হ্যাক হওয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ফিরিয়ে আনার উপায় ও তাৎক্ষণিক করণীয়
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
সকালে উঠে দেখলেন ফেসবুক থেকে লগআউট হয়ে আছেন, পুরোনো পাসওয়ার্ড আর কাজ করছে না, বন্ধুরা ফোন করে বলছেন আপনার আইডি থেকে টাকা চাওয়া হচ্ছে। এমন অবস্থায় আতঙ্কিত না হয়ে প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সঠিক পদক্ষেপ নিলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অ্যাকাউন্ট ফেরত পাওয়া যায়। দেরি করলে হ্যাকার ইমেইল, ফোন নম্বর সব বদলে ফেলে, তখন কাজ কঠিন হয়।
বিজ্ঞাপন
হ্যাক হওয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ফিরিয়ে আনার উপায় মূলত তিনটি। এক, ফেসবুকের নিজস্ব হ্যাকড অ্যাকাউন্ট রিপোর্ট পাতা facebook.com/hacked ব্যবহার করা। দুই, অ্যাকাউন্টের ইমেইল বা নম্বর বদলানো হলে পুরোনো ইমেইলে ফেসবুক যে সতর্কবার্তা পাঠায়, সেখানকার লিংক দিয়ে পরিবর্তন বাতিল করা। তিন, কিছুই না মিললে পরিচয়পত্র বা ভিডিও সেলফির মাধ্যমে মালিকানা প্রমাণ করা।
কাজগুলো কোন ক্রমে করবেন, কোথায় সাধারণত মানুষ ভুল করেন এবং অ্যাকাউন্ট ফেরত পাওয়ার পর কীভাবে আবার সুরক্ষিত করবেন, নিচে ধাপে ধাপে দেওয়া হলো।
প্রথমেই বুঝে নিন অ্যাকাউন্ট আসলে হ্যাক হয়েছে কি না
সব লগআউট মানেই হ্যাক নয়। কখনো অ্যাপের সমস্যায় বা নিরাপত্তাজনিত কারণে ফেসবুক নিজেই সাময়িকভাবে লগআউট করে দেয়। তবে নিচের লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখলে ধরে নিন অন্য কেউ অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে।
বিজ্ঞাপন
১. পাসওয়ার্ড কাজ করছে না: আপনি পাসওয়ার্ড বদলাননি, অথচ সঠিক পাসওয়ার্ড দিলেও ঢুকতে পারছেন না।
২. অচেনা ইমেইল এসেছে: ইনবক্সে ফেসবুকের কাছ থেকে বার্তা এসেছে যে আপনার ইমেইল, ফোন নম্বর বা পাসওয়ার্ড বদলানো হয়েছে।
৩. আপনার নামে পোস্ট বা মেসেজ: বন্ধুরা জানাচ্ছেন আপনার আইডি থেকে লিংক, বিজ্ঞাপন বা টাকা চেয়ে মেসেজ যাচ্ছে।
৪. নাম, জন্মতারিখ বা ছবি বদলে গেছে: প্রোফাইলের তথ্য আপনার অজান্তে পরিবর্তিত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ফেসবুক হ্যাক হলে করণীয়: প্রথম এক ঘণ্টা
সময়টাই এখানে সবচেয়ে বড় বিষয়। এই কাজগুলো একসঙ্গে শুরু করুন।
১. বন্ধুদের সতর্ক করুন: অন্য কারও ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা ফোনের মাধ্যমে কাছের মানুষদের জানিয়ে দিন, আপনার আইডি থেকে টাকা বা কোড চাইলে যেন সাড়া না দেন। প্রতারকেরা সাধারণত এই সুযোগটাই নেয়।
২. ইমেইল অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত করুন: ফেসবুকের সঙ্গে যে ইমেইল যুক্ত ছিল, আগে সেটির পাসওয়ার্ড বদলান। ইমেইল হাতছাড়া হলে ফেসবুক ফেরত পাওয়া অনেক কঠিন হয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
৩. পুরোনো ইমেইলে নিরাপত্তা বার্তা খুঁজুন: ফেসবুক কোনো ইমেইল ঠিকানা বদলানো হলে আগের ঠিকানায় একটি বার্তা পাঠায়। সেখানে সাধারণত লেখা থাকে, পরিবর্তনটি আপনি না করে থাকলে অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত করুন। ওই লিংকে ঢুকলে পরিবর্তন বাতিল করে নিজের ইমেইল ফেরত আনা যায়। স্প্যাম বা অন্যান্য ফোল্ডারও খুঁজে দেখুন।
