ঢাকা থেকে কক্সবাজার ট্রেন: টিকিট, স্টেশন ও যাত্রার খুঁটিনাটি
ট্রাভেল ডেস্ক · কক্সবাজার
প্রকাশ:
একসময় ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়া মানে ছিল সারা রাতের বাসযাত্রা, নয়তো বিমানের টিকিট। দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন রেলপথ চালু হওয়ার পর সেই হিসাব বদলে গেছে। এখন কমলাপুর থেকে সরাসরি ট্রেনে চেপে সমুদ্রশহরে নামা যায়, পথে দেখা যায় চট্টগ্রামের পাহাড়, লোহাগাড়া-চকরিয়ার সবুজ আর শেষ দিকে কক্সবাজারের বনভূমি।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা থেকে কক্সবাজার ট্রেন বলতে এখন মূলত দুটি আন্তনগর ট্রেন: কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেস। দুটিই ঢাকার কমলাপুর থেকে ছাড়ে এবং কক্সবাজার রেলস্টেশনে গিয়ে থামে। একটি সাধারণত রাতে ছেড়ে ভোরে বা সকালে পৌঁছায়, অন্যটি সকালে ছেড়ে দিনের আলোয় পৌঁছায়। যাত্রায় সময় লাগে মোটামুটি আট থেকে নয় ঘণ্টা।
টিকিট কাটতে হয় বাংলাদেশ রেলওয়ের অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থা থেকে, ওয়েবসাইট eticket.railway.gov.bd অথবা রেল সেবা অ্যাপে। এ জন্য নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নিবন্ধিত অ্যাকাউন্ট লাগে। চাহিদা অনেক বেশি, তাই টিকিট ছাড়ার সময়ই কেটে ফেলতে হয়।
দুই ট্রেনের পার্থক্য
কক্সবাজার এক্সপ্রেস: রাতের ট্রেন হিসেবে এটি বেশি জনপ্রিয়। রাতে ট্রেনে উঠে ঘুমিয়ে সকালে কক্সবাজার পৌঁছানো যায়, এতে এক রাতের হোটেল খরচ বাঁচে এবং পুরো প্রথম দিনটা সৈকতে কাটানো যায়।
বিজ্ঞাপন
পর্যটক এক্সপ্রেস: সাধারণত সকালে ঢাকা ছাড়ে। দিনের আলোয় যাত্রা হওয়ায় জানালার পাশে বসে পথের দৃশ্য দেখা যায়, বিশেষ করে চট্টগ্রাম পেরোনোর পর নতুন রেলপথের অংশটুকু। যাঁরা প্রথমবার এই পথে যাচ্ছেন, তাঁদের অনেকে দিনের ট্রেনই পছন্দ করেন।
দুটি ট্রেনের যাত্রাবিরতির স্টেশন, সাপ্তাহিক ছুটির দিন ও ছাড়ার সময় আলাদা। রেলওয়ে সময়ে সময়ে সময়সূচি হালনাগাদ করে, তাই এখানে নির্দিষ্ট ঘড়ির সময় দেওয়া হলো না। টিকিট কাটার সময় অ্যাপে বা ওয়েবসাইটে দেখানো সময়ই চূড়ান্ত ধরুন। ট্রেনের সময়সূচি ঢাকা টু কক্সবাজার জানতে কমলাপুর স্টেশনের অনুসন্ধান কাউন্টার বা রেলওয়ের কল সেন্টারেও খোঁজ নিতে পারেন।
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত আলাদা আন্তনগর ট্রেনও চালু আছে। ঢাকা থেকে সরাসরি টিকিট না পেলে অনেকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এক ট্রেনে, তারপর চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার আরেক ট্রেনে যান। এতে সময় কিছুটা বেশি লাগলেও যাত্রা সম্ভব হয়।
অনলাইনে টিকিট কাটার ধাপ
বিজ্ঞাপন
১. নিবন্ধন: রেল সেবা অ্যাপ বা রেলওয়ের টিকিট ওয়েবসাইটে মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলুন। নিবন্ধন যাত্রার কয়েক দিন আগেই সেরে রাখুন, টিকিট কাটার দিনে নয়।
