কাপড়ের দাগ তোলার উপায়: হলুদ, চা, কালি ও রক্তের দাগ দূর করার কৌশল
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
ভাত খেতে গিয়ে সাদা পাঞ্জাবিতে তরকারির ঝোল পড়ল, অফিসে কলমের কালি লাগল শার্টের পকেটে, কিংবা শিশুর জামায় লেগে গেল রক্তের দাগ। এমন মুহূর্তে অনেকেই সঙ্গে সঙ্গে গরম পানি আর সাবান দিয়ে জোরে ঘষতে শুরু করেন, আর তাতেই দাগ স্থায়ী হয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
কাপড়ের দাগ তোলার মূল কৌশল তিনটি: যত দ্রুত সম্ভব কাজ শুরু করা, দাগের ধরন অনুযায়ী ঠিক উপাদান বেছে নেওয়া এবং ঘষাঘষি না করে চেপে চেপে দাগ তোলা। রক্ত ও দুধের মতো প্রোটিনজাতীয় দাগে ঠান্ডা পানি লাগে, গরম পানি দিলে দাগ বসে যায়। হলুদের দাগ সাবানে পুরো না গেলে রোদে অনেকটা মিলিয়ে যায়। কালির দাগে কাজ করে অ্যালকোহল। তেলের দাগে লাগে থালাবাসন ধোয়ার তরল সাবান।
নিচে প্রতিটি পরিচিত দাগের জন্য ঘরে থাকা উপকরণ দিয়ে ধাপে ধাপে পদ্ধতি দেওয়া হলো। আগে সাধারণ নিয়মগুলো জেনে নিন, এগুলো সব দাগের ক্ষেত্রেই খাটে।
দাগ তোলার আগে যে নিয়মগুলো মানবেন
১. দেরি করবেন না: তাজা দাগ কাপড়ের সুতার গভীরে ঢোকার আগেই তোলা সহজ। বাইরে থাকলে অন্তত টিস্যু দিয়ে চেপে বাড়তি অংশ তুলে ফেলুন এবং ঠান্ডা পানি লাগিয়ে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
২. ঘষবেন না, চেপে তুলুন: ঘষলে দাগ চারপাশে ছড়িয়ে যায় এবং কাপড়ের সুতা নষ্ট হয়। পরিষ্কার কাপড় বা টিস্যু দিয়ে দাগের বাইরে থেকে ভেতরের দিকে চেপে চেপে তুলুন।
৩. উল্টো দিক থেকে পানি দিন: দাগের নিচে একটি ভাঁজ করা পরিষ্কার কাপড় রেখে কাপড়ের উল্টো পিঠ থেকে পানি ঢালুন। এতে দাগ সুতার ভেতর দিয়ে না গিয়ে বাইরে বের হয়ে আসে।
৪. লেবেল দেখুন ও আগে পরীক্ষা করুন: সিল্ক, উল, জর্জেট বা রঙিন কাপড়ে যেকোনো উপাদান লাগানোর আগে সেলাইয়ের ভেতরের দিকে অল্প লাগিয়ে দেখুন রং উঠছে কি না।
৫. দাগ না যাওয়া পর্যন্ত ড্রায়ার বা ইস্ত্রি নয়: তাপ লাগলে দাগ স্থায়ী হয়ে যায়। ধোয়ার পর দাগ পুরো না গেলে আবার পদ্ধতিটি করুন, তারপর শুকান।
বিজ্ঞাপন
হলুদের দাগ তোলার উপায়
আমাদের রান্নায় হলুদ সব জায়গায়, তাই তরকারির হলুদ দাগই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। হলুদের রং খুব দ্রুত সুতায় বসে যায়।
১. চামচ বা ছুরির ভোঁতা দিক দিয়ে তরকারির বাড়তি অংশ চেঁছে তুলুন।
২. উল্টো দিক থেকে ঠান্ডা পানি ঢেলে দাগ যতটা সম্ভব ধুয়ে ফেলুন।
বিজ্ঞাপন
