ইন্টারনেট স্পিড বাড়ানোর উপায়: মোবাইল ডেটা ও ওয়াইফাই দুটোই দ্রুত করুন
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
ভিডিও কলে মুখ আটকে যায়, অনলাইন ক্লাসের মাঝে লাইন কেটে যায়, একটা ছবি পাঠাতেও লাগে মিনিটের পর মিনিট। ধীরগতির ইন্টারনেট নিয়ে বিরক্তি প্রায় সবার। সমস্যার একটা অংশ অবশ্যই অপারেটর বা সেবাদাতার দিকে, কিন্তু বড় একটা অংশ আমাদের নিজেদের ফোন, রাউটার আর ব্যবহারের অভ্যাসে লুকিয়ে থাকে, যা নিজেই ঠিক করা যায়।
বিজ্ঞাপন
ইন্টারনেট স্পিড বাড়ানোর উপায় খুঁজতে গেলে আগে বুঝতে হবে আপনি কোন সংযোগ ব্যবহার করছেন। মোবাইল ডেটায় গতি নির্ভর করে নেটওয়ার্ক মোড, সংকেতের শক্তি, ফোনের সেটিং আর এলাকার ভিড়ের ওপর। ওয়াইফাইয়ে নির্ভর করে প্যাকেজের গতি, রাউটারের অবস্থান, সংযুক্ত ডিভাইসের সংখ্যা আর তারের অবস্থার ওপর।
নিচে আগে কারণগুলো, তারপর মোবাইল ডেটা ও ওয়াইফাইয়ের জন্য আলাদা করে পরীক্ষিত সমাধান দেওয়া হলো। কোনো স্পিড বাড়ানোর অ্যাপ নামানোর দরকার নেই, এ ধরনের অ্যাপ গতি বাড়ায় না, বরং বিজ্ঞাপন ও অপ্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়ে ফোন ভারী করে।
ইন্টারনেট স্লো কেন: আগে কারণ খুঁজুন
১. দুর্বল সংকেত: ভবনের ভেতরে, বেসমেন্টে বা ঘন দেয়ালের ঘরে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
২. ভিড়ের সময়: সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত বা কোনো বড় খেলা ও উৎসবের সময় একই টাওয়ারে বহু মানুষ যুক্ত হলে গতি কমে।
৩. ব্যাকগ্রাউন্ডে ডেটা খরচ: অ্যাপ হালনাগাদ, ক্লাউড ব্যাকআপ বা ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু থাকলে আপনার অজান্তেই ব্যান্ডউইথ চলে যায়।
৪. ডেটা প্যাকের সীমা: কিছু প্যাকেজে নির্দিষ্ট পরিমাণ ব্যবহারের পর গতি কমিয়ে দেওয়া হয়। প্যাকেজের শর্ত দেখে নিন।
৫. রাউটারে অনেক ডিভাইস: বাসার ওয়াইফাইতে প্রতিবেশী বা অচেনা কেউ যুক্ত থাকলে সবার গতি ভাগ হয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
ইন্টারনেট ফাস্ট করার উপায়: মোবাইল ডেটার জন্য
১. নেটওয়ার্ক মোড ঠিক করুন: ফোনের সেটিংসে মোবাইল নেটওয়ার্ক বা সিম অংশে পছন্দের নেটওয়ার্ক ধরন হিসেবে ফোরজি বা এলটিই, আর সমর্থন করলে ফাইভজি অন্তর্ভুক্ত রাখুন। ভুল করে টুজি বা থ্রিজিতে আটকে থাকলে গতি অনেক কমে যায়।
২. ডেটার সিম ঠিক আছে কি না: দুই সিমের ফোনে যে সিমে ডেটা প্যাক কেনা, মোবাইল ডেটার জন্য সেটিই নির্বাচন করা আছে কি না দেখুন। সাধারণত ফোরজি সংযোগ একটি সিমেই সবচেয়ে ভালো চলে।
৩. এয়ারপ্লেন মোড অন-অফ: কয়েক সেকেন্ডের জন্য এয়ারপ্লেন মোড চালু করে আবার বন্ধ করলে ফোন নতুন করে কাছের টাওয়ার খোঁজে। অনেক সময় এতেই গতি ফেরে।
বিজ্ঞাপন
৪. জায়গা বদলান: জানালার পাশে বা খোলা জায়গায় গেলে সংকেত শক্তিশালী হয়। স্ট্যাটাস বারে সংকেতের দাগ খেয়াল করুন।
৫. ব্যাকগ্রাউন্ড ডেটা নিয়ন্ত্রণ: সেটিংসে ডেটা ব্যবহারের তালিকা দেখে যে অ্যাপগুলো বেশি ডেটা খাচ্ছে, সেগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ড ডেটা সীমিত করুন। অ্যাপ হালনাগাদ শুধু ওয়াইফাইতে হওয়ার সেটিং দিন।
৬. নেটওয়ার্ক সেটিং রিসেট: অন্য কিছুতে কাজ না হলে সেটিংস থেকে নেটওয়ার্ক সেটিং রিসেট করতে পারেন। এতে সংরক্ষিত ওয়াইফাই পাসওয়ার্ডগুলোও মুছে যায়, তাই আগে লিখে রাখুন।
৭. ভিপিএন বন্ধ রাখুন: প্রয়োজন ছাড়া ভিপিএন চালু থাকলে ডেটা দূরের সার্ভার ঘুরে আসে বলে গতি কমে যায়।
বিজ্ঞাপন
ইন্টারনেট দ্রুত করার উপায়: ওয়াইফাইয়ের জন্য
১. রাউটারের জায়গা: রাউটার আলমারির ভেতরে, মেঝেতে বা রান্নাঘরের পাশে না রেখে বাসার মাঝামাঝি খোলা ও উঁচু জায়গায় রাখুন। মাইক্রোওয়েভ ওভেন, বড় আয়না ও পানির ট্যাংক সংকেতে বাধা দেয়।
২. রাউটার রিস্টার্ট: দীর্ঘদিন একটানা চালু থাকলে রাউটার ধীর হয়ে যেতে পারে। বিদ্যুৎ সংযোগ খুলে আধা মিনিট পর আবার চালু করুন।
৩. শক্ত পাসওয়ার্ড: রাউটারের ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড বদলে দীর্ঘ ও কঠিন পাসওয়ার্ড দিন। নিরাপত্তা হিসেবে ডব্লিউপিএটু বা তার চেয়ে নতুন পদ্ধতি বেছে নিন। রাউটারের সেটিং পাতায় সংযুক্ত ডিভাইসের তালিকায় অচেনা কিছু থাকলে সরিয়ে দিন।
বিজ্ঞাপন
৪. দুই ব্যান্ডের সুবিধা: ডুয়াল ব্যান্ড রাউটারে দুটি নেটওয়ার্ক থাকে। কাছাকাছি থাকলে পাঁচ গিগাহার্টজ ব্যান্ড বেশি গতি দেয়, আর দূরের ঘরে বা দেয়ালের ওপারে আড়াই গিগাহার্টজ ভালো পৌঁছায়।
৫. তার ও সংযোগ দেখুন: সেবাদাতার তার কোথাও ভাঁজ হয়ে বা কেটে থাকলে গতি ওঠানামা করে। কম্পিউটার বা স্মার্ট টিভি রাউটারের কাছে থাকলে তার দিয়ে সরাসরি যুক্ত করলে সবচেয়ে স্থিতিশীল গতি পাওয়া যায়।
৬. পুরোনো রাউটার বদলান: বহু বছরের পুরোনো রাউটার নতুন উচ্চগতির প্যাকেজের পুরো সুবিধা দিতে পারে না। বড় বাসায় একটি রাউটারে না কুলালে মেশ ব্যবস্থা বা রিপিটার ভাবতে পারেন।
গতি মেপে দেখুন, তারপর সেবাদাতাকে জানান
বিজ্ঞাপন
বিশ্বাসযোগ্য কোনো স্পিড টেস্ট ওয়েবসাইট বা অ্যাপে দিনের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে কয়েকবার গতি মাপুন। মাপার সময় অন্য ডাউনলোড বন্ধ রাখুন এবং সম্ভব হলে রাউটারের কাছে বা তার দিয়ে যুক্ত হয়ে মাপুন। তাহলে বোঝা যাবে সমস্যা রাউটারের, ঘরের, নাকি সেবাদাতার।
