মেথির উপকারিতা: খাওয়ার নিয়ম আর চুল ও ত্বকের যত্নে ব্যবহার
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
পাঁচফোড়নের পাঁচটি মসলার একটি মেথি। ডালে বা সবজিতে ফোড়ন দিলে যে হালকা তেতো, মিষ্টি গন্ধ ছড়ায়, তার উৎস এই ছোট হলুদাভ দানা। দাদি-নানিদের কাছে মেথি শুধু মসলা নয়, পেটের গোলমাল থেকে চুল পড়া পর্যন্ত নানা সমস্যার ঘরোয়া দাওয়াই।
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞানের চোখে মেথির সবচেয়ে বড় গুণ এর দ্রবণীয় আঁশ। পানিতে ভেজালে মেথি পিচ্ছিল জেলের মতো হয়ে যায়। এই আঁশ পেটে খাবার হজমের গতি ধীর করে, ফলে খাবারের পর রক্তে শর্করা হঠাৎ বেশি বাড়ে না এবং পেট অনেকক্ষণ ভরা থাকে। কিছু গবেষণায় রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল সামান্য কমাতে মেথির সহায়ক ভূমিকা দেখা গেছে। তবে এটি ওষুধের বিকল্প নয়।
সঠিক নিয়মে, পরিমিত পরিমাণে খেলে মেথি নিরাপদ ও উপকারী। কিন্তু বেশি খেলে পেটে গ্যাস, পাতলা পায়খানা হতে পারে, আর কিছু মানুষের জন্য এটি এড়িয়ে চলাই ভালো। নিচে বিস্তারিত।
মেথিতে কী আছে
মেথির দানায় আছে প্রচুর আঁশ, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম ও ম্যাঙ্গানিজ। এক চা-চামচ মেথির ওজন মোটামুটি চার-পাঁচ গ্রাম, এই অল্প পরিমাণেও উল্লেখযোগ্য আঁশ পাওয়া যায়। মেথিতে কিছু বিশেষ উদ্ভিজ্জ যৌগ থাকে, যেগুলোর কারণে এর স্বাদ তেতো এবং গন্ধ তীব্র।
বিজ্ঞাপন
মেথিশাকও খুব পুষ্টিকর। শীতকালে বাজারে পাওয়া যায় এই কচি শাক, এতে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এ ও সি আছে। ডাল বা আলুর সঙ্গে রান্না করলে তেতো ভাব অনেকটা কমে যায়।
মেথির উপকারিতা
১. হজমে সাহায্য: মেথির পিচ্ছিল আঁশ অন্ত্রে পানি ধরে রাখে, মল নরম করে। কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রবণতা থাকলে খাবারে মেথি রাখা উপকারী হতে পারে, সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি পান জরুরি।
২. রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক: খাবারের সঙ্গে মেথি খেলে শর্করা শোষণ ধীর হয়। টাইপ-২ ডায়াবেটিসে কিছু গবেষণায় সহায়ক প্রভাব পাওয়া গেছে। কিন্তু মেথি খেয়ে নিজে থেকে ডায়াবেটিসের ওষুধ কমানো বা বন্ধ করা বিপজ্জনক।
বিজ্ঞাপন
৩. পেট ভরা অনুভূতি: আঁশের কারণে অনেকক্ষণ খিদে কম লাগে। ওজন নিয়ন্ত্রণে যাঁরা চেষ্টা করছেন, তাঁদের জন্য এটি একটি সাহায্যকারী অভ্যাস হতে পারে, তবে মেথি নিজে চর্বি গলায় না।
৪. কোলেস্টেরলে সামান্য প্রভাব: দ্রবণীয় আঁশ অন্ত্রে কিছু চর্বি শোষণে বাধা দেয়। এ কারণে সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে মেথি কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সামান্য সহায়ক হতে পারে।
