আশুরার রোজার ফজিলত ও নিয়ম: কয়টি রোজা, কোন দিন রাখবেন
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
আশুরার রোজা রাখার সহজ নিয়ম হলো মহররমের ১০ তারিখের সঙ্গে আগের দিন ৯ তারিখ অথবা পরের দিন ১১ তারিখ মিলিয়ে মোট দুটি রোজা রাখা। শুধু ১০ তারিখে একটি রোজা রাখলেও তা আদায় হয়ে যায়, তবে মহানবী (সা.)-এর শেষ ইচ্ছার অনুসরণে দুটি রাখাই উত্তম।
বিজ্ঞাপন
এ রোজা ফরজ বা ওয়াজিব নয়, সুন্নত। সেহরি খাওয়া, নিয়ত করা, সারা দিন পানাহার ও রোজা ভঙ্গের কাজ থেকে বিরত থাকা এবং সূর্যাস্তে ইফতার করা, সব নিয়ম রমজানের রোজার মতোই। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, কোনো কারণে না রাখলে গুনাহ হয় না, আর রাখলে রয়েছে বড় সওয়াবের আশা।
আশুরার রোজার ফজিলত
আশুরার রোজার ফজিলত নিয়ে সবচেয়ে পরিচিত হাদিসটি সহিহ মুসলিমে হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত। মহানবী (সা.)-কে আশুরার রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, এ রোজা আগের এক বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে।
আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে মূলত সগিরা বা ছোট গুনাহ মাফের কথা বলা হয়েছে। কবিরা গুনাহের জন্য আলাদা করে খাঁটি তওবা প্রয়োজন, আর মানুষের হক নষ্ট করলে সেই মানুষের কাছ থেকে ক্ষমা নিতে বা হক ফিরিয়ে দিতে হয়। তাই আশুরার রোজাকে সব গুনাহ মাফের সহজ টিকিট ভাবা ঠিক নয়; বরং এটি নিজেকে শুধরে নেওয়ার একটি সুযোগ।
বিজ্ঞাপন
মহররম মাসের রোজার সামগ্রিক মর্যাদাও হাদিসে এসেছে। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত, রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা আল্লাহর মাস মহররমের রোজা। তাই আশুরা ছাড়াও মহররমে সুযোগমতো নফল রোজা রাখা যায়।
বুখারি ও মুসলিমে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) জানিয়েছেন, মহানবী (সা.)-কে তিনি আশুরা ও রমজান ছাড়া অন্য কোনো দিনের রোজার জন্য এতটা আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখেননি। এ থেকেই বোঝা যায়, নফল রোজার মধ্যে আশুরার অবস্থান কতটা বিশেষ।
কয়টি রোজা রাখবেন: ৯-১০ নাকি ১০-১১
মদিনায় ইহুদিরাও আশুরার দিনে রোজা রাখত। সহিহ মুসলিমের হাদিসে আছে, মহানবী (সা.) বলেছিলেন, আগামী বছর বেঁচে থাকলে আমি নবম তারিখেও রোজা রাখব। কিন্তু পরের মহররম আসার আগেই তিনি ইন্তেকাল করেন। এই হাদিসের ভিত্তিতে আলেমরা আশুরার সঙ্গে আরেকটি রোজা মেলানোর পরামর্শ দেন, যাতে ইবাদতে স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকে।
বিজ্ঞাপন
রোজা রাখার কয়েকটি পদ্ধতি তাই প্রচলিত:
১. ৯ ও ১০ মহররম: সবচেয়ে উত্তম ও বেশি প্রচলিত পদ্ধতি, সরাসরি হাদিসের সঙ্গে মিলে যায়।
২. ১০ ও ১১ মহররম: কোনো কারণে ৯ তারিখ রাখা না গেলে পরের দিন মিলিয়ে নেওয়া যায়।
৩. ৯, ১০ ও ১১ মহররম: কেউ কেউ তিন দিনই রাখেন। এটিও জায়েজ এবং মহররমের নফল রোজার সাধারণ ফজিলতের মধ্যে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
৪. শুধু ১০ মহররম: রোজা আদায় হয়ে যাবে এবং ফজিলতও পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। তবে হানাফি মাজহাবের অনেক ফকিহ শুধু একটি রাখাকে মাকরুহে তানজিহি, অর্থাৎ অনুত্তম বলেছেন। সুযোগ থাকলে আরেকটি মিলিয়ে নেওয়াই ভালো।
নিয়ত ও সেহরি
রোজার নিয়ত মূলত অন্তরের সংকল্প। মনে মনে ঠিক করা যে আমি আগামীকাল আশুরার নফল রোজা রাখব, এটুকুই যথেষ্ট। মুখে বলা জরুরি নয়; কেউ বাংলায় বা আরবিতে বলতে চাইলে বলতে পারেন। সেহরি খাওয়াও নিয়তের প্রমাণ বহন করে।
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী নফল রোজার নিয়ত রাতে না করলেও চলে। সকালে উঠে যদি মনে হয় রোজা রাখবেন, আর সুবহে সাদিকের পর থেকে কিছু খাননি বা রোজা ভঙ্গের কোনো কাজ করেননি, তাহলে দিনের মধ্যভাগের আগ পর্যন্ত নিয়ত করে নেওয়া যায়। তবে রাতেই নিয়ত করে সেহরি খেয়ে নেওয়া উত্তম, কারণ বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে সেহরিতে বরকতের কথা এসেছে।
