রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট: যাওয়ার উপায়, ঘোরার পথ, খরচ ও সতর্কতা
ট্রাভেল ডেস্ক · সিলেট
প্রকাশ:
বর্ষায় যে বনের গাছগুলো কোমর পর্যন্ত, কখনো গলা পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকে, আর সেই গাছের ফাঁক দিয়ে ডিঙি নৌকা চলে, তার নাম রাতারগুল। একে বলা হয় জলাবন বা সোয়াম্প ফরেস্ট। এ রকম মিঠাপানির জলাবন বাংলাদেশে হাতে গোনা, আর রাতারগুল তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত।
বিজ্ঞাপন
রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে, সিলেট শহর থেকে আনুমানিক ২৬ কিলোমিটার দূরে। বনটি গুয়াইন নদী ও চেঙ্গির খালের সঙ্গে যুক্ত। বছরের প্রায় চার-পাঁচ মাস এখানে পানি থাকে, বাকি সময় অনেকটা শুকিয়ে যায়।
সংক্ষেপে উত্তর হলো: ঢাকা থেকে সিলেট পৌঁছে শহর থেকে সিএনজি বা গাড়িতে বনের পাশের ঘাটে যেতে হয়, তারপর ঘাট থেকে ডিঙি নৌকা ভাড়া করে বনের ভেতর ঘুরতে হয়। আধা বেলাতেই রাতারগুল ভ্রমণ শেষ করা যায়।
বনটি কেমন, কী দেখবেন
রাতারগুলের প্রধান গাছ হিজল, করচ ও বরুণ। এসব গাছ বছরের অনেকটা সময় পানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। নৌকায় বসে গাছের ডালপালার নিচ দিয়ে এগোলে মনে হয় সবুজ সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। পানিতে গাছের ছায়া পড়ে এক অদ্ভুত আয়নার মতো দৃশ্য তৈরি হয়।
বিজ্ঞাপন
বনের ভেতর বানর, নানা প্রজাতির পাখি, গুইসাপ আর সাপের দেখা মেলে। শীতে কিছু পরিযায়ী পাখিও আসে। বনের একটি অংশে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার আছে, যেখান থেকে ওপর থেকে বনের বিস্তার দেখা যায়। টাওয়ারে ওঠার সময় ভিড় থাকলে ধৈর্য ধরুন, একসঙ্গে বেশি মানুষ ওঠা ঠিক নয়।
বর্ষায় বনের রূপ আর শীতের রূপ একেবারে আলাদা। বর্ষায় গাছের গুঁড়ি পানিতে ডুবে থাকে, পানির রং হয় গাঢ় সবুজ। পানি নেমে গেলে গুঁড়িতে পানির দাগ থেকে বোঝা যায়, বর্ষায় পানি কতটা উঁচুতে উঠেছিল। স্থানীয় মানুষের জীবনও এই বনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, বর্ষায় তাঁদের অনেকে মাছ ধরেন, কেউ পর্যটকদের নৌকা চালান।
রাতারগুল বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে আছে। তাই এখানে গাছের ডাল ভাঙা, পাখি বা প্রাণী বিরক্ত করা এবং উচ্চ শব্দে গান বাজানো নিষেধ।
রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট যাওয়ার উপায়
বিজ্ঞাপন
ঢাকা থেকে সিলেট: সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল ও মহাখালী থেকে সিলেটের বাস ছাড়ে, সময় লাগে ছয়-সাত ঘণ্টা। কমলাপুর থেকে পারাবত, জয়ন্তিকা, কালনী ও উপবন এক্সপ্রেস সিলেট যায়। সময় কম থাকলে ঢাকা থেকে সিলেটের ফ্লাইট নিতে পারেন।
