্যার পর ঘোরাঘুরি না করাই ভালো। সন্ধ্যার আগে রওনা দিলে আলো থাকতে থাকতে তামাবিল পেরিয়ে আসা যায় এবং রাতের খাবারের আগে শহরে ফেরা যায়।
বিজ্ঞাপন
পরিবার বা শিশুদের নিয়ে গেলে লালাখাল ও জাফলং একই দিনে না রেখে দুই দিনে ভাগ করে নিলে ভ্রমণ অনেক আরামদায়ক হয়।
জাফলং ভ্রমণ খরচ ও সতর্কতা
ঢাকা থেকে দুজনের একটি সাধারণ দুই দিনের সফরের হিসাব মোটামুটি এ রকম দাঁড়ায়: ট্রেন বা নন-এসি বাসে যাওয়া-আসা জনপ্রতি আনুমানিক ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকা, সিলেটে এক রাতের মাঝারি হোটেল আনুমানিক ১৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা, সিএনজি ভাড়া আনুমানিক ২০০০ টাকা, নৌকা ও খাবার মিলিয়ে আরও কিছু। সব মিলিয়ে জনপ্রতি আনুমানিক ৪০০০ থেকে ৬০০০ টাকায় সাধারণ মানের একটি জাফলং ভ্রমণ সম্ভব। ঈদ ও লম্বা ছুটিতে সব খরচই বেড়ে যায়।
নদীর স্রোত: জাফলংয়ে প্রতিবছর পানিতে ডুবে মৃত্যুর খবর আসে। ওপরে পানি শান্ত দেখালেও নিচে প্রবল স্রোত আর গভীর গর্ত থাকে। সাঁতার জানলেও গভীর পানিতে নামবেন না, শিশুদের সব সময় চোখে চোখে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
সীমান্ত: নদীর মাঝখান দিয়ে কোথাও কোথাও সীমান্তরেখা গেছে। শূন্যরেখার কাছে যাবেন না, বিজিবির নির্দেশনা মেনে চলুন।
পাথরের ট্রাক ও ধুলা: পাথর ব্যবসার কারণে এলাকায় ট্রাক চলে, শুষ্ক মৌসুমে ধুলাও বেশি। মাস্ক রাখুন।
পরিচ্ছন্নতা: প্লাস্টিকের বোতল ও চিপসের প্যাকেট নদীতে বা চরে ফেলবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
জাফলং কোথায় অবস্থিত?
সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলায়, সিলেট শহর থেকে আনুমানিক ৬০ কিলোমিটার দূরে ভারতের মেঘালয় সীমান্তের কাছে পিয়াইন নদীর তীরে।
এক দিনে কি জাফলং ঘুরে আসা যায়?
সিলেট শহর থেকে সকালে রওনা দিলে এক দিনেই জাফলং ঘুরে সন্ধ্যায় ফেরা যায়। ঢাকা থেকে গেলে রাতের বাস বা ট্রেনে গিয়ে পরদিন ঘুরে রাতে ফেরা সম্ভব, তবে ক্লান্তিকর।
বিজ্ঞাপন
জাফলং যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় কোনটি?
ঝরনা ও সবুজ পানি দেখতে চাইলে জুলাই থেকে অক্টোবর। আরামদায়ক আবহাওয়ায় হাঁটতে চাইলে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, তবে তখন পানি কম থাকে।
জাফলংয়ে কি পানিতে নামা নিরাপদ?
ঘাটের অগভীর অংশে পা ভেজানো যায়, কিন্তু গভীর পানিতে নামা বা সাঁতার কাটা ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয় প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকলে তা মেনে চলুন।
বিজ্ঞাপন
জাফলং থেকে কি ভারতের ডাউকিতে যাওয়া যায়?
জাফলং থেকে নদী পার হয়ে ভারতে যাওয়ার কোনো বৈধ পথ নেই। ভারতে যেতে হলে বৈধ ভিসা নিয়ে তামাবিল-ডাউকি স্থলবন্দর দিয়ে নিয়ম মেনে সীমান্ত পার হতে হয়।