বাবার মায়া থাকলেও পুত্রের নেই
অনুয়ার পলাতক, পরিবার মাদক ও সহিংসতার অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ
গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি · শ্রীপুর, গাজীপুর
প্রকাশ:
‘বাপে তো মায়া করছে, পুতে তো মায়া করছে না’—এমন কথায় জুবেদা খাতুন, যিনি মাদকাসক্ত ছেলের হাতে নিহত আবদুস সামাদের প্রতিবেশী, প্রথম আলোকে জানালেন। তিনি বললেন, “বাপে তো লাডি (লাঠি) লইয়া ভয় দেখাইছে, বাড়ি দিছে না। বাপে তো মায়া করছে, পুতে তো মায়া করছে না। পুতে তো বাঁশ দিয়ে বাড়ি মাইরা দিছে। এক বাড়িতে মাটিতে পইড়া গেছেগা। পইড়া গিয়া আর কোনো শব্দ নাই। এর পরেও বাইড়াইছে। ...এমন দৃশ্য আর জীবনে দেখছি না।”
বিজ্ঞাপন
গতকাল রোববার, রাত তিনটায় গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার সাইটালিয়া গ্রামের বন্নাভিটা এলাকায় একমাত্র ছেলে আনোয়ার হোসেনের (বয়স ৩৫) লাঠির আঘাতে ৬০ বছর বয়সী আবদুস সামাদ (বয়স ৬০) নিহত হয়। অনুয়ার আক্রমণ থেকে বাঁচতে সামাদ পাশের বাড়িতে আশ্রয় নিলেন, তবে তিনি শেষ পর্যন্ত মরতে বাধ্য হন। ঘটনার পর থেকে অনুয়ার পলাতক হয়ে গেছেন।
আবদুস সামাদ দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন; বিদেশ থেকে ফিরে এসে তিনি নিজে পিকআপ গাড়ি কিনে চালাতেন। তার একমাত্র ছেলে আনোয়ার হোসেনের তিনটি সন্তান আছে, এবং সন্তানদের লালন-পালনের দায়িত্বে দাদা আবদুস সামাদ নিয়মিত সহায়তা করতেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সোহাগ খান, সাইটালিয়া-সুটিপাড়া এলাকায় রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদক ছড়িয়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “পুলিশ মাদকসহ লোকজন ধরে নিয়ে যায়। এক-দেড় ঘণ্টা পর দেখি, আসামি আবার নিজের বাড়িতে হাজির। কীভাবে তারা ছাড়া পায়, কীভাবে পুলিশের হাত থেকে রেহাই পায়, তা আল্লাহ আর প্রশাসনই জানে।”
স্বজনের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে যে তিন বছর আগে অনুয়ার মারধরে তার মায়ের হাত ভেঙে গিয়েছিল, এবং সম্প্রতি তিনি মাদক ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। পরিবার অনুয়ার নেশা ছাড়ার জন্য চাপ দিলে, তিনি বাবার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
বিজ্ঞাপন
আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী শারমিন আক্তার, স্বামীর নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। তিনি বললেন, “মেয়ের জন্মের পর থেকেই স্বামীর মাদক গ্রহণের বিষয়টি বুঝতে পারি। নেশা করে গভীর রাতেও ঘুমাতেন না, তাঁকে মারধর করতেন। তাঁকে রক্ষা করতে গেলে শ্বশুরকেও মারধর করতেন।”
শারমিন রোববার রাত তিনটায় ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানান, ‘আমারে যে মারছে, অশ্লীল গালিগালাজ করছে—এগুলো সব তাঁর বাপে শুনছে। শুইন্না পরে যখন বাইরে গেছে লোকজনকে ফোন করে আনতে, তখন আমি ভয়ে বলছি, না আব্বা, আমারে কিছু করে না, আপনি কাউকে ডাকবেন না। এত রাইতে মানুষ ঢাহায়া আনলে সমস্যা হবে। আমি আব্বারে ফিরাইয়া রাখতেছি না, আব্বা গেছে। এরপর আমার স্বামী আব্বারে মাইরা শেষ করে দিয়েছে। মাদকের কারণে আমাদের পরিবারটা ধ্বংস হয়ে যায়।’
এই হত্যাকাণ্ডের পর এলাকার অন্য বাসিন্দারাও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন; তারা মাদকের বিস্তার বাড়ছে বলে অভিযোগ করছেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত বহু লোক বলছেন, ‘মাদকের এই পরিস্থিতি সামাল না দিলে শ্রীপুরের ঘরে ঘরে এমন আনোয়ারের জন্ম হবে।’
সাইটালিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. মনির হোসেন বলেছেন, ‘মাদকের এই পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে শ্রীপুরের ঘরে ঘরে এমন আনোয়ারের জন্ম হবে।’ তিনি এটি স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
মো. সোহাগ খান আবার উল্লেখ করেন, সাইটালিয়া ও সুটিপাড়া এলাকায় মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে; মাদকসহ কেউ আটক হয়ে এক-দেড় ঘণ্টা পর আবার নিজের বাড়িতে ফিরে আসছে।
শ্রীপুর থানার ওসি মোহাম্মদ শাহীনুর আলম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে জানিয়ে জানান, ‘অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ব্যবস্থা নেয়। মাদকসহ আসামি ধরে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা আমার সময়ে ঘটেনি। এগুলো ঢালাও অভিযোগ করা হচ্ছে।’