৪. ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পিন বদলান: যদি কখনো মেসেঞ্জারে পিন, পাসওয়ার্ড বা কার্ডের ছবি পাঠিয়ে থাকেন, সেগুলো এখনই বদলে ফেলুন।
কীভাবে হ্যাক হওয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধার করবেন
এবার মূল কাজ। ব্রাউজারে গিয়ে facebook.com/hacked ঠিকানায় যান। মোবাইল অ্যাপের চেয়ে ব্রাউজারে এই প্রক্রিয়া সাধারণত সহজ হয়। যে ফোন বা কম্পিউটার থেকে আগে নিয়মিত ফেসবুক চালাতেন, সম্ভব হলে সেটিই ব্যবহার করুন, কারণ পরিচিত ডিভাইস দেখলে ফেসবুক সহজে মালিককে চিনতে পারে।
বিজ্ঞাপন
১. সমস্যা বেছে নিন: পাতায় কয়েকটি বিকল্প থাকে, যেমন কেউ আমার পাসওয়ার্ড জেনে গেছে বা অচেনা কেউ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে। যেটি আপনার ক্ষেত্রে খাটে, সেটি বেছে নিন।
২. অ্যাকাউন্ট খুঁজে বের করুন: অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত ইমেইল, মোবাইল নম্বর বা প্রোফাইলের নাম দিয়ে খুঁজুন।
৩. কোড বা পুরোনো পাসওয়ার্ড দিন: ফেসবুক আপনার নম্বর বা ইমেইলে কোড পাঠাতে পারে, অথবা সাম্প্রতিক কোনো পুরোনো পাসওয়ার্ড চাইতে পারে। হ্যাকার পাসওয়ার্ড বদলালেও আগের পাসওয়ার্ড দিয়ে অনেক সময় মালিকানা প্রমাণ করা যায়।
৪. নির্দেশনা অনুসরণ করুন: এরপর ফেসবুক নতুন পাসওয়ার্ড দিতে বলবে, সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলো দেখাবে এবং অপরিচিত ডিভাইস সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ দেবে।
বিজ্ঞাপন
যদি দেখেন ইমেইল ও নম্বর দুটিই বদলে গেছে এবং কোড আপনার কাছে আসছে না, তাহলে লগইন পাতায় পাসওয়ার্ড ভুলে যাওয়ার বিকল্পে গিয়ে এসব আর ব্যবহার করতে পারছেন না জাতীয় অপশনটি খুঁজুন। সেখান থেকে নতুন একটি ইমেইল দিয়ে পুনরুদ্ধারের অনুরোধ করা যায়।
পরিচয় যাচাই: কোড না এলে শেষ ভরসা
কিছু ক্ষেত্রে ফেসবুক আপনার পরিচয় নিশ্চিত হতে চায়। তখন জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতো ছবিসহ পরিচয়পত্রের স্পষ্ট ছবি আপলোড করতে বলা হয়। অনেক সময় নিজের মুখের একটি ছোট ভিডিও সেলফি দিতে বলা হয়, যা প্রোফাইলের ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।
এখানে একটি কথা মনে রাখা জরুরি। প্রোফাইলে যদি আসল নাম না থাকে, বা ছবিগুলো আপনার না হয়, তাহলে এই পদ্ধতিতে সফল হওয়া কঠিন। তাই যারা ছদ্মনামে বা কার্টুনের ছবি দিয়ে অ্যাকাউন্ট চালান, তাদের ঝুঁকি বেশি। অনুরোধ জমা দেওয়ার পর উত্তর আসতে কয়েক দিনও লাগতে পারে। এ সময় একই অনুরোধ বারবার পাঠাবেন না।
বিজ্ঞাপন
যেসব ফাঁদে পা দেবেন না
অ্যাকাউন্ট হারানোর পর মানুষ মরিয়া হয়ে থাকেন, আর প্রতারকেরা ঠিক এই সময়টা ধরতে চায়।
১. টাকা নিয়ে আইডি ফেরতের প্রস্তাব: যারা বলে টাকা দিলে আইডি উদ্ধার করে দেবে, তাদের বেশির ভাগই প্রতারক। আপনার কাছ থেকে টাকা ও তথ্য দুটোই নিয়ে উধাও হয়।
