এআই কি এবং কিভাবে কাজ করে: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহজ ব্যাখ্যা
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
ফোনের ক্যামেরা আপনার মুখ চিনে লক খুলে দেয়, ভিডিও অ্যাপ জানে আপনি কোন ধরনের ভিডিও পছন্দ করবেন, ইমেইলের স্প্যাম ফোল্ডারে প্রতারণার বার্তা নিজে থেকে চলে যায়। এসবের পেছনে যে প্রযুক্তি কাজ করে, তার নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইংরেজিতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সংক্ষেপে এআই।
বিজ্ঞাপন
সহজ ভাষায় এআই কি, তার উত্তর হলো, এটি এমন কম্পিউটার প্রোগ্রাম, যা নির্দিষ্ট নিয়ম মুখস্থ করে নয়, বরং প্রচুর উদাহরণ দেখে নিজে নিজে ধরন বা প্যাটার্ন খুঁজে বের করে। সেই শেখা থেকে এটি নতুন কোনো ছবি চিনতে পারে, প্রশ্নের উত্তর লিখতে পারে বা ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে, তার অনুমান করতে পারে।
তবে একটা ভুল ধারণা আগেই দূর করা দরকার। এআই মানুষের মতো ভাবে না, অনুভব করে না, নিজের ইচ্ছাও নেই। এটি অত্যন্ত দক্ষ একটি হিসাবযন্ত্র, যা সম্ভাবনার অঙ্ক কষে সবচেয়ে মানানসই উত্তরটি বেছে নেয়।
প্রচলিত সফটওয়্যার আর এআইয়ের পার্থক্য
একটি সাধারণ ক্যালকুলেটর বা বেতনের হিসাবের সফটওয়্যারের কথা ভাবুন। প্রোগ্রামার সেখানে প্রতিটি নিয়ম আগে থেকে লিখে দেন: এই হলে ওই করবে। নিয়মের বাইরে কিছু ঘটলে সফটওয়্যার আটকে যায়।
বিজ্ঞাপন
এখন ভাবুন, কম্পিউটারকে বিড়াল চেনাতে হবে। বিড়ালের কান কেমন, গোঁফ কত লম্বা, এমন নিয়ম লিখে শেষ করা অসম্ভব, কারণ বিড়াল নানা রঙের, নানা ভঙ্গিতে, নানা আলোয় থাকে। এআইয়ের পথ আলাদা। একে লাখ লাখ ছবি দেখানো হয়, যেগুলোর কোনোটিতে বিড়াল আছে, কোনোটিতে নেই। ধীরে ধীরে প্রোগ্রাম নিজেই বুঝে নেয় কোন বৈশিষ্ট্যগুলো একসঙ্গে থাকলে ছবিটি বিড়ালের হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এই শেখার প্রক্রিয়াকেই বলে মেশিন লার্নিং।
এআই কিভাবে কাজ করে: তিনটি ধাপে
যেকোনো এআই ব্যবস্থার পেছনে মোটামুটি একই ধরনের তিনটি ধাপ থাকে।
১. তথ্য সংগ্রহ: শেখার জন্য প্রচুর উদাহরণ লাগে। ভাষা শেখাতে লাগে বিপুল লেখা, ছবি চেনাতে লাগে ছবি, রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করতে লাগে আগের রোগীদের পরীক্ষার ফল। তথ্য যত ভালো ও বৈচিত্র্যময়, এআই তত নির্ভরযোগ্য।
বিজ্ঞাপন
২. প্রশিক্ষণ: শক্তিশালী কম্পিউটারে তথ্যগুলো বারবার চালিয়ে মডেলকে শেখানো হয়। প্রতিবার ভুল উত্তর দিলে মডেলের ভেতরের লাখো সংখ্যা সামান্য করে সংশোধন হয়, যাতে পরেরবার ভুল কম হয়। এই প্রক্রিয়া কয়েক দিন থেকে কয়েক মাসও চলতে পারে এবং প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হয়।
