কিসমিসের উপকারিতা ও খাওয়ার নিয়ম: ভেজানো কিসমিস কেন খাবেন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
পোলাও, সেমাই বা পায়েসে কিসমিস না দিলে যেন স্বাদ পূর্ণ হয় না। কিন্তু মিষ্টি খাবারের সাজসজ্জার বাইরে কিসমিস নিজেও একটি পুষ্টিকর নাশতা। আঙুর শুকিয়ে কিসমিস তৈরি হয়, ফলে ফলের পুষ্টিগুণ ছোট্ট একটি দানায় ঘন হয়ে থাকে।
বিজ্ঞাপন
কিসমিসের মূল উপকারিতা হলো এতে আছে খাদ্য আঁশ, পটাশিয়াম, কিছুটা আয়রন, প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আর তাৎক্ষণিক শক্তি দেওয়ার মতো প্রাকৃতিক চিনি। নিয়মিত অল্প পরিমাণে খেলে হজমে সাহায্য করে, কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়ক হয় এবং চিপস বা বিস্কুটের চেয়ে ভালো নাশতা হিসেবে কাজ করে।
তবে কিসমিস ছোট বলে অনেকেই মুঠো মুঠো খেয়ে ফেলেন। এতে চিনি ও ক্যালরি দুটোই বেশি। তাই উপকার পেতে পরিমাণ জানা জরুরি।
কিসমিসে কী আছে
আঙুর থেকে পানি বের হয়ে যাওয়ায় কিসমিসে শর্করা, আঁশ ও খনিজ উপাদান ঘন হয়ে থাকে। এর বেশির ভাগ শক্তি আসে প্রাকৃতিক ফলের চিনি থেকে। আরও আছে আঁশ, পটাশিয়াম, আয়রন, ক্যালসিয়াম ও কিছু উদ্ভিজ্জ যৌগ, যেগুলো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।
বিজ্ঞাপন
বাজারে সাধারণত দুই রকম কিসমিস পাওয়া যায়, কালো ও সোনালি। কালো কিসমিস রোদে শুকানো, সোনালি কিসমিস সাধারণত যন্ত্রে শুকানো হয় এবং রং ধরে রাখতে কখনো কখনো সালফার ব্যবহার করা হয়। পুষ্টিগুণে দুটির পার্থক্য সামান্য।
কিসমিসের উপকারিতা
১. হজমে সাহায্য: কিসমিসের আঁশ মলের পরিমাণ বাড়ায় এবং অন্ত্রের নড়াচড়া সহজ করে। পর্যাপ্ত পানির সঙ্গে খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়ক।
২. তাৎক্ষণিক শক্তি: কিসমিসের প্রাকৃতিক চিনি দ্রুত শক্তি জোগায়। দীর্ঘ পরিশ্রম, খেলাধুলা বা ভ্রমণের সময় এক মুঠো কিসমিস কাজের নাশতা।
বিজ্ঞাপন
৩. আয়রনের ভালো সংযোজন: কিসমিসে কিছু আয়রন আছে। শুধু কিসমিস খেয়ে রক্তস্বল্পতা সারবে না, তবে শাকসবজি, ডাল ও মাছ-মাংসের পাশাপাশি এটি খাদ্যতালিকায় সাহায্য করে।
৪. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক পটাশিয়াম: পটাশিয়াম শরীরে লবণের প্রভাবের ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে। কম লবণ ও ফলমূলসমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে কিসমিস ভালো।
৫. হাড়ের জন্য খনিজ: ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য খনিজ অল্প পরিমাণে থাকলেও অন্য খাবারের সঙ্গে মিলে হাড়ের পুষ্টিতে ভূমিকা রাখে।
