ঘর পরিষ্কার রাখার উপায়: অল্প সময়ে গোছানো ঝকঝকে ঘরের রুটিন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
সারা সপ্তাহ অফিস, স্কুল, রান্নাবান্না সামলে ছুটির দিনে পুরো ঘর পরিষ্কার করতে বসলে দিনটাই শেষ হয়ে যায়, ক্লান্তিও লাগে। অথচ পরের দুই দিনেই ঘর আবার আগের মতো এলোমেলো। এই চক্র থেকে বের হওয়ার উপায় হলো কাজটাকে ভাগ করে নেওয়া।
বিজ্ঞাপন
ঘর পরিষ্কার রাখার আসল রহস্য একদিনের বড় অভিযান নয়, প্রতিদিনের ছোট অভ্যাস। প্রতিদিন পনেরো-বিশ মিনিটের কিছু নির্দিষ্ট কাজ, সপ্তাহে একদিন কয়েকটি বড় কাজ আর মাসে একবার গভীর পরিষ্কার, এই তিন স্তরের রুটিন মেনে চললে ঘর সবসময় মোটামুটি গোছানো থাকে। আর যে ঘরে প্রতিটি জিনিসের নির্দিষ্ট জায়গা আছে, সেখানে গোছানো অনেক সহজ।
পরিবারের সবাই মিলে কাজ ভাগ করলে চাপ আরও কমে। নিচে একটি বাস্তবসম্মত রুটিন, ঘরভেদে কিছু কৌশল আর কম খরচে পরিষ্কারের উপকরণের কথা বলা হলো।
আগে কমান অপ্রয়োজনীয় জিনিস
যত বেশি জিনিস, তত বেশি ধুলা আর তত বেশি গোছানোর ঝামেলা। তাই পরিষ্কারের রুটিন শুরুর আগে একবার ঘর হালকা করে নিন।
বিজ্ঞাপন
এক এক করে আলমারি, তাক, ড্রয়ার আর খাটের নিচ খুলে দেখুন। এক বছরে একবারও পরেননি এমন কাপড়, ভাঙা খেলনা, পুরোনো ঔষধের খালি বাক্স, জমানো পলিথিন, অচল চার্জার, মেয়াদোত্তীর্ণ প্রসাধনী আলাদা করুন। ভালো অবস্থার জিনিস কাউকে দান করুন, বাকিগুলো ফেলে দিন বা ভাঙারিতে বিক্রি করুন। পুরো ঘর একদিনে না করে প্রতি সপ্তাহে একটি আলমারি বা একটি তাক ধরলে কাজটা সহজ হয়।
এরপর প্রতিটি জিনিসের জন্য একটা 'ঠিকানা' ঠিক করুন। চাবি থাকবে দরজার পাশের হুকে, চার্জার একটি নির্দিষ্ট ঝুড়িতে, স্কুলব্যাগ পড়ার টেবিলের পাশে। ব্যবহারের পর জিনিস তার জায়গায় ফিরিয়ে রাখার অভ্যাসই ঘরকে গোছানো রাখে।
প্রতিদিনের ১৫ মিনিটের রুটিন
১. সকালে বিছানা গোছানো: ঘুম থেকে উঠেই চাদর টান করে বালিশ সাজিয়ে রাখুন। মাত্র দুই মিনিট লাগে, কিন্তু পুরো ঘর গোছানো লাগে।
বিজ্ঞাপন
২. রান্নার পর রান্নাঘর মোছা: চুলা ও তাকে পড়া তেল-মসলা গরম থাকতেই ভেজা কাপড়ে মুছে ফেলুন। শুকিয়ে গেলে তুলতে অনেক বেশি কষ্ট হয়।
৩. এঁটো বাসন জমাবেন না: রাতে ঘুমানোর আগে সিংক খালি রাখার নিয়ম করুন। এতে পোকামাকড় ও দুর্গন্ধ দুটোই কমে।
৪. মেঝে ঝাড়ু: বসার ঘর ও রান্নাঘরের মেঝে প্রতিদিন একবার ঝাড়ু দিন। ধুলাবালি বেশি হলে ভেজা মপ দিয়ে মুছুন।
