এআই চ্যাট ডিলিট করলেও সব তথ্য মুছে যায় না
অ্যান্ড্রয়েড ফোনের মুছে ফেলা এআই কথোপকথন পুনরুদ্ধারে ওরিজা (ORISA) নামের টুল তৈরি করেছেন জর্জিয়া টেক ইউনিভার্সিটির গবেষকরা।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:
স্মার্টফোনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এখনকার সময়ে দৈনন্দিন একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজের প্রয়োজনে কিংবা কৌতূহল মেটাতে আমরা নিয়মিত এআইয়ের সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলি এবং চ্যাট শেষে তা ডিলিটও করে দিই। সাধারণত ব্যবহারকারীরা মনে করেন যে, চ্যাট ডিলিট করার অর্থ হলো সবকিছু চিরতরে মুছে যাওয়া। কিন্তু জর্জিয়া টেক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষকের নতুন গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। তাঁদের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ফোন থেকে এআই চ্যাট মুছে ফেললেও তার সব চিহ্ন হারিয়ে যায় না।
বিজ্ঞাপন
গবেষকেরা ওরিজা (ORISA) নামের একটি বিশেষ টুল তৈরি করেছেন, যা অ্যান্ড্রয়েড ফোন থেকে মুছে ফেলা এআই কথোপকথন ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। এই টুলের বিশেষত্ব হলো, এটি শুধু হারানো তথ্য খুঁজে বের করে না, বরং তথ্যের টুকরোগুলো জোড়া লাগিয়ে আগের এআই সেশনটিকে পুরোপুরি সচল করে দিতে পারে।
এই গবেষণার বিষয়টি অনুধাবন করতে হলে লোকাল এআই এবং ক্লাউড এআইয়ের মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে হবে। চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো এআইগুলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে বড় সার্ভারে যুক্ত থাকে, যেগুলোকে ক্লাউড এআই বলা হয়। অন্যদিকে, কিছু এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ইন্টারনেটের সাহায্য ছাড়াই সরাসরি ফোনের প্রসেসরে চলে, যেগুলোকে লোকাল এআই বলা হয়।
অনেকেই লোকাল এআই ব্যবহার করাকে বেশি নিরাপদ মনে করেন, কারণ এতে ব্যক্তিগত কথোপকথন ইন্টারনেটের মাধ্যমে অন্য সার্ভারে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। কিন্তু গবেষকেরা দেখিয়েছেন, লোকাল এআই যখন ফোনে চলে, তখন এর তথ্যগুলো ফোনের র্যামে জমা হতে থাকে। ব্যবহারকারী চ্যাট ডিলিট করলেও র্যামের কোনো এক কোনায় সেই তথ্যের টুকরোগুলো থেকে যায়। ওরিজা ঠিক এই জায়গাটিতেই কাজ করে এবং ফোনের মেমোরি তন্নতন্ন করে খুঁজে মুছে ফেলা চ্যাটের টুকরোগুলো উদ্ধার করে।
গবেষকেরা বিষয়টি পরীক্ষা করার জন্য একটি অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করেন। তাঁরা চ্যাটারইউআই নামে একটি অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ ব্যবহার করে ‘প্রজেক্ট নোট কিপার’ নামে একটি কাল্পনিক এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট তৈরি করেন। এরপর সেই এআইকে একটি কাল্পনিক প্রজেক্টের ১০০টি তথ্য দেওয়া হয় এবং তথ্য দেওয়ার পর পুরো চ্যাট হিস্ট্রি ডিলিট করে দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
এর পরপরই ওরিজার কাজ শুরু হয়। টুলটি ডিলিট করা চ্যাট থেকে তথ্য উদ্ধার করে নতুন করে একটি সেশন চালু করে। গবেষকেরা যখন ওই উদ্ধার করা এআইয়ের কাছে আগের প্রজেক্টের তথ্য জানতে চান, তখন সেটি ২৬টি তথ্য নিখুঁতভাবে ফেরত দেয়।
এখানে একটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। চ্যাট ডিলিট করার আগে মূল এআই সেশনটি একসঙ্গে মাত্র ১৪টি তথ্য মনে রাখতে পারত, কারণ যেকোনো এআইয়ের নির্দিষ্ট পরিমাণ তথ্য মনে রাখার সীমা থাকে। কিন্তু ওরিজা যখন মেমোরি থেকে তথ্য উদ্ধার করল, তখন সেটি ২৬টি তথ্য বের করে আনে। এর অর্থ হলো, চ্যাট চলাকালীন এআই নিজে যে তথ্যগুলো সক্রিয় মেমোরি থেকে বাদ দিয়েছিল, ওরিজা র্যাম ঘেঁটে সেগুলোও বের করে এনেছে।
গবেষক দলের প্রধান এবং পিএইচডি শিক্ষার্থী কেন শু বলেন, ‘কেউ একজন এআইয়ের সঙ্গে কী শেয়ার করেছে এবং বিনিময়ে কী সাহায্য পেয়েছে, তা বের করতে এই টুল দারুণ কাজে আসবে।’
গবেষকেরা ১০টি আলাদা অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ এবং ৩টি ভিন্ন এআই মডেলের ওপর ওরিজার পরীক্ষা চালিয়েছেন। মোট ৬০টি ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, টুলটি প্রতিবারই মেমোরিতে থেকে যাওয়া তথ্য উদ্ধার করতে সফল হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এই গবেষণা একদিকে যেমন ডিজিটাল অপরাধ তদন্তকারীদের জন্য নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলেছে। অপরাধীরা ফোনে এআই ব্যবহার করে কোনো পরিকল্পনা সাজানোর পর তা মুছে ফেললেও তদন্তকারীরা এখন তা উদ্ধার করতে পারবেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত চ্যাটও যে কেউ চাইলেই ফিরিয়ে আনতে পারে, সেই ভয় থেকেই যাচ্ছে।
তবে এতে স্বস্তির একটি জায়গাও রয়েছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, ফোন থেকে ডিলিট করা তথ্য চিরকাল র্যামে থাকে না। ফোন ব্যবহার করার সময় আমরা যখন অন্য অ্যাপ চালাই বা গেম খেলি, তখন মেমোরির ওই জায়গাগুলো নতুন তথ্য দিয়ে পূর্ণ হতে থাকে, যাকে ওভাররাইট বলা হয়। অর্থাৎ, ডিলিট করার পর যত বেশি সময় পার হবে এবং ফোনে যত বেশি কাজ করা হবে, হারানো এআই চ্যাট উদ্ধার করা তত কঠিন হয়ে পড়বে।
২০২৬ সালের ‘আইইইই সিম্পোজিয়াম অন সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রাইভেসি’ সম্মেলনে এই গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমেই ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিতর্কে যুক্ত হলো এক নতুন মাত্রা।