কোরবানির নিয়ম: কার ওপর ওয়াজিব, পশুর বয়স ও শর্তাবলি
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
ঈদুল আজহার সকালে নামাজ শেষে পশু কোরবানি করা মুসলমানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এর সূচনা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ত্যাগের স্মৃতি থেকে, আর মহানবী (সা.) মদিনায় প্রতিবছর নিয়মিত কোরবানি করেছেন। সুরা কাওসারের দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, অতএব আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন।
বিজ্ঞাপন
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী কোরবানি ওয়াজিব। অর্থাৎ যার ওপর ওয়াজিব হয়েছে, সে না করলে গুনাহগার হবে। কার ওপর ওয়াজিব, কোন পশু দিয়ে কোরবানি হয়, পশুর বয়স কত হতে হবে এবং কোন দোষ থাকলে কোরবানি হয় না, এই চারটি বিষয় ঠিকঠাক জানা থাকলে কোরবানি নিয়ে বেশির ভাগ বিভ্রান্তি দূর হয়ে যায়।
সুরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মনে করিয়ে দিয়েছেন, কোরবানির গোশত বা রক্ত তাঁর কাছে পৌঁছায় না, পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। তাই পশুর দাম বা আকারের চেয়ে নিয়তের বিশুদ্ধতা ও নিয়ম মেনে চলাই আসল।
কোরবানি কার ওপর ওয়াজিব
হানাফি মাজহাবে নিচের শর্তগুলো একসঙ্গে পাওয়া গেলে কোরবানি ওয়াজিব হয়:
বিজ্ঞাপন
১. মুসলমান হওয়া: কোরবানি ইবাদত, তাই অমুসলিমের ওপর এর বিধান নেই।
২. প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের হওয়া: নাবালেগ শিশু বা মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব নয়, যদিও তার নিজের সম্পদ থাকে।
৩. মুকিম হওয়া: শরিয়তের দৃষ্টিতে মুসাফির অবস্থায় থাকলে কোরবানি ওয়াজিব নয়। তবে মুসাফির নিজের ইচ্ছায় করলে সওয়াব পাবেন।
৪. নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া: ১০ জিলহজের সুবহে সাদিক থেকে ১২ জিলহজের সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কোনো সময় মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলেই কোরবানি ওয়াজিব।
বিজ্ঞাপন
নিসাবের পরিমাণ সদকাতুল ফিতরের নিসাবের মতোই: সাড়ে সাত তোলা সোনা, অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা, অথবা এর সমমূল্যের নগদ টাকা, ব্যবসার পণ্য বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ। নগদ টাকা, কিছু সোনা ও অপ্রয়োজনীয় জিনিস মিলিয়ে রুপার নিসাবের মূল্যে পৌঁছালেও কোরবানি ওয়াজিব হয়। যাকাতের মতো এখানে পুরো এক বছর সম্পদ জমা থাকার শর্ত নেই।
থাকার ঘর, পরনের কাপড়, দৈনন্দিন ব্যবহারের আসবাব ও জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম মৌলিক প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে, এগুলো নিসাবে ধরা হয় না। ঋণ থাকলে তা বাদ দিয়ে হিসাব করতে হয়। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের হিসাব আলাদা। স্ত্রীর নিজের নামে নিসাব পরিমাণ গয়না থাকলে তাঁর ওপরও আলাদা কোরবানি ওয়াজিব; স্বামীর কোরবানিতে স্ত্রীরটা আদায় হয় না, যদি না স্বামী তাঁর পক্ষ থেকে আলাদা অংশ দেন।
নাবালেগ সন্তানের পক্ষ থেকে কোরবানি দেওয়া বাবার ওপর ওয়াজিব নয়, তবে দিলে তা নফল হিসেবে সওয়াবের কাজ। প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান নিজে নিসাবের মালিক হলে তার কোরবানি তার নিজের দায়িত্ব; বাবা তার অনুমতি নিয়ে তার পক্ষ থেকে দিলে আদায় হয়ে যায়। একান্নবর্তী পরিবারে অনেক সময় বাড়ির কর্তা একটি পশু কোরবানি দিয়ে মনে করেন সবার দায়িত্ব শেষ। আসলে পরিবারে নিসাবের মালিক যতজন, ওয়াজিব কোরবানিও ততজনের, প্রত্যেকের জন্য আলাদা ছাগল বা গরুর আলাদা অংশ লাগবে।
হাদিসেও কোরবানির ব্যাপারে কঠোর তাগিদ আছে। ইবনে মাজাহর একটি হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, যার সামর্থ্য আছে অথচ কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে।
বিজ্ঞাপন
কোরবানির সময়
শহরে ঈদুল আজহার নামাজের আগে কোরবানি করলে তা আদায় হয় না, আবার করতে হয়। ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ জিলহজের সূর্যাস্ত পর্যন্ত মোট তিন দিন কোরবানির সময়। প্রথম দিন, অর্থাৎ ১০ জিলহজ কোরবানি করা সবচেয়ে উত্তম। দিনের আলোয় জবাই করাই ভালো; রাতে জবাই করা জায়েজ হলেও আলো কম থাকায় ভুল হওয়ার আশঙ্কায় হানাফি ফকিহরা একে অনুত্তম বলেছেন।
যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব ছিল, সে যদি তিন দিনের মধ্যে কোরবানি করতে না পারে, তাহলে পরে আর কোরবানি করা যায় না। তখন একটি মাঝারি ছাগলের মূল্য সদকা করে দিতে হয়।
কোন পশু দিয়ে কোরবানি এবং কোরবানির পশুর বয়স
বিজ্ঞাপন
কোরবানি করা যায় শুধু গৃহপালিত চতুষ্পদ পশু দিয়ে: উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা। হাঁস-মুরগি বা হরিণের মতো বন্য প্রাণী দিয়ে কোরবানি হয় না।
১. ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা: কমপক্ষে এক বছর পূর্ণ হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বার বয়স ছয় মাস পেরিয়ে গেলে এবং দেখতে এক বছর বয়সীর মতো হৃষ্টপুষ্ট হলে তা দিয়েও কোরবানি জায়েজ। ছাগলের ক্ষেত্রে এ ছাড় নেই।
২. গরু ও মহিষ: কমপক্ষে দুই বছর পূর্ণ হতে হবে।
৩. উট: কমপক্ষে পাঁচ বছর পূর্ণ হতে হবে।
বিজ্ঞাপন
ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দিয়ে কেবল একজনের পক্ষ থেকে কোরবানি হয়। গরু, মহিষ ও উটে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারেন। সহিহ মুসলিমে হজরত জাবের (রা.) বলেছেন, হুদায়বিয়ার বছর তাঁরা মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে একটি উট সাতজনের পক্ষ থেকে এবং একটি গরু সাতজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করেছেন।
যেসব দোষ থাকলে কোরবানি হয় না
কোরবানির পশু সুস্থ ও উল্লেখযোগ্য ত্রুটিমুক্ত হতে হয়। আবু দাউদ ও তিরমিজির হাদিসে স্পষ্ট অন্ধ, স্পষ্ট অসুস্থ, স্পষ্ট খোঁড়া এবং এমন রোগা পশুর কথা এসেছে, যার হাড়ে মজ্জা নেই। হানাফি ফকিহরা এর আলোকে যে দোষগুলোকে কোরবানির জন্য বাধা বলেছেন:
১. দুই চোখ বা এক চোখ পুরোপুরি অন্ধ।
বিজ্ঞাপন
২. এত খোঁড়া যে জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত নিজে হেঁটে যেতে পারে না।
৩. এত দুর্বল ও রোগা যে হাড়ে মজ্জা নেই বলে মনে হয়।
৪. কান বা লেজের এক-তৃতীয়াংশের বেশি কাটা।
৫. শিং গোড়া থেকে ভেঙে যাওয়া, যাতে মস্তিষ্ক পর্যন্ত ক্ষতি পৌঁছেছে।
বিজ্ঞাপন
৬. বেশির ভাগ দাঁত পড়ে যাওয়া, যাতে ঘাস খেতে পারে না।
জন্মগতভাবে শিং নেই, কান ছোট বা সামান্য খুঁত থাকলে কোরবানি জায়েজ। ধনী ব্যক্তি পশু কেনার পর বড় দোষ দেখা দিলে আরেকটি পশু কোরবানি করবেন; গরিব ব্যক্তি, যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব ছিল না, তিনি ওই পশুই কোরবানি করতে পারবেন।
কোরবানির কিছু সুন্নত ও আদব
সহিহ মুসলিমে হজরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, যে কোরবানির ইচ্ছা রাখে, সে জিলহজের চাঁদ ওঠার পর থেকে কোরবানি করা পর্যন্ত চুল ও নখ কাটবে না। হানাফি মাজহাবে এটি মুস্তাহাব আমল।
বিজ্ঞাপন
সম্ভব হলে নিজের হাতে জবাই করা উত্তম; না পারলে জবাইয়ের সময় উপস্থিত থাকা ভালো। ধারালো ছুরি ব্যবহার করা, পশুকে কষ্ট না দেওয়া, এক পশুর সামনে আরেকটি জবাই না করা এবং পশু পুরোপুরি নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া না ছাড়ানো জরুরি আদব। কোরবানির পর পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখাও মুমিনের দায়িত্ব। রক্ত ও বর্জ্য গর্তে পুঁতে ফেলা বা সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার নির্ধারিত স্থানে জবাই করা প্রতিবেশীর হক রক্ষার অংশ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
চাকরিজীবী মানুষের হাতে নগদ টাকা কম, কিন্তু সোনার গয়না আছে। কোরবানি কি ওয়াজিব?
প্রয়োজনের অতিরিক্ত সোনা, নগদ টাকা ও অন্যান্য সম্পদের মোট মূল্য রুপার নিসাবের সমান বা বেশি হলে কোরবানি ওয়াজিব। হাতে নগদ না থাকলেও এটি প্রযোজ্য।
বিজ্ঞাপন
মৃত বাবা-মায়ের নামে কোরবানি দেওয়া যায়?
যায়। নিজের ওয়াজিব কোরবানি আদায়ের পর বা আলাদা অংশে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে নফল কোরবানি করা যায়, এর সওয়াব তাঁদের কাছে পৌঁছায় বলে হানাফি আলেমরা মত দিয়েছেন।
কোরবানির টাকা দান করে দিলে কি কোরবানি আদায় হবে?
না। কোরবানির দিনগুলোতে পশু জবাই করাই এ ইবাদত। এর বদলে টাকা দান করলে ওয়াজিব আদায় হবে না।
বিজ্ঞাপন
ঋণ থাকলে কি কোরবানি দিতে হবে?
ঋণের টাকা বাদ দিয়ে বাকি সম্পদ নিসাব পরিমাণ থাকলে কোরবানি ওয়াজিব। ঋণ বাদ দেওয়ার পর নিসাব না থাকলে ওয়াজিব নয়।