৩. ব্যবহার: শেখা শেষ হলে মডেলটি নতুন তথ্য পেলে সেই শেখা কাজে লাগিয়ে উত্তর দেয়। আপনি যখন কোনো চ্যাটবটে প্রশ্ন লেখেন বা ফোনের ক্যামেরা মুখ শনাক্ত করে, তখন এই ধাপটিই চলে।
নিউরাল নেটওয়ার্ক ও ভাষা মডেল
এখনকার বেশির ভাগ শক্তিশালী এআই চলে নিউরাল নেটওয়ার্ক নামের কাঠামোয়। মানুষের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের ধারণা থেকে নামটি এসেছে, যদিও আসলে এটি গাণিতিক হিসাবের অনেকগুলো স্তর। প্রথম স্তর হয়তো ছবির রেখা ও রং চেনে, পরের স্তর চেনে আকৃতি, আরও পরের স্তর চেনে চোখ বা নাক, শেষে পুরো মুখ। স্তর অনেক বেশি হলে একে বলা হয় ডিপ লার্নিং।
বিজ্ঞাপন
যে চ্যাটবটগুলো মানুষের মতো লিখতে পারে, সেগুলো বড় ভাষা মডেলের ওপর তৈরি। এরা বিপুল পরিমাণ লেখা পড়ে শিখেছে কোন শব্দের পর কোন শব্দ আসার সম্ভাবনা বেশি। আপনি প্রশ্ন করলে মডেলটি শব্দের পর শব্দ বেছে উত্তর সাজায়। এ কারণেই উত্তর অনেক সময় চমৎকার শোনায়, আবার কখনো আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্যও দেয়। এই ভুলকে প্রযুক্তির ভাষায় হ্যালুসিনেশন বলা হয়।
এআই কি জিনিস, তা বোঝা যায় দৈনন্দিন উদাহরণে
আমরা না জেনেই প্রতিদিন নানাভাবে এআই ব্যবহার করি।
১. মুখ ও আঙুলের ছাপ শনাক্ত: ফোনের ফেস আনলক এবং ছবির গ্যালারিতে একই মানুষের ছবি আলাদা করে সাজানো।
বিজ্ঞাপন
২. সুপারিশ: ভিডিও, গান বা অনলাইন কেনাকাটার অ্যাপ আপনার আগের পছন্দ দেখে নতুন কিছু সুপারিশ করে।
৩. অনুবাদ ও কণ্ঠস্বর: এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় অনুবাদ, মুখে বলা কথাকে লেখায় রূপান্তর এবং ভয়েস সহকারী।
৪. ব্যাংকিং নিরাপত্তা: কার্ড বা অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন দেখলে সতর্কবার্তা দেওয়া।
৫. স্বাস্থ্য ও কৃষি: এক্স-রে বা অন্যান্য পরীক্ষার ছবি বিশ্লেষণে চিকিৎসকদের সহায়তা, পাতার ছবি দেখে ফসলের রোগ শনাক্তের চেষ্টা।
বিজ্ঞাপন
৬. লেখা ও ছবি তৈরি: নির্দেশনা দিলে চিঠি, সারাংশ, ছবি বা কম্পিউটার কোড তৈরি করে দেওয়া। একে জেনারেটিভ এআই বলা হয়।
সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি
এআই যত কাজেরই হোক, এর কিছু সীমাবদ্ধতা মনে রাখা জরুরি।
১. ভুল তথ্য: এআই যা বলে, তা সব সময় সঠিক নয়। স্বাস্থ্য, আইন বা টাকাপয়সার মতো বিষয়ে এর উত্তর বিশেষজ্ঞ বা নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করে নিন।
বিজ্ঞাপন
২. পক্ষপাত: যে তথ্য দিয়ে শেখানো হয়, তাতে পক্ষপাত থাকলে এআইয়ের সিদ্ধান্তেও তা চলে আসে। যেমন কোনো ভাষা বা অঞ্চলের তথ্য কম থাকলে সেখানকার মানুষের ক্ষেত্রে ভুল বেশি হয়।
৩. গোপনীয়তা: চ্যাটবটে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ব্যাংকের তথ্য বা পাসওয়ার্ডের মতো ব্যক্তিগত তথ্য লিখবেন না।