৫. দশ মিনিটের গোছানো: রাতে খাওয়ার পর পরিবারের সবাই দশ মিনিট সময় নিয়ে নিজের জিনিস জায়গামতো রাখুন। সোফায় পড়ে থাকা কাপড়, টেবিলের কাপ, মেঝের খেলনা সব তুলে ফেলুন।
বিজ্ঞাপন
৬. ময়লা ফেলা: প্রতিদিন রান্নাঘরের ময়লার ঝুড়ি খালি করুন, ঝুড়ির ভেতরে পলিথিন ব্যবহার করুন।
সপ্তাহে একদিনের কাজ
ছুটির দিনে এক-দুই ঘণ্টা বরাদ্দ রাখুন। কাজের ক্রম মনে রাখুন: ওপর থেকে নিচে, শুকনো থেকে ভেজা। আগে সিলিং ফ্যান, পর্দার রড ও তাকের ধুলা ঝাড়ুন, তারপর আসবাব মুছুন, সবশেষে মেঝে ঝাড়ু দিয়ে মুছুন। উল্টো করলে ওপরের ধুলা পরিষ্কার মেঝেতে এসে পড়ে।
সাপ্তাহিক তালিকায় রাখুন বিছানার চাদর ও বালিশের কভার বদলানো, বাথরুমের কমোড, বেসিন ও মেঝে ঘষে পরিষ্কার করা, ফ্রিজের পুরোনো খাবার ফেলে তাক মুছে নেওয়া, আয়না ও জানালার কাচ মোছা, দরজার হাতল ও সুইচবোর্ড জীবাণুনাশক দিয়ে মোছা এবং পাপোশ ঝেড়ে রোদে দেওয়া।
বিজ্ঞাপন
কাজগুলো একা না করে পরিবারের মধ্যে ভাগ করে নিন। ফ্রিজের দেয়ালে বা দরজায় একটি কাগজে কে কোন দিন কোন কাজ করবে লিখে লাগিয়ে রাখতে পারেন। ছোটদের জন্য নিজের খেলনা গুছিয়ে রাখা, স্কুলের জুতা জায়গামতো রাখা বা গাছে পানি দেওয়ার মতো কাজ যথেষ্ট। বড়রা নেবেন বাথরুম, রান্নাঘর ও ভারী জিনিস সরানোর দায়িত্ব। পছন্দের গান চালিয়ে কাজ করলে সময় দ্রুত কাটে, আর একঘেয়েও লাগে না। কাজ শেষে সবাই মিলে চা খাওয়ার মতো ছোট একটা আয়োজন রাখলে পরের সপ্তাহেও উৎসাহ থাকে।
মাসে একবার গভীর পরিষ্কার
মাসে একবার এমন জায়গাগুলোয় হাত দিন, যেগুলো প্রতিদিন চোখে পড়ে না। খাট ও সোফা সরিয়ে নিচের ধুলা পরিষ্কার করুন। রান্নাঘরের এক্সজস্ট ফ্যান ও চুলার আশপাশের তেলচিটে দাগ তুলুন। পর্দা, কুশন কভার ধুয়ে দিন। জানালার গ্রিল ও নেট মুছুন। আলমারির ভেতর থেকে জিনিস নামিয়ে তাক মুছে আবার গুছিয়ে রাখুন। তোশক ও বালিশ রোদে দিন।
প্রতি মাসে একই সময় সব না করে মাসের চার সপ্তাহে কাজগুলো ভাগ করে নিতে পারেন, যেমন প্রথম সপ্তাহে রান্নাঘর, দ্বিতীয় সপ্তাহে শোবার ঘর।
বিজ্ঞাপন
ঘরভেদে কিছু কাজের কৌশল
রান্নাঘর: তেলচিটে টাইলস বা চুলার ওপর বেকিং সোডা ও অল্প পানির পেস্ট লাগিয়ে দশ মিনিট রেখে স্পঞ্জ দিয়ে ঘষুন। সিংকের ড্রেনে সপ্তাহে একবার গরম পানি ঢাললে আটকে থাকা চর্বি গলে যায়।
বাথরুম: গোসলের পর ওয়াইপার দিয়ে মেঝের পানি টেনে দিলে শ্যাওলা ও পিচ্ছিল ভাব কম হয়। বাথরুমের জানালা বা এক্সজস্ট ফ্যান চালু রাখুন, যাতে স্যাঁতসেঁতে ভাব না থাকে।