বিজ্ঞাপন
তারিখ ঠিক করবেন কীভাবে
আশুরার তারিখ চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি মহররমের চাঁদ দেখা গেছে কি না, তা ঘোষণা করে। সেই ঘোষণা অনুযায়ী মহররমের প্রথম দিন থেকে গুনে ৯, ১০ ও ১১ তারিখ বের করুন। সরকারি ছুটির তালিকায় আশুরার দিন উল্লেখ থাকে, তবে চাঁদের কারণে তা এক দিন এদিক-ওদিক হতে পারে।
প্রবাসে থাকলে যে দেশে আছেন, সেখানকার চাঁদ দেখার ঘোষণা অনুসরণ করাই নিয়ম। পরিবারের সবাই একসঙ্গে রোজা রাখতে চাইলে আগে থেকে তারিখ মিলিয়ে নিন, তাহলে সেহরি ও ইফতারের আয়োজন সহজ হবে।
নারী, শিশু ও অসুস্থদের জন্য কিছু কথা
বিজ্ঞাপন
রমজানের কাজা রোজা বাকি থাকলে কী করবেন, এ প্রশ্ন অনেক নারী করেন। হানাফি মাজহাবে রমজানের কাজা আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই, তাই কাজা বাকি থাকা অবস্থায়ও নফল রোজা রাখা জায়েজ। তবে আগে ফরজ কাজা আদায় করে নেওয়াই উত্তম, কারণ জীবনের নিশ্চয়তা কারও নেই। একই রোজায় কাজা ও আশুরা দুটির নিয়ত করলে কাজা আদায় হবে; আশুরার আলাদা সওয়াব পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে।
ঋতুস্রাব চলাকালে নারীরা রোজা রাখবেন না। নফল রোজা হওয়ায় এর কাজাও করতে হয় না। শিশুদের অভ্যাস গড়তে উৎসাহ দেওয়া যায়, তবে জোর করা ঠিক নয়। ডায়াবেটিস, কিডনির সমস্যা বা নিয়মিত ওষুধ খেতে হয় এমন রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নফল রোজা রাখবেন না। নফল ইবাদতের জন্য স্বাস্থ্যের ক্ষতি করার অনুমতি শরিয়তে নেই।
বিবাহিত নারীর নফল রোজার ক্ষেত্রে বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে স্বামী উপস্থিত থাকলে তাঁর অনুমতি নেওয়ার কথা এসেছে। সাধারণত পারিবারিক আলোচনায় বিষয়টি সহজেই মিটে যায়।
যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
বিজ্ঞাপন
১. রোজাকে কারবালার শোকের রোজা ভাবা: আশুরার রোজা কারবালার আগে থেকেই প্রচলিত। এর মূল ভিত্তি মুসা (আ.)-এর মুক্তিতে কৃতজ্ঞতা ও নবীজির সুন্নত।
২. ফজিলত বাড়িয়ে বলা: আশুরার রোজা রাখলে পঞ্চাশ বা ষাট বছরের ইবাদতের সওয়াব, এমন কিছু দাবি লোকমুখে শোনা যায়, যার নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। সহিহ হাদিসে যা আছে, সেটুকুই যথেষ্ট।
৩. ইফতারে অপচয়: নফল রোজার ইফতারকে ঘিরে বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই। খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার করা সুন্নত, এরপর স্বাভাবিক খাবার।
৪. অন্যকে চাপ দেওয়া: নফল ইবাদতে উৎসাহ দেওয়া ভালো, কিন্তু কেউ না রাখলে তাকে খোঁটা দেওয়া বা ছোট করা ঠিক নয়।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
শুধু ১০ মহররম একটি রোজা রাখলে কি হবে?
হ্যাঁ, রোজা আদায় হবে এবং ফজিলতের আশাও করা যায়। তবে হানাফি আলেমদের পরামর্শ হলো সঙ্গে ৯ বা ১১ তারিখ মিলিয়ে নেওয়া, কারণ সেটিই নবীজির শেষ ইচ্ছার কাছাকাছি।
আশুরার রোজার নিয়ত কখন পর্যন্ত করা যায়?
বিজ্ঞাপন
হানাফি মাজহাবে নফল রোজার নিয়ত দিনের মধ্যভাগের আগ পর্যন্ত করা যায়, যদি সুবহে সাদিকের পর কিছু খাওয়া বা রোজা ভঙ্গের কোনো কাজ না হয়ে থাকে। তবে রাতে নিয়ত করে সেহরি খাওয়া উত্তম।
আশুরার রোজা ভেঙে গেলে কি কাজা করতে হবে?
হানাফি মাজহাবে নফল রোজা নিয়ত করে শুরু করার পর ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে ফেললে পরে একটি কাজা রাখা ওয়াজিব হয়। তবে কাফফারা দিতে হয় না। ভুলে খেয়ে ফেললে রোজা ভাঙে না।
আশুরার রোজায় কোন গুনাহ মাফ হয়?
বিজ্ঞাপন
আলেমদের ব্যাখ্যায় সাধারণত ছোট গুনাহ মাফের কথা বলা হয়। বড় গুনাহের জন্য খাঁটি তওবা এবং মানুষের হক থাকলে তা পরিশোধ করা জরুরি।