৬. মিষ্টির ভালো বিকল্প: চা-নাশতায় মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা হলে চিনিযুক্ত বিস্কুট বা মিষ্টির বদলে কয়েকটি কিসমিস খেলে আঁশ ও খনিজ পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
কিসমিস খেলে হৃদরোগ বা ক্যানসার প্রতিরোধ হয়, এমন বড় দাবি বিশ্বাস করার মতো প্রমাণ নেই। এটি সুষম খাবারের একটি ভালো অংশ, ওষুধ নয়।
ভেজানো কিসমিসের উপকারিতা
রাতে কিসমিস পানিতে ভিজিয়ে সকালে খাওয়ার প্রচলন বহু পুরোনো। ভেজানো কিসমিস নরম হয়, চিবানো সহজ হয় এবং অনেকের পেটে সহজে হজম হয়। শুকনো কিসমিস খেলে যাঁদের দাঁতে লেগে থাকে বা গলা শুকিয়ে যায়, তাঁদের জন্য ভেজানো কিসমিস আরামদায়ক।
ভেজানো কিসমিসের পুষ্টিগুণ শুকনো কিসমিসের প্রায় সমান। ভেজালেই আলাদা কোনো জাদুকরি গুণ তৈরি হয় না, তবে সকালে পানির সঙ্গে আঁশ গ্রহণ কোষ্ঠকাঠিন্যে বাড়তি সাহায্য করতে পারে। অনেকে কিসমিস ভেজানো পানিটাও পান করেন, এতে কিছু চিনি ও খনিজ মেশে।
বিজ্ঞাপন
ভেজানোর নিয়ম: ১০ থেকে ১৫টি কিসমিস ভালো করে দুই-তিনবার ধুয়ে নিন, যাতে ধুলা ও আঠালো ভাব চলে যায়। একটি পরিষ্কার কাপে আধা কাপ খাওয়ার পানিতে রাতভর ঢেকে রাখুন। সকালে নাশতার সঙ্গে বা আগে কিসমিস চিবিয়ে খান, চাইলে পানিটাও পান করুন।
কিসমিস খাওয়ার নিয়ম ও পরিমাণ
একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য দিনে এক ছোট মুঠো, অর্থাৎ মোটামুটি ২০ থেকে ৩০ গ্রাম কিসমিস যথেষ্ট। গুনে নিলে সেটা প্রায় ২৫ থেকে ৪০টি ছোট কিসমিস। এর বেশি খেলে চিনি ও ক্যালরি অনেক বেড়ে যায়।
খাওয়ার কিছু উপায়:
বিজ্ঞাপন
১. সকালের নাশতায়: ওটস, সুজি বা দইয়ের সঙ্গে এক চামচ কিসমিস মিশিয়ে নিন।
২. বাদামের সঙ্গে মিশিয়ে: কয়েকটি কাঠবাদাম বা চিনাবাদামের সঙ্গে কিসমিস খেলে শক্তি অনেকক্ষণ থাকে, রক্তে চিনিও হঠাৎ বাড়ে না।
৩. শিশুর টিফিনে: স্কুলের টিফিনে চিপসের বদলে অল্প কিসমিস দিতে পারেন। খুব ছোট শিশুর ক্ষেত্রে গোটা কিসমিস গলায় আটকানোর ঝুঁকি থাকে, তাই নরম করে বা ছোট করে কেটে দিন এবং বসিয়ে খাওয়ান।
৪. রান্নায়: পোলাও, খিচুড়ি বা সালাদে কিসমিস দিলে বাড়তি চিনি ছাড়াই মিষ্টি স্বাদ আসে।
বিজ্ঞাপন
খাওয়ার পর পানি দিয়ে কুলি করা ভালো অভ্যাস, কারণ আঠালো কিসমিস দাঁতে লেগে থেকে ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ায়।
কিসমিসের অপকারিতা ও সতর্কতা
ডায়াবেটিস: কিসমিসে প্রাকৃতিক চিনি বেশি। ডায়াবেটিস থাকলে একসঙ্গে বেশি খাবেন না। দিনে কয়েকটি খেতে চাইলে বাদামের সঙ্গে, প্রধান খাবারের অংশ হিসেবে খান এবং চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে পরিমাণ ঠিক করে নিন।
ওজন বাড়া: অল্প জায়গায় অনেক ক্যালরি থাকায় যাঁরা ওজন কমাতে চান, তাঁদের পরিমাণে কড়া নজর রাখতে হবে।
বিজ্ঞাপন