৩. দাগের ওপর কয়েক ফোঁটা থালাবাসন ধোয়ার তরল সাবান লাগিয়ে আঙুল দিয়ে আলতো করে মেখে দশ-পনেরো মিনিট রেখে দিন, তারপর ধুয়ে ফেলুন। তেল-মসলার কারণে এখানে তরল সাবান বেশি কাজ করে।
৪. দাগ হালকা হয়ে গেলেও পুরো না গেলে ভেজা অবস্থায় কাপড়টি কড়া রোদে মেলে দিন। সূর্যের আলোয় হলুদের রং অনেকটাই ফিকে হয়ে যায়।
৫. সাদা সুতি কাপড়ে এরপরও দাগ থাকলে বেকিং সোডা ও অল্প পানির পেস্ট লাগিয়ে আধা ঘণ্টা রেখে ধুতে পারেন। কাপড়ের লেবেলে অনুমতি থাকলে প্যাকেটের নির্দেশনা মেনে কাপড়ের জন্য তৈরি ব্লিচ ব্যবহার করা যায়। রঙিন কাপড়ে ব্লিচ দেবেন না।
চা ও কফির দাগ
বিজ্ঞাপন
চা বা কফি পড়লে সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে ফেলুন। দুধ-চায়ে দুধের প্রোটিন থাকে, তাই প্রথম ধাপে গরম পানি নয়।
এরপর দাগে সরাসরি তরল ডিটারজেন্ট বা গুঁড়া ডিটারজেন্টের ঘন পেস্ট লাগিয়ে কিছুক্ষণ রেখে ধুয়ে নিন। পুরোনো, শুকিয়ে যাওয়া দাগের জন্য এক ভাগ সাদা ভিনেগার ও দুই ভাগ ঠান্ডা পানির মিশ্রণে দাগের অংশ আধা ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন, তারপর সাধারণ নিয়মে ধুয়ে ফেলুন। অনেক সময় দুই-তিনবার করতে হয়।
টেবিলক্লথ বা সোফার কভারে চা পড়লে প্রথমে টিস্যু দিয়ে যতটা পারেন শুষে নিন, তারপর ভেজা কাপড়ে ডিটারজেন্ট নিয়ে চেপে চেপে মুছুন।
কালির দাগ তোলার উপায়
বিজ্ঞাপন
বলপয়েন্ট কলমের কালি তেলজাতীয়, তাই শুধু পানিতে যায় না। এতে কাজ করে অ্যালকোহল।
১. দাগের নিচে কয়েক ভাঁজ করা টিস্যু বা পুরোনো কাপড় রাখুন।
২. তুলায় অল্প রাবিং অ্যালকোহল বা অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিয়ে দাগের ওপর চেপে চেপে লাগান। কালি নিচের টিস্যুতে চলে আসবে।
৩. নিচের টিস্যু রঙিন হয়ে গেলে বদলে দিন, দাগ হালকা না হওয়া পর্যন্ত চালিয়ে যান।
বিজ্ঞাপন
৪. শেষে তরল ডিটারজেন্ট দিয়ে স্বাভাবিক নিয়মে ধুয়ে ফেলুন।
ঝরনা কলম বা জেল পেনের পানিভিত্তিক কালি হলে শুরুতেই ঠান্ডা পানি ও ডিটারজেন্টে অনেকটা উঠে আসে। অ্যালকোহল দাহ্য, তাই চুলা বা আগুনের কাছে এটি ব্যবহার করবেন না। মার্কার বা স্থায়ী কালির দাগ সব সময় পুরোপুরি ওঠে না।
রক্তের দাগ তোলার উপায়
রক্তের দাগে সবচেয়ে বড় ভুল গরম পানি ব্যবহার করা। গরমে রক্তের প্রোটিন জমে সুতার সঙ্গে আটকে যায়।
বিজ্ঞাপন
