কোরবানির মাংস বণ্টনের নিয়ম: তিন ভাগের সুন্নাহ পদ্ধতি
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
কোরবানির পশু জবাইয়ের পর প্রায় প্রতিটি বাড়িতে একই প্রশ্ন ওঠে: মাংস কীভাবে ভাগ হবে, কাকে কতটুকু দেওয়া হবে, আর কতটা রেখে দেওয়া যাবে। শরিয়তের উত্তর বেশ সহজ। মাংস তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-প্রতিবেশীর জন্য এবং এক ভাগ গরিবদের জন্য রাখা মুস্তাহাব, অর্থাৎ পছন্দনীয় পদ্ধতি।
বিজ্ঞাপন
এটি বাধ্যতামূলক কোনো হিসাব নয়। পরিবার বড় হলে বা অভাব থাকলে বেশির ভাগ বা পুরো মাংস নিজেরা রাখলেও কোরবানি আদায় হয়ে যায়। আবার কেউ চাইলে পুরো মাংস দান করে দিতে পারেন, সেটি আরও সওয়াবের। তবে কিছু কাজ স্পষ্টভাবে নিষেধ: মাংস বা চামড়া বিক্রি করে নিজে টাকা রাখা এবং কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে মাংস বা চামড়া দেওয়া।
তিন ভাগের পদ্ধতি কোথা থেকে এল
কোরআনে কোরবানির পশু সম্পর্কে বলা হয়েছে, তোমরা তা থেকে খাও এবং অভাবী ও প্রার্থীকে খাওয়াও। সুরা হজের ২৮ ও ৩৬ নম্বর আয়াতে এ নির্দেশনা এসেছে। এখান থেকে বোঝা যায়, কোরবানির মাংসে কোরবানিদাতার নিজের অংশ আছে, আবার অভাবী মানুষেরও হক আছে।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে দেখা যায়, এক বছর অভাবের কারণে মহানবী (সা.) কোরবানির মাংস তিন দিনের বেশি জমিয়ে রাখতে নিষেধ করেছিলেন, যাতে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়। পরের বছর তিনি বলেন, এখন খাও, জমা করে রাখো এবং সদকা করো। সাহাবি ও পরবর্তী আলেমদের আমলের ভিত্তিতে ফকিহরা নিজের, উপহারের ও সদকার তিনটি ভাগকে উত্তম পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিজ্ঞাপন
কোন ভাগে কারা পড়েন
১. নিজের ও পরিবারের ভাগ: কোরবানিদাতা নিজে, স্ত্রী-সন্তান ও একই সংসারে থাকা সদস্যরা এ ভাগ থেকে খাবেন। মাংস রান্না করে অতিথি আপ্যায়নও এর মধ্যে পড়ে।
২. আত্মীয় ও প্রতিবেশীর ভাগ: যাঁদের বাড়িতে কোরবানি হয়নি এমন আত্মীয়, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের অগ্রাধিকার দিন। যাঁদের নিজেদের কোরবানি হয়েছে, তাঁদেরও উপহার হিসেবে দেওয়া যায়, এতে সম্পর্ক মজবুত হয়।
৩. গরিব-মিসকিনের ভাগ: এলাকার অসচ্ছল পরিবার, যাঁরা কোরবানি দিতে পারেননি, দিনমজুর, গৃহকর্মী, রিকশাচালক ও এতিমখানা এ ভাগের প্রকৃত হকদার। দরজায় ভিড় করা মানুষের পাশাপাশি যাঁরা লজ্জায় চাইতে আসেন না, তাঁদের খুঁজে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া উত্তম।
বিজ্ঞাপন