পেটে গ্যাস ও পাতলা পায়খানা: হঠাৎ অনেক বেশি খেলে আঁশ ও চিনির কারণে পেট ফাঁপা বা পাতলা পায়খানা হতে পারে।
অ্যালার্জি ও সালফার: সোনালি কিসমিসে ব্যবহৃত সালফারে কারও কারও, বিশেষ করে অ্যাজমার রোগীর সমস্যা হতে পারে।
কিডনির রোগ: পটাশিয়াম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বলা হলে কিসমিসসহ শুকনো ফল খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ভালো কিসমিস কেনা ও সংরক্ষণ
বিজ্ঞাপন
বাজারে খোলা ও প্যাকেট, দুই রকম কিসমিসই পাওয়া যায়। কেনার সময় দেখুন দানাগুলো শুকনো ও ঝরঝরে কি না। একটার সঙ্গে আরেকটা খুব বেশি লেপ্টে থাকলে, গায়ে সাদা বা সবুজ ছত্রাকের দাগ থাকলে কিংবা টক বা গেঁজে যাওয়ার গন্ধ এলে সেটি কিনবেন না। খুব চকচকে, অস্বাভাবিক উজ্জ্বল রঙের কিসমিসের চেয়ে স্বাভাবিক রঙের কিসমিস বেছে নেওয়া ভালো। প্যাকেট কিনলে মেয়াদ দেখে নিন।
বাসায় এনে কাচ বা প্লাস্টিকের বয়ামে ভরে ঢাকনা শক্ত করে আটকে রাখুন। আর্দ্র আবহাওয়ায় কিসমিসে সহজে ছত্রাক ধরে, তাই বর্ষাকালে ফ্রিজে রাখলে বেশি দিন ভালো থাকে। খাওয়ার আগে প্রতিবার ভালো করে ধুয়ে নেওয়ার অভ্যাস করুন, কারণ খোলা বাজারের কিসমিসে ধুলাবালি লেগে থাকে।
ঘরে চাইলে রান্না ছাড়াই কিসমিস দিয়ে একটি স্বাস্থ্যকর নাশতা বানাতে পারেন। এক কাপ টক দইয়ের সঙ্গে এক টেবিল চামচ কিসমিস, কয়েকটি কুচি করা বাদাম আর অর্ধেক কলা মিশিয়ে নিলেই সকালের বা বিকেলের হালকা খাবার তৈরি। এতে চিনি যোগ করার দরকার পড়ে না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
খালি পেটে কিসমিস খাওয়া কি ভালো?
সুস্থ মানুষ সকালে খালি পেটে ভেজানো কিসমিস খেতে পারেন, এতে ক্ষতি নেই। তবে ডায়াবেটিস থাকলে খালি পেটে না খেয়ে নাশতার সঙ্গে খাওয়া ভালো।
কালো কিসমিস নাকি সোনালি কিসমিস ভালো?
দুটির পুষ্টিগুণ প্রায় একই। কালো কিসমিসে সাধারণত বাড়তি রাসায়নিক কম থাকে, তাই সালফারে সংবেদনশীল হলে কালোটি বেছে নিন।
বিজ্ঞাপন
গর্ভাবস্থায় কিসমিস খাওয়া যাবে?
পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যায়, এটি শক্তি ও আঁশের ভালো উৎস। তবে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে পরিমাণ ঠিক করুন।
কিসমিস কি রক্ত বাড়ায়?
কিসমিসে কিছু আয়রন আছে, তবে শুধু এটি খেয়ে রক্তস্বল্পতা দূর হয় না। রক্তস্বল্পতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং আয়রনসমৃদ্ধ বিভিন্ন খাবার খান।
বিজ্ঞাপন
রাতে কিসমিস খেলে কি ওজন বাড়ে?
কোনো নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়ার কারণে ওজন বাড়ে না, বাড়ে সারা দিনের মোট ক্যালরি বেশি হলে। রাতে খেতে চাইলে কয়েকটি খান, মুঠো ভরে নয়, আর খাওয়ার পর দাঁত ব্রাশ করে ঘুমান।