ওমরাহ কী: ওমরাহর ফজিলত, বিধান এবং হজের সঙ্গে পার্থক্য
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
ওমরাহকে অনেকে 'ছোট হজ' বলেন। কথাটা পুরোপুরি ভুল নয়, আবার পুরোপুরি ঠিকও নয়। ওমরাহতে হজের মতোই ইহরাম, কাবা শরিফ তাওয়াফ ও সাফা-মারওয়ায় সাঈ আছে, কিন্তু আরাফা, মুজদালিফা, মিনা কিংবা জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ নেই। আর সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, হজ বছরে একবার নির্দিষ্ট দিনে হয়, ওমরাহ প্রায় সারা বছর করা যায়।
বিজ্ঞাপন
বিধানের দিক থেকে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য জীবনে একবার ওমরাহ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবের মতে তা জীবনে একবার ওয়াজিব। সুতরাং ওমরাহ ফরজ নয়, তবে এমন গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা সুযোগ থাকলে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
ওমরাহ শব্দের অর্থ ও পরিচয়
আরবি 'উমরাহ' শব্দের আভিধানিক অর্থ জিয়ারত করা, কোনো জায়গায় সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে যাওয়া। শরিয়তের পরিভাষায় মিকাত থেকে ইহরাম বেঁধে মসজিদুল হারামে গিয়ে কাবা শরিফ সাতবার তাওয়াফ করা, সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাতবার সাঈ করা এবং শেষে মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করে ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়াকে ওমরাহ বলা হয়।
কোরআনে হজের সঙ্গে ওমরাহর উল্লেখ এসেছে। সুরা বাকারার ১৯৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ ও ওমরাহ পূর্ণ করো। এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, ওমরাহ শুরু করলে তা যথাযথভাবে শেষ করতে হয়, মাঝপথে ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
বিজ্ঞাপন
ওমরাহ কি ফরজ: বিধান নিয়ে আলেমদের মত
ওমরাহ ফরজ কি না, এ প্রশ্ন অনেকের। চার মাজহাবের কোনোটিতেই ওমরাহ হজের মতো ফরজ নয়। হানাফি ও মালেকি মাজহাবে এটি জীবনে একবার সুন্নতে মুয়াক্কাদা, আর শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবে জীবনে একবার ওয়াজিব। বাংলাদেশে হানাফি মত অনুসরণ করা হয়, তাই এখানে ওমরাহকে গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত হিসেবেই দেখা হয়।
একটি প্রচলিত ধারণা হলো, ওমরাহ করলে নাকি হজ ফরজ হয়ে যায়। আসলে হজ ফরজ হয় আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্যের ভিত্তিতে, ওমরাহ করার কারণে নয়। যিনি হজের খরচ বহন করতে পারেন, তাঁর ওপর ওমরাহ না করলেও হজ ফরজ। তবে কেউ হজের মৌসুম, অর্থাৎ শাওয়াল মাস থেকে মক্কায় অবস্থান করলে তাঁর ক্ষেত্রে কিছু আলোচনা আছে; এমন পরিস্থিতিতে একজন বিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
কোরআন-হাদিসে ওমরাহর ফজিলত
বিজ্ঞাপন
ওমরাহর ফজিলত নিয়ে সহিহ হাদিস বেশ কয়েকটি। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হাদিসটি বুখারি ও মুসলিমে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত:
এক ওমরাহ থেকে আরেক ওমরাহ মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহের কাফফারা, আর মাবরুর হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া কিছু নয়।
তিরমিজি ও নাসায়িতে হজরত ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে মহানবী (সা.) হজ ও ওমরাহ পরপর আদায় করতে বলেছেন। তিনি বলেছেন, এ দুটি দারিদ্র্য ও গুনাহ এমনভাবে দূর করে, যেমন কামারের হাপর লোহা, সোনা ও রুপার ময়লা দূর করে।
রমজান মাসের ওমরাহর বিশেষ মর্যাদার কথা বুখারি ও মুসলিমে এসেছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, রমজানে ওমরাহ হজের সমতুল্য। আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে সওয়াবের দিক থেকে সমতুল্য বোঝানো হয়েছে। এর মানে এই নয় যে রমজানে ওমরাহ করলে ফরজ হজ আদায় হয়ে যাবে।
বিজ্ঞাপন
ফজিলতের এই কথাগুলোর সঙ্গে একটি শর্ত জড়িয়ে আছে: ইবাদত হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, হালাল টাকায় এবং সঠিক নিয়মে। লোক দেখানো, ছবি তুলে প্রচারের প্রতিযোগিতা কিংবা সফরে সঙ্গীদের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ ইবাদতের সৌন্দর্য নষ্ট করে। যাঁরা ওমরাহ থেকে ফিরে আসেন, তাঁদের কাছে পরিবার ও প্রতিবেশীরা নতুন আচরণ আশা করেন। নামাজে নিয়মিত হওয়া, মানুষের হক আদায় করা ও গুনাহ থেকে দূরে থাকাই একটি ওমরাহ কবুল হওয়ার বাস্তব লক্ষণ বলে আলেমরা মনে করেন।