তাজা দাগ হলে সঙ্গে সঙ্গে উল্টো দিক থেকে কলের ঠান্ডা পানি ঢালুন। তারপর দাগে সাবান লাগিয়ে আঙুল দিয়ে আলতো ঘষে ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে নিন। শুকিয়ে যাওয়া দাগের জন্য কাপড়টি এক বালতি ঠান্ডা পানিতে দুই টেবিল চামচ লবণ মিশিয়ে কয়েক ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন, তারপর ডিটারজেন্টে ধুয়ে ফেলুন।
সাদা সুতি কাপড়ে জেদি দাগ থাকলে দাগের ওপর অল্প হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড লাগালে বুদবুদ উঠে দাগ হালকা হয়। এটি রঙিন কাপড়ের রং তুলে ফেলতে পারে, তাই শুধু সাদা কাপড়ে এবং আগে পরীক্ষা করে ব্যবহার করুন। মাসিকের দাগের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম খাটে।
তেল, ঘাম ও অন্যান্য দাগ
তেল ও ঘি: দাগের ওপর ট্যালকম পাউডার বা ভুট্টার আটা ছিটিয়ে আধা ঘণ্টা রেখে দিন, বাড়তি তেল শুষে নেবে। পাউডার ঝেড়ে ফেলে থালাবাসন ধোয়ার তরল সাবান লাগিয়ে কুসুম গরম পানিতে ধুয়ে নিন।
বিজ্ঞাপন
ঘামের হলদে দাগ: সাদা শার্টের বগলের হলদে দাগে বেকিং সোডা, অল্প তরল সাবান ও পানির পেস্ট লাগিয়ে এক ঘণ্টা রেখে পুরোনো টুথব্রাশ দিয়ে হালকা ঘষে ধুয়ে ফেলুন। নিয়মিত ধুলে এই দাগ জমে না।
কাদা: কাদা ভেজা অবস্থায় ঘষবেন না। পুরো শুকাতে দিন, তারপর ঝেড়ে বা ব্রাশ করে মাটি ফেলে দিয়ে ডিটারজেন্টে ধুয়ে নিন।
মেহেদি: তাজা অবস্থায় ঠান্ডা পানি ও সাবানে ধুয়ে ফেলুন। পুরোনো মেহেদির দাগ অনেক সময় পুরো ওঠে না, তবে লেবুর রস লাগিয়ে রোদে দিলে কিছুটা হালকা হয়।
ডিম ও দুধ: এগুলোও প্রোটিনজাতীয়, তাই রক্তের মতো ঠান্ডা পানি দিয়ে শুরু করুন।
বিজ্ঞাপন
দামি সিল্ক, কাতান বা জামদানি শাড়িতে দাগ লাগলে নিজে বেশি পরীক্ষা না করে ভালো ড্রাই ক্লিনারের কাছে নেওয়াই নিরাপদ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
পুরোনো দাগ কি একেবারে তোলা যায়?
অনেক সময় যায়, তবে কয়েকবার চেষ্টা করতে হয়। যে দাগ গরম পানিতে ধোয়া বা ইস্ত্রি করা হয়ে গেছে, সেটি পুরো না-ও উঠতে পারে।
বিজ্ঞাপন
লেবুর রস কি সব কাপড়ে ব্যবহার করা যায়?
না। লেবুর রস হালকা ব্লিচের মতো কাজ করে, রঙিন কাপড়ের রং ফিকে করে দিতে পারে। সাদা সুতি কাপড়েই এটি নিরাপদ।
টুথপেস্ট দিয়ে কি কালির দাগ ওঠে?
সাদা টুথপেস্টে কিছু দাগ হালকা হতে পারে, কিন্তু এটি নির্ভরযোগ্য নয়। বলপয়েন্টের কালির জন্য অ্যালকোহলই বেশি কার্যকর।
বিজ্ঞাপন
ভিনেগার আর ব্লিচ কি একসঙ্গে ব্যবহার করা যায়?
কখনোই নয়। এ দুটি মিশলে ক্ষতিকর গ্যাস তৈরি হয়। একটির পর অন্যটি ব্যবহার করতে চাইলে মাঝখানে কাপড় ভালোভাবে ধুয়ে নিন।