পেরুর মরুভূমির নাজকা লাইন: রহস্য ও ইতিহাস
আনা নিভেস ও কার্স্টেন ল্যাম্বার্স সহ গবেষকদের তত্ত্বের বিশদ বিশ্লেষণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:
পেরুর মরুভূমিতে নাজকা লাইনস নামে পরিচিত বিশাল ভূচিত্রগুলো প্রায় দুই হাজার বছর আগে, খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ থেকে ৫০০ সালের মধ্যে, নাজকা সভ্যতার মানুষ দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ও লাইভ সায়েন্সের সূত্রে জানানো হয়েছে যে এই রেখাগুলোর মোট দৈর্ঘ্য ৮০০ মাইল বা ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটারের বেশি।
বিজ্ঞাপন
এই নকশাগুলোতে মানুষ, প্রাণী, গাছপালা, ফুল এবং বিভিন্ন জ্যামিতিক আকৃতি দেখা যায়; তবে ঠিক কতগুলো নাজকা রেখা রয়েছে, তার সঠিক হিসাব এখনো জানা যায়নি। আধুনিক এআইয়ের সাহায্যে এখনও নতুন নকশা আবিষ্কারের খবর আসে।
দীর্ঘকাল ধরে এই রহস্যময় রেখাগুলোর উদ্দেশ্য নিয়ে গবেষকদের মধ্যে নানা তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থইস্টার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আনা নিভেস জানান, "এই নকশাগুলোর উদ্দেশ্য নিয়ে অনেক রকম ধারণা রয়েছে।" তিনি আরও বলেন, নকশাগুলো আকারে একরকম নয় এবং কিছু বড়, কিছু ছোট, কিছু পাহাড়ে, কিছু সমতল মাটিতে তৈরি।
জার্মানির গবেষক কার্স্টেন ল্যাম্বার্স জানান, "এই নকশাগুলো কেন তৈরি হয়েছিল তার সঠিক উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ, সেকালের কোনো লিখিত বা মৌখিক ব্যাখ্যা আমাদের হাতে নেই। তা ছাড়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব জায়গার ব্যবহারের উদ্দেশ্যও বদলে গেছে।"
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে, শুরুর দিকে পাহাড়ের ঢালে তৈরি নকশাগুলো সম্ভবত দীর্ঘ দূরত্ব থেকে পথচিহ্ন হিসেবে কাজ করত এবং সাময়িক ক্যাম্পের স্থান নির্ধারণে সহায়তা করত। পরবর্তী সময়ে এই স্থানগুলো সমাবেশ, উৎসব ও ভোজের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
বিজ্ঞাপন
১৯৪১ সালে ইতিহাসবিদ পল কোসোক এবং গণিতবিদ মারিয়া রাইখে অনুমান করেন যে এই রেখাগুলো কোনো বিশাল ক্যালেন্ডার বা নক্ষত্রের অবস্থান মাপার যন্ত্র হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে আধুনিক গবেষকরা বলেন, খুব অল্পসংখ্যক নকশাই কেবল নক্ষত্র বা সূর্যের অবস্থার সঙ্গে মেলে। প্রধান গবেষক ক্রিস্টিয়ানে রিখটার জানান, "প্রায় ৮ শতাংশ নকশার সঙ্গে চাঁদের গতির পথ মিলে যায়।" তাই আকাশের গ্রহ বা চাঁদের সঙ্গে কিছু সম্পর্ক থাকা সম্পূর্ণ অসম্ভব নয়।
কিছু নকশার কাছাকাছি পাথরের তৈরি নিচু বেদিতে প্রাচীন মানুষ মৃৎপাত্র, ভুট্টা, কাঁকড়া এবং বিশেষ ধরনের ঝিনুক উপহার হিসেবে রাখত, যা বৃষ্টি, পানি ও মাটির উর্বরতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। অধ্যাপক আনা নিভেসের মতে, কিছু নকশা শুধু একটিমাত্র টানা রেখা দিয়ে তৈরি এবং এই রেখাগুলোর ওপর দিয়ে মানুষ সারিবদ্ধভাবে হেঁটে যেতে পারত, যা থেকে বোঝা যায় এগুলো ধর্মীয় শোভাযাত্রা বা আচার-অনুষ্ঠানের কাজে ব্যবহার করা হতো।
অধ্যাপক ড্যারিল উইলকিনসনের মতে, "এই বিশাল রেখাগুলোর ওপর দিয়ে একসঙ্গে হাঁটা ছিল একটি দলগত কাজ।" এর মাধ্যমে সেকালের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও একসঙ্গে মিলে কাজ করার মানসিকতা গড়ে উঠত।
যে কারণই হোক না কেন, নাজকা সভ্যতার মানুষ শত শত বছর আগে পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক মরুভূমিকে নিজের সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের চমৎকার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিল, যা আজও মানুষকে অবাক করে দেয়।