কক্সবাজারে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর জামিনযোগ্য ধারায় মামলা, ওসিকে আদালতে তলব
রিসোর্টে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও জরুরি বহির্গমনপথের অভাবে ঘটিত দুঃখজনক অগ্নিকাণ্ড
কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি · উখিয়া, কক্সবাজার
প্রকাশ:
কক্সবাজারের উখিয়া পাটুয়ারটেক সৈকতে টুপটুপ রিসোর্টে ১৭ অক্টোবর সকাল সাড়ে আটটায় অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৩ জনের বিরুদ্ধে জামিনযোগ্য ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। আদালত ওসি আতিকুর রহমানকে তলব করেছে, কারণ তিনি মামলায় দণ্ডবিধির ৩০৪‑ক ধারা ব্যবহার করে জামিনযোগ্য রেকর্ড করেছেন।
বিজ্ঞাপন
সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ এক আদেশে ওসি আতিকুর রহমানকে ২৯ অক্টোবর সশরীরে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেন। এই আদেশের বিষয়টি কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহাজাহান এলাহী নূরী প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন এবং নোটিশের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
ওসি আতিকুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, তিনি আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত আদালতের নোটিশ পাননি এবং নোটিশ পেলে যথাসময়ে আদালতে উপস্থিত হয়ে অভিযোগের ব্যাখ্যা দেবেন। তিনি মর্মাহত হয়ে বলেন, আগুন লাগার ব্যস্ততার মধ্যে মামলার এজাহারে দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারা বাদ পড়েছিল এবং পরদিন আদালতে ওই ধারা সংযোজনের আবেদন করা হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মামলায় দণ্ডবিধির ৩০৪‑ক, ৩৩৮ ও ৩৪ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে এবং ১৯ অক্টোবর তদন্ত কর্মকর্তা দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারা সংযোজনের আবেদন করেন। আদালত রেকর্ডিং কর্মকর্তা ওসি আতিকুর রহমানকে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ ৩০৪ ধারা না যুক্ত করার জন্য গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছে।
‘আমার তিন বোনের পাঁচ–ছেলে মেয়ে মারা গেছে, ওরা ৯ জন বেড়াতে এসেছিল’ আদালতের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে। আদালত উল্লেখ করেছে যে রিসোর্টে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও জরুরি বহির্গমনপথ (ফায়ার এক্সিট) না থাকায় দগ্ধ পর্যটকরা ভেতরে আটকা পড়ে ১০ জনের মৃত্যু ঘটেছে।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘদিন ধরে রিসোর্টের মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছাড়া রিসোর্ট পরিচালনা করে আসছিলেন, যা আদালত অসৎ উদ্দেশ্য বলে উল্লেখ করেছে। দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে জরিমানা ও সর্বোচ্চ জীবদ্দশা বা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে, যেখানে ৩০৪‑ক ধারায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
১৭ অক্টোবর সকাল সাড়ে আটটায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে রিসোর্টে আগুনের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ সকাল নয়টার দিকে পৌঁছায়, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা অগ্নি নেভাতে চেষ্টা করে এবং বেলা আড়াইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে, ফলে রিসোর্ট থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক রিমন ঘোষ মরদেহগুলোর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন; পুড়িয়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
১৭ অক্টোবর রাত ১১টার দিকে উখিয়া থানার উপপরিদর্শক আশীষ সূত্রধর অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলা দায়ের করেন, যেখানে চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে; মোট ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। চারজন আসামি হলেন রিসোর্টের মালিক মো. তানভীর সুলতান মিয়া (৩৮), প্রধান ব্যবস্থাপক বরিশালের সাঈদ আহমদ (৩২), ব্যবস্থাপক উখিয়া জালিয়াপালং এলাকার মোহাম্মদ সাইদ (৩০) এবং সহকারী ব্যবস্থাপক চট্টগ্রামের লোহাগাড়া চুনতি এলাকার জাহিদ হোসেন সুমন (২৯)। রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর কর্মরত ১৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
রিসোর্টের আরেকটি মালিক নেওয়াজ মোরশেদের নাম এজাহারে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় বাদ পড়ার অভিযোগে ওসি আতিকুর রহমান আদালতে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করেছেন।
মামলার চার নম্বর আসামি জাহিদ হোসেনকে ১৮ অক্টোবর বিকেলে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয় এবং সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে; আজ বিকেল পর্যন্ত আবেদনটির শুনানি হয়নি এবং শুনানি আগামীকাল সম্ভব। জাহিদ হোসেনকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।