সিলেট শহর থেকে ঘাট: সবচেয়ে প্রচলিত পথ হলো শহর থেকে বিমানবন্দর সড়ক হয়ে সালুটিকর পেরিয়ে মোটরঘাট। শহরের আম্বরখানা এলাকা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা রিজার্ভ নিয়ে যাওয়া যায়, সময় লাগে মোটামুটি এক ঘণ্টা। গোয়াইনঘাটের দিক থেকেও বনের অন্য পাশে ঘাট আছে, স্থানীয় চালকেরা সাধারণত সুবিধাজনক ঘাটটিই চেনেন।
ঘাট থেকে বনে: ঘাটে ছোট ডিঙি নৌকা পাওয়া যায়, প্রতিটিতে চার-পাঁচজন বসতে পারেন। নৌকার মাঝি বনের ভেতরের পথ চেনেন এবং ঘুরিয়ে আবার ঘাটে ফিরিয়ে আনেন। পুরো ঘোরায় সাধারণত দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লাগে।
কোন মৌসুমে যাবেন
বিজ্ঞাপন
রাতারগুলে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় বর্ষা, মোটামুটি জুন থেকে সেপ্টেম্বর। তখন বনের গাছের গোড়া পানিতে ডুবে থাকে আর নৌকায় বনের গভীরে যাওয়া যায়। অক্টোবরের পর পানি দ্রুত কমতে থাকে।
শীতে বনের বেশির ভাগ অংশে পানি থাকে না বললেই চলে। তখন নৌকা চলে না, হেঁটে কিছু অংশ দেখা যায়, কিন্তু জলাবনের আসল সৌন্দর্য পাওয়া যায় না। তাই শীতে সিলেট গেলে রাতারগুলের বদলে অন্য জায়গায় সময় দেওয়া ভালো।
ভোর বা বিকেল ঘোরার আদর্শ সময়। দুপুরে রোদ চড়া থাকে, আর ছুটির দিনে দুপুরের দিকে ঘাটে ভিড়ও বেশি হয়।
রাতারগুল ভ্রমণ খরচ
বিজ্ঞাপন
খরচের বড় অংশ যায় ঢাকা থেকে সিলেট যাতায়াত আর থাকায়। ট্রেন বা নন-এসি বাসে যাওয়া-আসা জনপ্রতি আনুমানিক ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকা লাগে।
সিলেট শহর থেকে ঘাট পর্যন্ত সিএনজি রিজার্ভে যাওয়া-আসা আনুমানিক ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা, দরদাম ও অপেক্ষার সময়ের ওপর নির্ভর করে। ঘাটে নৌকার ভাড়া স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত হয়, একটি ডিঙির জন্য আনুমানিক ৭৫০ থেকে ১৫০০ টাকা। বনে প্রবেশের জন্য টিকিট বা ফি থাকলে ঘাটেই তা জানিয়ে দেওয়া হয়।
সিলেট শহরে সব বাজেটের হোটেল ও গেস্টহাউস আছে। রাতারগুলের আশপাশে থাকার ভালো ব্যবস্থা তেমন নেই, তাই শহরে থেকে সকালে বেরিয়ে দুপুরের মধ্যে ফেরা সবচেয়ে সুবিধাজনক। একই দিনে বিকেলে বিছনাকান্দি বা সাদা পাথর যোগ করতে চাইলে আলাদা পরিকল্পনা লাগবে, কারণ সেগুলো ভিন্ন দিকে।
আধা দিনের পরিকল্পনা ও সঙ্গে যা নেবেন
বিজ্ঞাপন
রাতারগুল ঘোরার জন্য পুরো দিন লাগে না। সকালে নাশতা সেরে আটটার দিকে শহর থেকে রওনা দিলে নয়টার মধ্যে ঘাটে পৌঁছানো যায়। নৌকায় দেড়-দুই ঘণ্টা বনে ঘুরে, টাওয়ারে উঠে, ঘাটের পাশের দোকানে চা খেয়ে দুপুরের আগেই শহরে ফেরা সম্ভব। বিকেলটা তখন শহরের ভেতরের দর্শনীয় স্থান, যেমন হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার এলাকা বা সুরমা নদীর তীরে কাটাতে পারেন।