নবীজির (সা.) ওমরাহগুলো
বুখারি ও মুসলিমে হজরত আনাস (রা.) জানিয়েছেন, মহানবী (সা.) জীবনে চারটি ওমরাহ করেছেন। বিদায় হজের সঙ্গে আদায় করা ওমরাহটি ছাড়া বাকি সবগুলো ছিল জিলকদ মাসে।
১. হুদায়বিয়ার ওমরাহ: ষষ্ঠ হিজরিতে সাহাবিদের নিয়ে রওনা হলেও মক্কার কুরাইশরা বাধা দেয়। হুদায়বিয়ায় সন্ধি হয় এবং সেখানেই পশু জবাই করে ইহরাম খোলা হয়।
বিজ্ঞাপন
২. উমরাতুল কাজা: সন্ধির শর্ত অনুযায়ী পরের বছর মুসলমানরা মক্কায় এসে ওমরাহ আদায় করেন।
৩. জিরানার ওমরাহ: হুনাইনের যুদ্ধের পর জিরানা থেকে ইহরাম বেঁধে এ ওমরাহ করা হয়।
৪. বিদায় হজের সঙ্গে ওমরাহ: দশম হিজরিতে হজের সঙ্গে এই ওমরাহ আদায় করা হয়।
এই ইতিহাস জানার একটা বাস্তব লাভ আছে। জিরানা ও তানইম, যেখান থেকে আজও মক্কায় অবস্থানকারীরা নতুন ওমরাহর ইহরাম বাঁধেন, সেগুলোর পরিচিতি নবীজি ও সাহাবিদের আমল থেকেই।
বিজ্ঞাপন
হজ ও ওমরাহর পার্থক্য
দুটি ইবাদতে মিল অনেক, কিন্তু পার্থক্যগুলো স্পষ্ট জানা থাকলে প্রস্তুতি নিতে সুবিধা হয়।
১. বিধান: সামর্থ্যবানের ওপর হজ জীবনে একবার ফরজ। ওমরাহ হানাফি মতে সুন্নতে মুয়াক্কাদা।
২. সময়: হজ কেবল জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে হয়। ওমরাহ বছরের প্রায় যেকোনো দিন করা যায়।
বিজ্ঞাপন
৩. কাজের পরিধি: হজে আরাফায় অবস্থান, মুজদালিফায় রাতযাপন, মিনায় অবস্থান, জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ ও তাওয়াফে জিয়ারত আছে। ওমরাহতে কেবল ইহরাম, তাওয়াফ, সাঈ ও মাথা মুণ্ডন।
৪. সময়ের দৈর্ঘ্য: হজের আনুষ্ঠানিকতা পাঁচ-ছয় দিন চলে। ওমরাহ কয়েক ঘণ্টায় শেষ হতে পারে।
৫. কোরবানি: তামাত্তু ও কিরান হজে শুকরিয়ার কোরবানি ওয়াজিব। ওমরাহতে কোনো কোরবানি নেই।
৬. ফরজের সংখ্যা: হানাফি মতে হজের ফরজ তিনটি: ইহরাম, আরাফায় অবস্থান ও তাওয়াফে জিয়ারত। ওমরাহতে ইহরাম শর্ত এবং তাওয়াফ ফরজ।
বিজ্ঞাপন
৭. খরচ ও প্রক্রিয়া: হজের জন্য সরকারি নিবন্ধন, নির্দিষ্ট কোটা ও প্যাকেজের বিষয় আছে। ওমরাহর প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ, খরচও সাধারণত কম।
কখন ওমরাহ করা যায়, কখন মাকরুহ
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী বছরের পাঁচ দিন ওমরাহর ইহরাম বাঁধা মাকরুহে তাহরিমি: ৯ জিলহজ আরাফার দিন থেকে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত। এ দিনগুলো হজের জন্য নির্ধারিত। বাকি সারা বছর ওমরাহ করা যায়।
তবে বাস্তবতাও মাথায় রাখা দরকার। হজের মৌসুমের আগে-পরে কিছু সময় সৌদি কর্তৃপক্ষ ওমরাহ ভিসা দেওয়া বন্ধ রাখে। রমজানে, বিশেষ করে শেষ দশকে ভিড় সবচেয়ে বেশি থাকে, খরচও বাড়ে। বয়স্ক বা অসুস্থ কেউ গেলে তুলনামূলক কম ভিড়ের মাস বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
বিজ্ঞাপন
ঘন ঘন ওমরাহ করা যায় কি না, এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে ভিন্নমত আছে। অনেকে একবার মক্কায় থাকার সময় একাধিক ওমরাহকে জায়েজ বলেন, আবার অনেকে বেশি বেশি নফল তাওয়াফকে উত্তম মনে করেন। দুই মতের পক্ষেই যুক্তি আছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ওমরাহ করলে কি ফরজ হজ আদায় হয়ে যায়?
না। ওমরাহ আলাদা ইবাদত। রমজানের ওমরাহর সওয়াব হজের সমতুল্য বলা হলেও তাতে ফরজ হজের দায়িত্ব শেষ হয় না।
বিজ্ঞাপন
অন্যের পক্ষ থেকে ওমরাহ করা যায়?
হানাফি মতে মৃত বা শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তির পক্ষ থেকে নফল ওমরাহ করা যায়। এ ক্ষেত্রে ইহরামের নিয়তের সময় যাঁর পক্ষ থেকে করছেন, তাঁর কথা মনে রাখবেন।
ওমরাহ করার জন্য কি নির্দিষ্ট বয়স লাগে?
না, শিশুরাও অভিভাবকের সঙ্গে ওমরাহ করতে পারে। তবে শিশুর ওমরাহ নফল হিসেবে গণ্য হয়। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সামর্থ্য থাকলে তার সুন্নত ওমরাহর সুযোগ থাকে।
বিজ্ঞাপন
নারীরা কি একা ওমরাহে যেতে পারেন?
হানাফি মাজহাবে সফরের দূরত্বে নারীর জন্য মাহরাম সঙ্গী থাকা জরুরি। সৌদি আরবের ভিসা নীতিতে কিছু শিথিলতা এলেও শরিয়তের দিক থেকে বিষয়টি নিয়ে আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত।