মেছতা দূর করার উপায়: কেন হয়, ঘরোয়া যত্ন ও রোদ থেকে সুরক্ষা
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
গালের দুই পাশে, কপালে, নাকের ওপর বা ঠোঁটের ওপরে বাদামি বা ধূসর ছোপ, কিনারা অসমান, কিন্তু চুলকানি বা ব্যথা নেই। আয়নায় এই দাগ দেখে অনেকেই মন খারাপ করেন, আর তাড়াহুড়া করে দোকান থেকে 'দ্রুত ফর্সা করার' ক্রিম কিনে আনেন। এখান থেকেই শুরু হয় আসল বিপদ।
বিজ্ঞাপন
মেছতা ত্বকের রং তৈরির কোষগুলোর অতিরিক্ত সক্রিয়তার ফল। রোদ, হরমোন আর বংশগত প্রবণতা মিলে এটি তৈরি হয়। তাই মেছতা দূর করার প্রথম ও সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো রোদ থেকে ত্বককে রক্ষা করা: প্রতিদিন সানস্ক্রিন, ছাতা আর টুপি। এর সঙ্গে কোমল ত্বকচর্চা ও প্রয়োজনে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের দেওয়া চিকিৎসায় দাগ অনেকটাই হালকা হয়।
সত্যি কথা হলো, মেছতা একবারে চিরতরে সারানোর নিশ্চিত উপায় নেই। দাগ হালকা হওয়ার পরও রোদে অসাবধান হলে আবার ফিরে আসে। তাই একে দীর্ঘমেয়াদি যত্নের বিষয় হিসেবে দেখাই বাস্তবসম্মত।
মেছতা কেন হয়
সূর্যের আলো: রোদের অতিবেগুনি রশ্মি এবং দৃশ্যমান আলো ত্বকের রং তৈরির কোষকে উসকে দেয়। আমাদের দেশের কড়া রোদে বাইরে কাজ করা মানুষ, রোদে যাতায়াত করা শিক্ষার্থী বা চাকরিজীবীদের মধ্যে তাই মেছতা বেশি দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
হরমোন: নারীদের মধ্যে মেছতা অনেক বেশি। গর্ভাবস্থায় অনেকের মুখে মেছতা দেখা দেয়, যা প্রসবের পর কিছুটা কমে যেতে পারে। জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বা হরমোনজাতীয় ওষুধও কারণ হতে পারে।
বংশগত প্রবণতা: পরিবারে মা বা বোনের মেছতা থাকলে আপনারও হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বাদামি বা শ্যামলা ত্বকে মেছতা তুলনামূলক বেশি হয়।
তাপ ও চুলার আঁচ: দীর্ঘক্ষণ চুলার পাশে রান্না বা তাপের কাছে কাজ করলেও মেছতা বাড়তে পারে বলে মনে করা হয়।
ভুল প্রসাধনী: সুগন্ধিযুক্ত বা ত্বকে জ্বালা ধরায় এমন প্রসাধনী ব্যবহারে প্রদাহ হয়ে দাগ আরও গাঢ় হয়।
বিজ্ঞাপন
মেছতা ছোঁয়াচে নয় এবং সাধারণত শরীরের অন্য কোনো অসুখের লক্ষণ নয়। তবে দাগ হঠাৎ রং বদলালে, উঁচু হয়ে উঠলে বা রক্ত পড়লে সেটা মেছতা নাও হতে পারে, দ্রুত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ দেখান।
সানস্ক্রিন: চিকিৎসার প্রথম ধাপ
অন্য যেকোনো ক্রিম বা চিকিৎসা কাজ করবে না যদি রোদ থেকে সুরক্ষা না থাকে। তাই সানস্ক্রিন ব্যবহারের নিয়ম ঠিকঠাক জেনে নিন।
১. কোনটি বেছে নেবেন: 'ব্রড স্পেকট্রাম' লেখা, অন্তত এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি সানস্ক্রিন বেছে নিন। মেছতার জন্য রঙিন বা টিন্টেড সানস্ক্রিন বিশেষ উপকারী, কারণ এতে থাকা আয়রন অক্সাইড দৃশ্যমান আলো থেকেও কিছুটা সুরক্ষা দেয়।
বিজ্ঞাপন
২. পরিমাণ: পুরো মুখ ও গলার জন্য মোটামুটি দুই আঙুলের দৈর্ঘ্য সমান সানস্ক্রিন লাগে। অল্প লাগালে সুরক্ষা অনেক কমে যায়।
৩. কখন লাগাবেন: বাইরে বের হওয়ার পনেরো-বিশ মিনিট আগে। ঘরে থাকলেও জানালার পাশে বসলে লাগান।
৪. আবার লাগানো: বাইরে থাকলে প্রতি দুই-তিন ঘণ্টা পরপর, ঘামলে বা মুখ ধোয়ার পর আবার লাগান।
৫. শুধু রোদের দিনে নয়: মেঘলা দিনেও অতিবেগুনি রশ্মি থাকে, তাই প্রতিদিন।
বিজ্ঞাপন
সানস্ক্রিনের সঙ্গে চওড়া কিনারার টুপি, ছাতা ও সানগ্লাস ব্যবহার করুন। সম্ভব হলে সকাল দশটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত কড়া রোদ এড়িয়ে চলুন।
ঘরোয়া পদ্ধতিতে মেছতা দূর করা: কী আশা করবেন
ঘরোয়া উপায়ে মেছতা পুরো দূর হয় না, তবে কোমল যত্ন ত্বককে সুস্থ রাখে এবং চিকিৎসার পাশাপাশি সহায়ক হতে পারে।
অ্যালোভেরা জেল: তাজা অ্যালোভেরার পাতা কেটে ভেতরের স্বচ্ছ জেল রাতে দাগের ওপর পাতলা করে লাগিয়ে সকালে ধুয়ে ফেলতে পারেন। এটি ত্বক শীতল ও আর্দ্র রাখে। কিছু গবেষণায় দাগ সামান্য হালকা হওয়ার ইঙ্গিত আছে।
বিজ্ঞাপন
টক দই ও মধু: এক টেবিল চামচ টক দইয়ের সঙ্গে আধা চা-চামচ মধু মিশিয়ে দশ-পনেরো মিনিট লাগিয়ে রেখে ধুয়ে ফেলুন। এটি ত্বক কোমল রাখে।
গ্রিন টি: ঠান্ডা গ্রিন টিতে তুলা ভিজিয়ে মুখে লাগালে ত্বক আরাম পায়।
যা এড়িয়ে চলবেন: সরাসরি লেবুর রস, টুথপেস্ট, বেকিং সোডা, কাঁচা রসুন বা খুব ঘষা স্ক্রাব মুখে লাগাবেন না। এগুলো ত্বকে জ্বালা ও প্রদাহ তৈরি করে, আর প্রদাহ থেকে মেছতা আরও গাঢ় হয়। লেবুর রস রোদে ত্বককে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।
যেকোনো নতুন উপাদান মুখে লাগানোর আগে কানের পেছনে বা হাতের ভেতরের দিকে অল্প লাগিয়ে এক দিন অপেক্ষা করুন।
বিজ্ঞাপন
স্টেরয়েড ও পারদযুক্ত ক্রিম থেকে সাবধান
বাজারে নাম-পরিচয়হীন অনেক 'মেছতার ক্রিম' বা 'রাতারাতি ফর্সা' হওয়ার ক্রিম বিক্রি হয়। এর অনেকগুলোতে স্টেরয়েড বা পারদের মতো ক্ষতিকর উপাদান থাকে। প্রথম কয়েক সপ্তাহে ত্বক উজ্জ্বল দেখালেও দীর্ঘ ব্যবহারে ত্বক পাতলা হয়ে যায়, লাল রক্তনালি ফুটে ওঠে, ব্রণ বাড়ে এবং ক্রিম বন্ধ করলে দাগ আগের চেয়েও খারাপ হয়ে ফিরে আসে। পারদ শরীরের ভেতরেও ক্ষতি করতে পারে।
তাই পরিচিত কারও পরামর্শে বা বিউটি পার্লারের কথায় কোনো ওষুধি ক্রিম ব্যবহার করবেন না। মেছতার যে ক্রিমগুলো সত্যিই কাজ করে, সেগুলো চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শে নির্দিষ্ট মাত্রা ও সময়ের জন্য ব্যবহার করতে হয়।