২. রুট ও তারিখ বাছাই: যাত্রার স্টেশন হিসেবে ঢাকা (কমলাপুর) বা প্রয়োজনে বিমানবন্দর, গন্তব্য কক্সবাজার এবং যাত্রার তারিখ দিন। তালিকায় ট্রেনের নাম, সময় ও খালি আসন দেখা যাবে।
৩. শ্রেণি ও আসন: শোভন চেয়ার, এসি চেয়ার (স্নিগ্ধা) বা এসি বার্থ, যে শ্রেণি চান সেটি বেছে আসন নির্বাচন করুন। একটি অ্যাকাউন্ট থেকে নির্দিষ্টসংখ্যক টিকিটই কাটা যায়।
৪. যাত্রীর তথ্য: সহযাত্রীদের নাম দিতে হয়। ভ্রমণের সময় টিকিটের সঙ্গে পরিচয়পত্র মিলিয়ে দেখা হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
৫. পেমেন্ট: বিকাশ, নগদ, রকেট বা ব্যাংক কার্ডের মতো মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ করুন। সময় পেরোলে আসন ছেড়ে দেওয়া হয়।
৬. টিকিট সংরক্ষণ: পেমেন্টের পর টিকিটের পিডিএফ ও এসএমএস আসে। মোবাইলে রাখলেই চলে, তবে চাইলে প্রিন্ট করে রাখতে পারেন।
রেলওয়ে সাধারণত যাত্রার নির্দিষ্টসংখ্যক দিন আগে নির্দিষ্ট সময়ে টিকিট বিক্রি শুরু করে। কক্সবাজারের ট্রেনের টিকিট, বিশেষ করে বৃহস্পতিবার ও ছুটির আগের দিনগুলোর জন্য, কয়েক মিনিটেই শেষ হয়ে যায়। তাই টিকিট ছাড়ার আগেই লগইন করে প্রস্তুত থাকুন। ফেরার টিকিট কক্সবাজার থেকে একই পদ্ধতিতে কাটতে হয়, সেটিও আগেভাগে কেটে রাখা ভালো।
আসনের শ্রেণি ও আনুমানিক ভাড়া
বিজ্ঞাপন
এই পথে সাধারণত তিন শ্রেণির আসন পাওয়া যায়। ভাড়া রেলওয়ের নির্ধারিত হার অনুযায়ী, তবে ভ্যাট ও অন্যান্য চার্জ যোগ হয় বলে টিকিটে সামান্য পার্থক্য দেখা যায়। নিচের অঙ্কগুলো আনুমানিক।
শোভন চেয়ার: নন-এসি বসার আসন, ভাড়া আনুমানিক ৭০০ টাকার আশপাশে। কম বাজেটের যাত্রীদের প্রথম পছন্দ।
এসি চেয়ার বা স্নিগ্ধা: শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বসার আসন, আনুমানিক ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকা।
এসি বার্থ: রাতের ট্রেনে শুয়ে যাওয়ার সুবিধা, আনুমানিক ২৪০০ টাকার মতো। আসন সংখ্যা কম, তাই সবার আগে শেষ হয়।
বিজ্ঞাপন
পরিবার নিয়ে রাতে গেলে বার্থ আরামদায়ক, আর দিনের ট্রেনে এসি চেয়ারই যথেষ্ট।
বাসের সঙ্গে তুলনা করলে ট্রেনের বড় সুবিধা হলো নিরাপত্তা আর হাঁটাচলার সুযোগ। দীর্ঘ পথে বাসে টানা বসে থাকতে হয়, ট্রেনে উঠে দাঁড়ানো যায়, শৌচাগার ব্যবহার করা যায়। বয়স্ক যাত্রী, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও ছোট শিশুদের নিয়ে ভ্রমণে এই সুবিধা অনেক বড়। শোভন চেয়ারের ভাড়া নন-এসি বাসের ভাড়ার কাছাকাছি, তাই খরচের দিক থেকেও ট্রেন পিছিয়ে নেই।
দিনের ট্রেনে গেলে চট্টগ্রাম পেরোনোর পর জানালার পাশের আসন থেকে পাহাড়, ধানখেত আর চুনতির বনাঞ্চলের পাশ দিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। আসন বাছাইয়ের সময় জানালার পাশের আসন পাওয়া গেলে সেটিই নিন।
