সাদা পাথর ভোলাগঞ্জ: কোথায় অবস্থিত, যাওয়ার উপায় ও ঘোরার টিপস
ট্রাভেল ডেস্ক · সিলেট
প্রকাশ:
সাদা পাথর কোথায়? সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে, ভারতের মেঘালয় সীমান্তের একেবারে কাছে। মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা ধলাই নদ যেখানে বাংলাদেশে ঢুকেছে, সেই মুখে পানির স্রোতে বয়ে আসা অসংখ্য সাদা ও ধূসর পাথর জমে আছে। ওপরে পাহাড়, নিচে স্বচ্ছ ঠান্ডা পানি আর পাথরের বিছানা, এই দৃশ্যের জন্যই জায়গাটির নাম সাদা পাথর।
বিজ্ঞাপন
সিলেট শহর থেকে সাদা পাথর ভোলাগঞ্জের দূরত্ব আনুমানিক ৩৩ কিলোমিটার। সিলেট-ভোলাগঞ্জ সড়ক ভালো হওয়ায় শহর থেকে এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময়ে ভোলাগঞ্জ ঘাটে পৌঁছানো যায়। ঘাট থেকে ইঞ্জিন নৌকায় পনেরো-বিশ মিনিটের পথ।
একটি কথা আগেই জেনে রাখা ভালো। অবৈধ পাথর উত্তোলনের কারণে সাদা পাথরের পাথর কমে যাওয়ার অভিযোগ বিভিন্ন সময় উঠেছে, প্রশাসন অভিযানও চালিয়েছে। তাই জায়গাটির চেহারা মৌসুম ও সময়ভেদে আগের ছবির চেয়ে আলাদা লাগতে পারে।
ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সরাসরি ভোলাগঞ্জ যাওয়ার চেয়ে সিলেট শহর হয়ে যাওয়াই সুবিধাজনক।
বিজ্ঞাপন
১. ঢাকা থেকে সিলেট: সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, আরামবাগ ও মহাখালী থেকে সিলেটের বাস পাওয়া যায়, সময় লাগে ছয়-সাত ঘণ্টা। কমলাপুর থেকে পারাবত, জয়ন্তিকা, কালনী ও উপবন এক্সপ্রেস চলে। আকাশপথে ঢাকা থেকে সিলেটের নিয়মিত ফ্লাইটও আছে।
২. সিলেট শহর থেকে ভোলাগঞ্জ: শহরের আম্বরখানা এলাকা থেকে ভোলাগঞ্জগামী সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাস ছাড়ে। শেয়ারে গেলে খরচ কম, রিজার্ভ নিলে সময় বাঁচে এবং ফেরার সময় অপেক্ষার ঝামেলা থাকে না।
৩. ঘাট থেকে নৌকা: ভোলাগঞ্জ বাজারের পাশের ঘাট, যা স্থানীয়ভাবে ১০ নম্বর ঘাট নামে পরিচিত, সেখান থেকে সাদা পাথরের নৌকা ছাড়ে। নৌকার ভাড়া সাধারণত ঘাটে নির্ধারিত থাকে এবং যাওয়া-আসা মিলিয়ে হিসাব হয়।
ঘোরার সেরা সময়
বিজ্ঞাপন
সাদা পাথর ভালো লাগে বর্ষার শেষ ভাগ থেকে শরৎ পর্যন্ত, মোটামুটি জুলাই থেকে অক্টোবর। তখন নদে পর্যাপ্ত পানি থাকে, স্রোত পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যায়, আর ওপারের পাহাড় থাকে মেঘে ঢাকা। ভারী বর্ষণের সময় ও পাহাড়ি ঢলের পূর্বাভাস থাকলে যাওয়া বাদ দিন, তখন নদ হঠাৎ ফুলে উঠতে পারে।
শীত ও শুষ্ক মৌসুমে পানি অনেক কমে যায়। হাঁটার জন্য সুবিধা হলেও স্রোতের সেই চেনা দৃশ্য থাকে না। ছুটির দিনে দুপুরের পর ভিড় বাড়ে, তাই সকাল সকাল পৌঁছানো ভালো।