২. ভুয়া সাপোর্ট পেজ: ফেসবুক কখনো মেসেঞ্জারে মেসেজ দিয়ে পাসওয়ার্ড বা কোড চায় না। ফেসবুক সাপোর্ট নামে কোনো পেজ বা আইডি এমন চাইলে সেটি ভুয়া।
বিজ্ঞাপন
৩. কোড শেয়ার: কেউ ফোন করে আপনার মোবাইলে আসা ছয় সংখ্যার কোড চাইলে কখনো দেবেন না। ওই কোড দিয়েই অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়।
অ্যাকাউন্ট ফিরে পাওয়ার পর যা করতেই হবে
অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারা মানেই কাজ শেষ নয়। হ্যাকার কোনো দরজা খুলে রেখে গেছে কি না, তা দেখে নিন।
১. শক্ত পাসওয়ার্ড দিন: অন্তত ১২ অক্ষরের, অক্ষর, সংখ্যা ও চিহ্ন মিশিয়ে এমন পাসওয়ার্ড দিন, যা অন্য কোনো সাইটে ব্যবহার করেননি।
বিজ্ঞাপন
২. টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু করুন: সেটিংসের নিরাপত্তা অংশে গিয়ে দুই ধাপের যাচাই চালু করুন। অথেনটিকেটর অ্যাপ ব্যবহার করা এসএমএসের চেয়ে বেশি নিরাপদ। ব্যাকআপ কোডগুলো লিখে নিরাপদ জায়গায় রাখুন।
৩. লগইন করা ডিভাইস দেখুন: যেখান থেকে লগইন করা আছে, সেই তালিকায় অচেনা ফোন বা শহর দেখলে সেগুলো থেকে লগআউট করুন।
৪. ইমেইল ও নম্বর মিলিয়ে নিন: অ্যাকাউন্টে আপনার নয় এমন কোনো ইমেইল বা নম্বর যুক্ত থাকলে মুছে ফেলুন।
৫. সংযুক্ত অ্যাপ ও পেজের অ্যাডমিন দেখুন: আপনার পরিচালিত পেজে হ্যাকার নিজেকে অ্যাডমিন বানিয়ে রাখতে পারে। অপরিচিত অ্যাডমিন সরিয়ে দিন।
বিজ্ঞাপন
আইনি সহায়তা কখন নেবেন
আইডি থেকে কাউকে হুমকি দেওয়া, টাকা আদায় বা ব্যক্তিগত ছবি ছড়ানোর মতো ঘটনা ঘটলে নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি করুন। হ্যাক হওয়ার সময়, অ্যাকাউন্টের লিংক, হ্যাকারের পাঠানো মেসেজের স্ক্রিনশট ও ইমেইলের প্রমাণ গুছিয়ে রাখুন। পুলিশের সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করা ইউনিটগুলোও এ ধরনের অভিযোগ গ্রহণ করে। নারীরা হয়রানির শিকার হলে পুলিশের নারীদের জন্য আলাদা সাইবার সহায়তা সেবার সাহায্য নিতে পারেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
হ্যাক হওয়ার কত দিন পর্যন্ত অ্যাকাউন্ট ফেরত পাওয়া সম্ভব?
বিজ্ঞাপন
নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই, তবে যত দ্রুত চেষ্টা করবেন, সম্ভাবনা তত বেশি। পরিবর্তনের সতর্কবার্তার লিংক সাধারণত সীমিত সময় কার্যকর থাকে।
ইমেইল ও নম্বর দুটিই হ্যাকার বদলে দিলে কী করব?
facebook.com/hacked পাতা থেকে শুরু করুন এবং পুরোনো পাসওয়ার্ড ও পরিচিত ডিভাইস কাজে লাগান। তাতেও না হলে পরিচয়পত্র দিয়ে যাচাইয়ের পথে যেতে হবে।
ফেসবুক ফিরিয়ে আনার উপায় হিসেবে কি কাউকে টাকা দেওয়া উচিত?
বিজ্ঞাপন
না। ফেসবুকের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বিনা মূল্যে। টাকা নিয়ে আইডি ফেরতের প্রতিশ্রুতি প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রতারণা।
অ্যাকাউন্ট ফেরত পাওয়ার পর পোস্টগুলো কি মুছে দিতে হবে?
হ্যাকার যেসব পোস্ট, মন্তব্য বা মেসেজ পাঠিয়েছে, সেগুলো কার্যতালিকা থেকে খুঁজে মুছে ফেলুন এবং বন্ধুদের জানিয়ে দিন যে সেগুলো আপনি পাঠাননি।