ভাগ করার সময় শুধু হাড় ও চর্বি গরিবের ভাগে দেওয়া আর ভালো মাংস নিজের জন্য রাখা কোরবানির শিক্ষার সঙ্গে যায় না। তিন ভাগেই মাংস, হাড় ও কলিজা-জাতীয় অংশ মোটামুটি সমানভাবে রাখার চেষ্টা করুন।
বিতরণের পদ্ধতিতেও সম্মান বজায় রাখা জরুরি। বাড়ির গেটে লম্বা লাইন দাঁড় করিয়ে, ধাক্কাধাক্কির মধ্যে মাংস ছুড়ে দেওয়ার দৃশ্য প্রতি ঈদেই দেখা যায়। এর বদলে আগে থেকে পরিচিত অভাবী পরিবারগুলোর তালিকা করে প্যাকেট বানিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিলে গ্রহীতার সম্মান রক্ষা হয়, বণ্টনও সুষ্ঠু হয়। এলাকার মসজিদ কমিটি বা সামাজিক সংগঠন অনেক সময় এ কাজে সমন্বয় করে, তাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া যায়। শহরে যাঁদের আশপাশে অভাবী মানুষ কম, তাঁরা গ্রামের আত্মীয় বা নির্ভরযোগ্য সংস্থার মাধ্যমে গরিবের ভাগ পাঠাতে পারেন।
যেসব ক্ষেত্রে পুরো মাংস দান করতে হয়
সাধারণ কোরবানিতে তিন ভাগের নিয়ম মুস্তাহাব হলেও দুটি ক্ষেত্রে বিধান আলাদা।
বিজ্ঞাপন
১. মানতের কোরবানি: কেউ যদি মানত করে যে কাজ হলে কোরবানি দেবে, তাহলে সেই কোরবানির পুরো মাংস গরিবদের দান করতে হবে। মানতকারী নিজে এবং যাঁদের তিনি যাকাত দিতে পারেন না, যেমন বাবা-মা ও সন্তান, তাঁরা এ মাংস খেতে পারবেন না।
২. মৃত ব্যক্তির অসিয়তের কোরবানি: কেউ মৃত্যুর আগে নিজের সম্পদ থেকে কোরবানির অসিয়ত করে গেলে এবং তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে কোরবানি দেওয়া হলে পুরো মাংস সদকা করতে হবে বলে হানাফি আলেমরা উল্লেখ করেছেন। তবে কেউ নিজের টাকায় নফল হিসেবে মৃত বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে কোরবানি দিলে তা সাধারণ কোরবানির মতোই, নিজে খাওয়া ও বণ্টন দুটিই চলে।
শরিকে কোরবানি হলে মাংস ভাগ
গরু বা মহিষে কয়েকজন শরিক থাকলে প্রথম কাজ হলো মাংস শরিকদের মধ্যে ভাগ করা। এ ভাগ অনুমানে নয়, দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে করতে হয়। হানাফি ফকিহরা বলেছেন, অনুমানে ভাগ করলে কারও অংশ কম-বেশি হয়ে সুদের মতো অবৈধ বিনিময়ের আশঙ্কা তৈরি হয়। তবে মাথা, পা বা কলিজার মতো আলাদা অংশ কোনো ভাগের সঙ্গে যোগ করে দিলে সামান্য কম-বেশিতে সমস্যা নেই।
বিজ্ঞাপন
প্রত্যেক শরিক নিজের ভাগ পাওয়ার পর সেখান থেকে আলাদাভাবে তিন ভাগ করবেন। সব শরিকের মাংস একসঙ্গে রেখে বিতরণ করতে চাইলে সবার সম্মতি নিয়ে নিন।
চামড়া, মাংস বিক্রি ও কসাইয়ের মজুরি