৪. ভুয়া ছবি ও ভিডিও: এআই দিয়ে কারও চেহারা বা কণ্ঠ নকল করে ভুয়া ভিডিও বানানো যায়, যাকে ডিপফেক বলে। পরিচিত কারও কণ্ঠে হঠাৎ টাকা চেয়ে ফোন বা ভিডিও এলে অন্য উপায়ে নিশ্চিত না হয়ে সাড়া দেবেন না।
এআই কি মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে
বিজ্ঞাপন
প্রশ্নটি বহুল আলোচিত। বাস্তবতা হলো, একই ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ, যেমন তথ্য টাইপ করা বা সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, এআই দ্রুত করতে পারে। ফলে এসব কাজের চাহিদা কমতে পারে। আবার নতুন কাজও তৈরি হচ্ছে, যেমন এআই পরিচালনা, তথ্য যাচাই ও নতুন সেবা তৈরি। বিশ্লেষকদের বড় অংশ মনে করেন, যাঁরা এআইকে সহকারী হিসেবে ব্যবহার করতে শিখবেন, তাঁরা এগিয়ে থাকবেন। তাই ভয় না পেয়ে শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের উচিত নিজের কাজে এটি কীভাবে সহায়তা করতে পারে, তা হাতে-কলমে শেখা।
নিজে শুরু করবেন কীভাবে
এআই বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ব্যবহার করে দেখা। কোনো নির্ভরযোগ্য চ্যাটবটে সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করুন, যেমন একটি দরখাস্তের খসড়া বা কোনো কঠিন বিষয়ের সহজ ব্যাখ্যা। নির্দেশনা যত স্পষ্ট দেবেন, উত্তর তত কাজের হবে। কার জন্য লিখছেন, কত বড় হবে, কোন ভাষায় চান, এসব উল্লেখ করুন। আর ফলাফল হুবহু ব্যবহার না করে পড়ে, যাচাই করে, নিজের ভাষায় সাজিয়ে নিন। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, অ্যাসাইনমেন্ট পুরোটা এআই দিয়ে লিখিয়ে নিলে শেখার আসল উদ্দেশ্যই নষ্ট হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানুষের মতো চিন্তা করতে পারে?
না। এখনকার এআই শেখা ধরনের ভিত্তিতে সম্ভাব্য উত্তর তৈরি করে। এর নিজস্ব বোধ, অনুভূতি বা ইচ্ছা নেই।
রোবট আর এআই কি একই জিনিস?
না। রোবট হলো যন্ত্র, যা নড়াচড়া বা কাজ করতে পারে। এআই হলো সফটওয়্যারের বুদ্ধি। কোনো রোবটে এআই থাকতে পারে, আবার এআই শুধু ফোন বা কম্পিউটারের ভেতরেও থাকতে পারে।
বিজ্ঞাপন
এআই ব্যবহার করতে কি প্রোগ্রামিং জানতে হয়?
সাধারণ ব্যবহারের জন্য লাগে না, চ্যাটবট বা অ্যাপে সাধারণ ভাষায় লিখলেই চলে। তবে নিজে এআই তৈরি বা উন্নত করতে চাইলে প্রোগ্রামিং, গণিত ও পরিসংখ্যান শিখতে হয়।
এআইয়ের দেওয়া তথ্য কি বিশ্বাস করা যায়?
পুরোপুরি নয়। এটি ভুল তথ্য আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দিতে পারে, তাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সব সময় নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে মিলিয়ে নিন।