ঘাটে নামার পর অনেক সময় একাধিক মাঝি একসঙ্গে ডাকাডাকি শুরু করেন। ভাড়া, ঘোরার সময় আর টাওয়ার পর্যন্ত যাবেন কি না, এই তিনটি বিষয় নৌকায় ওঠার আগেই পরিষ্কার করে নিন। পরে ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো যাবে।
সঙ্গে রাখার মতো জিনিস: পানির বোতল, হালকা শুকনো খাবার, ছাতা বা রেইনকোট, মোবাইলের জন্য জলরোধী পাউচ, পোকামাকড় তাড়ানোর লোশন, ছোট তোয়ালে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ। বনের ভেতরে কোনো দোকান নেই, আর ঘাটের দোকানেও সব জিনিস পাওয়া যায় না।
ক্যামেরা নিয়ে গেলে ওয়াইড লেন্স কাজে লাগে, কারণ গাছের সারি আর পানির প্রতিফলন একসঙ্গে ধরতে চাইলে চওড়া ফ্রেম দরকার। নৌকায় ট্রাইপড ব্যবহারের সুযোগ প্রায় নেই।
বিজ্ঞাপন
নিরাপত্তা ও সতর্কতা
১. লাইফ জ্যাকেট: বর্ষায় বনের কোথাও কোথাও পানি বেশ গভীর। নৌকায় ওঠার আগে লাইফ জ্যাকেট চেয়ে নিন, শিশুদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক মনে করুন।
২. পানিতে নামবেন না: গাছের শিকড় আর কাদার কারণে এখানে সাঁতার কাটা বিপজ্জনক। ছবি তোলার জন্য নৌকার কিনারে ঝুঁকে দাঁড়াবেন না।
৩. সাপ ও জোঁক: বনে বিষধর সাপ আছে। গাছের ডালে হাত দেবেন না, নৌকা থেকে হাত পানিতে ডুবিয়ে রাখবেন না। হাঁটতে হলে লম্বা প্যান্ট ও বন্ধ জুতা পরুন।
বিজ্ঞাপন
৪. মোবাইল ও ক্যামেরা: নৌকা দুলে উঠলে ফোন পানিতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। জলরোধী পাউচ বা ছোট পলিথিন রাখুন।
৫. বৃষ্টির প্রস্তুতি: বর্ষায় হঠাৎ বৃষ্টি নামে। ছাতা, রেইনকোট আর অতিরিক্ত এক সেট কাপড় সঙ্গে রাখুন।
৬. বন রক্ষা: প্লাস্টিক, পলিথিন বা খাবারের উচ্ছিষ্ট পানিতে ফেলবেন না। মাঝিকেও উচ্চ শব্দে গান বাজাতে নিষেধ করুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট কোথায় অবস্থিত?
সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে, সিলেট শহর থেকে আনুমানিক ২৬ কিলোমিটার উত্তরে।
শীতকালে কি রাতারগুল যাওয়া উচিত?
শীতে পানি প্রায় থাকে না, নৌকাভ্রমণও হয় না। জলাবনের আসল রূপ দেখতে চাইলে বর্ষায় যাওয়াই ভালো।
বিজ্ঞাপন
এক নৌকায় কতজন উঠতে পারেন?
সাধারণত চার থেকে পাঁচজন। এর বেশি মানুষ উঠলে নৌকা ভারসাম্য হারাতে পারে, তাই মাঝি অনুমতি দিলেও বাড়তি লোক উঠবেন না।
শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে কি রাতারগুল যাওয়া যায়?
যায়, কারণ পুরো ভ্রমণটাই নৌকায় বসে। তবে লাইফ জ্যাকেট নিশ্চিত করুন এবং বৃষ্টি বা ঝড়ের পূর্বাভাস থাকলে সেদিন যাওয়া এড়িয়ে চলুন।
বিজ্ঞাপন
রাতারগুল ঘুরতে মোট কত সময় লাগে?
সিলেট শহর থেকে যাওয়া-আসা আর নৌকায় ঘোরা মিলিয়ে সাধারণত চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। তাই সকালে বের হলে দুপুরের মধ্যে ফেরা যায়।