কোরবানির মাংস, চামড়া, মাথা, পা বা অন্য কোনো অংশ বিক্রি করে সেই টাকা নিজে ব্যবহার করা জায়েজ নয়। চামড়া নিজে ব্যবহার করা যায়, যেমন জায়নামাজ বা অন্য কাজে। অথবা পুরো চামড়া কোনো গরিব বা মাদরাসার এতিমখানায় দান করা যায়। চামড়া বিক্রি করলে তার পুরো দাম যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত গরিবদের সদকা করে দিতে হবে।
কসাইয়ের মজুরি আলাদা টাকায় দিতে হবে। মজুরির অংশ হিসেবে মাংস বা চামড়া দেওয়া যাবে না। মজুরি পরিশোধের পর কসাই যদি গরিব হন, তাঁকে আলাদাভাবে উপহার হিসেবে মাংস দেওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
অমুসলিম প্রতিবেশী, বিশেষ করে অভাবী হলে, তাঁকে কোরবানির মাংস উপহার দেওয়া হানাফি মতে জায়েজ। এতে সামাজিক সম্প্রীতিও বাড়ে।
কোরবানির মাংস সংরক্ষণের নিরাপদ উপায়
ঈদের দিন একসঙ্গে অনেক মাংস ঘরে আসে, আর গরমে তা দ্রুত নষ্ট হতে পারে। কয়েকটি বিষয় মানলে ঝুঁকি কমে। জবাইয়ের পর মাংস বেশিক্ষণ খোলা জায়গায় ফেলে রাখবেন না। ধুয়ে পানি ঝরিয়ে এক বেলার রান্নার মাপে ছোট ছোট প্যাকেটে ভাগ করুন, তারপর ডিপ ফ্রিজে রাখুন। প্যাকেটের গায়ে তারিখ লিখে রাখলে পুরোনোটা আগে ব্যবহার করা সহজ হয়।
ফ্রিজ ঠাসাঠাসি করে ভরবেন না, ঠান্ডা বাতাস চলাচলের জায়গা রাখুন। একবার গলানো মাংস আবার জমিয়ে রাখা ঠিক নয়। ফ্রিজ না থাকলে মাংস লবণ-হলুদ দিয়ে ভালোভাবে সেদ্ধ করে বা জ্বাল দিয়ে কয়েক দিন রাখা যায়, তবে নিয়মিত গরম করতে হয়। গন্ধ, রং বা আঠালো ভাব দেখা দিলে সে মাংস খাবেন না।
বিজ্ঞাপন
সংরক্ষণের সুযোগ থাকলেও মনে রাখবেন, ফ্রিজ ভরিয়ে রাখার চেয়ে প্রতিবেশীর হাঁড়িতে মাংস পৌঁছে দেওয়া কোরবানির মূল শিক্ষার কাছাকাছি।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
পুরো মাংস নিজেরা রেখে দিলে কি কোরবানি হবে?
হ্যাঁ, কোরবানি আদায় হবে। তিন ভাগ করা মুস্তাহাব, বাধ্যতামূলক নয়। তবে সামর্থ্য থাকলে গরিবদের অংশ দেওয়াই উত্তম।
বিজ্ঞাপন
কোরবানির মাংস কতদিন রাখা যায়?
শরিয়তে এখন আর সময়সীমা নেই; মহানবী (সা.) জমা রাখার অনুমতি দিয়েছেন। স্বাস্থ্যের দিক থেকে ডিপ ফ্রিজে সঠিক তাপমাত্রায় রাখলে কয়েক মাস ভালো থাকে।
কোরবানির চামড়ার টাকা মসজিদ নির্মাণে দেওয়া যায়?
চামড়া বিক্রির টাকা সদকা হিসেবে গরিবদের মালিকানায় দিতে হয়। তাই মসজিদ নির্মাণের মতো খাতে না দিয়ে অভাবী মানুষ বা মাদরাসার এতিম ও গরিব শিক্ষার্থীদের তহবিলে দেওয়াই নিয়ম।
বিজ্ঞাপন
আকিকার মাংসও কি একইভাবে ভাগ হয়?
হ্যাঁ, আকিকার মাংস বণ্টনের নিয়মও মোটামুটি কোরবানির মতো। বাবা-মাসহ পরিবারের সবাই খেতে পারেন, আত্মীয় ও গরিবদেরও দেওয়া যায়।