৫. বুকের দুধ: প্রসূতি মায়ের দুধ বাড়াতে মেথি খাওয়ার প্রচলন অনেক দেশে আছে। এর পক্ষে প্রমাণ সীমিত। দুধ কম মনে হলে আগে বুকের দুধ খাওয়ানোর পদ্ধতি ঠিক আছে কি না, তা চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত পরামর্শকের সঙ্গে আলাপ করুন।
মেথি খাওয়ার নিয়ম ও মেথি ভেজানো পানি
বিজ্ঞাপন
মেথি ভেজানো পানি: রাতে এক গ্লাস (প্রায় ২৫০ মিলিলিটার) পানিতে এক চা-চামচ মেথি ভিজিয়ে রাখুন। সকালে পানিটা ছেঁকে পান করুন। চাইলে নরম হয়ে যাওয়া দানাগুলোও চিবিয়ে খেতে পারেন। তেতো লাগলে অল্প লেবুর রস মেশাতে পারেন।
অঙ্কুরিত মেথি: ভেজানো মেথি পানি ঝরিয়ে ভেজা সুতি কাপড়ে মুড়ে এক-দুই দিন রাখলে অঙ্কুর বের হয়। এই অঙ্কুরিত মেথি সালাদে মিশিয়ে খাওয়া যায়, তেতো ভাব তুলনামূলক কম।
রান্নায়: ডাল, সবজি, মাছের ঝোল বা আচারে ফোড়ন হিসেবে মেথি ব্যবহার করুন। মেথি হালকা ভেজে গুঁড়া করে রাখলে তরকারিতে আধা চা-চামচ দেওয়া যায়।
পরিমাণের ক্ষেত্রে দিনে এক থেকে দুই চা-চামচ মেথি দানা সাধারণ খাবারের মাত্রা হিসেবে ধরা হয়। প্রথমবার শুরু করলে আধা চা-চামচ দিয়ে শুরু করুন, শরীর মানিয়ে নিলে বাড়ান। বেশি খেলে উপকার বেশি হবে, এমন নয়।
বিজ্ঞাপন
মেথির ক্যাপসুল বা গুঁড়া সাপ্লিমেন্ট হিসেবে বাজারে পাওয়া যায়। এগুলোর মাত্রা খাবারের মেথির চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাবেন না।
মেথিশাক দিয়ে সহজ আলু ভাজি
শীতের মৌসুমে মেথিশাক পেলে এই সহজ ভাজি করে দেখতে পারেন। চার জনের জন্য লাগবে দুই আঁটি মেথিশাক (মোটামুটি ২৫০ গ্রাম), মাঝারি আকারের দুটি আলু ছোট কিউব করে কাটা, একটি পেঁয়াজ কুচি, তিন-চারটি কাঁচা মরিচ, চার কোয়া রসুন থেঁতো, আধা চা-চামচ হলুদ, স্বাদমতো লবণ আর দুই টেবিল চামচ সরিষার তেল।
শাকের শক্ত ডাঁটা বাদ দিয়ে পাতা ভালো করে ধুয়ে কুচি করুন। তেতো ভাব কমাতে চাইলে কুচানো শাকে সামান্য লবণ মাখিয়ে দশ মিনিট রেখে হালকা চিপে পানি ফেলে দিন। কড়াইয়ে তেল গরম করে রসুন ও পেঁয়াজ নরম করে ভাজুন, তারপর আলু, হলুদ ও লবণ দিয়ে ঢেকে অল্প আঁচে আলু সেদ্ধ হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন। এবার শাক ও কাঁচা মরিচ দিয়ে নেড়ে নেড়ে পাঁচ-সাত মিনিট রান্না করুন, যতক্ষণ না পানি শুকিয়ে যায়। গরম ভাত বা রুটির সঙ্গে ভালো লাগে।
বিজ্ঞাপন
চুল ও ত্বকের যত্নে মেথি
মেথির হেয়ার প্যাক: দুই টেবিল চামচ মেথি রাতভর ভিজিয়ে সকালে মিহি করে বেটে নিন। এর সঙ্গে দুই টেবিল চামচ টক দই মিশিয়ে চুলের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত লাগান। আধা ঘণ্টা পর হালকা শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে একবার ব্যবহার করলে চুল নরম ও ঝলমলে লাগে, খুশকির চুলকানিও অনেকের কমে।
মেথি ভেজানো পানি দিয়ে চুল ধোয়া: মেথি ভেজানো পানি ছেঁকে শ্যাম্পুর পর শেষবার চুলে ঢালতে পারেন।