শুক্র ও শনিবার এবং ঈদের ছুটিতে ঘাটে নৌকার জন্য লম্বা সারি পড়ে যায়, সাদা পাথরের মূল অংশেও দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়া কঠিন হয়। সম্ভব হলে সপ্তাহের মাঝের কোনো দিন বেছে নিন। তখন নৌকার ভাড়া নিয়েও দরদামের সুযোগ বেশি থাকে, আর ছবিও ভিড় ছাড়া তোলা যায়।
ভোলাগঞ্জ এলাকাটি বহু বছর ধরে পাথর কোয়ারির জন্য পরিচিত। ঘাটে যাওয়ার পথে পাথর ভাঙার যন্ত্র আর পাথরবোঝাই ট্রাক চোখে পড়বে। ষাটের দশকে পাথর পরিবহনের জন্য এখানে একটি রোপওয়েও তৈরি হয়েছিল, যার কিছু অবকাঠামো এখনো দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
সাদা পাথর ভোলাগঞ্জ ভ্রমণ খরচ
খরচ নির্ভর করে আপনি কোথা থেকে যাচ্ছেন, কয়জন যাচ্ছেন আর কীভাবে যাচ্ছেন তার ওপর। নিচের হিসাব সাধারণ ধারণা দেওয়ার জন্য, সবই আনুমানিক।
ঢাকা-সিলেট যাতায়াত: নন-এসি বাস বা ট্রেনে জনপ্রতি যাওয়া-আসা আনুমানিক ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকা, এসি বাসে আরও বেশি।
সিলেট-ভোলাগঞ্জ: শেয়ার সিএনজি বা বাসে জনপ্রতি আনুমানিক ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা এক পথে। পুরো দিনের জন্য সিএনজি রিজার্ভ আনুমানিক ১২০০ থেকে ২০০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
নৌকা: একটি নৌকায় সাধারণত আট-দশজন যাওয়া যায়, যাওয়া-আসার ভাড়া আনুমানিক ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা। দলে কম মানুষ হলে অন্যদের সঙ্গে নৌকা ভাগ করে নিতে পারেন।
খাবার: ভোলাগঞ্জ ও সাদা পাথর এলাকায় ছোট খাবারের দোকানে ভাত, মাছ, মুরগি ও হালকা নাশতা পাওয়া যায়। দাম আগে জেনে নিন।
সিলেট শহরে থাকলে জনপ্রতি আনুমানিক ৩৫০০ থেকে ৫৫০০ টাকায় ঢাকা থেকে সাধারণ মানের একটি সাদা পাথর ভ্রমণ সেরে আসা যায়।
সেখানে গিয়ে যা করবেন, যা করবেন না
বিজ্ঞাপন
পাথরের ওপর বসে পা ভিজিয়ে স্রোতের শব্দ শোনা, ওপারের পাহাড় আর মেঘের ছবি তোলা, এই সাদামাটা কাজগুলোই সাদা পাথরের আনন্দ। চাইলে নৌকায় নদের কিছুটা অংশ ঘুরে দেখতে পারেন।
পাথর নেবেন না: স্মৃতি হিসেবে পাথর তুলে আনা অনেকে নির্দোষ কাজ মনে করেন। কিন্তু এই পাথরই জায়গাটির সম্পদ, আর এখানে পাথর তোলা আইনত নিষিদ্ধ।
স্রোতকে হালকা ভাববেন না: পানি দেখতে অগভীর হলেও স্রোত প্রবল এবং পাথরের ফাঁকে গভীর গর্ত থাকে। পাথর উত্তোলনের কারণেও কোথাও কোথাও তলায় অপ্রত্যাশিত গর্ত তৈরি হয়েছে। সাঁতার কাটতে বা গভীরে নামতে যাবেন না।
পিচ্ছিল পাথর: শ্যাওলা ধরা পাথরে পা পিছলে আঘাত পাওয়া সাধারণ ঘটনা। স্যান্ডেলের বদলে ভালো গ্রিপের রাবারের জুতা পরুন।
বিজ্ঞাপন
সীমান্তের দিকে নয়: সাদা পাথরের ওপারেই ভারত। বিজিবির নির্দেশিত সীমার বাইরে যাবেন না, শূন্যরেখার কাছে ছবি তোলার চেষ্টাও করবেন না।