চিকিৎসকের কাছে কী চিকিৎসা মেলে
বিজ্ঞাপন
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ সাধারণত দাগের গভীরতা দেখে চিকিৎসা ঠিক করেন। এর মধ্যে থাকতে পারে দাগ হালকা করার প্রেসক্রিপশন ক্রিম, অ্যাজেলাইক অ্যাসিড বা নিয়াসিনামাইডের মতো উপাদানযুক্ত প্রসাধনী, প্রয়োজনে কেমিক্যাল পিল এবং কিছু ক্ষেত্রে লেজার। প্রতিটি চিকিৎসার সুবিধা ও ঝুঁকি আছে, ভুলভাবে করলে দাগ উল্টো বাড়তে পারে। তাই শুধু প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের কাছেই এসব করান।
চিকিৎসায় ফল পেতে সাধারণত দুই-তিন মাস বা তার বেশি সময় লাগে। দাগ হালকা হওয়ার পর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সানস্ক্রিন ও চিকিৎসকের দেওয়া রুটিন চালিয়ে যেতে হয়। গর্ভাবস্থা বা বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় অনেক ক্রিম ব্যবহার নিষেধ, তাই অবশ্যই চিকিৎসককে জানাবেন।
প্রতিদিনের সহজ রুটিন
সকালে কোমল ফেসওয়াশে মুখ ধুয়ে হালকা ময়েশ্চারাইজার, তারপর সানস্ক্রিন। দুপুরে বাইরে থাকলে আবার সানস্ক্রিন। রাতে মুখ ধুয়ে চিকিৎসকের দেওয়া ক্রিম অথবা শুধু ময়েশ্চারাইজার।
বিজ্ঞাপন
পর্যাপ্ত ঘুম, প্রচুর শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া এবং মানসিক চাপ কমানো ত্বকের সার্বিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। মুখে বারবার হাত দেওয়া বা দাগ খোঁটার অভ্যাস থাকলে বাদ দিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মেছতা কি একেবারে সেরে যায়?
অনেকের দাগ চিকিৎসায় প্রায় মিলিয়ে যায়, আবার অনেকের হালকা হয় কিন্তু পুরো যায় না। রোদ থেকে সুরক্ষা না থাকলে আবার ফিরে আসার প্রবণতা থাকে।
বিজ্ঞাপন
গর্ভাবস্থার মেছতা কি প্রসবের পর চলে যায়?
অনেক ক্ষেত্রে প্রসবের পর কয়েক মাসে কিছুটা বা অনেকটা কমে যায়। না কমলে বুকের দুধ খাওয়ানো শেষে বা চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা শুরু করা যায়।
পুরুষদেরও কি মেছতা হয়?
হয়, তবে নারীদের তুলনায় কম। পুরুষদের ক্ষেত্রেও রোদই প্রধান কারণ, আর চিকিৎসার নিয়ম একই।
বিজ্ঞাপন
ঘরে থাকলেও কি সানস্ক্রিন দরকার?
জানালা দিয়ে আসা আলো এবং দৃশ্যমান আলোও মেছতা বাড়াতে পারে। তাই ঘরে থাকলেও দিনের বেলা সানস্ক্রিন লাগানো ভালো, বিশেষ করে আলোকিত ঘরে থাকলে।
মেছতা আর ফ্রেকল বা তিল কি একই জিনিস?
না। ফ্রেকল ছোট ছোট বিন্দুর মতো দাগ, তিল সাধারণত গোল ও সামান্য উঁচু হতে পারে। মেছতা বড় বড় ছোপ আকারে মুখের দুই পাশে সমানভাবে ছড়িয়ে থাকে। কোনটি কী, তা নিশ্চিত হতে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ দেখানোই ভালো, কারণ চিকিৎসাও আলাদা।