কক্সবাজার রেলস্টেশন ও শহরে পৌঁছানো
বিজ্ঞাপন
কক্সবাজার রেলস্টেশনটি শহরের কেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরে, ঝিলংজা এলাকায়। ঝিনুকের আকৃতির এই স্টেশন ভবন নিজেই এখন একটি দেখার জিনিস, অনেকে নেমে প্রথমে ভবনের সামনে ছবি তোলেন। স্টেশনে অপেক্ষার জায়গা, খাবারের দোকান ও অন্যান্য সুবিধা আছে।
স্টেশন থেকে কলাতলী, সুগন্ধা বা লাবণী পয়েন্টের হোটেল এলাকা কয়েক কিলোমিটারের পথ। স্টেশনের বাইরে ইজিবাইক, অটোরিকশা ও সিএনজি পাওয়া যায়। ট্রেন পৌঁছানোর সময় চালকেরা বেশি ভাড়া চাইতে পারেন, তাই উঠার আগে ভাড়া ঠিক করে নিন। দলে থাকলে একটি গাড়ি ভাগ করে নেওয়া সাশ্রয়ী।
যাত্রার আগে কিছু পরামর্শ
১. আগে পৌঁছান: কমলাপুরে প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পেতে আর লাগেজ নিয়ে উঠতে সময় লাগে। ট্রেন ছাড়ার অন্তত আধা ঘণ্টা আগে স্টেশনে থাকুন।
বিজ্ঞাপন
২. খাবার ও পানি: ট্রেনে খাবার কেনার সুযোগ থাকলেও দাম বেশি ও মান অনিশ্চিত। রাতের ট্রেনে নিজের খাবার, পানি আর হালকা নাশতা সঙ্গে রাখুন।
৩. রাতের জন্য প্রস্তুতি: এসি কামরায় রাতে ঠান্ডা লাগে। পাতলা চাদর বা শাল সঙ্গে নিন। মূল্যবান জিনিস মাথার কাছে রাখুন।
৪. দালাল এড়িয়ে চলুন: স্টেশনের বাইরে বা অনলাইনে বেশি দামে টিকিট বিক্রির প্রস্তাব আসে। অন্যের নামে কাটা টিকিটে ভ্রমণ করলে জরিমানা হতে পারে।
৫. ভিড়ের মৌসুম: নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি এবং ঈদের ছুটিতে চাপ সবচেয়ে বেশি। তখন যাত্রার পরিকল্পনা টিকিট পাওয়ার ওপর ভিত্তি করে সাজান, হোটেল বুকিং পরে করুন।
বিজ্ঞাপন
৬. বিলম্ব মাথায় রাখুন: দীর্ঘ পথে ট্রেন দেরিতে পৌঁছাতে পারে। পৌঁছানোর দিনেই সন্ধ্যায় জরুরি কোনো কাজ রাখবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ঢাকা থেকে কক্সবাজার ট্রেনে কত সময় লাগে?
সাধারণত আট থেকে নয় ঘণ্টা। ট্রেনভেদে ও পথের পরিস্থিতিতে সময় কিছুটা কমবেশি হয়।
বিজ্ঞাপন
কক্সবাজারের ট্রেনের টিকিট কি স্টেশনের কাউন্টারে পাওয়া যায়?
রেলওয়ের টিকিটের বড় অংশ এখন অনলাইনে বিক্রি হয়। কাউন্টারে কিছু টিকিট থাকে কি না, তা রেলওয়ের সর্বশেষ নিয়মের ওপর নির্ভর করে, তাই অনলাইনে কাটাই নিরাপদ।
বিমানবন্দর স্টেশন থেকে কি কক্সবাজারের ট্রেনে ওঠা যায়?
এই পথের ট্রেনগুলো সাধারণত ঢাকার বিমানবন্দর স্টেশনে থামে। টিকিট কাটার সময় যাত্রার স্টেশন হিসেবে বিমানবন্দর বেছে নিলে উত্তরা ও আশপাশের যাত্রীদের সুবিধা হয়।
বিজ্ঞাপন
শিশুদের জন্য কি আলাদা টিকিট লাগে?
রেলওয়ের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট বয়সের নিচের শিশুরা বিনা ভাড়ায় বা কম ভাড়ায় যেতে পারে, তবে তাদের জন্য আলাদা আসন বরাদ্দ থাকে না। বড় শিশুর জন্য পূর্ণ টিকিট কাটাই আরামদায়ক।