মেথি ও নারকেল তেল: দুই চা-চামচ মেথি আধা কাপ নারকেল তেলে অল্প আঁচে কয়েক মিনিট গরম করে ঠান্ডা হলে ছেঁকে বোতলে রাখুন। গোসলের এক-দুই ঘণ্টা আগে মাথার ত্বকে হালকা মালিশ করুন।
বিজ্ঞাপন
ত্বকে: বাটা মেথির সঙ্গে অল্প মধু মিশিয়ে মুখে পাতলা করে লাগিয়ে দশ মিনিট পর ধুয়ে ফেলা যায়। তৈলাক্ত ত্বকে এটি আরাম দেয়। প্রথমবার কানের পেছনে বা হাতে অল্প লাগিয়ে দেখে নিন, লালচে ভাব বা চুলকানি হলে ব্যবহার করবেন না।
মনে রাখবেন, বংশগত বা হরমোনজনিত টাক, থাইরয়েড বা রক্তস্বল্পতার কারণে চুল পড়লে মেথি দিয়ে তা সারবে না। হঠাৎ অনেক চুল পড়লে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ দেখান।
মেথির অপকারিতা ও কারা সতর্ক থাকবেন
পেটের সমস্যা: বেশি মেথি খেলে পেট ফাঁপা, গ্যাস ও পাতলা পায়খানা হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
ঘাম ও প্রস্রাবে গন্ধ: নিয়মিত মেথি খেলে কারও কারও ঘাম ও প্রস্রাবে মিষ্টি ধরনের গন্ধ হয়, এটি ক্ষতিকর নয়।
গর্ভাবস্থা: খাবারে ফোড়নের মতো সামান্য মেথিতে সমস্যা নেই। কিন্তু গর্ভাবস্থায় বেশি পরিমাণে মেথি, মেথির পানি বা সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়, কারণ এটি জরায়ুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন: ওষুধের সঙ্গে নিয়মিত বেশি মেথি খেলে রক্তে শর্করা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কমে যেতে পারে। মাথা ঘোরা, ঘাম, কাঁপুনি হলে সতর্ক হোন এবং চিকিৎসককে জানান।
রক্ত পাতলা করার ওষুধ: এ ধরনের ওষুধ চললে নিয়মিত মেথি খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
বিজ্ঞাপন
অ্যালার্জি: চিনাবাদাম বা ছোলায় অ্যালার্জি থাকলে মেথিতেও প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
ছোট শিশুকে মেথির পানি বা মেথির গুঁড়া খাওয়ানোর আগে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মেথি ভেজানো পানি কখন খাওয়া ভালো?
বিজ্ঞাপন
সাধারণত সকালে নাশতার আগে বা নাশতার সঙ্গে খাওয়া হয়। খালি পেটে খেলে কারও অস্বস্তি হলে নাশতার পরে খান।
মেথি কি ডায়াবেটিস সারায়?
না। মেথি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক খাবার হতে পারে, কিন্তু ডায়াবেটিস সারায় না। ওষুধ, খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়াম চালিয়ে যেতে হবে।
প্রতিদিন মেথি খাওয়া কি নিরাপদ?
বিজ্ঞাপন
সুস্থ মানুষের জন্য খাবারের পরিমাণে, অর্থাৎ দিনে এক-দুই চা-চামচ মেথি সাধারণত নিরাপদ। পেটে সমস্যা হলে পরিমাণ কমান।
মেথির হেয়ার প্যাক কত দিন লাগালে ফল পাব?
চুলের নরম ভাব প্রথম কয়েকবারেই বোঝা যায়। তবে চুল পড়া কমার মতো পরিবর্তন বুঝতে কয়েক মাস নিয়মিত যত্ন লাগে, আর কারণ ভিন্ন হলে ফল না-ও মিলতে পারে।