যদি দেখা যায় রাউটারের পাশে বসেও নিয়মিত প্যাকেজের ঘোষিত গতির চেয়ে অনেক কম পাচ্ছেন, তাহলে ফলাফলের স্ক্রিনশট রেখে সেবাদাতার হেল্পলাইনে অভিযোগ করুন। মোবাইল ডেটায় নির্দিষ্ট এলাকায় দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে অপারেটরকে এলাকার নাম জানিয়ে অভিযোগ করুন। প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থাও ব্যবহার করা যায়।
ফোনের ভেতরের কিছু কারণ
কখনো সংযোগ ঠিক থাকলেও ফোন নিজেই ধীর হয়ে থাকে, তখন মনে হয় ইন্টারনেট স্লো। ফোনের স্টোরেজ পুরো ভরে থাকলে, ব্রাউজারের অতিরিক্ত ক্যাশ জমে থাকলে বা পুরোনো সফটওয়্যার চললে ওয়েবপাতা খুলতে দেরি হয়। মাঝে মাঝে অপ্রয়োজনীয় ফাইল মুছুন, ব্রাউজারের ক্যাশ পরিষ্কার করুন এবং সফটওয়্যার হালনাগাদ রাখুন। একসঙ্গে অনেক ট্যাব খোলা রাখার অভ্যাসও ছাড়ুন।
বিজ্ঞাপন
ডেটা সাশ্রয়ের কিছু সেটিংও পরোক্ষভাবে গতির অনুভূতি বাড়ায়। ভিডিও অ্যাপে মান স্বয়ংক্রিয় না রেখে মোবাইল ডেটায় মাঝারি মানে দেখলে বাফারিং কমে। সামাজিক মাধ্যমের অ্যাপে ভিডিও নিজে থেকে চালু হওয়া বন্ধ রাখলে পাতা দ্রুত লোড হয়। আর মেসেজিং অ্যাপে ছবি ও ভিডিওর স্বয়ংক্রিয় ডাউনলোড বন্ধ রাখলে জরুরি কাজের সময় পুরো গতি হাতে থাকে।
পরিবারে একাধিক মানুষ একই ওয়াইফাই ব্যবহার করলে কাজ ভাগ করে নিন। কেউ বড় ফাইল নামাচ্ছেন বা উচ্চমানের ভিডিও দেখছেন, অথচ আরেকজনের জরুরি অনলাইন মিটিং চলছে, এমন হলে দ্বিতীয়জনের সংযোগ ভেঙে যাবেই। বড় ডাউনলোড ও সফটওয়্যার হালনাগাদ রাতের দিকে বা কম ব্যবহারের সময়ে রাখলে সবার জন্যই ভালো।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
রাতে ইন্টারনেট স্লো হয় কেন?
বিজ্ঞাপন
সন্ধ্যা ও রাতে সবচেয়ে বেশি মানুষ একসঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। টাওয়ার ও সেবাদাতার নেটওয়ার্কে চাপ বাড়ায় গতি কমে যায়।
স্পিড বুস্টার অ্যাপ কি কাজ করে?
না, এসব অ্যাপ নেটওয়ার্কের গতি বাড়াতে পারে না। উল্টো বিজ্ঞাপন দেখায় ও অপ্রয়োজনীয় অনুমতি নেয়।
ওয়াইফাই আছে কিন্তু ইন্টারনেট নেই দেখাচ্ছে কেন?
বিজ্ঞাপন
এর মানে ফোন রাউটারের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু রাউটার সেবাদাতার সঙ্গে যুক্ত নয়। রাউটার রিস্টার্ট দিন, তার দেখুন, বিল বকেয়া কি না দেখুন, তারপরও না হলে সেবাদাতাকে জানান।
ফাইভজি ফোন হলেই কি গতি বেশি পাব?
শুধু ফোন ফাইভজি সমর্থন করলেই হবে না, আপনার এলাকায় অপারেটরের ফাইভজি নেটওয়ার্ক থাকতে হবে এবং সিম ও প্যাকেজও তা সমর্থন করতে হবে।