শোবার ঘর: বেডসাইড টেবিলে শুধু দরকারি জিনিস রাখুন। আলমারির কাপড় ঋতু অনুযায়ী ভাগ করে রাখলে খোঁজাখুঁজি কম হয়।
বিজ্ঞাপন
বসার ঘর: রিমোট, পত্রিকা ও চার্জারের জন্য একটি ঝুড়ি বা ট্রে রাখুন। সোফার ওপর কাপড় রাখার অভ্যাস বাদ দিন।
কম খরচে ঘরে তৈরি পরিষ্কারের উপকরণ
ভিনেগার মিশ্রণ: সমান পরিমাণ সাদা ভিনেগার ও পানি স্প্রে বোতলে নিয়ে কাচ, আয়না ও রান্নাঘরের তাক মোছা যায়। মার্বেল বা গ্রানাইট পাথরে ভিনেগার ব্যবহার করবেন না, দাগ পড়তে পারে।
বেকিং সোডা: হালকা ঘষামাজার জন্য খুব কাজের। পাত্রের পোড়া দাগ, সিংকের দাগ ও ফ্রিজের গন্ধ দূর করতে কাজে লাগে।
বিজ্ঞাপন
লেবু ও লবণ: কাটা লেবুতে লবণ লাগিয়ে কাটিং বোর্ড ও তামা-পিতলের পাত্র ঘষলে দাগ ও গন্ধ কমে।
একটা জরুরি সতর্কতা মনে রাখুন: ব্লিচের সঙ্গে কখনো ভিনেগার বা অ্যামোনিয়াযুক্ত ক্লিনার মেশাবেন না। এতে বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়। যেকোনো রাসায়নিক ক্লিনার ব্যবহারের সময় হাতে গ্লাভস পরুন, জানালা খোলা রাখুন এবং শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন। হাঁপানি বা ধুলায় অ্যালার্জি থাকলে ধুলা ঝাড়ার সময় মাস্ক পরুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্রতিদিন কি ঘর মোছা দরকার?
বিজ্ঞাপন
ধুলাবালি কম এমন বাসায় প্রতিদিন ঝাড়ু আর সপ্তাহে দুই-তিনবার মোছাই যথেষ্ট। তবে শিশু হামাগুড়ি দিলে বা রাস্তার পাশে বাসা হলে প্রতিদিন মোছা ভালো।
ঘরে দুর্গন্ধ হলে কী করব?
প্রথমে উৎস খুঁজুন: ময়লার ঝুড়ি, ড্রেন, ফ্রিজের নষ্ট খাবার বা স্যাঁতসেঁতে কাপড়। জানালা খুলে রোদ ও বাতাস ঢুকতে দিন, তারপর উৎস পরিষ্কার করুন। শুধু এয়ার ফ্রেশনার দিয়ে গন্ধ ঢাকা সমাধান নয়।
কর্মজীবী হলে কীভাবে রুটিন মানব?
বিজ্ঞাপন
প্রতিদিনের কাজ সকাল ও রাতে দশ মিনিট করে ভাগ করুন, সাপ্তাহিক কাজ ছুটির দিনে রাখুন। পরিবারের প্রত্যেককে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিন, শিশুদেরও বয়স অনুযায়ী ছোট কাজ দিন।
ধুলা কম জমানোর উপায় কী?
দরজার বাইরে ও ভেতরে পাপোশ রাখুন, বাইরের জুতা দরজার কাছেই খুলুন, জানালায় নেট লাগান এবং অপ্রয়োজনীয় শোপিস কমান।
ঘর মোছার পানিতে কী মেশালে ভালো হয়?
বিজ্ঞাপন
সাধারণ মোছার জন্য বালতির পানিতে বাজারের ফ্লোর ক্লিনার প্যাকেটের নির্দেশনা অনুযায়ী মেশালেই যথেষ্ট। অসুস্থ কেউ থাকলে জীবাণুনাশক ব্যবহার করুন। মোছার কাপড় প্রতিবার ধুয়ে রোদে শুকিয়ে নিন, নইলে ভেজা কাপড় থেকেই দুর্গন্ধ ছড়ায়।