ভেজা কাপড়ের প্রস্তুতি: পানিতে পা ভেজাতেই হবে, তাই বাড়তি কাপড়, তোয়ালে আর মোবাইলের জন্য পলিথিন সঙ্গে নিন। সেখানে কাপড় বদলের ব্যবস্থা সীমিত।
সঙ্গে যা নেবেন
সাদা পাথরে ছায়া কম, দোকানপাটও সীমিত। তাই প্রস্তুতি নিয়ে যাওয়াই ভালো।
বিজ্ঞাপন
১. রাবারের জুতা বা স্যান্ডেল: পিছলে না যায় এমন তলার জুতা। খালি পায়ে পাথরে হাঁটলে পা কেটে যেতে পারে।
২. বাড়তি কাপড় ও তোয়ালে: পানিতে পা ভেজাতে গিয়ে কাপড় ভিজে যাওয়া প্রায় নিশ্চিত। ফেরার পথে ভেজা কাপড়ে সিএনজিতে বসা অস্বস্তিকর।
৩. জলরোধী পাউচ: মোবাইল, টাকা ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি রাখার জন্য।
৪. রোদ থেকে সুরক্ষা: টুপি, সানগ্লাস ও সানস্ক্রিন। মেঘলা দিনেও পানির প্রতিফলনে রোদ বেশি লাগে।
বিজ্ঞাপন
৫. খাবার পানি ও হালকা খাবার: বিশেষ করে শিশুদের জন্য। তবে খাবারের প্যাকেট ফেরার সময় সঙ্গে নিয়ে আসুন।
৬. ছোট ব্যাগ: হাত খালি রাখলে পাথরে ভারসাম্য রাখা সহজ হয়, তাই কাঁধের ব্যাগের বদলে পিঠের ছোট ব্যাগ নিন।
একই সফরে আর কী দেখা যায়
সিলেটে দুই-তিন দিন থাকলে সাদা পাথরের সঙ্গে রাতারগুল, বিছনাকান্দি ও জাফলং যোগ করা যায়। তবে এগুলো সিলেট শহর থেকে ভিন্ন ভিন্ন দিকে, তাই প্রতিদিন একটি বা দুটি জায়গা রাখাই বাস্তবসম্মত। সাদা পাথরের দিনে সকালে সাদা পাথর ঘুরে বিকেলে শহরে ফিরে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার এলাকা বা কিনব্রিজের পাশে সুরমা নদীর তীরে সময় কাটাতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সাদা পাথর ভোলাগঞ্জ কোথায় অবস্থিত?
সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে, ধলাই নদের উৎসমুখে, সিলেট শহর থেকে আনুমানিক ৩৩ কিলোমিটার উত্তরে।
সিলেট থেকে সাদা পাথর যেতে কত সময় লাগে?
বিজ্ঞাপন
সড়কপথে ভোলাগঞ্জ ঘাট পর্যন্ত সাধারণত এক থেকে দেড় ঘণ্টা, তারপর নৌকায় পনেরো-বিশ মিনিট।
সাদা পাথরে কি গোসল করা যায়?
তীরের কাছে অগভীর অংশে পা ভেজানো যায়, কিন্তু গভীর পানিতে নামা বা সাঁতার কাটা বিপজ্জনক। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকলে তা মেনে চলুন।
শীতকালে সাদা পাথর কেমন থাকে?
বিজ্ঞাপন
শীতে পানি অনেক কমে যায়, পাথরের চর বেশি জেগে থাকে। স্রোত ও সবুজ পানির দৃশ্য চাইলে বর্ষার শেষ দিকে যাওয়াই ভালো।
সাদা পাথরে কি রাতে থাকার ব্যবস্থা আছে?
ভোলাগঞ্জ এলাকায় কিছু সাধারণ মানের থাকার জায়গা থাকলেও বেশির ভাগ পর্যটক সিলেট শহরে থেকে দিনে দিনে ঘুরে আসেন। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় সন্ধ্যার আগেই ঘাটে ফেরা নিরাপদ।